নতুন ব্রি ধান-১১৮ : দুই মাস আগেই ঘরে উঠবে বোরো, কমবে ঝুঁকি
- আপলোড সময় : ১০-০৬-২০২৬ ১১:৩৩:৪৮ পূর্বাহ্ন
- আপডেট সময় : ১০-০৬-২০২৬ ১১:৩৩:৪৮ পূর্বাহ্ন
স্টাফ রিপোর্টার ::
সুনামগঞ্জ হাওরাঞ্চলের কৃষকদের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ, অকাল বন্যা, পাহাড়ি ঢল ও অতিবৃষ্টিতে বোরো ধানহানির শঙ্কা দূর করতে নতুন আশার বার্তা নিয়ে এসেছে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি)। গবেষকদের উদ্ভাবিত নতুন উচ্চফলনশীল জাত ব্রি ধান-১১৮ প্রচলিত সময়ের তুলনায় প্রায় দুই মাস আগেই রোপণ ও আগাম ঘরে তোলা সম্ভব হবে। ফলে বর্ষা মৌসুম শুরুর আগেই কৃষকরা তাদের কাক্সিক্ষত ফসল নিরাপদে ঘরে তুলতে পারবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রতিবছর আকস্মিক বন্যা ও পাহাড়ি ঢলে হাওরাঞ্চলের লাখো কৃষক ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েন। চলতি বছরও মাত্র ৯ দিনের বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সুনামগঞ্জসহ দেশের সাত জেলার হাওরাঞ্চলে ৪৯ হাজার ৭৩ হেক্টর জমির বোরো ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যার আনুমানিক আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় এক হাজার ৪৭ কোটি টাকা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৬ এপ্রিল থেকে ৪ মে পর্যন্ত সময়ে সৃষ্ট বন্যা ও জলাবদ্ধতায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন দুই লাখ ৩৬ হাজার ৮১১ জন ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও বর্গাচাষি। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে সুনামগঞ্জ জেলায়, যেখানে ধানের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৫১৮ কোটি টাকা। এছাড়া নেত্রকোণা, কিশোরগঞ্জ, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, সিলেট ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চলেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় উদ্ভাবিত ব্রি ধান-১১৮ হাওরাঞ্চলের কৃষিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে বলে মনে করছেন কৃষি বিশেষজ্ঞরা। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের সিনিয়র সায়েন্টিফিক কর্মকর্তা ড. মো. রেজওয়ান ভূঁইয়া জানান, এই জাতের ধান কার্তিক মাসে, অর্থাৎ ২৫ অক্টোবর থেকে ৫ নভেম্বরের মধ্যে রোপণ করা যাবে। শীতসহনশীল হওয়ায় ধানগাছ স্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠবে এবং বর্ষা মৌসুম শুরু হওয়ার আগেই ফসল কাটা সম্ভব হবে।
তিনি বলেন, হাওরাঞ্চলের কৃষকরা বছরের পর বছর অকাল বন্যার কারণে ক্ষতির মুখে পড়ছেন। নতুন জাতের এই ধান আগাম রোপণ ও আগাম কর্তনের সুযোগ সৃষ্টি করবে, যা কৃষকদের ঝুঁকি অনেকাংশে কমিয়ে দেবে।
বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) উপ-পরিচালক (বীজ বিপণন) কৃষিবিদ মো. হুমায়ূন কবীর বলেন, ব্রি ধান-১১৮ দ্রুত কৃষকদের কাছে পৌঁছে দিতে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। আগামী মৌসুম থেকেই কৃষকরা এই বীজ সংগ্রহ করতে পারবেন।
সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. আবদুল আজিজ মনে করেন, হাওরাঞ্চলের জন্য এটি একটি যুগান্তকারী উদ্ভাবন। তিনি বলেন, বর্ষার আগেই ধান ঘরে তোলা গেলে কৃষকদের আর ফসল হারানোর শঙ্কায় থাকতে হবে না। দীর্ঘদিনের একটি বড় সমস্যার কার্যকর সমাধান হতে পারে এই জাত।
হাওরাঞ্চলে বোরো ধানের ক্ষয়ক্ষতির ইতিহাসও উদ্বেগজনক। ২০১৭ সালের ভয়াবহ বন্যায় প্রায় ৫ হাজার ৩০০ কোটি টাকার ধান নষ্ট হয়েছিল। ২০২২ সালেও ক্ষতির পরিমাণ ছিল প্রায় ১০০ কোটি টাকা। আর চলতি বছর ক্ষতির পরিমাণ ছাড়িয়েছে এক হাজার কোটি টাকা। এমন বাস্তবতায় আগাম ফলনশীল ও স্বল্পমেয়াদি ধানের নতুন জাতকে হাওরবাসীর জন্য ‘স্বপ্নের ধান’ হিসেবে দেখছেন কৃষিবিদরা।
কৃষি সংশ্লিষ্টদের আশা, মাঠপর্যায়ে সফলভাবে বিস্তার ঘটানো গেলে ব্রি ধান-১১৮ শুধু হাওরাঞ্চলের কৃষকদের ফসল রক্ষাই করবে না, বরং দেশের খাদ্য নিরাপত্তা জোরদার করতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ

স্টাফ রিপোর্টার, দৈনিক সুনামকণ্ঠ