সোনালী চেলা নদীতে ড্রেজারের তান্ডব, বিলীনের পথে ছয় গ্রাম
- আপলোড সময় : ০৫-০৭-২০২৬ ০৮:০৮:৫৫ অপরাহ্ন
- আপডেট সময় : ০৫-০৭-২০২৬ ০৮:০৮:৫৫ অপরাহ্ন
দোয়ারাবাজার প্রতিনিধি ::
মেঘালয়ের পাহাড় থেকে নেমে আসা স্বচ্ছ জলের পাহাড়ি নদী সোনালী চেলা একসময় ছিল প্রকৃতিপ্রেমী ও পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্র। দুই তীরের কাশবন আর স্বচ্ছ স্রোতের সেই নদী এখন দোয়ারাবাজার উপজেলার সীমান্তবর্তী ছয় গ্রামের মানুষের কাছে আতঙ্কের নাম। বছরের পর বছর ইজারার আড়ালে ড্রেজার মেশিন দিয়ে নির্বিচারে বালু উত্তোলনের ফলে নদীভাঙনে বিলীন হচ্ছে বসতভিটা, ফসলি জমি ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। অথচ দীর্ঘদিন ধরে মানববন্ধন, বিক্ষোভ ও সংবাদ প্রকাশের পরও থামছে না এই ধ্বংসযজ্ঞ।
শনিবার (৪ জুলাই) অবৈধ ড্রেজার বন্ধের দাবিতে আবারও মানববন্ধন করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তবে এটি নতুন কোনো ঘটনা নয়। এর আগেও বহুবার একই দাবিতে আন্দোলনে নেমেছেন সীমান্তবর্তী নরসিংপুর ইউনিয়নের পূর্বচাইরগাঁও, সারপিনপাড়া, সোনাপুর, চাইরগাঁও, হাবিবনগর ও রহিমের পাড়ার মানুষ। গত বছরের ৮ আগস্ট কয়েকশ শ্রমিক ও গ্রামবাসী পূর্বচাইরগাঁও খেয়াঘাট থেকে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে কাস্টমস অফিস ও বিজিবি টহল পোস্ট অতিক্রম করে সোনালী চেলা বিজিবি ক্যাম্প পর্যন্ত গিয়ে ড্রেজার বন্ধের দাবি জানিয়েছিলেন। কিন্তু আন্দোলনের পরও পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হয়নি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
বাসিন্দাদের ভাষ্যমতে, সারপিনপাড়া, পূর্বচাইরগাঁও, পূর্বসোনাপুর, রহিমের পাড়া, নাছিমপুর ও সোনাপুর - এই ছয় গ্রামের শতাধিক বসতভিটা এবং কয়েকশ একর কৃষিজমি ইতোমধ্যে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। নদীর তীরঘেঁষা একাধিক পাকা ঘরের ভাঙা অংশ এখনো পানিতে পড়ে আছে। ভাঙনের তীব্রতায় অনেক স্থানে নদীর গতিপথও পরিবর্তিত হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, জেলা প্রশাসন প্রতিবছর চেলা নদী বালুমহাল হিসেবে ইজারা দিয়ে কয়েক কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করলেও ইজারার শর্ত মানা হচ্ছে না। অনুমোদিত সীমার বাইরে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে ড্রেজার মেশিন, নদীর তলদেশ গভীরভাবে খননের পাশাপাশি কেটে ফেলা হচ্ছে বসতিসংলগ্ন পাড়। ফলে নদীভাঙন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।
বালুমহাল ব্যবস্থাপনা বিধিমালা অনুযায়ী, ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে বালু উত্তোলনের ফলে নদীতীর ভাঙনের আশঙ্কা থাকলে সেখানে বালু তোলা যাবে না। নদী বিশেষজ্ঞদের মতে, নদীর তীর, সেতু, বাঁধ ও ফসলি জমি থেকে নিরাপদ দূরত্ব - অন্তত এক কিলোমিটার বজায় রেখে বালু উত্তোলন করতে হয়। কিন্তু সোনালী চেলা নদীর ক্ষেত্রে এসব বিধির কোনোটি মানা হচ্ছে না বলে অভিযোগ এলাকাবাসীর।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, সরকারের কয়েক কোটি টাকার রাজস্বের বিনিময়ে যদি শতাধিক পরিবার ভিটেমাটি হারায়, কয়েকশ একর কৃষিজমি নদীগর্ভে চলে যায় এবং সরকারি অবকাঠামো হুমকির মুখে পড়ে, তবে সেই ক্ষতির দায় নেবে কে?
এই বালু উত্তোলন শুধু নদীভাঙনই নয়, প্রাণহানির ঘটনাও ঘটিয়েছে। গত ১৮ মে সোনালী চেলা নদীতে বালু পরিবহনের সময় বজ্রপাতে দুই শ্রমিক নিহত হন। দুই দিন পর সারপিনপাড়া এলাকায় নদীতে ভেসে ওঠে আরও এক শ্রমিকের মরদেহ। স্থানীয়দের অভিযোগ, ঝুঁকি নিয়ে দিনরাত কাজ করেন দরিদ্র শ্রমিকেরা, আর বিপুল মুনাফা যায় একটি প্রভাবশালী চক্রের হাতে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক বাসিন্দা অভিযোগ করেন, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ‘ম্যানেজ’ করে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট বছরের পর বছর বেপরোয়াভাবে বালু উত্তোলন করছে। তাদের দাবি, নদীর পাড় কেটে অন্তত ১০ থেকে ১৫ জন ব্যক্তি বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। প্রতিবাদ করতে গেলে হামলা-মামলা ও নানা ধরনের হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।
পূর্বচাইরগাঁও গ্রামের বিএনপি নেতা নুরুল ইসলাম নুরু বলেন, একসময় এই নদীই ছিল মানুষের কর্মসংস্থানের উৎস। হাতে বেলচা দিয়ে সনাতন পদ্ধতিতে বালু তুললে নদীও টিকে থাকত, মানুষের জীবিকাও চলত। এখন ড্রেজারের কারণে নদী ধ্বংস হচ্ছে, গ্রাম হারিয়ে যাচ্ছে। তিনি নদীর ইজারা বাতিল, অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ এবং জড়িতদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানান।
নদী বিশেষজ্ঞ ও রিভারাইন পিপলের গবেষণায় বলা হয়েছে, দেশে ৮০টির বেশি নদ-নদী থেকে বালু উত্তোলন করা হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় হাইড্রোগ্রাফিক জরিপ ও পরিবেশগত মূল্যায়ন ছাড়াই ইজারা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অনিয়ন্ত্রিতভাবে নদীর তলদেশ খনন ও পাড় কেটে বালু উত্তোলনের ফলে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও ভারসাম্য নষ্ট হয়, যার পরিণতিতে ভয়াবহ নদীভাঙন দেখা দেয়। অর্থাৎ সোনালী চেলার বর্তমান সংকট কেবল প্রাকৃতিক নয়, এটি অনেকাংশেই মানবসৃষ্ট।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের নদীগুলোর মতো সোনালী চেলা নদীতেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে - ইজারার শর্ত লঙ্ঘন করে ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন, নদীভাঙনে নিঃস্ব হচ্ছে মানুষ, অথচ কার্যকর প্রতিকার মিলছে না।
এ বিষয়ে দোয়ারাবাজার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অরূপ রতন সিংহ বলেন, অবৈধ ড্রেজার মেশিন বন্ধে প্রশাসন তৎপর রয়েছে।
তবে সীমান্তবর্তী নদীতীরের বাসিন্দাদের প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে- যে নদী থেকে প্রতিবছর কোটি কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হয়, সেই নদীর ভাঙনে সর্বস্ব হারানো মানুষের দায় কি রাষ্ট্র এড়াতে পারে? বছরের পর বছর আন্দোলনের স্লোগান মিলিয়ে যাচ্ছে সোনালী চেলার স্রোতে, কিন্তু ভাঙন থামছে না, মিলছে না জবাবও।
নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ

দোয়ারাবাজার প্রতিনিধি