হাওরের আতঙ্ক ‘আফাল’ : টেকসই সুরক্ষায় এখনই কার্যকর উদ্যোগ চাই
- আপলোড সময় : ১৭-০৭-২০২৬ ০৯:২৯:১৭ পূর্বাহ্ন
- আপডেট সময় : ১৭-০৭-২০২৬ ০৯:২৯:১৭ পূর্বাহ্ন
সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে বর্ষা মানেই শুধু প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য নয়, বরং হাজারো মানুষের জন্য এক নির্মম আতঙ্কের নাম ‘আফাল’। বিশাল হাওরে সৃষ্ট প্রবল ঢেউ বছরের পর বছর বসতভিটা, ফসলি জমি ও জনপদকে গ্রাস করছে। প্রতি বর্ষায় অসংখ্য পরিবার ঘরবাড়ি হারিয়ে নিঃস্ব হচ্ছে, আবার নৌকাডুবির ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনাও ঘটছে। অথচ এই দুর্যোগ হাওরবাসীর কাছে নতুন নয়; দীর্ঘদিন ধরেই তারা একই সংকটের মুখোমুখি।
বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার বাহাদুরপুর গ্রামের সাম্প্রতিক চিত্র গোটা হাওরাঞ্চলের বাস্তবতাকেই তুলে ধরে। টানা বৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল এবং আফালের সম্মিলিত আঘাতে একের পর এক বসতভিটা হাওরের গর্ভে বিলীন হচ্ছে। অনেক পরিবার নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ঘর ছেড়ে যেতে বাধ্য হচ্ছে। বাঁশ, বস্তা কিংবা কচুরিপানা দিয়ে সাময়িক প্রতিরোধ গড়ে তোলা হলেও তা প্রকৃতির প্রবল শক্তির কাছে অসহায় হয়ে পড়ে।
বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশকর্মীরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, হাওরের প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার ফলে আফালের তীব্রতা বেড়েছে। একসময় হিজল, করচসহ বিভিন্ন জলজ বৃক্ষ ও উদ্ভিদের প্রাকৃতিক বেষ্টনী ঢেউয়ের শক্তি অনেকাংশে শোষণ করত। নির্বিচারে গাছ নিধন, জলাভূমি ভরাট এবং অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণ সেই প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল করে দিয়েছে। ফলে আজ হাওরপাড়ের মানুষ আরও বেশি ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে।
আমরা মনে করি, শুধু ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে টিন বা ত্রাণ বিতরণ করে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ও বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা। ঝুঁকিপূর্ণ গ্রামগুলোতে টেকসই ভিলেজ প্রটেকশন ওয়াল নির্মাণ, হিজল-করচসহ দেশীয় জলজ বৃক্ষের ব্যাপক বনায়ন, হাওরের স্বাভাবিক জলপ্রবাহ ও পরিবেশ রক্ষা এবং ভাঙনপ্রবণ এলাকার নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এখন সময়ের দাবি। একই সঙ্গে দুর্যোগের আগাম সতর্কতা, নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র এবং নৌযান চলাচলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও জরুরি।
এটা বলার অপেক্ষা রাখেনা যে, হাওর বাংলাদেশের অর্থনীতি, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অঞ্চল। এখানকার মানুষের জীবন-জীবিকা সুরক্ষিত না হলে হাওরের টেকসই উন্নয়নও সম্ভব নয়। তাই আফালকে শুধুমাত্র মৌসুমি দুর্যোগ হিসেবে না দেখে জাতীয় পর্যায়ের একটি বিশেষ পরিবেশগত ও অবকাঠামোগত চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
আমরা হাওরবাসী প্রতিবছর একই দুর্ভোগের পুনরাবৃত্তি দেখতে চাই না। সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর, জনপ্রতিনিধি, পরিবেশবিদ এবং স্থানীয় জনগণের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে স্থায়ী সমাধানের পথ খুঁজে বের করাই এখন সবচেয়ে জরুরি। হাওরকে রক্ষা করা মানেই হাওরের মানুষকে রক্ষা করা - এই উপলব্ধি থেকেই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আর কোনো বিকল্প নেই।
নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদকীয়