:: বিশ্বজিত রায় ::
ইতিহাস নিজেকে নিজে তৈরি করে না। ইতিহাস লিখতে হয়। ইতিহাস কেউ লেখতে পারে, কেউ পারে না। ফুটবল ইতিহাসে যাঁরা অমলিন, তাঁদের মধ্যে লিওনেল মেসি অনন্য, অবিশ্বাস্য, অমোচনীয়। তাঁর দুই দশকের ফুটবল নৈপুণ্যে বশীভূত হয়েছে পৃথিবী। ফুটবলে মেসির অনবদ্য কীর্তি স্মরণ করিয়ে দেয় জীবনানন্দ দাশের অমর পঙক্তি- ‘এ পৃথিবী একবার পায় তারে, পায়নাকো আর।’ পৃথিবীর এই ফুটবল মঞ্চ লিওনেল মেসিকে হয়তো আর পাবে না। তবে তাঁর কীর্তি লেখা থাকবে ফুটবল বেঁচে থাকার আগ পর্যন্ত। ২০২৬ বিশ্বকাপ ফাইনালে স্পেনের ছন্দময় ফুটবল আর্জেন্টিনাকে হারিয়েছে ১-০ গোলে। মর্যাদার মঞ্চে হয়তো বিজয় ধরে রাখতে পারেনি আর্জেন্টিনা। পারেননি লিও। কিন্তু সম্মান-সমর্থনে মেসির প্রতি দর্শকের ভালোবাসার কি কমতি ছিল? দর্শক মেসিকে কতটা হৃদয়ে লালন করে তার উদাহরণ ফাইনাল মঞ্চ। রানার্সআপের পদকটা গলায় পরে নামার সময় গর্জে উঠেছিল নিউ জার্সির গ্যালারি- ‘মেসি! মেসি! মেসি!’ তিনি যে কিংবদন্তি। রক্তে-মাংসে মানুষ। আবেগ লুকাতে না পেরে ভাসলেন অশ্রুগঙ্গায়। সেই কান্না নতুন কিছু নয়। কখনও বেদনার বিষে নীল হয়ে, কখনও আনন্দে। ১৯ জুলাইয়ের ফাইনাল মঞ্চ যুক্তরাষ্ট্রের মেটলাইফ স্টেডিয়াম যেন কান্নার ডালি হয়ে থাকলো মেসির জন্য। ২০১৬ সালে সেই মেটলাইফ স্টেডিয়ামে কোপা আমেরিকা ফুটবল ফাইনালে চিলির কাছে হেরে হৃদয় ভেঙেছিল মেসির। টাইব্রেকারে ৪-২ গোলে হেরেছিল আর্জেন্টিনা। সেবার পেনাল্টি মিসের যাতনা জেঁকে বসেছিল মেসির উপর। ডাগআউটে বসে অঝোরে কেঁদেছিলেন। কষ্ট চেপে সেদিন অবসরের ঘোষণাও দিয়েছিলেন মেসি। কোটি ভক্তের ভালোবাসা-আকুতি ও হৃদয়ের টানে অবসর ভেঙে ফের ফুটবলে ফেরা। এরপর এক এক করে রচিত হলো অপ্রতিরোধ্য মেসি কাব্য। তাঁর নেতৃত্বে আর্জেন্টিনা জিতেছে ২০২১ কোপা আমেরিকা, ২০২২ ফিনালিসিমা, ২০২২ ফুটবল বিশ্বকাপ ও ২০২৪ কোপা আমেরিকা মেজর শিরোপা। বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে ৪৭টি বড় শিরোপা জিতেছেন মেসি। ৮ বার ব্যালন ডি’অর জেতা মেসি খেলেছেন তিনটি বিশ্বকাপ ফাইনাল। কিন্তু ফুটবলের গোধূলি বেলায় এসে পারলেন না। ২০২৬ বিশ্বকাপ শিরোপা হাতছাড়া হওয়ায় ফের কাঁদলেন রূপকথার জাদুকর। সেই দুঃখ ভারাক্রান্ত মেটলাইফ স্টেডিয়ামের সবুজ ঘাসের বুকে হয়তো লিখতে পারেননি মহাকাব্য। দুই দশকের ফুটবল ক্যারিয়ারে অসংখ্য বার রাঙিয়েছেন আদিগন্ত আকাশ। মেসির ব্যক্তিগত নৈপুণ্যে বিমোহিত হয়েছে ফুটবল দুনিয়া। সেই আটলান্টিকের উপকূল থেকে বঙ্গীয় বদ্বীপ। গোটা পৃথিবী মোহিত। মুগ্ধ একজনে। যাঁর দুই পায়ের জাদুতে ওলটপালট হয়েছে ইতিহাস। যাঁর নামে ফুটবল ঈশ্বরকে কীর্তির খেরোখাতায় প্রতিনিয়ত লিখতে হয়েছে নতুন কিছু। ফুটবলের ময়দান থেকে কীর্তিরা যাঁকে বারবার বসিয়েছে এভারেস্টের চূড়ায়। তিনি ক্ষুদে জাদুকর। ফুটবলের মহারাজা। সর্বকালের সেরা। শেষমেষ নিজেকে রাঙাতে পারেননি মেসি। পৃথিবী রাঙা সূর্যের যেন দিনশেষে রিক্ত হাতে ফেরা। ৩৯ বছরে এসে শেষ যাত্রায় শিরোপা, গোল্ডেন বুট, গোল্ডেন বল কিছুই পাওয়া হলো না তার। ক্যারিয়ারে এমন কিছু নেই, যা জেতেননি তিনি। কিন্তু বলতে হয়- কত রসিক ফুটবল। কখনও ইতিহাসের সেরা খেলোয়াড়কেও ফিরিয়ে দেয় খালি হাতে। ফাইনাল মঞ্চে পা রাখার আগে মেসি বারবার খোলেছেন জাদুর বাক্স। নকআউট পর্বে প্রতিটি খেলায় পরাজয় নিশ্চিতের শেষপ্রান্তে প্রতিপক্ষ সমর্থকেরা যখন আত্মতুষ্টির আকাশছোঁয়া ডানায় উড়ছে, তখন সব তুড়ি মেরে মেসি জাদু বারংবার জন্ম দিয়েছে রূপকথার রাজকীয় গল্প। দলের অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তনে প্রতিবার প্রাণ ফিরেছে শতকোটি ভক্ত, সমর্থক, ফুটবলপ্রেমীর বিষণœ দেহে। মেসির আঁধার বিকশিত ফুটবল আলোয় জেগে উঠেছে নিস্তব্ধ রাত। ক্ষুদে এই জাদুকর অভিজ্ঞতা, লড়াকু আত্মবিশ্বাস, মনোবল, ধৈর্য্য ও অদম্য মানসিকতায় ভর করে সতীর্থদের শিখিয়েছেন পুনর্জন্মের পাঠ। মেসি আজ রিক্ত-সিক্ত। তাঁর অপ্রাপ্তির অশ্রুগঙ্গায় ভাসছে কোটি ভক্তহৃদয়। কত শত মানুষ চিৎকার করে বলছে, তুমি কিংবদন্তী, তুমি সর্বকালের সেরা। হয়তো তুমি আর জাদুর ঝাঁপি খুলতে আসবে না। তবে তোমার জাদুকরী ছন্দ বেঁচে থাকবে ফুটবলের কল্পনায় কথনে। তুমি অমর। তুমি সর্বকালের সেরা।
নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha
ফুটবলে আঁধার বিকশিত আলো তুমি
- আপলোড সময় : ২২-০৭-২০২৬ ০৮:৫৮:০৩ পূর্বাহ্ন
- আপডেট সময় : ২২-০৭-২০২৬ ০৮:৫৯:২৩ পূর্বাহ্ন
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ

সুনামকন্ঠ ডেস্ক