সুনামগঞ্জ , শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২৬ , ১০ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
জামায়াত ফেরেশতাদের দল নয়, আমরাও মানুষ : শফিকুর রহমান গাজী সিনড্রোম এবং তার পেছনের মনস্তত্ত্ব অয়নৃত্য’র ৩য় বর্ষপূর্তি ও বর্ষা উৎসব ‘নীল নবঘনে’ নৃত্য-সুরে বর্ষার বন্দনা, মুগ্ধ দর্শক বৃক্ষরোপণই জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার কার্যকর উপায়: এমপি নূরুল ইসলাম নূরুল বিনামূল্যে অর্ধেক ভাগ না দেয়ায় জলমহাল দখলের অভিযোগ বিএনপি নেতাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগ, ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ দুই দশক পর টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্রে নতুন কূপ খননের পরিকল্পনা উদ্বোধনেই থমকে আছে সদর হাসপাতালের আইসিইউ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ভারত সফরের আমন্ত্রণ নরেন্দ্র মোদির শহরে জলাবদ্ধতাসহ নাগরিক দুর্ভোগ নিরসনের দাবি অপরাধমুক্ত সুনামগঞ্জ গড়তে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জামালগঞ্জে বাঁধ ভেঙে ঢুকছে পানি, প্লাবিত হচ্ছে বসতভিটা, আমন ফসল নিয়ে শঙ্কায় কৃষক জামায়াতে ইসলামী থেকে ‘ইসলামী’ শব্দ বাদ দেওয়ার দাবি যুবদল সভাপতির জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস পালনে প্রস্তুতিমূলক সভা জেলা পুলিশের অনলাইনভিত্তিক কুইজে প্রথম জেলা ছাত্রদলের সভাপতি পাহাড়ি ঢলে ভেঙেছে আছিয়ার শেষ আশ্রয়, অনিশ্চয়তায় জীবন ছাতক পৌরসভার টেকসই উন্নয়নে আইইউজিআইপি’র সভা জগন্নাথপুর পৌরসভার ২২ কোটি ৫০ লক্ষ টাকার বাজেট ঘোষণা অস্তিত্ব সংকটে পান্ডারখাল বাঁধ ওয়ার্ল্ড ভিশনের শিশুদের বার্ষিক সমাবেশ, ২ হাজার ৭৫০ শিশুর মাঝে উপহার বিতরণ

গাজী সিনড্রোম এবং তার পেছনের মনস্তত্ত্ব

  • আপলোড সময় : ২৫-০৭-২০২৬ ০১:৪২:১৭ অপরাহ্ন
  • আপডেট সময় : ২৫-০৭-২০২৬ ০১:৪৪:১৫ অপরাহ্ন
গাজী সিনড্রোম এবং তার পেছনের মনস্তত্ত্ব
সুলতানা স্বাতী::
আমি তখন ক্লাস সিক্স বা সেভেনে পড়ি। ওই সময় বিশেষ করে শীতকালে গ্রামের দিকে প্রায়ই ওয়াজ মাহফিল হতো। মাদ্রাসা চত্বরে বা খেলার মাঠে সামিয়ানা টানিয়ে ওয়াজের আয়োজন করা হতো। স্টেজে চেয়ারে বসে বা দাঁড়িয়ে মাওলানা সাহেবরা সুর করে ওয়াজ করতেন। সামনে, মাঠে চট বিছিয়ে মানুষজনের বসার ব্যবস্থা করা হতো। একপাশে নারীদের বসার জন্য পর্দাঘেরা ব্যবস্থাও থাকতো। প্রতিবেশী, বাবা-চাচাদের সাথে আমার মা, দাদি, ফুফুরাও মাঝে মাঝে সেই ওয়াজ শুনতে যেতেন। ওয়াজ শুরু হতো বেশ রাত করে, তাই বেশিক্ষণ থাকা হতো না। তবে খেলার মাঠের কাছে হওয়ায়, আমাদের বাড়ি থেকেই ওয়াজ শোনা যেতো। উঁচু বাঁশে চারদিকে চারটা মাইক বাঁধা থাকতো। তো ওইসব ওয়াজ মাহফিলের আয়োজকরা দলবেঁধে চাঁদা তুলতেন বাড়ি বাড়ি, স্কুল-কলেজ অথবা দোকান-রেস্টুরেন্টে গিয়ে। আমার ফুফু গার্লস স্কুলে চাকরি করতেন। আমরা স্কুলে যেতাম তার পিছে পিছে। একবার রাস্তায় তার কাছে চাঁদা চাইলেন আয়োজকরা। ফুফু ১০ টাকা দিলেন। মাহফিল ২/৩ দিন চলতো। পরদিন আবারও তারা চাঁদা চাইতে বের হয়েছেন। আর আমরাও রাস্তায়। স্কুলে যাচ্ছি। আগের দিন ১০ টাকা চাঁদা দেওয়া আমার ফুফু হুট করেই এক কা- করে বসলেন। এক আয়োজকের হাতে থাকা টাকার বান্ডিল থেকে নিজের দেওয়া ১০ টাকার নোটটা ছোঁ মেরে ছিনিয়ে নিয়ে বললেন- “আমার টাকা ফেরত দেন, আমি কোনও চান্দা-মান্দা দিমু না! সারা রাত মাইকে মেয়েদের বদনাম করছেন, তারা কী করবে আর কী করবে না সেই বয়ান দিছেন। তাদের হেদায়েত হতে বলছেন। পুরুষদের হেদায়েত হতে বলেন নাই কেন? আমি টাকাও দিমু, আবার মেয়েদের বদনামও শুনমু!” সেদিন ফুফুর ওই রাগ আর ক্ষোভের গভীরতা পুরোপুরি বোঝার বয়স আমার ছিল না। কিন্তু এখন বুঝি, আমাদের সমাজে ক্ষমতার আসনে বসে থাকা পুরুষরা নৈতিকতার ভাষা ব্যবহার করে কীভাবে নারীদের কাঠগড়ায় তোলেন। অথচ নিজেরা সেই একই নৈতিক মানদ-ের বাইরে অবস্থান করেন। সম্প্রতি সাতক্ষীরা-৪ আসনের তিনবারের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের ব্যক্তিগত ও নারীঘটিত বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে। পরবর্তীকালে তার দ্বিতীয় বিয়ে এবং আনুষঙ্গিক ঘটনাগুলোর পরিপ্রেক্ষিতে তিনি দল থেকেও বহিষ্কৃত হয়েছেন। তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়েও আলোচনা চলছে। এই নির্দিষ্ট ঘটনার সত্যতা ও দায় নির্ধারণের বিষয়টি অবশ্যই আইন, তদন্ত এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। তবে ঘটনাটি আবারও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নকে সামনে এনেছে- কেন একজন প্রভাবশালী সংসদ সদস্য বা জনপ্রতিনিধি বা কোনও ক্ষমতাধর ব্যক্তি নিজের ক্যারিয়ার, সম্মান এবং সামাজিক অবস্থান বাজি রেখে চরম ঝুঁকিপূর্ণ নৈতিক স্খলনে জড়ান? তিনি কি জানতেন না ধরা পড়ে যেতে পারেন? ধরা পড়ে গেলে কী অবস্থা হবে? তাহলে এত বড় ঝুঁকিতে তিনি কেন গেলেন? শুধু শারীরবৃত্তীয় চাহিদা নাকি ক্ষমতার মনস্তত্ত্ব? মনোবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এ ধরনের বেপরোয়া আচরণের পেছনে কাজ করে কিছু বিশেষ মানসিক প্রক্রিয়া। দীর্ঘদিন ক্ষমতার অবস্থানে থাকলে অনেকের মধ্যে এমন একটি বিশ্বাস তৈরি হতে পারে যে সাধারণ নিয়ম যেন তাদের ক্ষেত্রে পুরোপুরি প্রযোজ্য নয়। গবেষণায় দেখা গেছে, ক্ষমতা অনেক সময় মানুষের সহানুভূতি, আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং অন্যের অবস্থান থেকে চিন্তা করার ক্ষমতাকে দুর্বল করে দিতে পারে। এতে একজন ব্যক্তির মধ্যে ধীরে ধীরে জন্ম নেয় এক ধরনের ব্যতিক্রম হওয়ার মানসিকতা। তিনি ভাবতে শুরু করেন- আমি অন্যদের মতো নই। আমি আলাদা। অন্যদের নিয়মগুলো আমার জন্য প্রযোজ্য নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় আরও দুটি মানসিক প্রবণতা। এক. আমি ধরা পড়বো না - যাকে মনোবিজ্ঞানে অতিরিক্ত আশাবাদী হওয়ার প্রবণতা বলা হয়। এখানে ব্যক্তি বিশ্বাস করতে শুরু করেন, তার প্রভাব-প্রতিপত্তি, পরিচিতি ও নিরাপত্তা বলয় এতই শক্তিশালী যে এগুলো তাকে সবসময় রক্ষা করবে। দুই. ধরা পড়লেও তার কিছু হবে না। মনোবিজ্ঞানে এটি অজেয় থাকার ভ্রান্ত ধারণা নামে পরিচিত। এখানে বারবার পার পেয়ে গেলে মানুষ ভবিষ্যতের ঝুঁকিকেও তুচ্ছ মনে করতে শুরু করেন। ক্ষমতার মোহে থাকা ব্যক্তি বিশ্বাস করেন, যদি কিছু প্রকাশও পায়, তবে অর্থ, রাজনৈতিক চাপ বা অনুগামীদের দিয়ে ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে পারবেন। ফলে বাস্তবতার চেয়ে আত্মবিশ্বাস বড় হয়ে ওঠে। আর সেই অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসই অনেক সময় সবচেয়ে বড় ভুল সিদ্ধান্তের জন্ম দেয়। অনেকেই প্রশ্ন করেন - এ ধরনের ঘটনার পেছনে কি শুধু যৌন আকাক্সক্ষা কাজ করে? হেনরি কিসিঞ্জারের একটি বিখ্যাত উক্তি রয়েছে - ক্ষমতাই হলো চূড়ান্ত কামোদ্দীপক। যদিও এটি কোনও বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্ত নয়, তবু ক্ষমতা ও আকর্ষণের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনায় উক্তিটি প্রায়ই উল্লেখ করা হয়। মনোবিজ্ঞান বলছে, কিছু মানুষের কাছে যৌন সম্পর্ক শুধু শারীরিক চাহিদা পূরণের বিষয় নয় - এটি নিজের প্রভাব, আধিপত্য কিংবা আকর্ষণ ক্ষমতা প্রমাণের একটি মাধ্যমও হতে পারে। তখন মূল বার্তাটি হয়ে দাঁড়ায় - আমি যা চাই, তা পাওয়ার ক্ষমতা আমার আছে। বিশেষ করে যখন দুইপক্ষের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য থাকে না, তখন সম্পর্কের মধ্যে শোষণ বা ক্ষমতার অপব্যবহারের ঝুঁকি বেড়ে যায়। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- মোরাল লাইসেন্সিং বা নৈতিক ছাড়পত্রের মানসিকতা। মানুষ যখন দীর্ঘদিন নিজেকে নৈতিক, আদর্শবান বা সমাজসেবক হিসেবে দেখে কিংবা অন্যরাও তাকে সেভাবেই মূল্যায়ন করে, তখন কখনও কখনও তার ভেতরে একটি অবচেতন যুক্তি তৈরি হতে পারে - আমি এত ভালো কাজ করেছি, একটি ভুল করলে কী-ই বা হবে? এই মানসিক প্রবণতা আত্মসমালোচনার ক্ষমতাকে দুর্বল করে দিতে পারে। বয়সও কিছু ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে। বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে অনেক মানুষের মধ্যে নিজের আকর্ষণ, সক্ষমতা কিংবা গুরুত্ব হারিয়ে ফেলার এক ধরনের অবচেতন ভয় কাজ করে। একে মিডলাইফ ট্রানজিশনেরই অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। এই বয়সে এসে নিজের যৌবন বা শারীরিক সক্ষমতা প্রমাণ করার এক মরিয়া মানসিকতা থেকে অনেকে চরম ঝুঁকিপূর্ণ পথে পা বাড়ান। এ ছাড়া ক্ষমতার শীর্ষে থাকা ব্যক্তিদের কাছে ঝুঁকিপূর্ণ বা নিষিদ্ধ আচরণ কখনও কখনও এক ধরনের রোমাঞ্চও তৈরি করতে পারে। ডোপামিন হরমোন তখন তাৎক্ষণিক আনন্দকে ভবিষ্যতের সম্ভাব্য ক্ষতির চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়। ফলে মানুষ নিজের কাছেই যুক্তি দাঁড় করাতে শুরু করে - একবার করলে কিছু হবে না। আমাদের সমাজে বা কিছু প্রথাগত শিক্ষাব্যবস্থায় যৌনতাকে একটি স্বাভাবিক শারীরিক চাহিদা হিসেবে স্বীকার না করে ক্রমাগত অবদমন করতে শেখানো হয়। এমনকি এটি নিয়ে স্বাভাবিক আলোচনাকেও নিষিদ্ধ মনে করা হয়। দীর্ঘদিনের এই অবদমিত চাহিদা ও আড়ালে রাখার চর্চা পরবর্তীকালে ক্ষমতার ছায়ায় এসে এক ধরনের তীব্র মানসিক বিকৃতিতে রূপ নেয়। জনসম্মুখে ধর্মীয় ও নৈতিক আদর্শের বুলি আওড়ানো, আর আড়ালে চরম অনৈতিকতায় জড়ানো - এই দুই বিপরীতমুখী আচরণ তাদের ভেতরে দ্বৈত চরিত্রের জন্ম দেয়। নিজস্ব স্বাভাবিক কামনা-বাসনাকে বিসর্জন দিয়ে দিনের পর দিন ‘আদর্শ চরিত্রের’ অভিনয় করতে করতে একসময় তারা হাঁপিয়ে ওঠেন এবং সুযোগ পেলেই বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। ইতিহাস বলে, বেশিরভাগ ক্ষমতাবান মানুষের পতন হঠাৎ হয় না। তার আগে দীর্ঘ সময় ধরে তারা ছোট ছোট সীমা অতিক্রম করতে থাকেন। প্রথমবার কিছু হয় না। দ্বিতীয়বারও না। তৃতীয়বারও না। এরপর মস্তিষ্ক ধরে নেয়- আমি নিরাপদ। এই আত্মবিশ্বাস ধীরে ধীরে পরিণত হয় অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসে। আর সেখান থেকেই শুরু হতে পারে পতনের পথ।
[লেখক: সাইকোলজিস্ট]

নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগ, ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ

রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগ, ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ