বিশেষ প্রতিনিধি::
“ত্রাণ চাই না, চিড়া-মুড়ি চাই না। বসতভিটা রক্ষায় স্থায়ী সমাধান চাই। সরকারের কাছে আর কিছু চাই না। বাচ্চাকাচ্চা নিয়া বাঁচতে চাই। কত কষ্ট কইরা ঘর বানাই। আফালের ঢেউ আইয়া সব ভাইঙা নিয়া যায়। বাঁশ দিয়া, বস্তা দিয়া কত চেষ্টা করি, তবু আটকাইতাম পারি না।” কথাগুলো বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার বাহাদুরপুর গ্রামের বাসিন্দা হিমানি রানী বর্মণ। তার এই আকুতি শুধু একটি পরিবারের নয়, বরং করচার হাওরপাড়ে বসবাসকারী শত শত মানুষের দীর্ঘদিনের বেদনার প্রতিধ্বনি। বর্ষা শুরু হলেই হাওরের মানুষের জীবনে ফিরে আসে স্থানীয়দের কাছে পরিচিত এক আতঙ্ক ‘আফাল’। হাওরের উত্তাল ঢেউকে স্থানীয় ভাষায় বলা হয় ‘আফাল’। উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল, প্রবল বাতাস ও বিশাল জলরাশির প্রভাবে সৃষ্ট এই ঢেউ মুহূর্তেই ভেঙে দেয় বছরের পর বছর ধরে গড়ে তোলা ঘরবাড়ি। চলতি বর্ষায় সেই আফালের সবচেয়ে নির্মম রূপ দেখা যাচ্ছে বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার করচার হাওরপাড়ের বাহাদুরপুর গ্রামে। ইতোমধ্যে অন্তত ২০-২৫টি ঘরবাড়ি হাওরের পানিতে বিলীন হয়ে গেছে। ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে আরও অনেক বসতভিটা। জানা যায়, করচার হাওরের তীরঘেঁষে গড়ে ওঠা বাহাদুরপুর গ্রামের অধিকাংশ মানুষের জীবিকা মাছ ধরা ও হাওরকেন্দ্রিক চাষাবাদ। গত এক দশকে পাহাড়ি ঢল ও আফালের আঘাতে গ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকা হাওরগর্ভে বিলীন হয়েছে। অনেক পরিবার ভিটেমাটি হারিয়ে সিলেট, ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন এলাকায় চলে যেতে বাধ্য হয়েছে। যারা এখনও গ্রামে আছেন, তারা প্রতিদিন ভাঙনের আতঙ্ক নিয়ে দিন কাটাচ্ছেন। দিন-রাত অবিরাম আছড়ে পড়া ঢেউ ঠেকাতে গ্রামের মানুষ নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী বাঁশ, বালুর বস্তা ও কচুরিপানা দিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন। কিন্তু প্রকৃতির প্রবল শক্তির সামনে সেই চেষ্টা বেশিক্ষণ টেকে না। এক রাতের ভাঙনেই বিলীন হয়ে যায় একটি পরিবারের আজীবনের সঞ্চয়। বাহাদুরপুর গ্রামের বাসিন্দা সবুজ বর্মণ বলেন, আগে এই গ্রামে আরও অনেক ঘর ছিল। আফালের ভাঙনে একে একে সব শেষ হয়ে গেছে। অনেকে ভিটেমাটি হারিয়ে ঢাকা, সিলেটসহ বিভিন্ন জায়গায় চলে গেছেন। আমরা এখনও আছি, কিন্তু আর কতদিন টিকতে পারব জানি না। সুপ্রভা বর্মণ নামের আরেক বাসিন্দা বলেন, বর্ষা এলেই আমাদের রাতের ঘুম হারাম হয়ে যায়। ঘরে ঘুমাই না, কখন ঢেউ এসে ঘর ভেঙে নিয়ে যায় সেই ভয়ে জেগে থাকি। অনেক কষ্ট করে ঘর বানাই, কিন্তু এক রাতের আফাল সব শেষ করে দেয়। গ্রামবাসীর অভিযোগ, বছরের পর বছর একই দুর্ভোগের মুখোমুখি হলেও ভাঙন রোধে কার্যকর কোনো স্থায়ী উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ভাঙনের পর সাময়িক ত্রাণসামগ্রী মিললেও সমস্যার মূল সমাধান হয় না। তাই প্রতি বর্ষায় নতুন করে শুরু হয় বসতভিটা হারানোর আতঙ্ক। তাদের দাবি, ঝুঁকিপূর্ণ হাওরপাড়ে দ্রুত টেকসই বেড়িবাঁধ বা ওয়েভ প্রটেকশন ওয়াল নির্মাণ, তীর সংরক্ষণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের উদ্যোগ নিতে হবে। অন্যথায় প্রতি বর্ষায় আফালের তা-বে এভাবেই হারিয়ে যাবে আরও অসংখ্য বসতভিটা, আর বাড়বে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা। এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমান বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য সরকারি টিন বরাদ্দ রয়েছে। আবেদন পেলে যাচাই-বাছাই শেষে তা বিতরণ করা হবে। এছাড়া আফাল ও নদীভাঙন থেকে বসতভিটা রক্ষায় সরকার দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছে।
নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha
আফালের তান্ডবে বিপর্যস্ত বাহাদুরপুরবাসীর আকুতি
“ত্রাণ চাই না, বসতভিটা রক্ষায় স্থায়ী সমাধান চাই”
- আপলোড সময় : ২৭-০৭-২০২৬ ০৯:৪৩:০৮ পূর্বাহ্ন
- আপডেট সময় : ২৭-০৭-২০২৬ ০৯:৪৩:৪৭ পূর্বাহ্ন
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ

বিশেষ প্রতিনিধি