সুনামগঞ্জের সব খাল বাঁচাতে হবে
- আপলোড সময় : ৩০-০৭-২০২৬ ১২:৫৮:৪২ পূর্বাহ্ন
- আপডেট সময় : ৩০-০৭-২০২৬ ১২:৫৮:৪২ পূর্বাহ্ন
সুনামগঞ্জ শহরের প্রাণপ্রবাহ কামারখাল আজ দীর্ঘদিনের অবহেলা, অপরিকল্পিত নগরায়ন, অবৈধ দখল এবং যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা ফেলার কারণে তার স্বাভাবিক অস্তিত্ব হারানোর পথে। অথচ এই খালটি শুধু একটি জলধারা নয়; এটি শহরের প্রাকৃতিক পানিনিষ্কাশন ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান অবলম্বন। বর্ষা এলেই জলাবদ্ধতা, দুর্গন্ধ, মশা-মাছির উপদ্রব এবং জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি বাড়তে থাকে। তাই কামারখাল রক্ষা মানে শুধু একটি খাল পরিষ্কার করা নয়, বরং একটি বাসযোগ্য ও পরিবেশবান্ধব শহর গড়ে তোলার ভিত্তি নির্মাণ করা।
সম্প্রতি জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমান এবং পৌরসভার প্রশাসক অসীম চন্দ্র বণিকের কামারখাল পরিদর্শন এবং দ্রুত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম শুরুর ঘোষণা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় উদ্যোগ। এক সপ্তাহের মধ্যে দৃশ্যমান পরিবর্তনের আশ্বাস এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনার পরিকল্পনা শহরবাসীর মধ্যে আশাবাদ সৃষ্টি করেছে। তবে বাস্তবতা হলো, অতীতেও বিভিন্ন সময়ে খাল পরিষ্কারের উদ্যোগ নেওয়া হলেও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, কঠোর নজরদারি এবং দখল উচ্ছেদের অভাবে সেই সুফল দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।
প্রকৃত সমস্যা শুধু কামারখালেই সীমাবদ্ধ নয়। সুনামগঞ্জ পৌর শহরের বলাই খাল, বড়পাড়া খাল, তেঘরিয়া খাল, ঘাবরখালি খাল একই সংকটে আক্রান্ত। কোথাও খালের ওপর অবৈধ স্থাপনা গড়ে উঠেছে, কোথাও ময়লা-আবর্জনা ও নির্মাণবর্জ্যে পানিপ্রবাহ বন্ধ হয়ে গেছে, আবার কোথাও খালের প্রস্থ সংকুচিত হয়ে কার্যকারিতা হারিয়েছে। ফলে অল্প সময়ের ভারী বৃষ্টিতেই শহরের বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়, সড়ক তলিয়ে যায় এবং জনজীবনে ভোগান্তি নেমে আসে।
একটি শহরের খাল কেবল পানি বহনের পথ নয়; এটি নগরের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা, অতিরিক্ত বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশন, ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ এবং জীববৈচিত্র সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পরিকল্পিত নগর ব্যবস্থাপনায় খালকে কেন্দ্র করেই ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হয়। কিন্তু যখন খাল দখল, ভরাট কিংবা দূষিত হয়, তখন পুরো নগর ব্যবস্থাই বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। জলাবদ্ধতার পাশাপাশি ডেঙ্গুসহ পানিবাহিত রোগের ঝুঁকিও বহুগুণ বেড়ে যায়।
সুনামগঞ্জ একটি হাওরাঞ্চল। এই অঞ্চলের প্রকৃতি, অর্থনীতি ও জীবনযাত্রা পানিনির্ভর। অথচ শহরের খালগুলোকে পরিকল্পিতভাবে সংরক্ষণ না করে উল্টো সংকুচিত হতে দেওয়া হয়েছে। নগর পরিকল্পনার ক্ষেত্রে খালগুলোর সীমানা সংরক্ষণ, পানিপ্রবাহ নিশ্চিতকরণ এবং পরিবেশগত গুরুত্বকে যথাযথ গুরুত্ব না দেওয়ার ফল আজ স্পষ্ট।
এখন সময় এসেছে খ-িত নয়, সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার। শুধু কামারখাল পরিষ্কার করলেই চলবে না; শহরের সব খালকে একটি সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যানের আওতায় আনতে হবে। প্রথমেই প্রতিটি খালের পূর্ণাঙ্গ জরিপ সম্পন্ন করে সরকারি সীমানা নির্ধারণ এবং ডিজিটাল রেকর্ড সংরক্ষণ করতে হবে। এরপর কোনো ধরনের রাজনৈতিক বা সামাজিক প্রভাব বিবেচনা না করে সব অবৈধ দখল উচ্ছেদ করতে হবে। একই সঙ্গে নিয়মিত ড্রেজিং, আবর্জনা অপসারণ, পানিপ্রবাহ সচল রাখা এবং বার্ষিক রক্ষণাবেক্ষণের জন্য স্থায়ী বাজেট বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে। খালের দুই পাড়ে ময়লা ফেলা স¤পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে। প্রয়োজনীয় ডাস্টবিন স্থাপন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আধুনিক ব্যবস্থা, নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা এবং আইন লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।
পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়ী, সামাজিক ও পরিবেশবাদী সংগঠনকে স¤পৃক্ত করে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। কারণ জনগণের অংশগ্রহণ ছাড়া কোনো উন্নয়নই দীর্ঘস্থায়ী হয় না।
অনেক শহরেই খালকে দখলমুক্ত করে তার দুই তীরে সবুজায়ন, হাঁটার পথ, উন্মুক্ত স্থান ও নান্দনিক পরিবেশ গড়ে তোলা হয়েছে। সুনামগঞ্জেও সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা সম্ভব। এতে একদিকে যেমন জলাবদ্ধতা কমবে, অন্যদিকে শহরের সৌন্দর্য, পরিবেশ ও নাগরিক জীবনের মানও উন্নত হবে।
পৌর কর্তৃপক্ষের বর্তমান উদ্যোগের সফলতা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর। কেবল কয়েক দিনের পরিচ্ছন্নতা অভিযান বা প্রচারণামূলক কর্মসূচি দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো- কামারখালসহ সুনামগঞ্জ শহরের সব খালকে স¤পূর্ণ দখলমুক্ত করা এবং ভবিষ্যতে নতুন করে দখল বা দূষণ যাতে না ঘটে, তা নিশ্চিত করা। অন্যথায় আজকের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কয়েক মাসের মধ্যেই আবার আগের অবস্থায় ফিরে যাবে।
আমরা আশা করি, জেলা প্রশাসন, পৌরসভা এবং সংশ্লিষ্ট সব সংস্থা সমন্বিতভাবে কাজ করে কামারখালসহ সুনামগঞ্জের সব খাল পুনরুদ্ধারে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে। খাল বাঁচলে শহর বাঁচবে, জলাবদ্ধতা কমবে, পরিবেশ রক্ষা পাবে এবং নাগরিকরা পাবে একটি পরিচ্ছন্ন, সুস্থ ও বাসযোগ্য সুনামগঞ্জ। তাই আজ সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি- শুধু কামারখাল নয়, সুনামগঞ্জের প্রতিটি খালকে দখলমুক্ত, দূষণমুক্ত ও সচল করা হোক।
নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদকীয়