এস ডি সুব্রত:
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যখন রাশিয়া (সোভিয়েত ইউনিয়ন) সফর করেন তখন সে দেশের সুধী সমাজ এবং সাধারণ পাঠকমহলে তিনি ছিলেন তুমুল জনপ্রিয়। ১৯৩০ সালের ১১ সেপ্টেম্বর বার্লিন থেকে বিশেষ ট্রেনে অতিথিরা মস্কোয় পৌঁছালেন। কবির অন্যতম সফরসঙ্গী ছিলেন বিজ্ঞানী আইনস্টাইনের কন্যা মারগারিতা আইনস্টাইন। ১৯২৫ থেকে ১৯২৮ পর্যন্ত এই তিন বছরের মধ্যে পাঁচ বার রাশিয়া-ভ্রমণের আমন্ত্রণ পেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। অবশেষে ১৯৩০ সালে তিনি পা রাখেন মস্কোয়। না, নিতান্তই পর্যটন নয়। রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস করতেন, সাধারণ মানুষের জীবন, তাঁদের সমাজব্যবস্থা, শিল্প-সংস্কৃতি কোনো একটি অঞ্চলের আসল পরিচয়। তাঁর রাশিয়া-ভ্রমণের উদ্দেশ্যও ছিল সেটা। সেখানকার মানুষ এবং সমাজব্যবস্থাকে সামনে থেকে দেখা, চেনা। রাশিয়ার ছাত্র-ছাত্রী, অধ্যাপক, লেখক, শ্রমিক, কৃষকদের সঙ্গেই অধিকাংশ সময়টাই কাটিয়েছিলেন তিনি। হয়ে উঠেছিলেন ভারত-রাশিয়ার মৈত্রীর সেতু। রবীন্দ্রনাথের ১৬১তম জনবার্ষিকী উপলক্ষে বিশ্বকবিকে বিশেষ বিশেষ সম্মাননা জানাল মস্কোর প্রাচ্য সাহিত্যকেন্দ্র মস্কো সেন্টার ফর ওরিয়েন্টাল লিটারেচার। ২৫ বৈশাখ পেরিয়ে যাওয়ার দিন কয়েক পর গান, কবিতা, নাচ, চিত্র ও রবীন্দ্রনাথের পা-ুলিপি প্রদর্শনীর মাধ্যমে উদযাপিত হল তাঁর জন্মদিন। রবীন্দ্রনাথের রাশিয়া সফর রাশিয়ার জনমানসের আরো নিবিড় সংযোগ গড়ে তোলে। রবীন্দ্রনাথের সত্তর বছরের জন্মতিথিতে সে দেশের বুদ্ধিজীবী ও অন্যান্য সম্প্রদায়ের মানুষের সাগ্রহ অংশগ্রহণের মধ্যে প্রকাশিত হয় ঞযব এড়ষফবহ ইড়ড়শ ড়ভ ঞধমড়ৎব। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন ১৯৪৪ সালে মস্কো থেকে প্রকাশিত সাহিত্যবিষয়ক পত্রিকা গড়ফবৎহ জবারব-িতে সোভিয়েত কবি নিকলাই তিখনভ লিখছিলেন ‘রাশিয়ার কাছে যেমন লেভ তলস্তয়, ভারতের কাছে রবীন্দ্রনাথও তা-ই।’ রবীন্দ্রনাথের বই রাশিয়াতে ছাপা হয়েছে প্রায় ৫০ লাখ কপির ওপরে এবং অনুবাদ হয়েছে রুশ ছাড়াও রাশিয়ার প্রতিবেশী ইউক্রেন, উজবেকিস্তান, আর্মেনিয়াসহ ১৮টি জাতীয় ভাষায়। তার নাটক রাশিয়ার রঙ্গমঞ্চে সাফল্যের সঙ্গে অভিনীত হয়। রুশ ভাষায় রবীন্দ্রনাথের রচনার প্রথম অনুবাদের কৃতিত্ব দাবি করতে পারেন বিখ্যাত রুশ সাংবাদিক ও সমালোচক ভিক্তর শক্লোভস্কি। ‘গীতাঞ্জলি’র জন্য রবীন্দ্রনাথের নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির বহু আগেই শক্লোভস্কি ইংরেজি ‘গীতাঞ্জলি’র অন্তর্গত প্রায় সব কবিতা রুশ ভাষায় অনুবাদ করে ফেলেন- যা পর্যায়ক্রমে ১৯১৩ সালের ৬ জুন পর্যন্ত রুশ সাহিত্য পত্রিকা ‘রুশ সমাচার’-এ প্রকাশিত হয়। রবীন্দ্রনাথের নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির ঘটনা রুশ দেশের বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছিল। মস্কোর বিখ্যাত সাহিত্য পত্রিকা ‘নিভা’তে ডিসেম্বর ১৯১৩ সংখ্যায় রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে করা হয়েছিল প্রচ্ছদ নিবন্ধ। এই সংখ্যায় ভিক্তর শক্লোভস্কি লেখেন ‘রবীন্দ্রনাথের রচনা থেকে নিঃসন্দেহে এটাই প্রমাণিত হচ্ছে, সে দেশে রেনেসাঁসের এক নব অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে।’ ১৯১৩ থেকে ১৯১৫ সালের মধ্যে রুশ দেশে প্রকাশিত ‘গীতাঞ্জলি’র ছয়টি অনুবাদের মধ্যে অন্যতম বিখ্যাত লেখক ইভান বুনিন, যিনি পরে নোবেল পুরস্কার পান, তার অনূদিত ও স¤পাদিত সংকলনটি। ১৯১৪ ও ১৯১৫ সালে রবীন্দ্রনাথের দার্শনিক বক্তৃতাবলি সাধনা এবং গীতিনাটক চিত্রাঙ্গদা, রাজা ও ডাকঘরের অনুবাদ প্রকাশিত হয়। সর্বাপেক্ষা বৃহদায়তনের যে রবীন্দ্র রচনা সংকলন প্রকাশিত হয় ১৯১৫ সালে সেটি ছিল ‘এষরসঢ়ংবং ড়ভ ইবহমধষ খরভব’ নামে ইংরেজি ভাষায় রজনীরঞ্জন সেন অনূদিত রবীন্দ্রনাথের ১৩টি ছোটগল্পের রুশ অনুবাদ। রবীন্দ্রনাথের এই ছোটগল্পগুলো সেদিন রুশ পাঠকমহলে চাঞ্চল্য সঞ্চার করেছিল। সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পর সোভিয়েত শাসন ক্ষমতার প্রথম আমলে রবীন্দ্র রচনার গবেষণা ও প্রচারের ক্ষেত্রে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। ক্রেমলিনে লেনিনের ব্যক্তিগত গ্রন্থাগারে রবীন্দ্রনাথের ‘গীতাঞ্জলি’, ‘ঘরে বাইরে’-এর রুশ অনুবাদ, জার্মান অনুবাদ পাওয়া গেছে। সরাসরি বাংলা থেকে রবীন্দ্র রচনা প্রথম রুশ ভাষায় অনুবাদের কৃতিত্ব, রাশিয়ায় বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিতে বাংলা ভাষা চর্চার পথিকৃৎ তুবিয়ানস্কি এবং সে দেশে দাউদ আলি ছদ্ম নামে পরিচিত ভারতীয় বিপ্লবী প্রমথনাথ দত্ত। বিশেষত প্রমথনাথ দত্তই প্রথম সোভিয়েত ইউনিয়নে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলা ভাষা শিক্ষার গোড়াপত্তন করেন। বিশের দশকে ‘মস্কোর রাষ্ট্রীয় ললিত সাহিত্য প্রকাশনালয়’-এর মতো রাষ্ট্রীয় ও বড় প্রকাশনালয় থেকে রবীন্দ্রনাথের রচনা ১৫ থেকে ৩০ হাজার কপিতে প্রকাশ হতে থাকে। রবীন্দ্র জন্মশতবর্ষে সোভিয়েত ও ভারতের বিশিষ্ট লেখক ও গবেষকদের একটি সুবৃহৎ সংকলন প্রকাশিত হয়। ১৯৬১ সালে সংকলনটি প্রকাশ করে সোভিয়েত বিজ্ঞান আকাদেমি। রবীন্দ্র জন্মশতবর্ষে ১৯৬১ সালে মস্কোর রাষ্ট্রীয় ললিত সাহিত্য প্রকাশনালয় থেকে রুশ ভাষায় ১২ খ-ের রবীন্দ্র রচনাবলি প্রকাশিত হয় এবং ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ভাঙার আগ পর্যন্ত এর মুদ্রণসংখ্যা ৪০ লাখ ছাড়িয়ে যায়। এই সোভিয়েত আমলেই তার রচনা সে দেশের ২৩টি জাতীয় ভাষা যেমন উজবেক, তাজিক, আর্মেনীয় ইত্যাদি ভাষায় দেড় শতাধিক বার প্রকাশিত হয়েছে, যার মুদ্রণসংখ্যা ৬০ লাখেরও বেশি। আজ এক শতাব্দীর বেশি কাল ধরে রাশিয়ায় রবীন্দ্রসাহিত্যের গবেষণা, চর্চা ও অনুবাদের কাজ চলছে। রুশ ভাষায় রবীন্দ্রনাথের সর্বাধিক অনূদিত কাব্যগ্রন্থ ‘গীতাঞ্জলি’, সর্বাধিক জনপ্রিয় উপন্যাস ‘নৌকাডুবি’, ‘ঘরে বাইরে’ ও ‘গোরা’ এবং সর্বাধিক পরিচিত নাটক ‘ডাকঘর’। সাম্য ও ন্যায়ের প্রতীক মহান মানবপ্রেমিক কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অমর সৃষ্টিগুলো রাশিয়ার জনগণের কাছে এখনো একান্ত শ্রদ্ধার। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধেরও আগে থেকে রবীন্দ্রনাথকে একাধিক অভ্যর্থনা জানিয়েছে রাশিয়া। তাঁর জীবদ্দশায় প্রদর্শিত হয়েছে তাঁর আঁকা ছবি। ১৯৬১ সাল থেকে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় গ্রন্থাগারে সংরক্ষিত হয়েছিল, মস্কো সফরকালীন সময়ে তাঁর লেখা ‘ফেট ইমপ্রিন্টেড অন দ্য ফোরহেড’-এর আসল পা-ুলিপি। বর্তমানে সেই পা-ুলিপিই প্রদর্শিত হচ্ছে মস্কোর প্রাচ্য সাহিত্যকেন্দ্রে। ছাত্র-ছাত্রী, গবেষক এবং সাধারণ মানুষের জন্য প্রথমবার প্রকাশ্যে আনা হয়েছে এই দুর্মূল্য পা-ুলিপি। শুধু রুশ সাংস্কৃতিক মহলই না, রাশিয়ার সাধারণ মানুষের কাছে রবীন্দ্রনাথ পৌঁছে গেছেন তাঁর গানের মাধ্যমে। ১৯৮০ সালে রুশ ফিচার ফিল্ম ‘লাভ অ্যান্ড লাইস’-এ ব্যবহৃত হয়েছিল একটি ব্যালাড। যা আদতে ‘শেষের কবিতা’ উপন্যাসের শেষ কবিতাটিই। সুরকার আলেক্সি রবনিকভের তত্ত্বাবধানে গানের রূপ নিয়েছিল কবিতাটির রুশ অনুবাদ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯৩০ সালে সোভিয়েত রাশিয়া ভ্রমণের পর তার অভিজ্ঞতা নিয়ে “রাশিয়ার চিঠি” নামে বেশ কিছু চিঠি লিখেছিলেন যা পরবর্তীতে একটি গ্রন্থ হিসেবে প্রকাশিত হয়। চিঠিগুলিতে রবীন্দ্রনাথ সোভিয়েত সমাজের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে তার দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করেন। রাশিয়ার বিপ্লবের পর সমাজের পরিবর্তন এবং সোভিয়েত নেতৃবৃন্দের প্রয়াস তাকে মুগ্ধ করে। কবিগুরু রাশিয়ায় সাধারণ মানুষের জন্য শিক্ষা ও সংস্কৃতির প্রসার দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন। তিনি লক্ষ্য করেন, রাশিয়ার বিপ্লবের পর সাধারণ মানুষ, বিশেষত শ্রমিক ও কৃষকদের মধ্যে শিক্ষার প্রসার অনেক বেশি হয়েছে। বিশেষ করে শিশুদের শিক্ষা ও মানসিক বিকাশের জন্য সরকার যে উদ্যোগ নিয়েছিল, তা রবীন্দ্রনাথের কাছে অত্যন্ত প্রশংসনীয় ছিল। রাশিয়ার বিপ্লবের পর বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তির প্রসারের জন্য সরকার বিভিন্ন প্রকল্প হাতে নিয়েছিল। রবীন্দ্রনাথ এ বিষয়ে বিশেষভাবে উল্লেখ করেন যে, রাশিয়ায় মানুষ বিজ্ঞানের চর্চা এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়নের দিকে বিশেষ মনোযোগ। রাশিয়ার শ্রমিকদের অবস্থার উন্নয়ন এবং তাদের ক্ষমতায়নের বিষয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রশংসা করেন। তিনি দেখেন, শ্রমিকদের সম্মান, সামাজিক মর্যাদা এবং অধিকার এখানে বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে। যদিও রবীন্দ্রনাথ রাশিয়ার অনেক অগ্রগতি দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন, তবে তিনি সেখানে ব্যক্তিস্বাধীনতার অভাব সম্পর্কে সমালোচনা করেন। তিনি উল্লেখ করেন, সোভিয়েত সমাজে স্বাধীন চিন্তার পরিসর সংকুচিত হয়েছে। মত প্রকাশের স্বাধীনতা এবং সৃজনশীলতার সীমাবদ্ধতা তাকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছিল। রবীন্দ্রনাথ রাশিয়ার একনায়কতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার সমালোচনা করেছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মনে করেন যে, রাশিয়ার সমাজে যে সাম্যের ভিত্তি স্থাপন করা হয়েছে, তা সমাজের উন্নতির মূল কারণ।
লেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক, সুনামগঞ্জ।
নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha
রাশিয়ায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর : রবীন্দ্র চর্চা ও তাঁর অভিজ্ঞতা
- আপলোড সময় : ০১-০৮-২০২৬ ০৮:৫৬:১৪ পূর্বাহ্ন
- আপডেট সময় : ০১-০৮-২০২৬ ০৮:৫৬:৪৬ পূর্বাহ্ন
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ

সুনামকন্ঠ ডেস্ক