সুনামগঞ্জ , সোমবার, ১০ অগাস্ট ২০২৬ , ২৬ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
জুলাইয়ে সিলেট বিভাগে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৩১ জীবিত থাকতে পায়নি, মৃত্যুর পর আইসিইউতে হাম-আক্রান্ত শিশু- অভিযোগ বাবা-মায়ের ডা. সৈয়দ মোনাওয়ার আলী : জনকল্যাণে অনন্য পথিকৃৎ ভারতীয় মদসহ কথিত সাংবাদিক লিটন আটক ট্রাভেলস ব্যবসায়ীর মরদেহ উদ্ধার বোকা নদীর সেতুতে ঝুলছে ডাম্প ট্রাক, চালক পলাতক সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সুন্দর বাংলাদেশ গড়তে চাই : প্রধানমন্ত্রী সাড়ে ৬ বছরে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত ১৫ হাজার ৭১২ ভালো কাজের প্রলোভনে ভারতে পাচার, গুয়াহাটি ক্যাম্পে মানবেতর জীবন সুনামগঞ্জের যুবকের বৈঠার টানেই চলে জীবন-সংসার রবীন্দ্রনাথের জীবন, কর্ম ও দর্শন নিয়ে সাহিত্য আড্ডা দিরাই বিএনপি’র অভ্যন্তরীণ বিরোধ তুঙ্গে কিসের হাসিনা, তার চেহারা কি দেখা গেছে : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্য ভারত সমর্থন করে না : জয়সওয়াল তাহিরপুরে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে পাঠদান প্রধানমন্ত্রীর সহযোগিতায় দিরাই-শাল্লার উন্নয়ন করতে চাই : এমপি নাছির চৌধুরী গ্রামেগঞ্জে ১৬ ঘণ্টা লোডশেডিং, ক্ষুব্ধ গ্রাহক সব হাসপাতালে দুর্ঘটনায় আহতদের চিকিৎসা নিশ্চিতের নির্দেশ হাইকোর্টের জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস পালিত সুরমা নদীর পাড় যেন ময়লার ভাগাড়
আমাদের গুণীজন

ডা. সৈয়দ মোনাওয়ার আলী : জনকল্যাণে অনন্য পথিকৃৎ

  • আপলোড সময় : ১০-০৮-২০২৬ ০৯:২৬:০১ পূর্বাহ্ন
  • আপডেট সময় : ১০-০৮-২০২৬ ০৯:২৬:৪২ পূর্বাহ্ন
ডা. সৈয়দ মোনাওয়ার আলী : জনকল্যাণে অনন্য পথিকৃৎ
::আকরাম উদ্দিন::
অফিস অ্যাসাইনমেন্টে লেখার তালিকায় ডা. সৈয়দ মোনাওয়ার আলীর নামটি চোখে পড়তেই স্মৃতির জানালা যেন হঠাৎ খুলে গেল। মন ফিরে গেল প্রায় চার দশক আগের সুনামগঞ্জে। সময়টা ১৯৮৭ খ্রিস্টাব্দ। তখন তিনি সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও), আর আমি সাংবাদিকতার পথে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করছি। সেই সময় থেকেই তাঁর সঙ্গে পরিচয়। অত্যন্ত শান্ত, সংযত ও অমায়িক স্বভাবের একজন চিকিৎসক। সংবাদ সংগ্রহের প্রয়োজনে যখনই তাঁর কাছে গিয়েছি, অকপটে প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়েছেন। কখনো বিরক্ত হননি, কখনো অযথা অপেক্ষায় রাখেননি। একজন দক্ষ চিকিৎসকের পাশাপাশি একজন মানবিক মানুষের প্রতিচ্ছবিও খুঁজে পেয়েছিলাম তাঁর মধ্যে। বহু বছর কেটে গেছে। কর্মব্যস্ততার কারণে সরাসরি দেখা-সাক্ষাৎও কমে এসেছে। এবার তাঁর জীবন ও কর্ম নিয়ে লেখার সিদ্ধান্ত নিতেই মনে হলো, পুরোনো সেই পরিচয়ের সূত্র ধরেই এগিয়ে যাই। শিষ্টাচার অনুযায়ী আগেই ফোন করলাম। ওপাশ থেকে ভেসে এলো সেই চেনা কণ্ঠ। কুশল বিনিময়ের পর সাক্ষাৎকারের অনুরোধ জানালে প্রথমে কিছুটা অনীহা থাকলেও পরে তিনি রাজি হলেন। নির্ধারিত দিন শুক্রবার সকাল ১১টায় পৌঁছে গেলাম সুনামগঞ্জ শহরের জেনারেল হাসপাতালের তাঁর চেম্বারে। নামাজের প্রস্তুতি নিয়ে বাসা থেকে এসে তিনি আমাকে সময় দিলেন। রোগী ও অন্যান্য ব্যস্ততার মাঝেও সাক্ষাৎকারের জন্য বরাদ্দ ছিল মাত্র ৩০ মিনিট। অথচ জানার ছিল পাঁচ দশকেরও বেশি সময়ের চিকিৎসা, প্রশাসন ও মানবসেবার এক দীর্ঘ ইতিহাস। প্রশ্নোত্তর শুরু হতেই সময়ের হিসাব যেন হারিয়ে গেল। স্মৃতিচারণ, অভিজ্ঞতা, চিকিৎসাসেবার নানা অধ্যায় এবং মানুষের জন্য তাঁর নিরলস কাজের গল্পে কখন যে এক ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে, টেরই পাইনি। বারবার রোগীর তাগাদা আসছিল। অবশেষে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে তিনি উঠে দাঁড়ালেন। আন্তরিক বিদায় জানিয়ে আমিও বেরিয়ে এলাম, মনে হলো, একজন চিকিৎসকের নয়, একজন নিবেদিতপ্রাণ সমাজসেবকের জীবনের অসংখ্য অজানা অধ্যায়ের সাক্ষী হয়ে ফিরছি। কিন্তু সেই আলাপে আমার লেখার জন্য প্রয়োজনীয় সব উপাদান পাওয়া হলো না। সেদিনই মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলাম, আরেকবার চেষ্টা করতেই হবে। তখন রাত প্রায় ৮টা। কিছুক্ষণ ভেবে আবার তাঁকে ফোন করলাম। তিনি জানালেন, বাসায় আছেন। অনেকটা দ্বিধা নিয়েই হেঁটে তাঁর বাসার উদ্দেশে রওনা হলাম। শহরের এসপি বাংলোর পাশের রাস্তা ধরে আবাসিক এলাকার নিরিবিলি পরিবেশ পেরিয়ে পৌঁছে গেলাম তাঁর বাসায়। তিনি নিজেই এগিয়ে এসে দরজা খুলে আন্তরিকতার সঙ্গে বসতে দিলেন। চারপাশে ছিল নীরব, নিস্তব্ধ এক প্রশান্ত পরিবেশ। অল্প কিছুক্ষণ কথাবার্তার পর তিনি পাশের একটি কক্ষে গেলেন। কিছুক্ষণ পর ফিরে এসে আবার আলাপ শুরু করলেন। এরই মধ্যে চা-নাস্তা চলে এলো। আমি সত্যিই বিস্মিত হলাম, কিছুটা লজ্জাও পেলাম। বললাম, আমি তো এসেছি আমার প্রয়োজনেই। এত কষ্ট করে আবার এত আয়োজন কেন? তিনি মৃদু হেসে বললেন, ঠিক আছে, শুরু করুন। তাঁর সেই সহজ-সরল উত্তর আর আন্তরিক আপ্যায়ন আমাকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছিল। ভাবলাম, একজন এত বড় মাপের মানুষ, অথচ বিন্দুমাত্র অহংকার নেই, অতিথিপরায়ণতায়ও নেই কোনো কৃত্রিমতা। যেন আবারও এক নতুন অধ্যায়ের সাক্ষী হলাম। মনে মনে উপলব্ধি করলাম, যাঁকে দেখলে শ্রদ্ধাবোধ আরও বেড়ে যায়, আল্লাহ তাঁকে অহংকারহীন এক অনন্য ব্যক্তিত্ব হিসেবে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। তাঁর হৃদয়ে রয়েছে অফুরন্ত মানবিকতা ও ভালোবাসা। সেই দিন যেভাবে তাঁকে দেখেছিলাম, আজও তাঁর মধ্যে ঠিক সেই একই সুন্দর মানুষটিকেই খুঁজে পাই। তাঁর আন্তরিক আচরণে আজও আমি ভালোবাসায় সিক্ত হই। জন্ম ও পারিবারিক জীবন : ডা. সৈয়দ মোনাওয়ার আলীর জন্ম ১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দের ২০ জুন সুনামগঞ্জ জেলার দিরাই উপজেলার জগদল ইউনিয়নের নগদীপুর গ্রামের ঐতিহ্যবাহী সৈয়দ বাড়িতে। তাঁর পিতা মরহুম সৈয়দ সুরুজ আলী এবং মাতা সৈয়দা আফতাবুন নেছা। চার ভাই ও দুই বোনের মধ্যে তিনি সর্বকনিষ্ঠ। ১৯৭৭ সালে তিনি সুনামগঞ্জ শহরের হাছননগরের সাবেক পিপি আব্দুস সামাদের জ্যেষ্ঠ কন্যা সারাহ’র সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁদের সংসারে দুই ছেলে ও দুই মেয়ে রয়েছে। শিক্ষাজীবন : ডা. সৈয়দ মোনাওয়ার আলীর শৈশব কেটেছে গ্রামের বাড়িতেই। প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন নিজ গ্রামের পাশের দৌলতপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। এরপর বর্তমান শান্তিগঞ্জ উপজেলার দরগাপাশা রশিদিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হন। সে সময় তিনি বড় বোন সৈয়দা গুলবাহার বেগমের বাড়িতে থেকে লেখাপড়া করেন। পরবর্তীতে তিনি সুনামগঞ্জ শহরের বুলচান্দ উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং তেঘরিয়া পীরবাড়িতে আত্মীয়ের বাসায় থেকে পড়াশোনা চালিয়ে যান। ১৯৬৫ সালে তিনি ওই বিদ্যালয় থেকে প্রথম বিভাগে এসএসসি উত্তীর্ণ হন। ছাত্রজীবনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী এবং নিয়মিত শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করতেন। পরে সিলেটের মুরারিচাঁদ (এমসি) কলেজ থেকে এইচএসসি এবং সিলেট মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে নিপসম থেকে ডিপ্লোমা ইন পাবলিক হেলথ (ডিপিএইচ) ডিগ্রী স¤পন্ন করেন। ১৯৮৫-৮৬ খ্রিস্টাব্দে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) বৃত্তি নিয়ে থাইল্যান্ডের ব্যাংকক সিটিতে মাহিদল ইউনিভার্সিটি থেকে মাস্টার অব পাবলিক হেলথ (এমপিএইচ) ডিগ্রি অর্জন করেন। কর্মজীবন : সিলেট মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে ইন্টার্নশিপ স¤পন্ন করে ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দে তৎকালীন ছাতক থানায় স্বাস্থ্য প্রশাসক হিসেবে সরকারি চাকরিতে যোগদান করেন। পরে বালাগঞ্জ ও বাহুবল থানায় একই দায়িত্ব পালন করেন। দক্ষতার স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি বৃহত্তর সিলেট জেলার শ্রেষ্ঠ থানা স্বাস্থ্য প্রশাসক নির্বাচিত হন এবং স্বর্ণপদক লাভ করেন। ১৯৮৩ খ্রিস্টাব্দে তিনি মৌলভীবাজার মহকুমার মেডিকেল অফিসার হিসেবে যোগদান করেন। পরে হবিগঞ্জে দায়িত্ব পালন করেন। ১ মার্চ ১৯৮৪ খ্রিস্টাব্দে সুনামগঞ্জ জেলায় উন্নীত হওয়ার পর সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) হিসেবে যোগদান করেন এবং পরবর্তীতে একাধিকবার একই দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৬ সালে পদোন্নতি পেয়ে ভোলা জেলার সিভিল সার্জন হিসেবে যোগদান করেন। পরবর্তীতে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও চাঁদপুর জেলার সিভিল সার্জনের দায়িত্ব পালন করেন। ১ আগস্ট ১৯৯৫ সালে সিলেট বিভাগ প্রতিষ্ঠার পর তিনি বিভাগীয় স্বাস্থ্য দপ্তরের প্রথম সহকারী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে ঢাকার মহাখালী ইনস্টিটিউট অব হেলথ টেকনোলজি (আইএইচটি)-এর অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ২০০৬ সালের জুন মাসে তিনি সরকারি চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করেন। স্বাস্থ্যসেবায় অনন্য অবদান : দীর্ঘ কর্মজীবনে ডা. সৈয়দ মোনাওয়ার আলী জনস্বাস্থ্য উন্নয়ন, ইপিআই কর্মসূচি, মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য, সংক্রামক রোগ প্রতিরোধ এবং স্বাস্থ্যসচেতনতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তিনি প্রশাসন, অর্থব্যবস্থাপনা ও জনস্বাস্থ্য বিষয়ে দেশে-বিদেশে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। প্রবীণদের অক্ষমতা প্রতিরোধ ও পুনর্বাসন বিষয়ে তিনি বিশেষজ্ঞ। মাহিদল ইউনিভার্সিটিতে অধ্যয়নকালে পুষ্টিবিষয়ক তাঁর গবেষণাপত্র প্রশংসিত হয়। সততা, দক্ষতা, কর্মনিষ্ঠা ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী এবং সাধারণ মানুষের কাছে তিনি একজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত। সরকারি দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি দরিদ্র মানুষের চিকিৎসা সেবায়ও তিনি ছিলেন সমান আন্তরিক। অবসরের পরও মানুষের পাশে : সরকারি চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পরও তিনি কর্মবিরতি নেননি। বর্তমানে সুনামগঞ্জ শহরের একটি প্রতিষ্ঠিত বেসরকারি জেনারেল হাসপাতালে নিয়মিত রোগী দেখছেন। ৭৭ বছর বয়স অতিক্রম করার পরও তাঁর কর্মস্পৃহা, নিষ্ঠা ও রোগীদের প্রতি আন্তরিকতা সত্যিই প্রশংসনীয়। দীর্ঘ ৫১ বছরের চিকিৎসাজীবনে তিনি শুধু একজন দক্ষ চিকিৎসকই নন, মানুষের আস্থা ও বিশ্বাসের প্রতীক হয়ে উঠেছেন। আজও গ্রামের সাধারণ মানুষ নির্ভরতার সঙ্গে তাঁর শরণাপন্ন হন। শিক্ষা ও সমাজসেবায় অগ্রণী ভূমিকা : চিকিৎসা সেবার পাশাপাশি শিক্ষা ও জনকল্যাণমূলক কর্মকা-েও তিনি অনন্য অবদান রেখে চলেছেন। ২০১৪ সালে নিজ গ্রাম নগদীপুরে প্রতিষ্ঠা করেন ডা. সৈয়দ মোনাওয়ার আলী কলেজ। পরে পিতার স্মৃতির উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠা করেন সৈয়দ সুরুজ আলী মেমোরিয়াল ট্রাস্ট। এই ট্রাস্টের মাধ্যমে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের মেধাবী শিক্ষার্থীদের বৃত্তি প্রদান, একটি মক্তব পরিচালনা, দরিদ্র শিক্ষার্থীদের সহায়তা এবং অসহায় মানুষের কল্যাণে বিভিন্ন মানবিক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। সাংগঠনিক কর্মকা- : ডা. সৈয়দ মোনাওয়ার আলী চিকিৎসা সেবার পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন সামাজিক, মানবিক ও জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে স¤পৃক্ত। তিনি সুনামগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের প্রতিষ্ঠাতা। অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী কল্যাণ সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে প্রায় ১৩ বছর দায়িত্ব পালন করেন এবং তাঁর নেতৃত্বে সমিতি শ্রেষ্ঠ সমিতির স্বীকৃতি অর্জন করে। তিনি জেলার প্রবীণ হিতৈষী সংঘের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, সুনামগঞ্জ ডায়াবেটিক সমিতির বর্তমান সেক্রেটারি এবং ডায়াবেটিক হাসপাতাল প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা পালনকারী অন্যতম সংগঠক। এছাড়া সুনামগঞ্জ হার্ট ফাউন্ডেশন, হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক মালিক সমিতির জেলা সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি সুনামগঞ্জ জেলা ইউনিটের কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য এবং উন্নয়ন কমিটির আহ্বায়ক। এছাড়া জেলা কারাগারের বেসরকারি পরিদর্শক, ‘প্রত্যয় স্কুল’-এর দাতা সদস্য, জেলা প্রতিবন্ধী বিষয়ক কমিটির সদস্য এবং সর্বশেষ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জেলা ভিজিল্যান্স টিমের বেসরকারি সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ছাত্রজীবনে তিনি বৃহত্তর সিলেট জেলা ছাত্র ইউনিয়নের সহ-সভাপতি ছিলেন। সে সময় বর্তমান সংসদ সদস্য নাছির উদ্দিন চৌধুরী একই সংগঠনের সদস্য ছিলেন। জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রেও তাঁর অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গুটিবসন্ত নির্মূল কর্মসূচিতে বাংলাদেশ জাতীয় এপিডেমিওলজি কর্মসূচির আওতায় নির্বাচিত হয়ে তিনি প্রায় এক বছর মাঠপর্যায়ে কাজ করেন এবং গুটিবসন্ত নির্মূলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ : বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) ব্যবস্থাপনায় ২০০৩ সালে সরকারি সফরে তিনি ইন্দোনেশিয়ার বালি দ্বীপে অনুষ্ঠিত ৪২ দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক সেমিনারে অংশগ্রহণ করেন। ‘ডিজিজ বার্ডেন’ বিষয়ক ওই সেমিনারে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ৪০ জন চিকিৎসক অংশ নেন। সেখানে রোগের প্রকোপ, জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা এবং আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি নিয়ে অভিজ্ঞতা বিনিময় ও আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। সরকারি সফরের পাশাপাশি তিনি ব্যক্তিগতভাবে সৌদি আরব, কানাডা, জাপান ও অস্ট্রেলিয়া ভ্রমণ করেছেন। বিভিন্ন দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা, চিকিৎসাসেবা ও সামাজিক সংস্কৃতি সম্পর্কে তাঁর প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা পেশাগত দৃষ্টিভঙ্গিকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। বিভিন্ন সম্মাননায় ভূষিত : সুনামগঞ্জের বিশিষ্ট চিকিৎসক, সমাজসেবক এবং শহরের জেনারেল হাসপাতাল (প্রা.)-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. সৈয়দ মোনাওয়ার আলী চিকিৎসা, জনস্বাস্থ্য ও সমাজকল্যাণে দীর্ঘদিনের অনন্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বিভিন্ন সময়ে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, পেশাজীবী সংগঠন ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের পক্ষ থেকে অসংখ্য সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন। বিশ্বব্যাপী করোনা (কোভিড-১৯) মহামারির সময় সম্মুখসারির যোদ্ধা হিসেবে নিরলস স্বাস্থ্যসেবা প্রদান এবং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় অসামান্য অবদানের জন্য বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ), সুনামগঞ্জ জেলা শাখা তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে সম্মাননা প্রদান করে। স্বাস্থ্যখাতে বিশেষ অবদান ও মানবসেবায় অনন্য ভূমিকার স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ নারী কল্যাণ ফাউন্ডেশন তাঁকে ‘মাদার তেরেসা স্বর্ণ স্মারক-২০১৫’ প্রদান করে। এ সম্মাননা অর্জন উপলক্ষে বাংলাদেশ অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী কল্যাণ সমিতি, সুনামগঞ্জ জেলা শাখা তাঁর সম্মানে সংবর্ধনার আয়োজন করে এবং বিশেষ সম্মাননা প্রদান করে। ২০০৬ সালে ঢাকার মহাখালীতে অনুষ্ঠিত ছাত্র-শিক্ষক প্রতিনিধি পরিষদের অভিষেক অনুষ্ঠানে ইনস্টিটিউট অব হেলথ টেকনোলজির অধ্যক্ষ হিসেবে তাঁর অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে সম্মাননা প্রদান করা হয়। মা ও শিশুর অকালমৃত্যু প্রতিরোধে বিশেষ অবদানের জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় তাঁকে সম্মাননা প্রদান করে। ২০০১ সালে বাংলাদেশ কেমিস্ট অ্যান্ড ড্রাগিস্ট সমিতি চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবায় অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে সম্মাননা প্রদান করে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা জেলা আইন সহায়তা কেন্দ্র (আসক) ফাউন্ডেশন-এর ২১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে ২০১৮ সালে তাঁকে বিশেষ সম্মাননা প্রদান করে। ২০২০ সালে দরিদ্র ও অসহায় রোগীদের বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার স্বীকৃতিস্বরূপ জগদল ইউনিয়ন সমাজকল্যাণ পরিষদ তাঁকে সম্মাননা প্রদান করে। এছাড়াও চিকিৎসা, জনকল্যাণ, মানবসেবা, শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়নে অসামান্য অবদানের জন্য তিনি বিভিন্ন সময়ে অসংখ্য সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, পেশাজীবী সংগঠন, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের পক্ষ থেকে সম্মাননা স্মারক, সংবর্ধনা ক্রেস্ট এবং বিশেষ সম্মানে ভূষিত হয়েছেন। তাঁর এসব সম্মাননা সমাজ ও মানুষের কল্যাণে নিবেদিত দীর্ঘ কর্মময় জীবনের উজ্জ্বল স্বীকৃতি বহন করে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, একজন চিকিৎসকের উচিত রোগীর সঙ্গে সবসময় সৌহার্দ্যপূর্ণ ও আন্তরিক আচরণ করা। চিকিৎসা সেবায় মানবিকতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তাই প্রতিটি রোগীর প্রতি সহমর্মিতা ও সম্মান প্রদর্শন করতে হবে। তিনি আরও বলেন, আমরা চিকিৎসকরা রোগীকে চিকিৎসাসেবা দিয়ে থাকি, আর রোগ নিরাময়ে মূল ভূমিকা পালন করে ওষুধ। তাই রোগীর উচিত চিকিৎসকের প্রতি আস্থা রাখা, তাঁর পরামর্শ ও নির্দেশনা যথাযথভাবে মেনে চলা এবং নির্ধারিত সময়ে নিয়মিত ওষুধ সেবন করা। এসব নির্দেশনা অনুসরণ করলে রোগ থেকে সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়। এক অনুকরণীয় জীবন : একজন দক্ষ চিকিৎসক, সফল স্বাস্থ্য প্রশাসক, শিক্ষানুরাগী ও মানবসেবক হিসেবে ডা. সৈয়দ মোনাওয়ার আলী সুনামগঞ্জের মানুষের হৃদয়ে বিশেষ স্থান করে নিয়েছেন। পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে মানুষের চিকিৎসাসেবা, জনস্বাস্থ্য উন্নয়ন এবং সমাজকল্যাণে তাঁর নিরলস অবদান নতুন প্রজন্মের চিকিৎসকদের জন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। সুনামগঞ্জের স্বাস্থ্যখাতের ইতিহাসে তাঁর নাম শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে উচ্চারিত হবে, একজন চিকিৎসক হিসেবে নয় বরং একজন নিবেদিতপ্রাণ মানবসেবক হিসেবে।
[লেখক আকরাম উদ্দিন : গল্পকার এবং সাংবাদিক]

নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha

কমেন্ট বক্স