বিশেষ প্রতিনিধি::
এক হাতে সন্তানের ব্যাগ, আরেক হাতে ছেলেকে আঁকড়ে ধরে পথ চলতেন মা। কখনো কাদামাখা পথ, কখনো বৃষ্টি, কখনো প্রখর রোদ - কোনো কিছুই থামাতে পারেনি সেই পথচলা। কারণ, মায়ের কোলে শুধু সন্তান ছিল না; ছিল সন্তানের স্বপ্নও। চার বছর বয়সে জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে ছায়েম আল হাসানের হাত-পা অস্বাভাবিক হয়ে যায়। স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে না পারায় অন্য শিশুদের মতো স্কুলে যাওয়া সম্ভব ছিল না তার। কিন্তু ছেলের পড়াশোনার স্বপ্নকে কোনো প্রতিবন্ধকতার কাছে হারতে দেননি মা হাফসা বেগম। নিজের শরীরে নানা অসুস্থতা নিয়েও বছরের পর বছর ছেলেকে কোলে করে স্কুল-মাদরাসায় নিয়ে গেছেন তিনি। ক্লাস শেষ না হওয়া পর্যন্ত বসে থেকেছেন মাদরাসার বারান্দায়। সেই মায়ের ত্যাগ আর ছেলের অদম্য ইচ্ছাশক্তির ফল এসেছে এবার। সদ্য প্রকাশিত দাখিল পরীক্ষার ফলাফলে দোয়ারাবাজার উপজেলার রামপুর গ্রামের বাসিন্দা ছায়েম আল হাসান আলহেরা জামেয়া ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসা থেকে গোল্ডেন এ প্লাস অর্জন করেছে। ফলাফল হাতে পেয়ে আজ ছায়েমের চোখে স্বপ্ন বিসিএস ক্যাডার হয়ে দেশ ও মানুষের সেবা করার। আর মায়ের চোখে আনন্দের অশ্রু। সেই অশ্রুতে মিশে আছে বছরের পর বছর কষ্ট, ত্যাগ আর অপেক্ষার গল্প। ছায়েমের মা হাফসা বেগম বলেন, চার বছর বয়সে জটিল রোগে আক্রান্ত হওয়ার পর আমার ছেলের হাত-পা অস্বাভাবিক হয়ে যায়। ছোটবেলা থেকেই তাকে কোলে করে স্কুলে নিয়ে ভর্তি করাই। এরপর প্রতিদিন স্কুল থেকে মাদরাসা পর্যন্ত কোলে করে নিয়ে গেছি। অনেক কষ্ট হয়েছে, কিন্তু ছেলের পড়াশোনা বন্ধ হতে দিইনি। আজ তার ফলাফলের খবর শুনে আমি গর্বিত। ছেলের জন্য এতটা পথ পাড়ি দেওয়া এই মায়ের নিজের শরীরও নানা রোগে জর্জরিত। তার দুটি কিডনিই ক্ষতিগ্রস্ত। রয়েছে আরও নানা শারীরিক জটিলতা। কিন্তু সন্তানের ভবিষ্যতের কাছে নিজের কষ্টকে কখনো বড় হতে দেননি তিনি। তার কাছে এই ফলাফল কেবল একটি ভালো ফল নয় এটি মায়ের প্রতিটি কষ্টের, প্রতিটি অপেক্ষার এবং প্রতিটি ত্যাগের স্বীকৃতি। নিজের সাফল্যের জন্য মা, শিক্ষক ও পরিবারের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে ছায়েম আল হাসান বলেন, আমার এই সাফল্যের পেছনে আমার মা, শিক্ষক ও পরিবারের অনেক অবদান রয়েছে। আমি সবার কাছে কৃতজ্ঞ। সবার সহযোগিতা পেলে ভবিষ্যতে বিসিএস ক্যাডার হয়ে দেশসেবার কাজে নিজেকে নিয়োজিত করতে চাই। আমার মতো যারা বিশেষ চাহিদাস¤পন্ন, তাদের অধিকার আদায়েও কাজ করতে চাই। আমি সবার দোয়া চাই। ছায়েমের প্রতিবেশী এডভোকেট মাসুক মিয়া বলেন, ছায়েম দেখিয়ে দিয়েছে, প্রতিবন্ধকতা কোনো বোঝা নয়। তার এই সাফল্যে আমরা আনন্দিত ও গর্বিত। আমরা চাই সরকার তার দিকে সুদৃষ্টি দেবে, যাতে উচ্চশিক্ষার পথে তাকে কোনো প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে না হয়। ছায়েমের সাফল্যে আবেগাপ্লুত তার নানী সৈয়দুন নেছাও। তিনি বলেন, ছোটবেলা থেকেই কত বাধাবিপত্তির মধ্য দিয়ে সে বড় হয়েছে। তার মায়ের যে ত্যাগ, আর কোনো মা এমন করবে বলে মনে হয় না। আমার নাতির এই সাফল্য আল্লাহর দান। আমি চাই, সে জীবনে অনেক বড় হোক, মানুষের কল্যাণে কাজ করুক। ছায়েমের সাফল্যে উচ্ছ্বসিত তার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও। আলহেরা জামেয়ার ভাইস প্রিন্সিপাল তোফায়েল আহমদ খান বলেন, ছায়েম খুবই মেধাবী। তার এই অর্জনে আমরা অত্যন্ত আনন্দিত ও গর্বিত। ছায়েম আলিমে ভর্তি হলে প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে তাকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করা হবে।
নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha
অদম্য মেধাবী ছায়েম আল হাসান
শারীরিক প্রতিবন্ধকতা জয় করে গোল্ডেন এ প্লাস অর্জন
- আপলোড সময় : ১৬-০৮-২০২৬ ০৯:৩৩:৩৪ পূর্বাহ্ন
- আপডেট সময় : ১৬-০৮-২০২৬ ০৯:৩৪:১১ পূর্বাহ্ন
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ

বিশেষ প্রতিনিধি