বিশেষ প্রতিনিধি::
গত মার্চ মাসে লিবিয়া থেকে সাগরপথে গ্রীস যাবার সময় ভূমধ্যসাগরে খাবার ও পানির অভাবে মারা যান সুনামগঞ্জের ১২ যুবক। স্বজনদের বুকের সেই দগদগে ক্ষত এখনো শুকায়নি। এখনো তাদের চোখে ঝরছে অশ্রু। এর মধ্যে আবার ৬ মাস না যেতেই আরো ৫ যুবক লিবিয়া থেকে গ্রীস যাবার পথে বহনকারী নৌকাটি নষ্ট হয়ে নিখোঁজ হয়েছেন। ১জন হাসপাতালে মুমূর্ষু অবস্থায় কাতরাচ্ছেন। ৫জন বেঁচে আছেন কি না জানেননা কেউ। স্বজনরাও স্থানীয় দালালদের প্ররোচনায় পড়ে কোনও কথা বলছেন না। পুলিশ প্রশাসনও কোনও ক্লু উদ্ধার করতে পারেনি। উল্লেখ্য, গত মার্চ মাসে ভূমধ্যসাগরে দিরাই উপজেলার ৬ জন, জগন্নাথপুরের ৫ জন এবং দোয়ারাবাজার উপজেলার ১জন মারা গিয়েছিলেন। বিষয়টি জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। এর মধ্যে আবারও একই ঘটনায় সুনামগঞ্জের নাম সামনে এসেছে। পুলিশ, এলাকাবাসী ও স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শান্তিগঞ্জ উপজেলার চিকারকান্দি গ্রামের ইসলাম উদ্দিনের ছেলে এনামুল খান, হযরত খানের ছেলে মামুন খান, রাজ মিয়ার ছেলে রিপন মিয়া, রনসি গ্রামের এখলাছ উদ্দিনের ছেলে সাব্বির হোসেন তালহা, পাথারিয়া গ্রামের আব্দুল করিম, শত্রুমর্দন গ্রামের রন্টু চন্দ্র পালের ছেলে হৃদয় চন্দ্র পাল কয়েক মাস আগে স্থানীয় ডুংরিয়া ও কামরূপ দলং গ্রামের দালালসহ স্থানীয় কমিশনপ্রাপ্ত দালারের মাধ্যমে লিবিয়া হয়ে ইউরোপ পাঠানোর জন্য ১০-১২ লাখ টাকার চুক্তি করেন। পরিবারগুলো জমি ও গবাদিপশু বিক্রি করে দালালের হাতে তোলে দেয় টাকা। পরে তাদের লিবিয়া নিয়ে ‘গেইমঘরের’ মাধ্যমে সাগরপথে ঝুঁকিপূর্ণ নৌযানে গ্রীস ও ইতালির উদ্দেশ্যে প্রেরণ করে। সম্প্রতি সুনামগঞ্জের এই ৬জনের মধ্যে আব্দুল করিম বাদে বাকি সবাই নিখোঁজ আছেন। আব্দুল করিম মিশরের মারসা মাতরুহ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন। সেখান থেকেই তিনি ফেসবুকে ভিডিও বার্তায় দুর্ঘটনার খবর জানান। ওই নৌকায় ৪২ অভিবাসীর মধ্যে ৩৮জন বাংলাদেশি ও ৪জন সুদানী ছিলেন বলে জানা গেছে। লিবিয়ার তাবারুক উপকূল থেকে গ্রিসের উদ্দেশ্য যাত্রার পর নৌকার ইঞ্জিন বিকল হয়ে গেলে তারা টানা ১১দিন ভাসতে থাকেন। অল্প খাবার ও পানি শেষ হয়ে যাওয়ায় ১১জন মারা গেলে সাগরে ফেলে দেওয়া হয়। পরে উদ্ধারকারী দল আহতদের গুরুতর অবস্থায় মিসরের হাসপাতালে ভর্তি করে। আব্দুল করিমের ভিডিও কলের সূত্রেই সুনামগঞ্জের নিখোঁজদের বিষয়ে জানতে পারেন স্বজনরা। তবে এ নিয়ে সাংবাদিক ও প্রশাসনের লোকজন নিখোঁজদের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে তারা কেউ কোনও তথ্য জানাতে চাননি। দালালদের প্ররোচনা ও হুমকি ধমকিতে তারা চুপসে আছেন বলে জানান স্থানীয়রা। চিকারকান্দি গ্রামের এনামুল খানের পিতা ইসলাম উদ্দিন খান বলেন, আমার ছেলের সঙ্গে ১০-১২দিন আগে কথা হয়েছে। এখন শুনি সে নিখোঁজ। তবে আমরা নিখোঁজের কোনও প্রমাণ পাইনি। যাদের মাধ্যমে পাঠিয়েছি তারা জানিয়েছে তাদের কাছে আছে। রনসি গ্রামের তালহা আলমের জ্ঞাতি ভাই মোরশেদ আলম বলেন, তালহার সঙ্গে তার বাবা মায়ের সর্বশেষ কথা হয়েছে গত ৩ আগস্ট। এখন আমরা শুনতে পেলাম সে নিখোঁজ। তবে আমরা নিখোঁজের কোনও তথ্য পাইনি। তার মা-বাবাও বেশি কিছু বলতে পারছেন না। চিকারকান্দি গ্রামের ইউপি সদস্য সালিক মিয়া বলেন, থানা পুলিশ আমাদের নিয়ে নিখোঁজদের বাড়িতে গিয়েছিল। নিখোঁজদের স্বজনরা কেউ কিছু বলতে চাননি। আমার মনে হয় দালালরা তাদের লোভ দেখিয়েছে। তবে তাদের সন্তানরা যে বিপদে আছে সেটা বুঝা গেছে তাদের চেহারা দেখেই। শান্তিগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিল্লোল চাকমা বলেন, আমরা নিখোঁজ ৫টি পরিবারের সঙ্গেই কথা বলেছি। তারা জানিয়েছে ৩ আগস্টের পর থেকে কারো সঙ্গে যোগাযোগ নেই। তারাও এ বিষয়ে স্পষ্ট জানেনা কিছু। তাছাড়া এ নিয়ে তারাও বেশি কথা বলতে চাচ্ছেন না। আমরা ধরে নিচ্ছি এই ৫জনই নিখোঁজ। তাদের সম্পর্কে জানতে আমরা আরো চেষ্টা চালাচ্ছি।
নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha
দালালদের প্ররোচনায় কথা বলতে অনীহা স্বজনদের
ভূমধ্যসাগরে নিখোঁজ সুনামগঞ্জের ৫ তরুণ
- আপলোড সময় : ১৮-০৮-২০২৬ ১০:০৫:০৫ পূর্বাহ্ন
- আপডেট সময় : ১৮-০৮-২০২৬ ১০:০৫:৩৪ পূর্বাহ্ন
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ

বিশেষ প্রতিনিধি