সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়ক চার লেনে উন্নীত করা সময়ের দাবি
- আপলোড সময় : ১৬-০৯-২০২৬ ০৯:৪৯:৫৫ পূর্বাহ্ন
- আপডেট সময় : ১৬-০৯-২০২৬ ০৯:৪৯:৫৫ পূর্বাহ্ন
সুনামগঞ্জের উন্নয়ন ও সম্ভাবনার সঙ্গে যোগাযোগব্যবস্থার প্রশ্নটি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। প্রাকৃতিক সম্পদ, হাওরভিত্তিক কৃষি, মৎস্য, পর্যটন, সীমান্তবাণিজ্য - বহুমাত্রিক সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও দুর্বল ও অপর্যাপ্ত সড়ক যোগাযোগ জেলার অর্থনৈতিক অগ্রগতির অন্যতম বড় বাধা হয়ে আছে। এ বাস্তবতায় সিলেট-সুনামগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়ককে চারলেনে উন্নীত করার দাবি অত্যন্ত সময়োপযোগী এবং যৌক্তিক।
গত সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) সুনামগঞ্জে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত সমন্বয় সভায় জেলা পরিষদের প্রশাসক ও বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মো. মিজানুর রহমান চৌধুরী সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়ক চারলেনে উন্নীত করার দাবি জানিয়েছেন। জেলার সার্বিক উন্নয়ন, জননিরাপত্তা ও সরকারি কর্মকা-ের সমন্বয় নিয়ে অনুষ্ঠিত সভায় এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগত দাবি উঠে আসা নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ। তবে এটি কোনো ব্যক্তি বা দলের দাবি হিসেবে সীমাবদ্ধ না রেখে সুনামগঞ্জের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়ক শুধু দুটি জেলার মধ্যে যোগাযোগের পথ নয়; এটি বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকা-ের একটি গুরুত্বপূর্ণ করিডোর। প্রতিদিন এই সড়ক দিয়ে যাত্রীবাহী বাস, পণ্যবাহী ট্রাক, ব্যক্তিগত যানবাহনসহ বিপুলসংখ্যক যান চলাচল করে। সুনামগঞ্জের কৃষিপণ্য, মাছ, পাথর ও অন্যান্য স্থানীয় পণ্য সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পরিবহনের ক্ষেত্রেও এ সড়কের গুরুত্ব অপরিসীম। একই সঙ্গে সুনামগঞ্জের মানুষ চিকিৎসা, শিক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও প্রশাসনিক নানা প্রয়োজনে সিলেটমুখী হন।
সড়কটি চারলেনে উন্নীত হলে শুধু যানজট ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমবে না, যাতায়াতের সময়ও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে। পণ্য পরিবহনে সময় ও ব্যয় কমলে কৃষক ও ব্যবসায়ীরা সরাসরি লাভবান হবেন। দ্রুত পণ্য বাজারজাত করা সম্ভব হলে হাওরাঞ্চলের কৃষি অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। বিশেষ করে বোরো ধান, মাছ, সবজি ও অন্যান্য কৃষিপণ্য দ্রুত বৃহত্তর বাজারে পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
সুনামগঞ্জের পর্যটন সম্ভাবনার কথা আলাদাভাবে উল্লেখ করতে হয়। টাঙ্গুয়ার হাওর, নীলাদ্রি লেক, শিমুল বাগান, যাদুকাটা নদী, বারেকের টিলা, লাউড়েরগড়সহ জেলার বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে প্রতিবছর দেশ-বিদেশের বিপুলসংখ্যক পর্যটক আসেন। কিন্তু পর্যটনকেন্দ্রগুলোর সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হলে শুধু দর্শনীয় স্থান থাকলেই হবে না; প্রয়োজন নিরাপদ, দ্রুত ও আরামদায়ক যোগাযোগব্যবস্থা। সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়ক উন্নত হলে সিলেটের পর্যটন অবকাঠামোর সঙ্গে সুনামগঞ্জের পর্যটনকেন্দ্রগুলোর সংযোগ আরও শক্তিশালী হবে। ফলে সুনামগঞ্জে পর্যটকের অবস্থানকাল ও স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকা- বৃদ্ধির সম্ভাবনা তৈরি হবে।
অন্যদিকে সুনামগঞ্জের একটি বড় অংশ হাওর ও সীমান্তবর্তী এলাকা। বর্ষাকালে জেলার অনেক অঞ্চলের সড়ক যোগাযোগ নানাভাবে ব্যাহত হয়। প্রধান আঞ্চলিক মহাসড়কটি আধুনিক ও সক্ষমতাস¤পন্ন হলে দুর্যোগের সময় জরুরি পণ্য, চিকিৎসাসেবা ও উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনাও তুলনামূলক সহজ হবে। উন্নত সড়ক শুধু অর্থনীতির জন্য নয়, মানুষের জীবন ও নিরাপত্তার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
তবে চারলেনের দাবি বাস্তবায়নে শুধু সড়কের প্রস্থ বাড়ালেই চলবে না। প্রকল্প গ্রহণের সময় ভবিষ্যৎ যানবাহনের চাপ, জনবসতি, বাজার, সেতু-কালভার্ট, জলাবদ্ধতা, হাওরের পানি প্রবাহ এবং পরিবেশগত বিষয়গুলো সমন্বিতভাবে বিবেচনা করতে হবে। প্রয়োজন হলে গুরুত্বপূর্ণ বাজার ও জনবহুল এলাকায় সার্ভিস লেন, পথচারী পারাপারের ব্যবস্থা, বাসস্ট্যান্ড, ড্রেনেজ এবং পর্যাপ্ত সড়ক নিরাপত্তা অবকাঠামো রাখতে হবে। সড়কের দুই পাশে অপরিকল্পিত স্থাপনা ও দখল যাতে নতুন সংকট সৃষ্টি না করে, সেদিকেও কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।
আরেকটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ- শুধু চারলেন নির্মাণের ঘোষণা দিয়ে প্রকল্প বছরের পর বছর ঝুলিয়ে রাখা যাবে না। সম্ভাব্যতা যাচাই, ভূমি অধিগ্রহণ, অর্থায়ন ও নকশা প্রণয়নের কাজ স্বচ্ছতা ও দ্রুততার সঙ্গে এগিয়ে নিতে হবে। প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় বৃদ্ধি, নি¤œমানের কাজ কিংবা অপ্রয়োজনীয় বিলম্ব যাতে না ঘটে, তার জন্য শক্তিশালী তদারকি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।
সুনামগঞ্জ দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়ন বৈষম্যের শিকার। হাওর ও সীমান্তঘেঁষা এই জেলার সম্ভাবনাকে জাতীয় অর্থনীতির মূলধারায় যুক্ত করতে হলে যোগাযোগ অবকাঠামোয় বড় ধরনের বিনিয়োগ প্রয়োজন। সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়ক চারলেনে উন্নীত করা সেই বিনিয়োগের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে।
আমরা মনে করি, সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়ক চারলেনে উন্নীত করার দাবিকে রাজনৈতিক বক্তব্য বা সভার প্রস্তাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সরকারের দীর্ঘমেয়াদি আঞ্চলিক যোগাযোগ পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করা দরকার। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের উচিত দ্রুত কারিগরি ও অর্থনৈতিক সমীক্ষা করে প্রকল্পের বাস্তব সম্ভাবনা যাচাই করা এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
সুনামগঞ্জের হাওর, কৃষি, পর্যটন ও সীমান্ত অর্থনীতির যে সম্ভাবনা রয়েছে, তা কাজে লাগাতে হলে আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থার বিকল্প নেই। তাই সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়ক চারলেনে উন্নীত করা কোনো বিলাসী প্রকল্প নয় - এটি সুনামগঞ্জের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ, জননিরাপত্তা ও আঞ্চলিক উন্নয়নের প্রয়োজনীয় অবকাঠামো। এখন প্রয়োজন দাবি থেকে সিদ্ধান্তে এবং সিদ্ধান্ত থেকে দ্রুত বাস্তবায়নে যাওয়া।
নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদকীয়