জালাল উদ্দিন নাসিম::
সুনামগঞ্জ জেলার ১২টি উপজেলার প্রায় ৩০ লাখ মানুষের চিকিৎসার অন্যতম প্রধান ভরসাস্থল ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতাল। অথচ ৭৪টি চিকিৎসক পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ২৫ জন। অর্থাৎ চিকিৎসকের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি পদই শূন্য। এর সঙ্গে নার্স, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট ও ফার্মাসিস্টের তীব্র সংকট। ২৫০ শয্যার হাসপাতালটিতে গত সাত-আট মাস ধরে প্রতিদিন গড়ে ৭০০ থেকে ৮০০ রোগী চিকিৎসা নিতে আসছেন; কোনো কোনো দিন এই সংখ্যা ৯০০ ছাড়িয়ে যাচ্ছে। ফলে অতিরিক্ত রোগীর চাপ, শয্যা ও জনবল সংকটে কার্যত ধুঁকছে হাওরাঞ্চলের এই প্রধান সরকারি হাসপাতাল। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, ২৫০ রোগীর জন্য যে জনবল ও বরাদ্দ, তা দিয়েই প্রতিদিন তিন গুণেরও বেশি রোগীর চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে হচ্ছে। ফলে চিকিৎসক ও অন্যান্য জনবলের ওপর তৈরি হচ্ছে বাড়তি চাপ। শয্যা না পেয়ে অনেক রোগীকে মেঝে, বারান্দা ও করিডোরে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। বিশেষ করে শিশু ও হাম আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ৭৪টি চিকিৎসক পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ২৫ জন। তাঁদের মধ্যে আবার ৫ থেকে ৬ জন বিভিন্ন সময়ে ছুটিতে থাকেন। ফলে কোনো কোনো সময় উপস্থিত চিকিৎসকের সংখ্যা আরও কমে যায়। ২৬৩ জন নার্সের বিপরীতে ফাংশনাল নার্স রয়েছেন ১৫০ জন। মেডিকেল টেকনোলজিস্ট ও ফার্মাসিস্টের পদেও রয়েছে উল্লেখযোগ্য শূন্যতা। জনবলের এই ঘাটতির মধ্যেই প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক রোগীর চাপ সামলাতে হচ্ছে হাসপাতালটিকে। সম্প্রতি হাসপাতাল ঘুরে রোগী ও স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চিকিৎসকের অপেক্ষায় দীর্ঘ সময় থাকতে হচ্ছে অনেক রোগীকে। প্রয়োজনীয় ওষুধ না পাওয়ার অভিযোগও রয়েছে। ফলে সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসেও কিছু ওষুধ বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে বলে অভিযোগ রোগী ও স্বজনদের। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংকট এবং হাসপাতালের বিভিন্ন স্থানে অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিয়েও রয়েছে অভিযোগ। জয়নগর এলাকার বাসিন্দা রকিব তাঁর শিশুকে নিয়ে হাসপাতালে এসে বলেন, সকালে বাচ্চাকে নিয়ে হাসপাতালে এসেছি। নিচতলা-উপরতলা সব জায়গায় ঘুরেছি, কিন্তু অনেক জায়গায় ডাক্তার পাওয়া যায়নি। ডাক্তারের সংখ্যা খুবই কম। আরেক রোগী বলেন, চার দিন ধরে হাসপাতালে আসছি। একজন ডাক্তারকে দুই-তিনশ রোগী দেখতে হয়। পর্যাপ্ত ডাক্তার নেই। অনেক ওষুধও পাওয়া যায় না। বাইরে থেকে কিনে আনতে হয়। ওয়াজখালি এলাকা থেকে চিকিৎসা নিতে আসা এক রোগী বলেন, সরকারি হাসপাতালে এসেও অনেক সময় ওষুধ নিজের টাকায় কিনতে হয়। ডাক্তারকে অনুরোধ করে দেখিয়ে ওষুধ লিখিয়ে নিতে হয়। অনেক সময় ডাক্তার নিয়মিত থাকেন না। সকালে একবার দেখা গেলেও বিকেলে অনেক সময় পাওয়া যায় না। মানবাধিকারকর্মী মোহাম্মদ তোফাজ্জল হোসেন বলেন, ২৫০ শয্যার হাসপাতালে যেখানে ৭৪ জন চিকিৎসক থাকার কথা, সেখানে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ২৫ জন। হাসপাতালটি যেন নিজেই রোগী হয়ে রয়েছে। আমরা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে অনুরোধ করছি, দ্রুত পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ দিয়ে সাধারণ মানুষের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা হোক। সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. আলী আশরাফ সোহাগ বলেন, চিকিৎসক থাকার কথা ৭৪ জন। আছেন ২৫ জন। এর মধ্যে ৫ থেকে ৬ জন ছুটিতে থাকেন। নার্স থাকার কথা ২৬৩ জন, ফাংশনাল আছেন ১৫০ জন। মেডিকেল টেকনোলজিস্টেরও প্রায় ৪০ শতাংশ পদ শূন্য। ফার্মাসিস্টের পদও প্রায় ৫০ শতাংশ শূন্য রয়েছে। তিনি বলেন, আমাদের সব বরাদ্দ দেওয়া হয় ২৫০ জন রোগীর অনুপাতে। কিন্তু সেই বরাদ্দ দিয়েই ৭০০ থেকে ৮০০ রোগীকে সেবা দিতে হচ্ছে। গত সাত-আট মাস ধরে প্রতিদিনই অতিরিক্ত রোগী আসছেন। কোনো কোনো দিন রোগীর সংখ্যা ৯০০ ছাড়িয়ে যায়। আমাদের ম্যানপাওয়ার প্রয়োজনের তুলনায় প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। ফলে চিকিৎসকসহ জনবলের অভাবে সেবা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha
২৫০ শয্যার হাসপাতালে প্রতিদিন সেবা নিচ্ছেন ৭০০-৮০০ রোগী, ৭৪ চিকিৎসকের পদে কর্মরত মাত্র ২৫
সংকটে ধুঁকছে সদর হাসপাতাল
- আপলোড সময় : ১৯-০৯-২০২৬ ০২:০১:৩৮ পূর্বাহ্ন
- আপডেট সময় : ১৯-০৯-২০২৬ ০২:০৫:৩০ পূর্বাহ্ন
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ

স্টাফ রিপোর্টার, দৈনিক সুনামকণ্ঠ