সুনামগঞ্জ , মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ , ৭ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
রাজউকের নকশা অনুমোদনে ওয়ানস্টপ, প্রকল্পে জবাবদিহি নিশ্চিতের উদ্যোগ জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় জনসাধারণের ক্ষোভ তাহিরপুরে ইউনিয়ন ছাত্রদলের সহ-সভাপতি বহিষ্কার সোনালী চেলা নদীতে ড্রেজারের তান্ডব থামেনি সাদাসিধে জীবন, আলোকিত কর্মযাত্রা নজরুল বর্ষ উপলক্ষে সুনামগঞ্জ সদরে উপজেলা পর্যায়ের সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত বিএনপি নেতা জালাল উদ্দিন ফারুকীকে দল থেকে বহিষ্কারের সুপারিশ জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয়ে ফুটবল উৎসব উদ্বোধন প্রকল্পের অপেক্ষায় ভাগাড়ে পরিণত পুরাতন পৌরসভা চত্বর কিশোর গ্যাং দমনে কঠোর পদক্ষেপের দাবিতে মানববন্ধন সফর সংক্ষিপ্ত, কূটনৈতিক কর্মসূচি বিস্তৃত: নিউইয়র্কে তারেক রহমান নতুন পে-স্কেলের প্রজ্ঞাপন জারি ঢাকা-সিলেট সড়কের ৬ লেনের নির্মাণকাজ শেষ হবে ২৯ সালে : সড়কমন্ত্রী দিরাই সরকারি ডিগ্রি  কলেজে ‎"অধ্যক্ষ বিহীন ১৭ বছর" ছাতক-গোবিন্দগঞ্জ সড়ক উন্নয়নে ১৭৪ কোটি টাকার কাজ উদ্বোধন ভিপি জমি দখলের চেষ্টার অভিযোগ, সংবাদ সম্মেলনে মমতাজ বেগম ছাতকে ১৫ লাখ টাকার ভারতীয় চোরাচালান পণ্যসহ আটক ১ ডাকসুতে ইতিহাসের বিতর্ক, বাংলাদেশের জন্মপথ কি মুছে ফেলা যায়? ‎তিন সন্তানকে বিষপান করানোর পর বাবারও বিষপান, তাহিরপুরে তিন শিশুর মৃত্যু সংকটে ধুঁকছে সদর হাসপাতাল
কাজী মাওলানা শাহেদ আলী

সাদাসিধে জীবন, আলোকিত কর্মযাত্রা

  • আপলোড সময় : ২২-০৯-২০২৬ ০৯:৩৫:৫৯ পূর্বাহ্ন
  • আপডেট সময় : ২২-০৯-২০২৬ ০৯:৩৭:৪৫ পূর্বাহ্ন
সাদাসিধে জীবন, আলোকিত কর্মযাত্রা
:: আকরাম উদ্দিন ::
সুনামগঞ্জের শিক্ষাঙ্গনে আড়ালে থাকা আলোকবর্তিকাদের মধ্যে কাজী আলহাজ্ব মাওলানা শাহেদ আলী অন্যতম। স্থানীয়ভাবে তিনি সবার কাছে ‘কাজী হুজুর’ নামে পরিচিত। নিকাহসংক্রান্ত নানা বিষয়ে তাঁর অবদান অনেক। এ কারণে মানুষ তাঁর পরিচয় দিতে গিয়ে তাঁকে ‘মঙ্গলকাটার কাজী হুজুর’ বলেই অভিহিত করে থাকেন। দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবন, নিকাহ রেজিস্ট্রারের দায়িত্ব পালন, সামাজিক সালিশ ও জনকল্যাণমূলক কর্মকা-ের মধ্য দিয়ে তিনি অর্জন করেছেন সুনাম, গ্রহণযোগ্যতা ও মানুষের ভালোবাসা। প্রচারবিমুখ এই গুণী মানুষটি নীরবে-নিভৃতে অসহায় ও বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে আসছেন দীর্ঘদিন ধরে।
জন্ম ও পারিবারিক পরিচয় : কাজী আলহাজ্ব মাওলানা শাহেদ আলী ১৯৫৮ সালের ১ মার্চ ময়মনসিংহ জেলার নন্দাইল উপজেলার কানারামপুর ইউনিয়নের কুতুবপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মরহুম মৌলভী আব্দুল জব্বার এবং মাতা মরহুম শহরবানু। চার ভাই ও তিন বোনের মধ্যে তিনি সবার বড়। মাত্র তিন বছর বয়সে পরিবারের সঙ্গে ময়মনসিংহ থেকে সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার মৌয়াকুড়া গ্রামে চলে আসেন তিনি। ফলে তাঁর বাল্যকাল ও বেড়ে ওঠার বড় একটি সময় কেটেছে এই গ্রামেই। পরে সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার জাহাঙ্গীরনগর ইউনিয়নের মীরেরচর এলাকায় ইয়াকুবিয়া দাখিল মাদ্রাসা সংলগ্ন এলাকায় বসতিবাড়ি নির্মাণ করেন।
বাল্যকাল ও শিক্ষাজীবন : কাজী আলহাজ্ব মাওলানা শাহেদ আলীর শিক্ষাজীবনের সূচনা বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার কাপনা দাখিল মাদ্রাসায়। পরবর্তীতে মেরুয়াখলা মমিনিয়া কামিল মাদ্রাসা থেকে দাখিল, আলিম ও ফাজিল পাস করেন। এরপর সিলেটের সৎপুর কামিল মাদ্রাসা থেকে সর্বোচ্চ ডিগ্রি অর্জন করেন। শিক্ষাজীবন শেষ করেই তিনি শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নেন। জ্ঞানচর্চা ও শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়ার এই পথচলাই পরবর্তী সময়ে তাঁর জীবনের অন্যতম প্রধান পরিচয়ে পরিণত হয়। ৪২ বছরের শিক্ষকতা জীবন : শিক্ষাজীবন শেষে দোয়ারাবাজার উপজেলার বড়ইউড়ি মাদ্রাসায় সুপার হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন কাজী আলহাজ্ব মাওলানা শাহেদ আলী। পরে সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলার তেলিকোণা দাখিল মাদ্রাসায় সুপার পদে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৪ সালে সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার জাহাঙ্গীরনগর ইউনিয়নের ইয়াকুবিয়া দাখিল মাদ্রাসায় সুপার হিসেবে যোগদান করেন। সেখানে টানা ৩৫ বছর দায়িত্ব পালন শেষে অবসর গ্রহণ করেন। এর আগে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে প্রায় সাত বছর শিক্ষকতা করেছেন। সব মিলিয়ে তাঁর শিক্ষকতা জীবনের ব্যাপ্তি প্রায় ৪২ বছর। শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি নিকাহ রেজিস্ট্রারের দায়িত্বও পালন করেছেন। দীর্ঘদিন এই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে মানুষের পারিবারিক ও সামাজিক নানা বিষয়ে স¤পৃক্ত হওয়ার সুযোগ পান। ন্যায়সংগত সিদ্ধান্ত ও সুন্দরভাবে বিষয়গুলো সমাধানের চেষ্টা তাঁকে স্থানীয়ভাবে একজন গ্রহণযোগ্য সালিশ ব্যক্তিত্ব হিসেবেও পরিচিত করে তোলে। শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান গড়ার উদ্যোগ : বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার সলুকাবাদ ইউনিয়নের গোলগাঁও এলাকায় নিজস্ব পৈতৃক ভূমিতে তিনি একটি মাদ্রাসা কমপ্লেক্স নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছেন। এর আওতায় মক্তব, এতিমখানা ও মসজিদ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা রয়েছে। ইতোমধ্যে কমপ্লেক্সের নির্মাণকাজ এগিয়ে চলছে। শিক্ষা ও ধর্মীয় মূল্যবোধের সমন্বয়ে একটি আলোকিত প্রজন্ম গড়ে তোলার প্রত্যয় থেকেই তাঁর এই উদ্যোগ। কাজী আলহাজ্ব মাওলানা শাহেদ আলী জেলা কাজী সমিতির সভাপতির দায়িত্বও পালন করেছেন। বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় সংগঠনের সঙ্গে তাঁর স¤পৃক্ততা রয়েছে। দীর্ঘদিন তিনি সদর উপজেলার মীরেরচর শাহী ঈদগাহের খতিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এই ঈদগাহে বাইশ গ্রামের মানুষ ঈদের জামাতে অংশ নেন।
পরিবারে শিক্ষার বিস্তার : কাজী আলহাজ্ব মাওলানা শাহেদ আলীর সবচেয়ে বড় সাফল্যের একটি দিক হলো তাঁর পরিবারে শিক্ষার ব্যাপক বিস্তার। তাঁর সন্তান, ভাই ও ভাগ্নেদের অনেকে শিক্ষকতা, ধর্মীয় শিক্ষা, ব্যবসা ও সরকারি চাকরিতে যুক্ত রয়েছেন। তাঁর বড় ছেলে কাজী মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম সপরিবারে সৌদি আরবের মক্কা নগরীতে বসবাস করছেন। তিনি কাজী শফিক হলিডেইজের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন। এই প্রতিষ্ঠানের দেশে-বিদেশেও শাখা রয়েছে। দ্বিতীয় ছেলে কাজী আমিন আত তাফহীম বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার মেরুয়াখলা মমিনিয়া কামিল মাদ্রাসার প্রধান মুহাদ্দিস ও সহকারী অধ্যাপক। ধর্মীয় আলোচনার পাশাপাশি তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইউটিউবেও নিয়মিত বক্তব্য প্রচার করেন। সম্প্রতি তিনি ইউটিউব থেকে ‘গোল্ডেন প্লে বাটন’ অর্জন করেছেন। তৃতীয় ছেলে কাজী মমিনুল ইসলাম সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার জাহাঙ্গীরনগর ইউনিয়নের নিকাহ রেজিস্ট্রার ও কাজী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। চতুর্থ ছেলে মাহবুবুল ইসলাম সুনামগঞ্জের কাজী শফিক হলিডেইজের পরিচালক ও গ্রাফিক্স ডিজাইনার। পঞ্চম ছেলে কাজী সাদিকুল ইসলাম ফয়সল সৌদি আরবের পবিত্র মক্কা নগরীতে ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কর্মরত। কাজী আলহাজ্ব মাওলানা শাহেদ আলীর চার ভাইয়ের মধ্যেও রয়েছেন শিক্ষাক্ষেত্রে কর্মরত আছেন তিনজন। হাফিজ আব্দুল হামিদ দিঘীরপাড় দাখিল মাদ্রাসার শিক্ষক, মাওলানা মোহাম্মদ আলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এবং মাওলানা আহমদ আলী আনোয়ার একটি হাইস্কুলের ধর্মীয় শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ভাগ্নেদের মধ্যেও অনেকে শিক্ষকতা ও সরকারি চাকরিতে যুক্ত। মাওলানা শামসুল হুদা এইচএমপি উচ্চ বিদ্যালয়ের ধর্মীয় শিক্ষক, মাওলানা আব্দুল আউয়াল রঙ্গারচর হরিনাপাটি উচ্চবিদ্যালয়ের ধর্মীয় শিক্ষক এবং মাওলানা আতাউর রহমান সরকারি এসসি গার্লস হাইস্কুলের ধর্মীয় শিক্ষক হিসেবে কর্মরত। মোহাম্মদ ইসমাইল হোসেন সুনামগঞ্জ সরকারি জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয়ের ইংরেজি শিক্ষক। এছাড়া আব্দুল বাছির, নেছার উদ্দিন ও ওবায়দুল্লাহ, এই তিনজন পুলিশের এ.এস.আই হিসেবে কর্মরত রয়েছেন।
বিভিন্ন অবদানে স্বীকৃতি : দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবন, শিক্ষা বিস্তার এবং সামাজিক কর্মকা-ে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ কাজী আলহাজ্ব মাওলানা শাহেদ আলী পেয়েছেন অসংখ্য সম্মাননা। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য হিসাবে ১৯৯৭ সালে তিনি ‘শ্রেষ্ঠ শিক্ষক’ সম্মাননা লাভ করেন। পরে ২০১৮ সালে অর্জন করেন ‘শিক্ষাগুরু পদক’। এসব স্বীকৃতি তাঁর দীর্ঘ কর্মময় জীবনের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসারই বহিঃপ্রকাশ।
শেষ কথা : জীবনের দীর্ঘ সময় শিক্ষকতা করেছেন, মানুষের সুখ-দুঃখের সঙ্গে থেকেছেন, নিকাহ রেজিস্ট্রারের দায়িত্ব পালন করেছেন, সামাজিক সালিশে ভূমিকা রেখেছেন এবং শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছেন-সব মিলিয়ে কাজী আলহাজ্ব মাওলানা শাহেদ আলীর জীবন বহুমাত্রিক। তিনি প্রচারের আলোয় না থেকেও মানুষের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। তাঁর মতো নীরব কর্মীরা সমাজের আলোকবর্তিকা হয়ে থাকেন। তাঁদের জীবন ও কর্ম নতুন প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস। আমরা কাজী হুজুরের সুস্থতা, দীর্ঘায়ু ও সুন্দর জীবন কামনা করি।

[লেখক : আকরাম উদ্দিন, গল্পকার ও সাংবাদিক]

নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha

কমেন্ট বক্স