সুনামগঞ্জ , মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ , ৭ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় জনসাধারণের ক্ষোভ তাহিরপুরে ইউনিয়ন ছাত্রদলের সহ-সভাপতি বহিষ্কার সোনালী চেলা নদীতে ড্রেজারের তান্ডব থামেনি সাদাসিধে জীবন, আলোকিত কর্মযাত্রা নজরুল বর্ষ উপলক্ষে সুনামগঞ্জ সদরে উপজেলা পর্যায়ের সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত বিএনপি নেতা জালাল উদ্দিন ফারুকীকে দল থেকে বহিষ্কারের সুপারিশ জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয়ে ফুটবল উৎসব উদ্বোধন প্রকল্পের অপেক্ষায় ভাগাড়ে পরিণত পুরাতন পৌরসভা চত্বর কিশোর গ্যাং দমনে কঠোর পদক্ষেপের দাবিতে মানববন্ধন সফর সংক্ষিপ্ত, কূটনৈতিক কর্মসূচি বিস্তৃত: নিউইয়র্কে তারেক রহমান নতুন পে-স্কেলের প্রজ্ঞাপন জারি ঢাকা-সিলেট সড়কের ৬ লেনের নির্মাণকাজ শেষ হবে ২৯ সালে : সড়কমন্ত্রী দিরাই সরকারি ডিগ্রি  কলেজে ‎"অধ্যক্ষ বিহীন ১৭ বছর" ছাতক-গোবিন্দগঞ্জ সড়ক উন্নয়নে ১৭৪ কোটি টাকার কাজ উদ্বোধন ভিপি জমি দখলের চেষ্টার অভিযোগ, সংবাদ সম্মেলনে মমতাজ বেগম ছাতকে ১৫ লাখ টাকার ভারতীয় চোরাচালান পণ্যসহ আটক ১ ডাকসুতে ইতিহাসের বিতর্ক, বাংলাদেশের জন্মপথ কি মুছে ফেলা যায়? ‎তিন সন্তানকে বিষপান করানোর পর বাবারও বিষপান, তাহিরপুরে তিন শিশুর মৃত্যু সংকটে ধুঁকছে সদর হাসপাতাল শহরের পাসপোর্ট অফিস রোড এলাকায় ঘনঘন চুরি

সোনালী চেলা নদীতে ড্রেজারের তান্ডব থামেনি

  • আপলোড সময় : ২২-০৯-২০২৬ ০৯:৪১:৩৯ পূর্বাহ্ন
  • আপডেট সময় : ২২-০৯-২০২৬ ০৯:৪১:৩৯ পূর্বাহ্ন
সোনালী চেলা নদীতে ড্রেজারের তান্ডব থামেনি
স্টাফ রিপোর্টার :: নদী রক্ষার দাবিতে মানববন্ধন করেছেন স্থানীয়রা। ড্রেজারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছেন। নদীর তীর ও বসতভিটা রক্ষায় প্রশাসনের কাছে অভিযোগও দিয়েছেন। কিন্তু সেই প্রতিবাদকারীদেরই কয়েকজন এখন পরিবেশ অধিদপ্তরের মামলার আসামি। অন্যদিকে একই নদীতে রাতের আঁধারে একের পর এক ড্রেজার চালিয়ে বালু উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, প্রশাসনের অভিযান ও প্রতিবাদের পরও থামেনি বালুখেকোদের তৎপরতা। বরং সন্ধ্যার পর নদীতে বাড়তে থাকে ড্রেজারের আনাগোনা। রাত গভীর হলে বিভিন্ন এলাকায় চলে অবাধে বালু উত্তোলন। দোয়ারাবাজার উপজেলার সীমান্তবর্তী সোনালী চেলা নদী ঘিরে এমন অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগ ও মামলার ঘটনায় তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন। নদীর কোন অংশ ইজারাকৃত, কোথায় বালু উত্তোলনের অনুমতি রয়েছে, কোন ড্রেজারের বৈধ কাগজপত্র আছে, আর কোনটি ইজারার বাইরে এসব প্রশ্নের পাশাপাশি সামনে এসেছে প্রতিবাদকারীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার বিষয়টিও। গত ১৮ সেপ্টেম্বর (শুক্রবার) রাত ১২টা থেকে ভোর ৪টা পর্যন্ত সোনালী চেলা নদীর কয়েকটি এলাকায় সরেজমিনে ড্রেজারের কার্যক্রম দেখা যায়। স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চৈলতার ঢালা, পূর্ব সোনাপুরের কলাবাগান, মরা গাংসহ আশপাশের বিভিন্ন অংশে ড্রেজারের মাধ্যমে বালু উত্তোলন চলছিল। রাতের নীরবতা ভেঙে ড্রেজারের বিকট শব্দ শোনা যাচ্ছিল দূর থেকেও। স্থানীয়দের দাবি, ওই রাতে নদীর বিভিন্ন অংশে শতাধিক ড্রেজার সক্রিয় ছিল। একইভাবে পরবর্তী কয়েক রাতেও বালু উত্তোলন হয়েছে বলে তারা অভিযোগ করেন। তবে সরেজমিনে দেখা প্রতিটি ড্রেজারের বৈধতা, ইজারা সীমানা, অনুমোদিত উত্তোলন এলাকা কিংবা পরিবেশগত ছাড়পত্র তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, নদীর বালু প্রতি ঘনফুট প্রায় ২০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। রাতের বালু উত্তোলন ও বিক্রির হিসাব রাখার কাজে কয়েকজন ব্যক্তি থাকার কথাও জানান তারা। ফরিদ নামের এক ব্যক্তির সঙ্গে কথা হলে তিনি দাবি করেন, কো¤পানীগঞ্জের আব্বাস নামের এক ব্যক্তি ওই এলাকার বালু কিনেছেন। আব্বাস জানান, তিনি কো¤পানীগঞ্জে বালু মজুত করেন এবং বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে বালু কিনে আনেন। ওই এলাকায় ছাতকের বুলবুল হাজী, সুরত মিয়া, বশির কো¤পানিসহ আরও কয়েকজনের স¤পৃক্ততার দাবি করেন তিনি। স্থানীয় পর্যায়ে আলোচনায় সোনালী চেলা নদী থেকে বিপুল পরিমাণ বালু উত্তোলন এবং এর আর্থিক মূল্য কয়েক কোটি টাকা পর্যন্ত হওয়ার দাবি উঠেছে। কোথাও কোথাও এর পরিমাণ প্রায় ৫০ কোটি টাকা বলেও দাবি করা হচ্ছে। তবে এই ৫০ কোটি টাকার হিসাব কীভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে, কত ঘনফুট বালু উত্তোলন হয়েছে, কতদিন ধরে উত্তোলন চলছে, বাজারদর কত এবং এর মধ্যে কত অংশ বৈধ ইজারার আওতায় এসব তথ্যের সরকারি নথি ছাড়া ৫০ কোটি টাকা মূল্যের বালু উত্তোলনের দাবি নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। সোনালী চেলা নদীর ইজারাদার শাহ রুবেল বলেন, তার ইজারাকৃত এলাকার বাইরে স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি রাতের আঁধারে ড্রেজার চালিয়ে বালু উত্তোলন করছেন। তিনি জানান, বিষয়টি জানিয়ে জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগও দিয়েছেন। শাহ রুবেলের দাবি, অবৈধ বালু উত্তোলনের সঙ্গে তার কোনো স্টাফ বা লোকজন জড়িত নন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও বিষয়টি জানে বলে দাবি করেন তিনি। তবে ইজারাকৃত এলাকায় আসা বিভিন্ন বালুবাহী নৌকা থেকে রয়্যালটি আদায়ের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, বিভিন্ন উৎস থেকে বালু আসায় কোনটি নদী থেকে উত্তোলিত আর কোনটি অন্য উৎসের সবসময় তা শনাক্ত করা সম্ভব হয় না। এই বক্তব্যের পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে ইজারাকৃত এলাকা ও ইজারাবহির্ভূত এলাকার সীমানা মাঠপর্যায়ে কীভাবে নির্ধারণ করা হচ্ছে এবং বালুর উৎস যাচাইয়ের জন্য কী ব্যবস্থা রয়েছে? সোনালী চেলা নদীতে ড্রেজারবিরোধী আন্দোলনে অংশ নেওয়া কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দার দাবি, প্রতিবাদের পরই তাদের মামলায় আসামি করা হয়েছে। কোণিমোড়া বাজারের ব্যবসায়ী রোয়াব আলী জানান, প্রায় তিন বছর ধরে তিনি মুদি ব্যবসা করছেন। এর আগে চুনাপাথরের ব্যবসা করলেও কোনো মামলায় জড়িত ছিলেন না বলে দাবি তার। চৈলতার ঢালা থেকে তার বাড়ির দূরত্ব প্রায় আড়াই কিলোমিটার। ড্রেজারের বিরুদ্ধে কয়েকটি প্রতিবাদ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার পর মামলায় তার নাম আসে বলে দাবি করেন তিনি। সোনাপুরের ৬২ বছর বয়সী ধন মিয়া মেম্বারও নিজেকে মামলার আসামি হিসেবে উল্লেখ করেন। তার দাবি, দীর্ঘদিন ধরে হৃদরোগে ভুগছেন তিনি। ৫ সেপ্টেম্বর সিলেট উইমেন্স মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরে জানতে পারেন, তিনি মামলার আসামি হয়েছেন। ড্রেজারের বিরুদ্ধে স্থানীয়দের বিভিন্ন প্রতিবাদ কর্মসূচিতেও উপস্থিত ছিলেন বলে জানান তিনি। কৃষক আরজু মিয়া জানান, এর আগে কোনো মামলায় জড়িত না থাকলেও হঠাৎ তাকে মামলার আসামি করা হয়েছে। তার বাড়ি চৈলতার ঢালা থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে। বারকি শ্রমিক মাফিজ আলীর অভিযোগ, ড্রেজারের কারণে নদীতে তাদের কাজ কমে গেছে। জীবিকা রক্ষার পাশাপাশি নদী রক্ষার দাবিতে তিনি প্রতিবাদে অংশ নিয়েছিলেন। এরপরই মামলায় আসামি হয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি। ইলিয়াছ আলীর বক্তব্যও একই। বয়সজনিত নানা সমস্যার পাশাপাশি মাথায় ক্ষত নিয়ে দীর্ঘদিন চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি। তার দুই ছেলে প্রবাসে থাকেন এবং তাদের পাঠানো অর্থে সংসার চলে বলে জানান। বালুর ব্যবসার সঙ্গে কোনো স¤পর্ক নেই দাবি করে তিনি প্রশ্ন তোলেন, কীভাবে মামলায় তার নাম এসেছে। ছাতকের রমজান আলী প্রায় তিন বছর ধরে রয়্যালটি ঘাটে দৈনিক ৮০০ টাকা হাজিরায় কাজ করেন। ড্রেজারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার পর তিনিও মামলার আসামি হয়েছেন বলে দাবি করেন। আলমপুর গ্রামের ৬৩ বছর বয়সী নজির আলীও একই অভিযোগ করেন। দীর্ঘদিন প্রবাসে থাকার পর অসুস্থতার কারণে বর্তমানে বাড়িতে থাকেন তিনি। স্থানীয় প্রবীণ ব্যক্তি হিসেবে ড্রেজারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে অংশ নিয়েছিলেন বলে জানান। ইসলামপুর ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের আব্দুল খালেকও জানান, প্রবাস থেকে ফিরে নদীর পাড় ড্রেজারে কাটার দৃশ্য দেখে কয়েকটি আন্দোলনে অংশ নেন। পরে মামলায় তার নাম আসে বলে দাবি করেন তিনি। স্থানীয়দের আশঙ্কা, প্রতিবাদকারীদের বিরুদ্ধে মামলা হলে ভবিষ্যতে নদী রক্ষার দাবিতে সাধারণ মানুষ প্রকাশ্যে কথা বলতে ভয় পেতে পারেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ভুক্তভোগী এক ব্যক্তি স্থানীয় কয়েকজনের বিরুদ্ধে বালুর ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ তুলেছেন। তিনি আব্দুল হেকিম চেয়ারম্যান ও রহমতপুরের দ্বীন ইসলামের নাম উল্লেখ করেছেন। বাবুল মিয়াও কয়েকজনের বিরুদ্ধে বালু উত্তোলনের অভিযোগ করেন এবং সুরত আলীর নাম উল্লেখ করেন। তবে অভিযুক্ত সুরত আলী বলেন, তিনি বালুর ব্যবসা করেন এবং বিভিন্ন জায়গা থেকে বালু কিনে মজুত করেন। তিনি যাদের কাছ থেকে বালু কেনেন, তারা কোথা থেকে বালু সংগ্রহ করেন, সেটি তাদের বিষয় বলে দাবি করেন। এবিষয়ে জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. মোহাইমিনুল হক জানান, নদীতে বালু উত্তোলনের অভিযোগ পেয়ে আমরা সরেজমিনে গিয়ে স্থানীয়দের সাথে কথা বলি এবং ২ জন সাক্ষী দিতে রাজি হওয়ায় আমরা মামলা দায়ের করি। যারা আসামি হয়েছেন তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে যদি সংশ্লিষ্টতা না পাওয়া যায় তাহলে পরবর্তীতে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে। অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের অভিযোগ প্রসঙ্গে সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) তাপস শীল বলেন, অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে জেলা প্রশাসন সচেষ্ট রয়েছে। দোয়ারাবাজারে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে একাধিক মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়েছে বলেও জানান তিনি। টাস্কফোর্সের অভিযান হয়েছে এবং এসব অভিযানে কারাদ-, অর্থদ- ও নৌযান জব্দ করা হয়েছে বলে জানান তিনি। তিনি আরও বলেন, স্থানীয় বিজিবি, পুলিশ ও উপজেলা প্রশাসনকে নিয়মিত অভিযান পরিচালনার জন্য বলা হয়েছে। নদী ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় অভিযান অব্যাহত থাকবে এবং ভবিষ্যতে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে একাধিক অভিযান পরিচালনার কথা বলা হলেও স্থানীয়দের অভিযোগ, অভিযান শেষ হওয়ার পর আবারও রাতের আঁধারে ড্রেজার চালু হয়ে যায়। ১৮ সেপ্টেম্বর রাতের সরেজমিন পর্যবেক্ষণে ড্রেজারের কার্যক্রম দেখা যাওয়ার বিষয়টি স্থানীয় অভিযোগকে নতুন করে সামনে এনেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, ড্রেজার দিয়ে নদীর তীরঘেঁষা এলাকা থেকে বালু উত্তোলনের ফলে নদীর তীর ও আশপাশের বসতবাড়ি ঝুঁকিতে পড়ছে। বাবুল মিয়াসহ কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দার দাবি, নদীভাঙনে তাদের ঘরবাড়ি হারানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। নদীর গতিপথ, তীরের স্থিতিশীলতা ও বালু উত্তোলনের প্রভাব স¤পর্কে কোনো বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা হয়েছে কি না সেটিও এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। কারণ নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও তীরের স্থিতিশীলতায় বালু উত্তোলনের কী প্রভাব পড়ছে, তা শুধু অভিযোগ বা পাল্টা অভিযোগ দিয়ে নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন নদী বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের কারিগরি মূল্যায়ন।

নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha

কমেন্ট বক্স