মোসাইদ রাহাত::
দিরাই উপজেলার কেজাউড়া গ্রাম। সাত বছর আগে এই গ্রামের একটি বাড়িতে গভীর রাতে ঘুম ভেঙে যায় এক মায়ের। ঘরের দরজা খোলা, পাশে ঘুমিয়ে থাকা পাঁচ বছরের ছেলে তুহিন নেই। রাত পেরিয়ে সকাল হলে বাড়ির পাশের গাছের ডালে পাওয়া যায় তার রক্তাক্ত মরদেহ। গলায়, দুই কানে ও যৌনাঙ্গে আঘাতের চিহ্ন। পেটে বিদ্ধ দুটি ছুরি। নিজের সন্তানকে হারানোর সেই রাতের পর সাতটি বছর পেরিয়ে গেছে। কিন্তু তুহিনের মা মনিরা বেগমের কাছে সেই রাত যেন এখনো শেষ হয়নি। প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে এবং এলাকায় তাদের বিরুদ্ধে জনমত তৈরি করতে নিজের সন্তানকে হত্যার অভিযোগ উঠেছিল পরিবারেরই সদস্যদের বিরুদ্ধে। দীর্ঘ তদন্ত ও বিচার শেষে তুহিনের বাবা আবদুল বাছির ও চাচা নাসির উদ্দিনকে মৃত্যুদণ্ড দেন আদালত। রায় ঘোষণার পরও কেটে গেছে প্রায় সাড়ে ছয় বছর। আগামী ১৩ অক্টোবর তুহিন হত্যাকাণ্ডের সাত বছর পূর্ণ হবে। তবে নিম্ন আদালতে দেওয়া সেই মৃত্যুদণ্ড এখনো কার্যকর হয়নি। যা ঝুলে আছে হাইকোর্টের আপিল বিভাগেই। ২০১৯ সালের ১৩ অক্টোবর রাতে দিরাই উপজেলার কেজাউড়া গ্রামে তুহিন মিয়াকে হত্যা করা হয়। পরদিন সকালে বাড়ির পাশের একটি গাছের ডালে ঝুলন্ত অবস্থায় তার মরদেহ পাওয়া যায়। নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের খবর ছড়িয়ে পড়লে পুরো দেশে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। প্রথমে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে মামলা করেছিলেন তুহিনের মা মনিরা বেগম। পরে তদন্তে বেরিয়ে আসে, হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তুহিনের পরিবারের কয়েকজন সদস্য জড়িত। তুহিন ছিল কৃষক আবদুল বাছির ও মনিরা বেগমের ছেলে। ঘটনার রাতে বাবার সঙ্গে একই খাটে ঘুমিয়েছিল সে। মা ছিলেন পাশের কক্ষে। গভীর রাতে তুহিনের চাচাতো বোন ঘুম থেকে ডেকে জানান, বসতঘরের দরজা খোলা। তখন তুহিনকে আর তার বাবার পাশে পাওয়া যায়নি। সকালে বাড়ির কাছের গাছে ছেলের লাশ পাওয়ার পর যে দৃশ্য মনিরা বেগম দেখেছিলেন, সেটি তার জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ স্মৃতি হয়ে আছে। যে সন্তানকে আগের রাতে ঘুমন্ত অবস্থায় রেখে গিয়েছিলেন, সকালে তাকেই দেখতে হয় রক্তাক্ত ও ক্ষতবিক্ষত অবস্থায়। মামলার সাক্ষ্যগ্রহণের সময় আদালতে দেওয়া বক্তব্যে মনিরা বেগম বলেন, ঘটনার রাতে তুহিন তার বাবা আবদুল বাছিরের সঙ্গে ঘুমিয়েছিল। গভীর রাতে ঘরের দরজা খোলা দেখতে পান তারা। পরে সকালে জানতে পারেন, তুহিনকে হত্যা করে গাছের সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। ছেলেকে হত্যার ঘটনায় তিনিই বাদী হয়ে দিরাই থানায় মামলা করেছিলেন। অথচ তদন্তে তার স্বামী ও পরিবারের ঘনিষ্ঠ সদস্যদেরই আসামি হতে দেখেন তিনি। তদন্তে পুলিশ দাবি করে, গ্রামের দুই পক্ষের মধ্যে দীর্ঘদিনের বিরোধ ছিল। সেই বিরোধের জের ধরে প্রতিপক্ষের লোকজনকে ফাঁসানোর উদ্দেশ্যে তুহিনকে হত্যা করা হয়। হত্যার পর ঘটনাটি এমনভাবে সাজানোর চেষ্টা করা হয়েছিল, যাতে সন্দেহ গিয়ে পড়ে বিরোধী পক্ষের ওপর। পুলিশ তুহিনের বাবা আবদুল বাছির, তিন চাচা নাসির উদ্দিন, আবদুল মোছাব্বির ও জমসেদ আলী এবং এক চাচাতো ভাইকে গ্রেপ্তার করে। পরে তাদের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। ২০১৯ সালের ৩০ ডিসেম্বর পাঁচজনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ। ২০২০ সালের ৭ জানুয়ারি মামলার অভিযোগ গঠন করা হয়। এরপর সাক্ষ্যগ্রহণ ও যুক্তিতর্ক শেষে দ্রুতই মামলার বিচার শেষ হয়। ২০২০ সালের ১৬ মার্চ সুনামগঞ্জের জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক ওয়াহিদুজ্জামান শিকদার তুহিন হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করেন। রায়ে তুহিনের বাবা আবদুল বাছির ও চাচা নাসির উদ্দিনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। অপর দুই চাচা আবদুল মোছাব্বির ও জমসেদ আলীকে অপরাধ প্রমাণিত না হওয়ায় খালাস দেন আদালত। এর আগে ১০ মার্চ তুহিনের ১৭ বছর বয়সী চাচাতো ভাইকে আট বছরের আটকাদেশ দেন সুনামগঞ্জের শিশু আদালত। বয়স কম হওয়ায় তার বিচার আলাদাভাবে হয়। রায় ঘোষণার সময় আদালতে উপস্থিত ছিলেন দণ্ডিত বাবা আবদুল বাছির ও চাচা নাসির উদ্দিন। তৎকালীন সুনামগঞ্জের শিশু আদালতের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) নান্টু রায় বলেন, আলোচিত এই মামলায় দ্রুততম সময়ে বিচার শেষ করে রায় দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে মামলাটি হাইকোর্টের আপিল বিভাগেই রয়েছে। সেখান থেকে এখনো রায় হয়নি যার কারণে তাদের রায়ের কার্যকর করা হয়নি। তুহিনের মায়ের সাথেও আমার দীর্ঘদিন হয় কোন যোগাযোগ নেই, সেজন্য বুঝা যায় নিম্ন আদালতের রায়ই এখনও বহাল রয়েছে। তিনি জানান, আদালতে উপস্থাপিত সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই বাবা ও চাচাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় তুহিনের মা মনিরা বেগম বলেন, সাত বছর হয়ে গেল, কিন্তু আমার কাছে মনে হয় ঘটনাটা যেন সেদিনের। আমার ছেলেটা রাতে বাবার পাশে ঘুমিয়েছিল। সকালে তার লাশ গাছের সঙ্গে ঝুলতে দেখেছি। একজন মা হিসেবে ওই দৃশ্য আমি কোনো দিন ভুলতে পারব না। তুহিন তো কারও শত্রু ছিল না, সে ছিল ছোট্ট একটা শিশু। তাকে কেন এভাবে মেরে ফেলতে হলো, এই কষ্টটা আমি সারা জীবন বয়ে বেড়াব। তিনি আরও বলেন, আদালত রায় দিয়েছেন, আসামিদের মৃত্যুদণ্ড হয়েছে। কিন্তু এত বছর পরও সেই সাজা কার্যকর হয়নি। আমি চাই, আইনের নিয়ম মেনে দ্রুত এই মামলার শেষ হোক। আমার ছেলে আর ফিরে আসবে না, কিন্তু তার হত্যার বিচারটা যেন শেষ পর্যন্ত দেখতে পারি এটাই আমার চাওয়া।
নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha
প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে শিশু তুহিন হত্যায় বাবা-চাচার মৃত্যুদণ্ড
সাত বছর ধরে রায় কার্যকরের অপেক্ষায় মা
- আপলোড সময় : ০৪-১০-২০২৬ ০৬:০৬:৪০ অপরাহ্ন
- আপডেট সময় : ০৪-১০-২০২৬ ০৬:১৯:০৬ অপরাহ্ন
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ

স্টাফ রিপোর্টার, দৈনিক সুনামকণ্ঠ