মতপ্রকাশ ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা নিশ্চিত হোক
- আপলোড সময় : ২৮-১০-২০২৬ ০৯:১৬:৫৭ পূর্বাহ্ন
- আপডেট সময় : ২৮-১০-২০২৬ ০৯:১৬:৫৭ পূর্বাহ্ন
সংস্কৃতি মানুষের মুক্তচিন্তা, মানবিকতা ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার বাহন। গান, নাটক, খেলাধুলা কিংবা লোকজ ঐতিহ্য - এসবের মধ্য দিয়েই একটি সমাজ তার বহুত্ববাদী পরিচয় তুলে ধরে। অথচ সেই সংস্কৃতিচর্চার পথেই যখন একের পর এক বাধা আসে, তখন তা শুধু শিল্পী বা সংস্কৃতিকর্মীদের জন্য উদ্বেগের বিষয় থাকে না; প্রশ্ন ওঠে মানুষের সাংবিধানিক অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিয়েও।
দিরাইয়ে নারী বাউলশিল্পীদের গান গাওয়া নিয়ে আপত্তি ওঠা এবং গানের আসর বন্ধের ঘটনা সেই উদ্বেগকেই সামনে এনেছে। এর আগে একই উপজেলায় মেয়েদের প্রীতি ফুটবল ম্যাচও আপত্তির মুখে স্থগিত হয়েছিল। একের পর এক এমন ঘটনায় স্পষ্ট হচ্ছে, সাংস্কৃতিক আয়োজন ও নারীদের অংশগ্রহণের ক্ষেত্র সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এবার দিরাইয়ের ঘটনার প্রতিবাদে ঢাকায় মানববন্ধন করতে গিয়ে সংস্কৃতিকর্মীদের পুলিশের বাধার মুখে পড়া এবং একজনকে আটক করার ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করেছে।
প্রশ্ন হলো, গান গাওয়া বা খেলাধুলা করার ক্ষেত্রে আপত্তি জানানোর অধিকার কারও থাকলেও, সেই আপত্তির ভিত্তিতে অন্যের সাংস্কৃতিক অধিকার কেড়ে নেওয়ার সুযোগ আছে কি? ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি শ্রদ্ধা অবশ্যই জরুরি। কিন্তু ধর্মের দোহাই দিয়ে অন্যের স্বাধীনতা খর্ব করা, নারীশিল্পীদের অংশগ্রহণে বাধা দেওয়া কিংবা ভিন্নমতকে দমিয়ে রাখার চেষ্টা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। ধর্মীয় বিশ্বাস ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা পর¯পরের প্রতিপক্ষ নয়। বরং পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহনশীলতার মধ্য দিয়েই একটি সুস্থ সমাজ গড়ে ওঠে।
একইভাবে, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ কর্মসূচি আয়োজনের অধিকারও গণতান্ত্রিক সমাজের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। ঢাকার ধানমন্ডিতে সংস্কৃতিকর্মীদের মানববন্ধনে পুলিশের বাধা এবং বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি দীপক শীলকে আটকের ঘটনায় তাই স্বচ্ছ ব্যাখ্যা প্রয়োজন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব পুলিশের, কিন্তু সেই দায়িত্ব পালনের নামে শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার বাধাগ্রস্ত করা কিংবা কাউকে অযৌক্তিকভাবে আটক করা গ্রহণযোগ্য নয়। কোনো বক্তব্য আইনবিরোধী হলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে; তবে শুধু ভিন্নমত প্রকাশ বা স্লোগান নিয়ে বিতর্কের জেরে কাউকে আটক করার যৌক্তিকতা জনসমক্ষে স্পষ্ট হওয়া দরকার।
বাউলগান আমাদের ঐতিহ্য ও আত্মপরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ। লালন, হাছন রাজা, রাধারমণ ও শাহ আবদুল করিমের গান মানুষের মধ্যে মানবতা, সাম্য ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার বাণী ছড়িয়ে দিয়েছে। সেই ঐতিহ্যের চর্চা বাধাগ্রস্ত হলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় আমাদের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার। নারীশিল্পীদের গান কিংবা মেয়েদের ফুটবল খেলা বন্ধ করে দিয়ে সমাজে নৈতিকতা প্রতিষ্ঠা করা যায় না; বরং এতে অসহিষ্ণুতা ও বৈষম্যই শক্তিশালী হয়।
এ পরিস্থিতিতে প্রশাসনকে নিরপেক্ষ ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। সাংস্কৃতিক আয়োজনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার রক্ষা করতে হবে এবং আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোকে সংলাপ, সচেতনতা ও সম্প্রীতির চর্চা জোরদার করতে হবে।
বাউলগানের আসরে বাধা, মেয়েদের ফুটবল খেলায় বাধা, আর এসবের প্রতিবাদে বাধা - এই ধারাকে স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। সংস্কৃতির স্বাধীনতা রক্ষা করা মানে শুধু শিল্পীদের অধিকার রক্ষা নয়; এটি মুক্ত, মানবিক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ারও শর্ত। যে সমাজে গান গাওয়ার স্বাধীনতা থাকে না, প্রতিবাদেরও স্বাধীনতা থাকে না, সে সমাজে মুক্তচিন্তার বিকাশ বাধাগ্রস্ত হতে বাধ্য।
নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদকীয়