বিশেষ প্রতিনিধি::
হাওরের চার উপজেলার মানুষের চলাচলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সড়ক সুনামগঞ্জ-বিশ্বম্ভরপুর। এই সড়কের লালপুর-সালামপুর এলাকায় তিনটি সেতুর সংযোগ সড়ক উঁচুকরণসহ বিভিন্ন সংস্কারকাজ চলছে ৮৭ কোটি টাকা ব্যয়ে। কিন্তু নির্মাণকাজে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার, কার্যাদেশের শর্ত না মানা এবং ফসলি জমির মাটি দিয়ে ভরাটের অভিযোগ উঠেছে। সদ্য নির্মিত গার্ডওয়াল হেলে পড়ার ঘটনাও সামনে এসেছে। এতে ক্ষুব্ধ স্থানীয় বাসিন্দাসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। তাঁদের অভিযোগ, গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কের নির্মাণকাজে এমন অনিয়ম হলে বর্ষা ও বন্যার সময় সড়কটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে নির্মাণকাজের অনিয়ম সরেজমিনে দেখতে গিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সুনামগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য নূরুল ইসলাম নূরুল। মঙ্গলবার কাজের মান নিয়ে অসন্তোষ জানিয়ে ঠিকাদারকে ভর্ৎসনা করেন তিনি। পাশাপাশি কাজ বন্ধ রেখে অনিয়ম তদন্তের নির্দেশ দেন সড়ক বিভাগকে। এর ঘণ্টা না যেতেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে তাঁর বিরুদ্ধে এক কোটি টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগ করেন প্রকল্পের সাব-ঠিকাদার শফিকুল ইসলাম। বিষয়টি নিয়ে এলাকায় আলোচনা-সমালোচনা তৈরি হয়েছে। সুনামগঞ্জ-তাহিরপুর সড়কের লালপুর এলাকায় সেতুর সংযোগ সড়ক প্রশস্তকরণ, গার্ডওয়াল নির্মাণ ও ব্লক স্থাপনের কাজ করছে সড়ক ও জনপথ বিভাগ। স্থানীয়দের অভিযোগ, কাজের শুরু থেকেই নির্মাণের গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ওয়ার্ক অর্ডার অনুযায়ী ভিট বালু দিয়ে সেতুর অ্যাপ্রোচ সড়ক ও সড়ক উঁচুকরণে ভরাটের কথা থাকলেও সেই শর্ত যথাযথভাবে মানা হচ্ছে না। এর পরিবর্তে ফসলি জমি থেকে মাটি এনে ভরাট করা হয়েছে বলে অভিযোগ তাঁদের। এতে একদিকে কৃষিজমির ক্ষতি হচ্ছে, অন্যদিকে সড়কের স্থায়িত্ব নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। স্থানীয়রা বলেন, সড়কটি শুধু একটি এলাকার যোগাযোগের পথ নয়; হাওরাঞ্চলের মানুষের যাতায়াত, কৃষিপণ্য পরিবহনসহ নানা প্রয়োজনে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্ষা মৌসুমে সড়কটি ক্ষতিগ্রস্ত হলে কয়েকটি উপজেলার মানুষকে চরম দুর্ভোগে পড়তে হবে। তাই দায়সারাভাবে কাজ শেষ না করে কার্যাদেশ অনুযায়ী মানসম্মত নির্মাণ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। বুধবার দুপুরে ফের নির্মাণকাজের এলাকা পরিদর্শনে যান সংসদ সদস্য নূরুল ইসলাম নূরুল। এ সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন সড়ক বিভাগের প্রকৌশলী, দলীয় নেতাকর্মী ও স্থানীয় বাসিন্দারা। পরিদর্শন শেষে এমপি নূরুল ইসলাম নূরুল বলেন, একটি অনুষ্ঠান থেকে ফেরার পথে স্থানীয়রা তাঁকে নির্মাণকাজে অনিয়মের অভিযোগ জানান। পরে তিনি দেখতে পান, সদ্য নির্মিত গার্ডওয়াল একদিকে হেলে পড়েছে। ব্লক নির্মাণে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করা হয়েছে। মাটি কমপ্যাকশন না করে জিও টেক্সটাইলের ওপর নিম্নমানের ব্লক বসিয়ে সড়কের সুরক্ষাব্যবস্থা তৈরি করা হচ্ছে। ভিট বালুর পরিবর্তে কৃষিজমির উপরিভাগের মাটি ব্যবহার করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। সংসদ সদস্য অ্যাড. নূরুল ইসলাম আরো বলেন, এই সড়ক হাওরের চারটি উপজেলার মানুষের চলাচলের গুরুত্বপূর্ণ পথ। নির্মাণকাজে অনিয়মের কারণে সড়ক ধসে পড়লে সাধারণ মানুষকে চরম দুর্ভোগে পড়তে হবে। তাই কাজ বন্ধ রেখে অনিয়ম তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তিনি আরও বলেন, অনিয়ম ধরিয়ে দেওয়ার ঘণ্টা না যেতেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে আমার বিরুদ্ধে কোটি টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগ করা হয়েছে। আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালিয়ে জনগণের পক্ষে কথা বলা থেকে বিরত রাখা যাবে - এমন ধারণা ভুল। প্রতিটি কাজের গুণগত মান নিশ্চিত করেই ছাড়ব। চাঁদা দাবির অভিযোগের বিষয়ে এমপি নূরুল বলেন, তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রমাণ করতে হবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে তিনি শাস্তি মেনে নেবেন। একইভাবে নির্মাণকাজে অনিয়মের অভিযোগও তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। তিনি দাবি করেন, সরকার গঠনের আগে এই কাজ চলমান থাকলেও তখন চাঁদা দাবির অভিযোগ তোলা হয়নি। অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগের পরই তাঁর বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ আনা হয়েছে। সুনামগঞ্জ সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী জহিরুল ইসলাম বলেন, সংসদ সদস্যের উত্থাপিত অভিযোগগুলো লিখিতভাবে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে। পাশাপাশি ডিজাইন ইউনিটের সঙ্গে যোগাযোগ করে পরবর্তী নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি বলেন, মাটির চাপ বেশি থাকায় গার্ডওয়াল হেলে গেছে এটি সঠিক। ঠিকাদারকে একাধিকবার সতর্ক করা হয়েছে, যাতে নির্মাণকাজে ত্রুটি না থাকে। এদিকে প্রকল্পটির সাব-ঠিকাদারির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধের অভিযোগও সামনে এসেছে। জানা যায়, মূল ঠিকাদার বদরুল ইকবাল ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দেশ ছেড়ে চলে যান। এর আগে প্রকল্পের কাজ সাব-ঠিকাদারি হিসেবে নেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট ইউপি চেয়ারম্যান আজাদ হোসেন। পরে তার বিরুদ্ধে মামলা হলে তিনি কারাগারে যান। এরপর প্রকল্পের কাজের নিয়ন্ত্রণ নেন সাব-ঠিকাদার শফিকুল ইসলাম বলে অভিযোগ করেছেন আজাদ হোসেন। আজাদ হোসেন বলেন, মূল ঠিকাদারকে ২০ কোটি টাকা দিয়ে তিনি কাজটি নিয়েছিলেন। এ কাজে শফিকুল ইসলামও তাঁর অংশীদার ছিলেন এবং চুক্তিতে সাক্ষী হিসেবে স্বাক্ষর করেছিলেন। ৫ আগস্টের পর শফিকুল ইসলামের যোগসাজশে তাঁকে মিথ্যা মামলায় কারাগারে পাঠিয়ে কাজের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। এ বিষয়ে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলেও জানান আজাদ হোসেন। তবে চাঁদা দাবির অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে সাব-ঠিকাদার শফিকুল ইসলামের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। উল্লেখ্য, সুনামগঞ্জ-তাহিরপুর সড়কের লালপুর-সালামপুর এলাকায় তিনটি সেতুর সংযোগ সড়ক উঁচুকরণসহ বিভিন্ন সংস্কারকাজ ৮৭ কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়ন করছে সড়ক ও জনপথ বিভাগ। বিগত সরকারের আমলে প্রকল্পটির কাজ শুরু হয়।
নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha
অনিয়ম ঢাকতেই এমপি নূরুলের বিরুদ্ধে ঠিকাদারের অভিযোগ
- আপলোড সময় : ২৯-১০-২০২৬ ০৮:৫৯:৩৪ পূর্বাহ্ন
- আপডেট সময় : ২৯-১০-২০২৬ ০৯:০০:১২ পূর্বাহ্ন
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ

বিশেষ প্রতিনিধি