সুনামগঞ্জ , বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬ , ১ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
আজ পহেলা বৈশাখ আগামী সপ্তাহে চিকিৎসা ও বাণিজ্যিক ভিসা চালু করছে ভারত ভাঙন রোধ, অবৈধ দখল উচ্ছেদ এবং দূষণ নিয়ন্ত্রণে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা মইনপুরে প্রতিপক্ষের হামলায় নিহত ১ নববর্ষ হাওরবাসীর জন্য বয়ে আনুক মঙ্গলবার্তা সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকার ফসল উৎপন্নের আশা যে ছয় কারণে ব্যর্থ হল যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি আলোচনা অধ্যাদেশ নিয়ে বিরোধীদল ইস্যু তৈরির চেষ্টা করছে : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিএনপি সব জায়গায় নিজেদের লোক বসিয়ে ‘ক্যু’ শুরু করেছে : জামায়াত আমির ভোজ্যতেলের দাম বাড়ছে না : বাণিজ্যমন্ত্রী সিলেটে বিশিষ্টজনদের সাথে ভারতের মনিপাল হাসপাতালের কর্তৃপক্ষের মতবিনিময় শান্তিগঞ্জে বাঁধ কেটে জলাবদ্ধতা নিরসনের উদ্যোগ, স্বস্তিতে কৃষক সাত দফা দাবিতে প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি হাওরে জলাবদ্ধতা নিরসনে বাঁধ কাটতে গিয়ে তরুণের মৃত্যু, শোকে স্তব্ধ মধ্যনগর প্রধানমন্ত্রী সিলেট আসছেন ২ মে এগারো দলীয় জোটের ভবিষ্যৎ কী সমন্বিত প্রচেষ্টায় বিচারিক কাজকে আরো কার্যকরের আহ্বান পাথারিয়া ইউপি ভবন নির্ধারিত স্থানে বাস্তবায়নের দাবিতে সভা পানির তোড়ে ভেঙে যাওয়া বাঁধ রক্ষা করলেন হাজারো কৃষক গণশুনানিতে বদলাচ্ছে রাজনীতির ধরণ, আলোচনায় এমপি কামরুল

বাংলার মেলা পার্বণ এবং হাওরপাড়ের বর্ষবরণ

  • আপলোড সময় : ১৪-০৪-২০২৬ ১০:৪৯:৪৮ পূর্বাহ্ন
  • আপডেট সময় : ১৪-০৪-২০২৬ ১০:৫১:১২ পূর্বাহ্ন
বাংলার মেলা পার্বণ এবং হাওরপাড়ের বর্ষবরণ
সুখেন্দু সেন::>
বারো মাসে তেরো পার্বণের লোকজ সংস্কৃতির বিচিত্র রঙে, রূপে ভরপুর গাঙ্গেয় ব-দ্বীপের এ পলিল ভূখ-। বাঙালি জীবনধারার সাথে মেলা পার্বণের যোগসূত্র দীর্ঘদিনের। এ সম্পর্ক আন্তরিক ও নিবিড়। লোকজীবন ও লোকসংস্কৃতির সমন্বিত পরিচয় মেলাতেই সার্থকভাবে প্রকাশিত এবং প্রতিফলিত। রবীন্দ্রনাথের ভাবনা থেকে ধার করে যদি বলি তবে বিষয়টি এ ভাবে উপস্থাপন করা যায়- পল্লী প্রধান এই দেশে পল্লী যখন মাঝে মাঝে আপনার বাড়ির মধ্যে বৃহৎ জগতের রক্ত চলাচল অনুভব করার জন্য উৎসুখ হয়ে উঠে তখন মেলাই তার প্রধান উপায়। এ মেলা আমাদের দেশে বাহিরকে ঘরের মধ্যে আহ্বান জানায়। এমন উৎসবে হৃদয় খুলে দান করা আর গ্রহণ করার উপলক্ষ খুঁজে পায়। বাংলাদেশে মেলা পরবের ঐতিহ্য দীর্ঘ দিনের। এর প্রাচীনত্বের সীমা নির্দিষ্টকরণ সম্ভব নয়। তবে এটা নিশ্চিত পল্লীর নিবিড় অন্তর থেকেই মেলার উদ্ভব। ধারণা করা হয় যে ধর্মীয় উপলক্ষ থেকেই মেলার জন্ম। পরে এর সাথে যুক্ত হয় নানা অনুষঙ্গ। স্থানীয় বৈশিষ্ট্য ও ঐতিহ্য ধারণ করে পায় সার্বজনীন রূপ। মেলা বলতেই উৎসব। বাঙালির উৎসবপ্রিয়তা সর্বজনবিদিত। যে কোন উপলক্ষকেই তারা উৎসবে রূপান্তরিত করে নিতে পারে। গ্রামীণ শ্রমনিবিড় দৈন্যদগ্ধ জীবনও কোন না কোনভাবে যুক্ত হয়ে যায় মেলার উদার সামাজিক বৈশিষ্ট্যে। যদিও ভিন্নতা থাকতে পারে আবেগ-অনুভূতিতে। বাংলাদেশে যত মেলা পার্বণের আয়োজন তার নব্বই ভাগই গ্রামীণ মেলা। সারা বছরই দেশের কোন না কোন স্থানে নানা উপলক্ষে মেলা বসে বিভিন্ন স্থায়িত্ব নিয়ে। তবে উৎসব আবহ সমানভাবেই পরিলক্ষিত হয়। ধর্মাশ্রিত মেলাগুলির অন্তরঙ্গে ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান থাকলেও বহিরঙ্গ হয়ে উঠে ধর্মনিরপেক্ষ আর্থ সাংস্কৃতিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ ও পরিচালিত। রথের মেলা, বারুণীর মেলা, সোমেশ্বরীর মেলা, ¯œানযাত্রা, দোলযাত্রার মেলা, ভোলাভোলির মেলা, পৌষ সংক্রান্তি, চৈত্র সংক্রান্তির মেলাও তেমনি ধর্মীয় আবরণের বাইরে এসে হয়ে উঠে উৎসব, বিনোদন, কেনাকাটা সামাজিক মেলবন্ধনের উদার ক্ষেত্র। এছাড়া সাধু সন্ত, পীর দরবেশদের সাধনপীঠ, মাজার, সমাধিতে আবির্ভাব তিরোধান তিথিকে কেন্দ্র করে ওরস এবং সে উপলক্ষে মেলাও বসে। এসব মেলা জাতিধর্ম নির্বিশেষে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। পূর্ব উদ্ধৃত রবীন্দ্রভাবনার শত বৎসর পরে বাংলাদেশে বর্ষবরণ বা বৈশাখী মেলা ভিন্ন চিন্তা-চেতনায় ভিন্ন বৈশিষ্ট্য নিয়ে বাঙালি সাংস্কৃতিক অঙ্গনে যোগ করেছে অনন্য মাত্রা। চিরায়ত গ্রামীণ লোকজ সংস্কৃতির নগরায়ণ ঘটিয়েছে এ মেলা। নাগরিক জীবন এবং গ্রামীণ জীবনের মেল বন্ধনই বৈশাখী মেলার বৈশিষ্ট্য। পহেলা বৈশাখ হালখাতা অনুষ্ঠানের গ-ি পেরিয়ে মেলা বা উৎসবে রূপান্তর বঙ্গ সংস্কৃতির সাম্প্রতিক সংযোজন। বর্ষবরণের উৎপত্তিস্থল ঢাকার রমনার বটমূল গ্রামের বট-পাকুড়াশ্রিত চত্বরে আয়োজিত মেলার প্রতীক। বটমূলের আয়োজন থেকে পরবর্তীকালে তা ছড়িয়ে যায়, চারুকলা, টিএসসি, ধানমন্ডির রবীন্দ্র সরোবর, হাতিরঝিল, শাহবাগসহ বিভিন্ন কেন্দ্রে। ঢাকা থেকে ক্রমে জেলাশহর, উপজেলা শহরে। বর্ষবরণ বা বৈশাখী উৎসব লোকজ উপজীব্য নিয়ে শহরে দাপট দেখালেও গ্রামীণ প্রান্তিক জনমানসে এর আবেদন এখনও তেমন প্রবল হতে পারে নি। কৃষিপ্রধান বাংলাদেশের কৃষিনির্ভর সংস্কৃতি লোকাচারের সাথে বাংলা সন ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। বাংলা বর্ষপঞ্জির প্রচলনই হয়েছে মূলত কৃষিকাজ ও খাজনা সংগ্রহের ব্যবস্থাকে ঘিরে। জমিতে চাষ দেয়া, বীজবোনা, ফসলতোলা, খাজনা দেয়া, সামাজিক ক্রিয়াকর্ম, জন্মমৃত্যু, বিয়ে-শাদি বাংলা সন তারিখ নির্ভর। হিন্দু মুসলিম নির্বিশেষে গ্রামীণ জীবনযাত্রায় বাংলা সন তারিখের দীর্ঘ প্রচলন থাকলেও গ্রামীণ সংস্কৃতিতে হালখাতা ব্যতীত বর্ষবরণ বা নববর্ষের কোন অনুষ্ঠান নিকট অতীতেও লক্ষ করা যায় নি। স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশে বাঙালির অনিরুদ্ধ আবেগ সংস্কৃতির বিভিন্ন শাখায় শেকড় সন্ধানী সৃষ্টিশীল বিকাশ সম্ভব করে তুলেছে। মেলা পার্বণের এই দেশে ঐতিহ্য আনুগত্যে স্থানীয় মেলা বা উৎসব নুতন পরিসরে যুক্ত হয়ে বঙ্গ সংস্কৃতির পরিধি বিস্তৃত করে চলছে। পহেলা বৈশাখ বা নববর্ষ উদযাপন মূলত লোকজ ঐতিহ্যের নাগরিক আগ্রহ থেকেই সৃষ্ট। শহুরে জীবনে এর আবেদনটা বেশি। পহেলা বৈশাখ নাগরিক মনে ক্ষণিকের জন্য হলেও গ্রাম তৃষ্ণা জাগিয়ে তুলে। শেকড়ের টান অনুভূত হয় শহরদগ্ধ জীবনে। গ্রাম্য জীবনে তেমনটি অনুভূত হয় না। ভৌগোলিক বৈচিত্র্যের কারণে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে লোকাচার ও জীবনযাত্রারও তারতম্য রয়েছে। অফুরন্ত কৃষি ও জলজ স¤পদে ভরপুর হাওর অঞ্চলে ছয় মাস শুষ্ক এবং ছয়মাস জলাশ্রয়ী জীবনধারা স্বাভাবিকভাবেই দেশের অন্য অঞ্চল থেকে ভিন্ন। এখানে বৈশাখ বর্ষবরণের আনন্দ নিয়ে আসে না, আসে ফসল তোলার সংগ্রামী আহ্বান নিয়ে। বৈশাখের রুদ্ররূপ আর বিধ্বংসী চরিত্রকে বরণ করতেই তারা অভ্যস্ত। প্রাকৃতিক স্বেচ্ছাচারিতা ও খামখেয়ালিপনার বিরুদ্ধে লড়াই করেই হাওরপাড়ের মানুষ বেঁচে থাকে। কখনও প্রকৃতির উদার সহনীয় আচরণে স্বস্তি বোধ করে, গোলায় ফসল তুলে তৃপ্তি পায় কিন্তু ফুরসৎ পায় না রঙে ভরা বৈশাখের রঙ উপভোগের। হাওরজুড়ে তখন অন্য উৎসব। সে এক মহাসংগ্রাম। হাওর তখন এক রণাঙ্গন। ফসল কাটা, মাড়াই, শুকানোর মহাযজ্ঞ। তার রূপ রঙ ভিন্ন। আর যে বছর অতিবৃষ্টি শিলাবৃষ্টি, ঢল প্লাবনে নদীর জল ফুলে ফেঁপে উঠে হাওরে ঢোকার ফাঁকফোকর খোঁজতে থাকে, ফসল রক্ষার ঠুনকো বাঁধ যখন কোন প্রতিরোধ ছাড়াই বালির বাঁধের মত ভেসে যায়- শ্রম, ঘাম, যতœ পরিচর্যায় সন্তান ¯েœহে ফলানো কাঁচা পাকা ধানও তখন চোখের সামনে তলিয়ে যায়। সেই সাথে তলিয়ে যায় কৃষকের স্বপ্ন। সে নুতন বছর শুরুই হয় তাদের হতাশা আর দীর্ঘশ্বাস নিয়ে। যেমনটি হয়েছিল ১৪২৪ বঙ্গাব্দের বৈশাখে। বর্ষবরণের শহুরে উচ্ছ্বাস চাপা পড়ে গিয়েছিল ফসলহারা মানুষের হাহাকারে। এ বছরতো খেয়ালখুশি মতো অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণের ফলে মওসুমের প্রথম বৃষ্টিতেই ডোবরায় তলিয়ে যাচ্ছে ফসল। হাওরে ঢলের পানি প্রবেশ রোধে নির্মিত বাঁধ কেটে দিতে হচ্ছে ভেতরে আটকা পানি বের করার জন্য, লাগানো হয়েছে পাম্প। বাঁধে বাঁেধ কৃষকের জীবন মরণ সংগ্রাম। পানির ভীষণ তোড়ে বাঁধের মাটি চাপায় কী নিদারুণ প্রাণ গেল কৃষকের। এখানে আনন্দ কি আর থাকে। তবু জীবন মরণ লড়াই শেষেও যদি ফসল রক্ষা পায় সেটাই মঙ্গল। শুধু প্রকৃতির খামখেয়ালিপনাই নয়, হাওর রক্ষায় নিয়োজিতদের লোভ, দুর্নীতি, খামখেয়ালিপনার কাছেও পরাজিত হয় প্রকৃতির যোদ্ধা কৃষক। বৃটিশ যুগ পাকিস্তান যুগ গেছে আগেই। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালনও হয়ে গেছে। কিন্তু লুটেরা বর্গীরা এখনও সক্রিয় রয়ে গেছে বিভিন্ন রূপে বিভিন্ন ক্ষেত্রে রক্ত দিয়ে অর্জিত এই স্বাধীন দেশে। আর উদার হাওর হয়ে উঠেছে নব্য বর্গীদের অবাধ লুণ্ঠনের অবারিত ক্ষেত্র। বৈশাখের কালো মেঘের মতই হাওরপাড়ের কৃষকের মনে নিত্য শঙ্কা ও দুশ্চিন্তার জমাট বাঁধা মেঘ। অনিরাপদ বাঁধ আর প্রকৃতির ব্যতিক্রমী আচরণ কৃষকের মনে স্বস্তি দিতে পারে না সারা বৈশাখজুড়েই। বর্ষবরণের সে অবকাশ আর থাকে কোথায়। তখন শুধুই সংগ্রামের প্রস্তুতি, ফসল আগলে রাখার তাগিদ। ভাগ্য সুপ্রসন্ন হলে প্রকৃতির দাক্ষিণ্যে ফসল গোলায় তুলে স্বস্তি আর নয়তো কৃষকের চোখে বৈশাখের একটি মাত্র রঙ- সেটি অন্ধকার। বর্ষবরণের আয়োজন শহরে প্রাণ পেলেও মূলত বাংলা নববর্ষের ভিত্তি গড়ে দিয়েছে গ্রামের কৃষক। যারা মাটিতে প্রাণ ফোটায়, সারা বছর যারা সবুজের সাধনা করে। বৈশাখে সে রঙ সোনালী হলে তাদের বুক ভরে। ধানপাকা সোনালী রঙই বৈশাখী উৎসবের প্রকৃত রঙ। সকল বিপর্যয় কাটিয়ে হাওরে হাওরে লাগুক সোনালী বৈশাখের রঙ। সে রঙ যেন কোনদিনই কালো না হয় - জাগুক সে প্রত্যয়। পহেলা বৈশাখ চিরন্তন। বৈশাখের রুদ্র রূপ সংগ্রামী চেতনার প্রতীক। বর্ষবরণের অনুষ্ঠান সেতো প্রতিবাদ প্রতিরোাধের দীপ্ত প্রত্যয়ে সংহত। হাওরপাড়ের বর্ষবরণে থাকুক ফসল তোলায় নিয়োজিত সংগ্রামী যোদ্ধাদের প্রতি সংহতি। লুটেরা মুক্ত হোক হাওর। নিরাপদ থাক ফসল। ফসল রক্ষার অধিকার নিশ্চিত হোক।

নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha

কমেন্ট বক্স
নববর্ষ হাওরবাসীর জন্য বয়ে আনুক মঙ্গলবার্তা

নববর্ষ হাওরবাসীর জন্য বয়ে আনুক মঙ্গলবার্তা