বিদিশা এরশাদ:>
গত বছর ওমরাহ পালন করতে গিয়ে মক্কার ইব্রাহিম আল-খলিল স্ট্রিটের লুলু হাইপারমার্কেটে যাই। উদ্দেশ্য ছিল দেশে ফেরার সময় আত্মীয়-স্বজনদের জন্য কিছু ইলেকট্রনিক অ্যাকসেসরিজ, জায়নামাজ, আতর ও খেজুর কেনা। সেখানে কর্মরত বুলবুল ও নাজিম নামে দুই সহোদরের সঙ্গে পরিচয় হয়। তাদের চেহারায় বয়সের চেয়ে বেশি ক্লান্তির ছাপ। কথায় কথায় জানা গেল, প্রায় পাঁচ বছর আগে নরসিংদী থেকে দালালের মাধ্যমে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছিলেন তারা। লিবিয়ার পথে যেতে ভূমধ্যসাগরে একটি রাবারের নৌকায় ছিল ১৬ জন। তাদের মধ্যে ১২ জনেরই সলিল সমাধি হয়। ভাগ্যের জোরে বেঁচে যায় এই দুই ভাই। এরপর নানা দালালের হাত ঘুরে কোনোরকমে পৌঁছায় মক্কায়। গত কয়েক বছর ধরে তারা চেষ্টা করে যাচ্ছে জীবনটা একটু গুছিয়ে নিতে। কিন্তু তাদের মতো ভাগ্য আর কতজনের জোটে? যে নৌকায় তারা উঠেছিল, সেই নৌকার বেশিরভাগ মানুষ আর ফেরেনি। তাদের নাম নেই, কবর নেই, শুধু আছে পরিবারের অন্তহীন অপেক্ষা। ভূমধ্যসাগরের খবর পড়তে পড়তে এক ধরনের অসাড়তা জন্মে গেছে। প্রতিবার একই ছবি, একই বর্ণনা- রাবারের নৌকা, উত্তাল ঢেউ, ভাসমান লাশ। সংখ্যাগুলো এত বড় হয়ে গেছে যে মাঝে মাঝে মনে হয় এগুলো আর মানুষের কথা নয়, কোনো পরিসংখ্যানের কথা। কিন্তু সুনামগঞ্জের একটি গ্রামে যখন কোনো বাবা ছেলের জন্য অপেক্ষা করতে করতে অশীতিপর বৃদ্ধ হয়ে যান, তখন বোঝা যায় এটা পরিসংখ্যান নয়, এটা আমাদেরই গল্প। ২৮ মার্চ ২০২৬; লিবিয়ার তোবরুক বন্দর থেকে ছেড়ে যাওয়া একটি রাবারের নৌকায় ২২ জন মারা গেছেন। মৃতদের মধ্যে ১৮ জন বাংলাদেশি। উদ্ধার হওয়া ২৬ জনের মধ্যে ২১ জন বাংলাদেশি। বেঁচে ফেরা একজন জানিয়েছেন, ছয় দিন কোনো খাবার নেই, পানি নেই, জিপিএস নেই। যারা মারা যাচ্ছিলেন, তাদের লাশ পাচারকারীর নির্দেশে ফেলে দেওয়া হচ্ছিল সমুদ্রে। এই ঘটনা নতুন নয়। এটি একটি চলমান ট্র্যাজেডি, যার পুনরাবৃত্তি হচ্ছে বছরের পর বছর। গত এক দশকে ভূমধ্যসাগরে ৩০ হাজারের বেশি মানুষ মারা গেছেন বা নিখোঁজ হয়েছেন। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) বলছে, এই মৃতদের ১২ শতাংশই বাংলাদেশি; অর্থাৎ প্রায় দুই হাজার বাংলাদেশির সলিলসমাধি হয়েছে এই একটি সাগরে। শুধু ২০২৬ সালের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতেই মারা গেছেন ৫৫৯ জন, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। ব্র্যাকের হিসাব বলছে, প্রতি বছর শুধু এই রুটেই অন্তত ৫০০ বাংলাদেশি প্রাণ হারান। ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে সমুদ্রপথে অবৈধভাবে ইউরোপে যাওয়ার তালিকায় শীর্ষে ছিল বাংলাদেশ- ৯ হাজার ৭৩৫ জন। সংখ্যাগুলো দেখে প্রথম যে চিন্তা মাথায় আসে তা হলো, এত মৃত্যুর খবর জানার পরও মানুষ কেন যাচ্ছে? বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট গেল মার্চেই বলে গেছেন, গত এক দশকে বাংলাদেশের শ্রমবাজারে প্রায় এক কোটি ৪০ লাখ তরুণ যুক্ত হয়েছেন, কিন্তু কর্মসংস্থান হয়েছে মাত্র ৮৭ লাখের। বাকি ৫৩ লাখ তরুণ বেকার। শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার প্রায় ৮৭ শতাংশ, যাদের বেশিরভাগই ¯œাতক বা ¯œাতকোত্তর ডিগ্রিধারী। এই তরুণ জানেন যে সরকারি পদের বিপরীতে শত শত প্রার্থী লড়ছেন, বেসরকারি খাতে নিশ্চয়তা নেই, আর উদ্যোক্তা হওয়ার পথে পুঁজি ও সুযোগ দুটোই অধরা। তার কাছে ১২ থেকে ১৫ লাখ টাকা দেশে লাগানো মানে অনিশ্চয়তায় ডোবা, আর ওই টাকা দালালকে দেওয়া মানে একটি সম্ভাবনার দরজায় কড়া নাড়া। এই বাস্তবতায় গ্রামের কেউ একজন ইতালিতে গিয়ে বাড়ি বানিয়েছে, সেই একটি গল্পই যথেষ্ট। দালাল সেই গল্পটাকেই পুঁজি করে। দালালের মুখে পথটা সহজ শোনায়। বাস্তবে লিবিয়া পৌঁছানোর পর শুরু হয় আসল বিভীষিকা। পরিত্যক্ত ‘গেইম ঘরে’ আটকে রাখা, পরিবারের কাছ থেকে মুক্তিপণ আদায়, মারধর, তারপর রাতের অন্ধকারে ৪০ থেকে ৫০ জনকে একটি ছোট রাবারের নৌকায় ঠেলে দেওয়া। লাইফজ্যাকেট নেই, নেভিগেশন যন্ত্র নেই। সমুদ্র উত্তাল হলে নৌকা উল্টে যায়, ইঞ্জিন বন্ধ হলে নৌকা হয়ে ওঠে ভাসমান কফিন। এই চক্র থামাতে এত মামলা হচ্ছে, এত অভিযান হচ্ছে, তারপরও সংখ্যা কমছে না। কারণটা সহজ। মামলা হচ্ছে নিচের তলার দালালদের বিরুদ্ধে, কিন্তু মূল চক্রের গডফাদাররা ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকছে। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য বলছে, মানবপাচার আইনে এখন চার হাজার ৪৪৮টি মামলা বিচারাধীন; আসামি ১৬ হাজারের বেশি। কিন্তু এই বিশাল সংখ্যার মামলায় বড় মাছ কতজন ধরা পড়েছে, সেই হিসাব পরিষ্কার নয়। কোনো বড় দুর্ঘটনার পর কিছুদিন প্রশাসনের তৎপরতা দেখা যায়, তারপর আবার আগের মতো। এই সমীকরণে ইউরোপও দায়মুক্ত নয়। বৈধ পথে বাংলাদেশ থেকে ইউরোপে কাজের সুযোগ কার্যত বন্ধ, অথচ ইতালি, জার্মানি ও গ্রিসে দক্ষ-অদক্ষ দুই ধরনের শ্রমিকেরই চাহিদা আছে। বৈধ চ্যানেল খোলা থাকলে মানুষ রাবারের নৌকায় উঠত না। লিবিয়ার অরাজক পরিস্থিতিও এই সমস্যার জ্বালানি। ২০১১ সালের পর থেকে সেখানে আন্তর্জাতিক পাচার চক্র যে শূন্যতায় বাসা বেঁধেছে, সেখানে বাংলাদেশিরা ধরা পড়ছে বারবার। তাহলে বাংলাদেশ সরকারের সামনে পথ কোথায়? আমার মনে হয়, এই সমস্যার গভীরে না গিয়ে কেবল আইনি তৎপরতায় কোনো ফল আসবে না। দেশে তরুণদের জন্য কর্মসংস্থানের বাস্তব পরিবেশ তৈরি করতে না পারলে, যে তরুণ ১৫ লাখ টাকা নিয়ে নৌকায় উঠছেন তাকে থামানো যাবে না। সুনামগঞ্জ, মাদারীপুর, নরসিংদীর মতো এলাকায় শুধু দুর্ঘটনার পরের তৎপরতা নয়, সারা বছরের স্থায়ী সচেতনতা কার্যক্রম দরকার। আর দালালচক্রের ওপরের স্তরে যদি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর না পড়ে, তাহলে হাজারো মামলা দিয়েও চক্র ভাঙবে না। সবচেয়ে জরুরি যে কাজটি এখনো হয়নি, সেটি হলো ইতালি, গ্রিস, জার্মানির মতো দেশগুলোর সঙ্গে বৈধ পথে কর্মী পাঠানোর কূটনৈতিক চুক্তি। এই কাজে সরকারের আন্তরিক উদ্যোগ থাকলে রাবারের নৌকার আকর্ষণ অনেকটাই কমে আসত। যে মা তার ছেলেকে ১৫ লাখ টাকা দিয়ে বিদেশ পাঠিয়েছিলেন, তিনি দালালের বিরুদ্ধে আঙুল তুলেছেন। সেটা ঠিকই আছে। কিন্তু ওই তরুণকে এমন নড়বড়ে নৌকায় তুলে দিয়েছে একটি রাষ্ট্রের ব্যর্থতা, একটি সমাজের উদাসীনতা আর একটি ব্যবস্থার ফাঁকফোকর। ভূমধ্যসাগরে প্রতিটি মৃত্যু একটি পরিবারের শেষ হওয়া, একটি গ্রামের স্বপ্নের শেষ হওয়া আর একটি দেশের ব্যর্থতার দলিল হওয়া। এই মৃত্যুর মিছিল থামাতে হলে শুধু শোক প্রকাশ করলে হবে না; সিদ্ধান্ত নিতে হবে এবং সেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে এখনই।
নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha
নোনাজলে ডুবে যাচ্ছে স্বপ্ন, ডুবে যাচ্ছে একটি প্রজন্ম
- আপলোড সময় : ২০-০৪-২০২৬ ১০:২৩:১৫ পূর্বাহ্ন
- আপডেট সময় : ২০-০৪-২০২৬ ১০:২৬:৪৩ পূর্বাহ্ন
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ

সুনামকন্ঠ ডেস্ক