সুনামগঞ্জ , শনিবার, ২৫ এপ্রিল ২০২৬ , ১২ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
মধ্যনগরের গুমাই নদে ড্রেজার বসিয়ে বালু উত্তোলন, ব্যবস্থা নিচ্ছে না প্রশাসন মে দিবসে সবেতনে ছুটি ও ন্যূনতম মজুরি বাস্তবায়নের দাবিতে বিক্ষোভ স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে মাঠ গোছাচ্ছেন সম্ভাব্য প্রার্থীরা সোনালী চেলা নদীর পাড় কেটে বালু উত্তোলন : বিলুপ্তির পথে ৬ গ্রাম ২৮ এপ্রিল থেকে আকস্মিক বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টির ঝুঁকি আবহাওয়ার বিরূপ আচরণে হাওরের কৃষি : এখনই সমন্বিত পদক্ষেপ জরুরি ভারত থেকে পাইপলাইনে এলো আরও ৭০০০ মে. টন ডিজেল সাংবাদিকদের সাথে জেলা প্রশাসকের মতবিনিময় একটি সেতুর প্রতীক্ষায় কয়েক প্রজন্ম শ্রমিক সংকট ও জলাবদ্ধতায় বাড়ছে দুশ্চিন্তা আবহাওয়ার বিরূপ আচরণ : সংকটে হাওরাঞ্চলের কৃষি অন্তর্বর্তী সরকারের সময় হামের টিকা আমদানি করা হয়নি : প্রধানমন্ত্রী বিশ্বম্ভরপুরে মোটরসাইকেল চালকের গলাকাটা লাশ উদ্ধার সিলেটের নতুন বিভাগীয় কমিশনার মশিউর রহমান শহরে অর্ধ কোটি টাকার স্বর্ণ ও ডলার চুরির ঘটনায় গ্রেফতার ৫ এইচএসসি পরীক্ষা শুরু ২ জুলাই, সূচি প্রকাশ ফসলরক্ষা বাঁধের কাজ নিয়ে ক্ষোভ দোয়ারাবাজারে যুবকের ওপর হামলা প্রতিবন্ধী কৃষকের জমির ধান কেটে নেওয়া ও হামলার প্রতিবাদে মানববন্ধন অপ্রয়োজনীয় স্থানে বজ্র নিরোধক দন্ড স্থাপন, কাজে আসেনি তালগাছ প্রকল্পও

প্রতিস্বরের আলাপ

  • আপলোড সময় : ২৫-০৪-২০২৬ ১০:৩৫:১০ পূর্বাহ্ন
  • আপডেট সময় : ২৫-০৪-২০২৬ ১০:৩৫:১০ পূর্বাহ্ন
প্রতিস্বরের আলাপ
এনামুল কবির:: আমাদের স্বরূপচন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৯২৬ সালে। এটা উনিশ শতক ছিল না, তবুও এটা ছিল সে সময়ের অনুবর্তী বলতে হয়। কেননা উনিশ শতক ছিল বিভিন্ন কারণে বাংলার মনন ও বিকাশপর্বে অত্যন্ত ফলবান। তাৎপর্যের প্রশ্ন যদি তৈরি করে পর¤পরা, তাহলে এদিক থেকে বলতে হয় এই বিশ শতকে উনিশী সে প্রভাব কারও স্বীকার না করার কথা নয়। জমিদার শ্রেণি তো আগেই সৃষ্টি হয়ে গিয়েছিল, এখানে দেখা যাবে তাঁদের সামাজিক একটা দায়বদ্ধতা ও উদ্যোগের উদাহরণ। জগন্নাথপুর তখন যত পশ্চাৎপদ হোক এখানকার অগ্রসর শ্রেণিও ভালোভাবে স্মরণে রেখেছিলেন তাঁদের সেসব দায়বদ্ধতা তথা উদ্যোগ গ্রহণ করার মতো কাজ। এখানে সে ধারাবাহিকতা থেকে আমরা দেখি- ভারত রায়ের বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছেন একজন- তিনি’ই ভারত চন্দ্র রায়। তাঁর বাড়ির পাশে নিজ জমিতে প্রাথমিক ও উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা থেকে বুঝতে পারি জমিদার না হোন- বিত্ত ও মেজাজে তিনি তাঁদের আলাদা ছিলেন না। এই স্কুল দুটির মাঝখানে তিনি খনন করেছেন পুকুর এবং এর নাম দিয়েছেন- ‘ভারত সাগর’। এখানে আছে দুটি পাকা ঘাট, গেইট দুটির ব্লক অক্ষরে এই লেখা ও নামকরণ ব্যক্তি ভারত’কে চমৎকারভাবেই সাগরে প্রতীকায়িত করে। পুকুরটা এখানে সাগরই, এর পূর্বপাড়ে আমরা তাঁর কীর্তিটা পাঠ করি তাঁর পিতৃনাম- স্বরূপ চন্দ্র রায়ের আড়ালে; সে নামেই তিনি প্রতিষ্ঠা করে গেছেন এই হাইস্কুল- স্বরূপচন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়। এই বিদ্যাপীঠই আমার স্কুল। জগন্নাথপুর তখনও উজান থেকে ভাটিতে, তবুও এখানে আমি ছিলাম ভাটির মানুষ। কারণ এমনটা বলতেন এখানকার আমি ছিলাম যাঁদের রক্তের অংশীদার, সেসব বয়োজ্যেষ্ঠরা। বুঝতে পারি এটা ছিল আমার প্রতি তাঁদের একটা সরস মশকরা। তাই কেমন করে এসবের বাইরে আমি এই উজান- জগন্নাথপুর গেলাম, ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হলাম স্বরূপ চন্দ্রে এবং এখান থেকে এসএসসি পাশ করি- এবার সে কথাটা বলি। আমাদের গ্রামের নাম ডুংরিয়া, তখন সুনামগঞ্জ আর একটা মহকুমা শহর নয়; ক’বছর হলো এই সদর থানা একটা উপজেলা এবং জেলাও বটে। আমি ছিলাম সে গ্রাম- ডুংরিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্র। বৃত্তি দেওয়া ছাত্র আমি, ভালো ছাত্র যে ছিলাম তা বলতে পারি না। মনে পড়ে সবকটা বছর জুড়ে এখানে আমার অবস্থান ছিল তৃতীয়। এখানে ধলাই স্যার তো ছিলেন, তাঁর ভালো নাম এম এ ওয়ারিছ। তিনি ছিলেন এই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক, তিনি- আমাদের হাজী বাড়ির স্যারও বটে। তাঁর মতো সর্বজনপ্রিয় শিক্ষক ও দরদপ্রাণ মানুষ আর আমরা কবে পাবো? এখানে মালেক স্যার ছিলেন, তিনি সমধিক পরিচিত ছিলেন লেংড়া স্যার নামে; তাঁর স্বাক্ষর ছিল আমার কাছে বড় প্রাপ্তি এবং অবশ্যই বিস্ময়কর। আর বড়ঘাটের স্যার- কাদির স্যার এবং বিশ্বম্ভপুরের স্যার! আসলে আমাদের মগজের আড়ষ্টতা ভাঙার কাজটা করছিলেন এরকম কিছু মহান পুরুষেরা, তাঁরা ছিলেন এই আমার প্রিয় ও সম্মানিত শিক্ষকবৃন্দ- আমার দ্বিতীয় এই জন্মের কারিগর। এখানে তাঁদের হাত ধরে নব্বই দশকের মাঝামাঝি শেষ হয়ে গিয়েছিল আমার প্রাথমিক পর্যায়ের পড়াশোনা। কিন্তু সমস্যা হলো আমাদের গ্রাম- ডুংরিয়াতে তখন মাধ্যমিক স্তরে পড়াশোনা করার মতো হাইস্কুল নেই! যদিও আমার জন্য বলতে গেলে পূর্ব নির্ধারিত হয়েই ছিল আমি জগন্নাথপুর যাবো, পিতার মানুষের মতো মানুষ হবার নির্দেশ নিয়ে স্বরূপ চন্দ্রে গিয়ে ভর্তি হবো। তখন প্রেসিডেন্ট এরশাদের আমল, এই প্রতিষ্ঠানটা তখনও বেসরকারি। এখানে ভর্তির কাজ যত সহজ ছিল, একটা সীল না থাকায় সেদিন আমার জন্য সেটা হয়ে গিয়েছিল বড় কঠিন। আমি তখন বেশ পীড়িত হয়ে পড়েছিলাম। সে সময়টাতে ডুংরিয়া থেকে জগন্নাথপুরে যাওয়া-আসা তত সহজ ও আরামপ্রদ হয়ে উঠেনি, ‘বর্ষায় নাও, হেমন্তে পাও’ এই ছিল সম্বল। জানুয়ারির প্রথম দিকে শ্রদ্ধেয় পিতা- গোলাম মোস্তফার সাথে হেঁটে আমি জগন্নাথপুর গিয়েছিলাম। তবে ভর্তির জন্য স্কুলে নিয়ে গিয়েছিলেন আমার ছোট নানা তাহির আলী; যাঁর ব্যবসাভিত্তে লোকেরা নানাবাড়িকে মহাজন বাড়ি ডাকত। তিনি ছিলেন আমার আব্বার ছোট মামা এবং মায়ের ছোট চাচাও। শারীরিকভাবে তাঁর উচ্চতা ছিল বিশাল, গৌরবর্ণের এই মানুষটির সাথে যখন হাঁটছিলাম, তখন নিশ্চয়ই আমাকেও আরও পুঁচকেই দেখাচ্ছিল! আমি বলতে গেলে তখন ছোট নানার পিছনে দৌড়েই হাঁটছিলাম। আমাদের স্কুলে ছিল তখন দুটি গেইট, এখনও যে এর পরিবর্তন হয়েছে এমন নয়। আমরা দক্ষিণের গেইট দিয়ে ঢুকলাম। এখানে যখন ডান পাশের রুমের পাশ দিয়ে বামে মোড় নিলাম, দেখলাম এর কী দীর্ঘ বারান্দা। প্রথম রুমটাতে বসে আছেন ক’জন। সন্দেহ নেই তাঁরা ছিলেন এখানকার শ্রদ্ধেয় শিক্ষকবৃন্দ। ছোট নানাকে দেখে এখনকার কেউ না চেনার কারণ ছিল না। একজন সালাম দিলেন, ব্যতিব্যস্ত হয়ে জানতে চাইলেন অন্যজন, কী উদ্দেশ্যে এই আসা। আমার ছোট নানার মাথায় চুল ছিল না, চুল ছিল না এখানে তাঁকে বসতে বলা শ্রদ্ধেয় মানুষটিরও; পরবর্তীতে তিনি ছিলেন আমাদের নয়ন স্যার। তাঁর সম্পর্কে কত কথাই না বলা যায়! আমি ছিলাম ছোট নানার কাছে শুধুই এলেমান, কিন্তু শিক্ষক কমন রুমে ামাকে দেখিয়ে বলছিলেন, এই বাহাদুরকে ভর্তি করতে নিয়া আইছি। নয়ন স্যারের ডাকে রানুদ্দা এলে আমরা গেলাম পরবর্তী রুম- হেড স্যারের কাছে। হেড স্যার তখন গিরিন্দ্র কুমার সরকার, দেখলেন আমার ৫ শ্রেণি পাশ করা সাটিফিকেট- এতে কোনও সীল দেওয়া নেই! তাই বললেন, এটা ঠিক করে আনতে হবে এবং মহাজন সাহেবকে এজন্য আর আসতে হবে না। কেবল সীলযুক্ত সার্টিফিকেট নিয়ে আমি একা এলেই হবে। সেদিনের মতো আমরা হেড স্যারের রুম থেকে বের হয়ে আসলাম। এদিকে ভর্তি হতে না পারার কারণে আমার মন দুশ্চিন্তায় আচ্ছন্ন হয়ে গিয়েছিল। তখন বলতে গেলে আমার ভবিষ্যৎ নিয়ে আমি উদ্বিগ্ন হয়ে উঠছিলাম। আমাদের স্বরূপ চন্দ্রে ভর্তি হতে তখন ইন্টারভিউ লাগতো না, লটারিতে সুযোগ পাবার প্রশ্নও ছিল অবান্তর। কিন্তু সেদিন এই আমি এসবের বাইরে বড় এক পরীক্ষার মধ্যে গিয়ে পড়েছিলাম। মাত্র দুইদিন আগে নিজ গ্রাম ডুংরিয়া থেকে হেঁটে এসেছি, এখন আবার যেতে হবে। এছাড়া আব্বাও এখন জগন্নাথপুর নেই, বাড়ি ফিরে গিয়েছেন। তাহলে উপায়! এতে নানু- মায়া ভরকে যাননি, আমাকে ভরসা দিলেন এবং আজিজ বুড়াকে করে দিলেন সেদিনের সঙ্গী। (মনে পড়ে সেদিন এই মানুষটি একটি টাকা বাঁচাতে আমাকে কতটা বাড়তি মাইল হাঁটিয়েছিলেন!) হেড স্যার- ধলাই স্যারের কথা তো আগেই বলেছি। তিনি সীলহীন সার্টিফিকেটের কথা শুনে মনে হলো একটু কষ্ট ও লজ্জা পেলেন। এটা আমার জন্য ছিল আরও অস্বস্তির। আমাদের ধলাই স্যার ছিলেন ধবধবে সাদা মানুষ, মুখের মধ্যে বেড়ানো কালো মেঘ আড়াল করে স্যার তাঁর পাশে টেনে নিলেন, লিখে দিলেন সাটিফিকেট। এবার সীল দিতে ভুল করলেন না। তাহলে আগামীকাল আমাকে আবার হাঁটতে হবে। কাউকে শারীরিক সে কষ্টের কথা বললাম না, বিকেল বেলা ঘুরলাম এদিক-সেদিক এবং এই প্রথম বুকের মধ্যে শুনতে পেলাম একটা হাহাকার- কবে আর আমার বাড়ি ফেরা হবে! (বাড়িতে যে আসা-যাওয়া হয়নি বা করিনি তা তো নয়, তবে পড়াশোনা শেষ করার কথা যদি ধরি, সেটা ২০০২ এর আগে আর হয়নি।) এখন সেসব দিনের কথা বয়ান করি এমন ভাষা কোথায় আমার! যথাসময়ে ছোট নানা আমাকে স্কুলে নিয়ে ভর্তি করে নিয়ে এসেছিলেন, এভাবে শুরু হয়ে গেল আমার স্বরূপ চন্দ্রের দিন। আমি স্কুলে যাই, উপস্থিতি তেমন মিস হয় না। সুব্রত দা’র চায়ের দোকান তখন শুরু হয়নি, দেখি- পুকুরপাড় ঘেঁষে বসে ছোট ছোট দোকান, বেশ কয়েকটি কিরা’র। ফজলু ভাইয়ের দোকানটা একটু বড়, আম গাছের নিচে- তাঁর জায়গা মতো চানাচুর নিয়ে বসে আছেন বকুল দা। গৃহস্থঘরের অনেক শ্রমিক ঘাস কেটে এখানে বিশ্রাম করেন, জলপাই গাছগুলো তখনও হারায়নি তার সজীবতা। ছোটবেলা থেকে জেনে এসেছি তেঁতুল গাছে থাকে ভুতের বাস, এখানে সে অতিকায় গাছটাতে কি না আশপাশের অনেক ছোটরা বীরপুঙ্গব- এসব গ্রাহ্য করে না। সাজিদ মামা, মায়ের ফুফাত ভাই, তখনও হারাননি তাঁর পা; বেশ উঠতেন তেঁতুলগাছে, আমাকেও দিতেন। এটা কখনও আমার প্রিয় ছিল না, দাঁতে ঠক লেগে থাকে এবং তখন কিছু খাওয়া যায় না। তেঁতুলগাছের পূর্বপাশেই মসজিদ, ক্যাাম্পাসের ভেতরেই হলো এর অবস্থান; এটা আমাদের স্কুলের নিজস্ব মসজিদ। টিফিনে এখানে আমরা নামাজে যাই, মিস করলে মাওলানা স্যার- মাওলানা আব্দুল খালিক আনসারী- কোনও ক্ষমা করেন না। কী পেটানোই না তিনি করতেন আমাদের! কিন্তু আমার সমস্যা ছিল অন্যখানে, সেটা বিজ্ঞান গবেষণাগার নিয়ে। কেরানি স্যার- বিষ্ণু স্যার, তিনি নয়ন স্যারের ছোট ভাইও বটে; তাঁর রুমের উত্তরে ছিল এর অবস্থান। এখানকার ভীতি জাগানিয়া কথাটা হচ্ছে- পশ্চিমের দেয়াল ঘেঁষে গ্লাসের ভেতরে রাখা মানুষের কংকাল! এই রুমের পাশ দিয়ে গেলেও আমার গা ছমছম করতো, একটা সময় অবশ্য সেটা আর থাকেনি। উত্তরের গেইট দিয়ে আমরা স্কুলে প্রবেশ করতাম। প্রবেশকৃত এই বারান্দাটা ছিল পূর্বপশ্চিম বরাবর, আমাদের ক্লাসগুলোর ক্রমিকটাও ছিল সে নিরিখে বিন্যস্ত- ষষ্ঠ থেকে দশম পর্যন্ত। একেবারে পূর্বপাশের ভবনটা মনে হয় এর কিছুদিন পর নির্মাণ করা হয়েছিল। মনে পড়ে এখানে আমাদের বার্ষিক মিলাদ অনুষ্ঠিত হতো, পরীক্ষার হল হিসেবেও ব্যবহৃত হতো এটা। ছাদওয়ালা ভবন বলতে গেলে তখন ছিল এই একটাই। উল্লেখ যে, প্রবেশ মুখেই ছিল আমাদের ক্লাসরুম- ষষ্ঠ শ্রেণি। পরবর্তীতে কেন জানি পার্টিশন দিয়ে এখানে একটা ছোট রুম তৈরি করে নেওয়া হয়েছিল। টিনসেট ভবন, ছাদে বাস করতো বেশ জালালি কবুতর; ঝড়ো রাতে বেঞ্চগুলো বেশ ময়লা হয়ে যেতো। রাণুদ্দার সাথে আছেন প্রাণেশ দা, একটা বড়সড় স্কুলের কতটা দিক তাঁরা আর দেখতে পারেন! এখানে পাঠদানের কথায় প্রথমে বলতে হয় আমাদের প-িত স্যারের কথা। সৈয়দ মুজতবা আলীর কথা তো জানি, তাঁর একটা গদ্য আছে- প-িত মশাই, তখনও এটা আমার পড়া হয়নি। তবে আমার খালাদের মুখে এর কিছুটা আগে শুনে গিয়েছিলাম। তাঁদের এই বয়ানভাষ্যের মধ্যে আমি মিল পেয়েছিলাম সেদিন ষোলআনাই। প-িত স্যার ধুতি পড়তেন, মাথার পেছনে ছিল তাঁর টিকি; দাঁত ছিল না, তবুও পান খেতেন। আর- টেবিলে পা তুলে দিতেন ঘুম! আমাদের বাংলা ব্যাকরণ কিছুটা পড়িয়ে থাকবেন, তবে হিন্দুধর্ম শিক্ষাতে ছিল তাঁর অধিকার ও স্ফূর্তি। এখানকার শ্লোকগুলো ছিল সংস্কৃতে, তিনি এসব আওড়াতেন ও বলে দিতেন এর বাংলা। বিবৃত করতেন বিবেকানন্দের বাণী- ‘জীবে প্রেম করে যেইজন, সেইজন সেবিছে ঈশ্বর।’ পরবর্তীতে এসব আমার মনে স্থায়ী ভাবে মুদ্রিত হয়নি তা বলতে পারি না। এখানে এটাও বলতে হয়, যে কজন মানুষ আমাকে বেশি প্রভাবিত করেছেন, তাঁদের একজন- আমাদের এই প-িত স্যার। (মনে পড়ে যখন জেলা শহর সুনামগঞ্জ যাওয়ার বয়স ও সুযোগ হলো, যেতাম আদর্শ লাইব্রেরিতে এবং এখান থেকে বিবেকানন্দের যা পেতাম, তা ই কিনে নিতে চাইতাম!) প-িত স্যারের মেয়ের দিকের এক নাতিও আমাদের সাথে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছিল, সে ছিল স্বল্প বাক, তার নামের শেষ অংশটুকুই কেবল এখন মনে আছে- অধিকারী। আমার এই স্কুল জীবনে সে ই ছিল মনে হয় প্রথম বন্ধু। (এখন সে কোথায় আছে, জানতে- বড্ড ইচ্ছে করে; আহা আমার সে হারিয়ে ফেলা বন্ধু!) এর মধ্যে নতুন একজন স্যার যোগদান করেছিলেন, তিনি ছিলেন আমাদের- শ্রদ্ধেয় মনোরঞ্জন স্যার। বলতে গেলে তিনিই হচ্ছেন আমার আজকের এই পৃথিবীর একমেবাদ্বিতীয়ম- নির্মাতা। একটা সময় দূরের গ্রাম জগন্নাথপুর হলেও সে ভয় আমার কেটে গিয়েছিল। তাই এই সময়ে একটু একটু করে আকাশ দেখা শুরু করে দিয়েছিলাম। পড়াশোনার মান আর বজায় থাকে! কোনও রকমে ৭ম এবং এভাবে ৮ম শ্রেণিতেও উঠলাম। সে বছর যোগ দিয়েছিলেন মনে হয় প্রফুল্ল স্যার। তাঁর ভাতিজা লিটন হলো আমার বন্ধু। আমি স্যারের সান্নিধ্যে গিয়েও আর পড়াতে মন বসাতে পারি না। এখন ইটখোলা আর পাখির বাসা নয়, উপজেলা কোর্টে শায়েক আহমদ ও ফারুক কামাল এডভোকেটের তর্কেও মন ভোলে না। বলবো কী- আমি তখন পুরোদস্তুর কবিতার পাঠক! এর মধ্যে চৌধুরী আল বেলালকে পেয়ে যাই। স্কুলে আসে নতুন একটা বিষয়- অনুষ্ঠিত হবে ক্লাস ক্যাপটেন নির্বাচন। আমরা দাঁড় করিয়ে দেই তাকে। সে ফেল করে, আমাদের কৌশল কাজ না করায় আমরা ক’জন বেশ কষ্ট পাই। বেলাল মনে হয় না তখনও এসব গায়ে মেখেছে, তবে তার বড় গুণ, সে আমাদের- রবীন্দ্র সঙ্গীত গেয়ে শোনায়। নজরুলের তখন তো শিবু দা ছিলেন, আপাত আমাদের আছে বেলাল। বেবী আপা তো ছিলেনই। এই সময়টাতে যখন ক্লাসে আসতেন পাখি মিয়া (তাঁর ভালো নাম- মন্তেশ্বর আলী) স্যার, আমাদের পড়াতেন ইংরেজি গ্রামার, পড়া না পারলে যে পারতো, সেও তাঁর বেত্রাঘাত থেকে নিস্তার পেত না। তখন আমাদের স্কুলে বিদ্যুতের সংযোগ হয়ে গেছে। বঙ্কিম স্যারও গ্রামার পড়িয়েছেন, পড়িয়েছেন হেডস্যারও। তিনি অবশ্য ক্লাসে এসে কেবল প্রধান শিক্ষকের নিকট ৩দিনের ছুটি চেয়ে ইংরেজিতে আবেদন লেখতে বলতেন- এতোটুকুই। এর মধ্যে আমাদের স্কুল আর বেসরকারি নেই, যে দুইবার প্রেসিডেন্ট এরশাদ জগন্নাথপুর এসেছিলেন, প্রথমবার গার্লস স্কুল এবং ৮৭ সালে আমাদের দাবিতে স্বরূপ চন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়কে সরকারি করে যান। আমরা একদিন সে সুবাদে হারিয়ে ফেলি জিতেন স্যারকে, তিনি ছিলেন বিজ্ঞানের শিক্ষক, এবার তিনি আমাদের ছেড়ে বদলী হয়ে গিয়েছেন সিলেটের পাইলট স্কুলে। মসজিদের পূর্ব অংশে এই সময়টাতে কি না নির্মিত হয়েছিল ভোকেশনাল শাখা- টিনসেট ভবন। এখানকার কর্তব্যরত ছিলেন জনাব ছায়াদ আলী স্যার। তাঁর ক্লাস মনে হয় আমাদের খুব একটা ছিল না, তাই লোহালক্ষরের শব্দ শুনতে ওদিকে আমরা মাঝে মধ্যে গিয়ে ঢুঁ দিতাম। এখন এটা বলতে দ্বিধা নেই, পৃথিবীতে যদি কোথাও কোনও আরাম ও প্রশান্তির জায়গা থাকে, সেটা হলো আমার এই স্কুল- এর প্রাঙ্গণ। ইচ্ছে হয় বারবার এখানে যাই, কিন্তু সে সুযোগ ও অবসর আর পাই! এমনটা শুনেছিলাম যে, মানুষ নাকি দ্বিতীয়বার জন্মগ্রহণ করে; আর তাঁদের তখন বলা হয় দ্বিজ। এই আমিও বেশ মনে পড়ছে এক দ্বিতীয়বার জন্মগ্রহণ করা মানুষ। বলা বাহুল্য এখানে সেটা সম্ভব হয়েছিল মাতৃজঠরের পর আমার প্রিয় বিদ্যাপীঠ- স্বরূপচন্দ্র সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের দৌত্যে। আমি ছিলাম এখনকার ছাত্র, এই নিয়ে আমি এখনও তুমুল গর্ব করি। গত ১৫ এপ্রিল, আমার সে স্কুলের ১০০ বছর পূর্ণ হলো। বলা বাহুল্য এর সবটা জুড়ে ছিল অন্ধকারের বিরুদ্ধে এর লড়াই, বাতিঘর তো বটেই এবং একটা নিত্য আলোর উৎসব। অভাবনীয় কী আনন্দ যে, এই সময়টাতে আমরা বেঁচে আছি। এই স্মৃতি উসকে দেওয়া মুহূর্তে আমার সেসব প্রিয় ও শ্রদ্ধেয় শিক্ষক মহোদয়গণের মুখ ও কথা খুব মনে পড়ছে। তাঁদের সালাম জানাই। তাঁরা ছিলেন সোনা ফলানো মানুষ, ফেলে আসা দিনগুলোতে তাঁরা বলতেন এই জগৎ আমাদের কাছে কী চায়। সেটা ছিল চরিত্রবান ও ভালো মানুষ, যেখানে মানুষ হয়ে আছে মানুষের গন্তব্য। ভাবি- সেই ভাবনার হাতুড়ির ঘা’তে যদি আমরা নির্মিত হয়ে থাকি, এখানে আমাদের দায় আছে সমাজ ও রাষ্ট্রে সেই দীপ্তিটাকে এখন ছড়িয়ে দেওয়ার। অবশ্যই জনবান্ধব রূপে এর পুনঃনির্মাণ আমাদের করতে হবে। [লেখক- শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক]

নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha

কমেন্ট বক্স
স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে মাঠ গোছাচ্ছেন সম্ভাব্য প্রার্থীরা

স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে মাঠ গোছাচ্ছেন সম্ভাব্য প্রার্থীরা