সুনামগঞ্জ , বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬ , ৭ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
সেতু নির্মাণে নিম্নমানের সামগ্রী দেখে কাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দিলেন এমপি কামরুল শারদীয় দুর্গোৎসব সম্পন্ন: নৌকায় কৈলাস ফিরলেন দেবী দুর্গা সম্প্রীতির বন্ধন সুদৃঢ়, এ ধারা অব্যাহত রাখতে হবে : এমপি নূরুল ইসলাম সাফেলা বড় বিল ও কুড়ি বিলে দখল বুঝিয়ে দিতে বাধা শুভ বিজয়া : অশুভের বিনাশ, সম্প্রীতি ও গণতন্ত্রের জয় হোক বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হল শারদীয় দুর্গোৎসব ৩০ অক্টোবর শুরু হচ্ছে হাজীপাড়া ফুটবল প্রিমিয়ার লিগের দ্বিতীয় আসর, ২৩ অক্টোবর প্লেয়ার নিলাম সনাতন ধর্মাবলম্বীরা পূজা করবে আর আনন্দটা সবার, বিভাগীয় কমিশনার মোহাম্মদ মসিউর রহমান সাংবাদিক আলিফ হত্যাকারীদে শাস্তির দাবি তাহিরপুরে মানববন্ধন মধ্যনগরে পূজামণ্ডপ পরিদর্শনে ইনামুল গণি তালুকদার রুবেল সুনামগঞ্জে দুর্গাপূজার নিরাপত্তাব্যবস্থা সন্তোষজনক: সিলেট রেঞ্জের ডিআইজি সাংবাদিক আলিফ হত্যা ও মোত্তালিব ভূঁইয়ার ওপর হামলার প্রতিবাদে সুনামগঞ্জে মানববন্ধন দিরাইয়ে মাদকবিরোধী সভার পর প্রবাসী লিমনের ওপর হামলার অভিযোগ ‎সব ধর্মের মানুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দেশ গড়ি : প্রধানমন্ত্রী ‎সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা করতে আমাদের কোনো দ্বিধা নেই : আইনমন্ত্রী শান্তিগঞ্জে ১৬২ কেজি মাছের পোনা অবমুক্ত ‎মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করলেন ইশরাক দুর্গাপূজা উপলক্ষে পশ্চিম নতুনপাড়ায় ৮৮ প্রবীণকে সম্মাননা দিরাইয়ে মোটরবাইক দুর্ঘটনায় আহত ২ সাংবাদিক আলিফ হত্যার প্রতিবাদে সুনামগঞ্জে মানববন্ধন, খুনিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি

হাওরের ফসল ডোবায় কে?

  • আপলোড সময় : ১৩-০৫-২০২৬ ১২:৩৭:০৬ অপরাহ্ন
  • আপডেট সময় : ১৩-০৫-২০২৬ ১২:৩৮:০০ অপরাহ্ন
হাওরের ফসল ডোবায় কে?
আমীন আল রশীদ::>
হাওরাঞ্চলে ফসল ডুবে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের বছরব্যাপী সহায়তা দেওয়াসহ ১৩ দফা দাবি জানিয়ে গত ৭ মে সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসক বরাবর স্মারকলিপি দিয়েছেন স্থানীয়রা। তাঁদের অভিযোগ, বিগত কোনো সরকারই হাওরের সমস্যাকে গুরুত্বের সঙ্গে না দেখে ভাসাভাসা কর্মসূচি নিয়ে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় করেছে। গণমাধ্যমের খবর বলছে, সাম্প্রতিক অতিবৃষ্টিতে হাওরাঞ্চলের সাত জেলায় প্রায় অর্ধলক্ষ হেক্টর জমির ধান তলিয়ে গেছে। অপরিকল্পিত নির্মাণকাজ, দুর্বল বাঁধ, যত্রতত্র পল্লীসড়ক এবং ইজারাদারদের দৌরাত্ম্যে হাওরের জলাধারগুলোর গভীরতা কমে জলাবদ্ধতা সৃষ্টির কারণেই এই পরিস্থিতি। গ্রীষ্মেই এই পরিস্থিতি। ফলে আসন্ন বর্ষা ও বন্যার মৌসুমে হাওরাঞ্চলের কৃষকদের জন্য আরও বড় বিপদ অপেক্ষা করছে বলেও তাঁদের শঙ্কা। প্রশ্ন হলো, নদী-খাল-হাওরের দেশের কৃষকেরা প্রতি বছর কেন এই একই সংকটে খাবি খায়? হাওরের ফসল আসলে কে ডোবায়? বেশ কয়েকদিন ধরেই সংবাদমাধ্যমে হাওরের ফসলহানির খবর আসছে। সেসব খবর পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলে টানা বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে বিস্তীর্ণ হাওর এলাকা প্লাবিত হয়ে ভয়াবহ বিপর্যয়ের সৃষ্টি হয়েছে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ৯ মে পর্যন্ত কিশোরগঞ্জে ১৩ হাজার ১২২ হেক্টর জমির বোরো ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। নি¤œাঞ্চল প্লাবিত হওয়ায় কৃষকদের বড় একটি অংশ তাঁদের ফসল ঘরে তুলতে পারেননি। এতে প্রায় ৫০ হাজার কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’ প্রবাদটি প্রতি বছরই ফিরে আসে সুনামগঞ্জের কৃষকদের জীবনে। এ বছরও তা-ই। একদিকে টানা বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা, অন্যদিকে পানিতে ডুবে থাকা পাকা ধান কাটার জন্য শ্রমিকসংকট। বেশি পারিশ্রমিক দিয়েও শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। স্বয়ং জেলা প্রশাসকও স্বীকার করেছেন যে, শ্রমিকসংকটের কারণে এবার শতভাগ ফসল ঘরে তোলা সম্ভব হবে না। ফলে বিপুল পরিমাণ ধান শেষ পর্যন্ত নষ্ট হবে এবং সেই সঙ্গে ভঙ্গ হবে অসংখ্য কৃষকের স্বপ্ন। এখানে শ্রমিকসংকটের মূল কারণ হলো, হাওরে একসময় দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ধান কাটার শ্রমিকেরা আসতেন। আবার স্থানীয়ভাবেও শ্রমিক ছিলেন। কিন্তু বাইরের শ্রমিকদের আসা কমে গেছে। আবার ধান কাটার যন্ত্র চালু হওয়ায় স্থানীয় শ্রমিকেরাও আর আগের মতো ধান কাটেন না। ফলে ধান যখন পানির নিচে চলে গেছে, তখন সেই ধান কেটে ঘরে তোলার মতো পর্যাপ্ত শ্রমিক মিলছে না। আবার একটা মেশিনে একদিনে যে পরিমাণ জমির ধান কাটা ও মাড়াই করা যায়, ১০০ জন শ্রমিকের পক্ষেও তা সম্ভব হয় না। এ ছাড়া পর্যাপ্ত মজুরি ও সম্মান না পাওয়াসহ আরও অনেক কারণে কৃষিশ্রমিক কমছে। সেটা সারা দেশেরই চিত্র। নদী ও জলমাতৃক এবং কৃষিনির্ভর বাংলাদেশের একটা বড় ট্র্যাজেডি হলো, এই দেশে কৃষকেরাই সবচেয়ে বেশি অবহেলার শিকার। ¯্রষ্টার কৃপা আর যে কৃষকের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে ছোট্ট একটি দেশের প্রায় ২০ কোটি মানুষ খেয়েপরে বেঁচে আছে; যে মানুষগুলো দেশের খাদ্যনিরাপত্তা বজায় রাখতে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখছেন, সেই মানুষগুলোই সমাজে সবচেয়ে বেশি অসম্মানের পাত্র। কৃষকের ছেলেকে ‘চাষার ছেলে’ বলা হয়। ফলে কৃষকের ছেলে আর কৃষক হওয়ার স্বপ্ন দেখে না। খুব কম কৃষকই শুধু কৃষিকাজ করে তাঁর সংসার চালাতে পারেন। বরং তাঁর পরিবারের অন্য কাউকে অন্য কোনো কাজ করতে হয়। বজ্রপাতে প্রতি বছর যে প্রাণহানি হয়, তার অধিকাংশই কৃষক। হাওরের মতো উন্মুক্ত স্থানে বেশি বজ্রপাত হয় এবং তাতে সবচেয়ে বেশি প্রাণ যায় কৃষকের। অতিবৃষ্টি, অকাল বন্যা কিংবা খরায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন এই কৃষকেরাই। এসব কারণে সারা দেশেই কৃষকের সংখ্যা কমছে। শিক্ষিত তরুণদের অনেকে আধুনিক কৃষিতে এলেও সেই সংখ্যা কম এবং তাঁদের কৃষির ধরন আলাদা। বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতে প্রথাগত কৃষির বিকল্প নেই। কিন্তু সেই প্রথাগত কৃষক এবং কৃষিশ্রমিকের সংখ্যা যে হারে কমছে, তাতে ভবিষ্যতে বাংলাদেশ খাদ্য আমদানিনির্ভর দেশে পরিণত হয় কি না সন্দেহ। সেটা হলে আরও অনেক বড় ট্র্যাজেডি আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। প্রশ্ন হলো, কৃষকেরা প্রতি বছরই কেন তাঁদের ফসল নিয়ে এরকম অনিশ্চয়তা আর ঝুঁকির মধ্যে থাকবেন? কেন তাঁদের জীবন ও ফসলের নিরাপত্তা থাকবে না? বস্তুত কৃষি ও কৃষকের সুরক্ষায় রাষ্ট্রের যে উদ্যোগ প্রয়োজন ছিল, সেখানে বড় ধরনের ঘাটতি আছে। এই ঘাটতি চিরকালই ছিল। কারণ কৃষকেরা রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণের সঙ্গে যুক্ত নন। নীতিনির্ধারণ করেন বড় ব্যবসায়ী, আমলা ও শিক্ষিত শ্রেণি। ফলে অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি কিংবা বন্যায় ফসলহানি হলে ওই নীতিনির্ধারকদের টনক নড়ে। তাঁরা তাৎক্ষণিক কিছু প্রকল্প পাস করেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বাংলাদেশ যে একটা প্রকল্পশাসিত রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে, তার ছোবল থেকে হাওরের কৃষকেরাও রক্ষা পাননি। এখানকার জনজীবন রক্ষায় যে ধরনের উন্নয়ন পরিকল্পনা নেওয়ার কথা ছিল, সেগুলো হয়েছে মূলত প্রকল্পনির্ভর। প্রতি বছর একেকটি প্রকল্প নেওয়া হয় কোটি কোটি টাকা তসরুপ করার জন্য। জনগণের অর্থ সরকার এখানে বরাদ্দ দেয়। কিন্তু পরের বছর আবার ওই একই সংকট সমাধানে নতুন প্রকল্প নিতে হয়। আগের প্রকল্পটি যে ঠিকমতো বাস্তবায়িত হলো না, সে জন্য সংশ্লিষ্টদের জেলের ভাত খেতে হয় না। বরং তাঁরা বহাল তবিয়তেই থাকেন। ২০১৭ সালের ঘটনা হয়তো আপনার মনে আছে। ওই বছরও মেঘালয়ে অতিবৃষ্টি এবং উজানের নদীর পানি বেড়ে যাওয়ায় বাঁধ উপচে বিস্তীর্ণ হাওরের ফসল ডুবে গিয়েছিল। তখনও কৃষকদের মূল দাবি ছিল টেকসই বাঁধ এবং নানা কারণে ভরাট হয়ে যাওয়া নদীগুলো খনন করে এর নাব্যতা বাড়ানো। হাওরের কৃষকদের অন্যতম প্রধান দাবি টেকসই বাঁধ। কিন্তু হাওরের ভুক্তভোগী মানুষেরা এখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন, বাঁধ নির্মাণ হচ্ছে একটি ‘লাভজনক ব্যবসা’। অর্থাৎ কৃষকদের স্বার্থে সরকার প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা দেয়। কিন্তু কাজ বাস্তবায়ন যাঁদের দায়িত্ব, তাঁরা নিজেদের স্বার্থই বড় করে দেখেন। তাঁদের কাছে প্রকল্প মানেই টাকা। টাকা মানেই ভাগবাটোয়ারা। সুতরাং হাওরের প্রাণপ্রকৃতি আর ফসল রক্ষায় বিনিয়োগ হলেও সেই বিনিয়োগে ভারী হয় মূলত প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের পকেট। হাওরের ভুক্তভোগী মানুষের বরাতে গণমাধ্যমের খবরেও বলা হয়, পানি উন্নয়ন বোর্ড ও প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, স্থানীয় প্রভাবশালীরা মিলে হাওরে বাঁধ সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছে। যে কারণে কাজে দুর্নীতি-অনিয়ম হয়। বাঁধের নামে অপচয় ও লুটপাট হয়। কপাল পোড়ে কৃষকের। আবার যে বাঁধ নির্মাণ করা হয়, সারা বছর সেটিরও তদারকি করা হয় না। একটা দুর্ঘটনা ঘটলেই সবাই নড়েচড়ে বসেন। মন্ত্রী ও প্রশাসনের কর্তারা কৃষকের কাছে ছুটে যান। তদন্ত কমিটি করেন। দুর্বল বাঁধ নির্মাণের জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে শাস্তির আশ্বাস দেন। কিন্তু পরের বছর কৃষককে আবারও সেই একই আতঙ্কে রাত জেগে বাঁধ পাহারা দিতে হয়। সুনামগঞ্জের হাওর অঞ্চলের মানুষের অভিযোগ, নানা জায়গায় অপ্রয়োজনে বাঁধ হলেও প্রয়োজনীয় জায়গায় হয়নি। আবার বাঁধ নির্মাণে অনিয়মেরও শেষ নেই। ফলে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে অধিকাংশ বাঁধই এখন ঝুঁকিতে। আরেকটি বড় অভিযোগ, অধিকাংশ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব ও অর্থনৈতিক সুবিধা নিয়ে হাওরে বাঁধ নির্মাণের জন্য পিআইসি গঠন করা হয়। যে কারণে নি¤œমানের বাঁধ নির্মাণ করা হলেও তার কোনো জবাবদিহি নেই। আবার প্রয়োজনীয় অনেক স্থানে বাঁধ নির্মাণে বরাদ্দ রাখা হয়নি। বাঁধের পাড় থেকেই মাটি কেটে বাঁধে ফেলাতেও কিছু বাঁধ ঝুঁকিতে আছে। তবে বাঁধের চেয়েও হাওরাঞ্চলে নানা কারণে ভরাট হয়ে যাওয়া নদীগুলো খননে যে পরিমাণ আন্তরিকতা থাকার কথা ছিল, তা অনুপস্থিত। অথচ নদীগুলো নাব্য থাকলে, গভীর থাকলে সে অতিবৃষ্টি ও বন্যার অতিরিক্ত পানি ধারণ করতে পারত। তাতে হাওরের বাঁধ ভেঙে ফসলের জমি তলিয়ে যেত না। কিন্তু নদী খননের বাজেটও কোথায় কতটুকু খরচ করা হয়েছে; কী কাজ হয়েছে; সেই কাজের ফলাফল কী - তা নিয়ে স্থানীয়দের মনে প্রশ্নের শেষ নেই। সুতরাং, হাওরে কৃষকের ফসল কে ডোবায়, সেই প্রশ্নের উত্তর নিশ্চয়ই আমরা পেয়ে গেছি। লেখক: সাংবাদিক ও লেখক

নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
শারদীয় দুর্গোৎসব সম্পন্ন: নৌকায় কৈলাস ফিরলেন দেবী দুর্গা

শারদীয় দুর্গোৎসব সম্পন্ন: নৌকায় কৈলাস ফিরলেন দেবী দুর্গা