সুনামগঞ্জ , রবিবার, ০৭ জুন ২০২৬ , ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
৮ বছরের শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে দুই কিশোর আটক জন্মজয়ন্তীতে কবি নজরুল ইসলামকে স্মরণ ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনতামূলক র‌্যালি গাছের সঙ্গে ট্রাকের ধাক্কায় শ্রমিক নিহত, অটোরিকশার চাপায় প্রাণ গেল ৬ বছরের শিশুর পুশইনে মরিয়া বিএসএফ, সীমান্তে উত্তেজনা মে মাসে গণপিটুনি ও সহিংসতায় নিহত ৩১, ধর্ষণের শিকার ৮৩ নারী ও শিশু বাদাম চাষে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়ালেও ফলন নিয়ে শঙ্কা জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের বর্ধিত সভা অনুষ্ঠিত মাদক ব্যবসায়ী ও মাদকসেবীকে ছাড় দেওয়া হবে না ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকায় অনিয়ম, ক্ষোভে ফুঁসছেন বঞ্চিতরা টাঙ্গুয়ার হাওরে নিভে গেল ছোট্ট সৌম্যতার জীবনপ্রদীপ তাহিরপুরে ঈদ পুনর্মিলনী ও আলোচনা সভায় এমপি কামরুল মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে অন্য কোনও ঘটনার তুলনা হয় না : মির্জা ফখরুল শিশুর হাতে স্মার্টফোন : আশীর্বাদ না অভিশাপ? হাওরের জন্য ৫০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দের দাবি টাঙ্গুয়ার হাওরে উজাড় হচ্ছে হিজল-করচ বাগ সাম্রাজ্যবাদী ও দেশবিরোধী সব চুক্তি বাতিলের দাবি “সমন্বয়কদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন হান্নান মাসউদ” গুপ্ত ছিলাম, বাইরে যাইনি, ভবিষ্যতেও পালাবো না : জামায়াত আমির প্রাথমিক শিক্ষা পদক ২০২৬ জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ হলেন যাঁরা
ফাঁদে ইউরোপযাত্রা

দুই বছরে নিঃস্ব হয়ে ফিরেছেন ২১৫ জন

  • আপলোড সময় : ০৪-০৬-২০২৬ ০৯:৪৮:১৯ পূর্বাহ্ন
  • আপডেট সময় : ০৪-০৬-২০২৬ ০৯:৫২:৩৮ পূর্বাহ্ন
দুই বছরে নিঃস্ব হয়ে ফিরেছেন ২১৫ জন
বিশ্বজিত রায়::
* নির্যাতনের লোমহর্ষক বর্ণনা তিন তরুণের

স্বপ্নের ইউরোপ যাত্রায় চরম ঝুঁকিপূর্ণ পথ বেছে নিচ্ছে সুনামগঞ্জের শত শত অভিবাসন প্রত্যাশী তরুণ। ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে এদের কেউ স্বপ্ন পূরণে সফল হলেও ‘ইউরোপ’ নামক ‘সোনার হরিণ’ ধরতে সাগরে সলিল সমাধি হচ্ছে অনেকের। এছাড়া লিবিয়ায় মাফিয়া চক্রের পাশবিক নির্যাতনের শিকার হয়ে সর্বস্ব হারিয়ে বাড়ি ফেরার ঘটনাও ঘটছে। মুক্তিপণ দিয়ে সদ্য বাড়ি ফেরা কয়েকজনের সাথে কথা বলে লিবিয়ার জিম্মিদশার বিষয়টি জানা গেছে। অভিবাসন নিয়ে কাজ করা এনজিও সংস্থা ব্র্যাকের এমআরএসসি’র হিসাব অনুযায়ী, গেল দুই বছরে নিঃস্ব হয়ে বাড়ি ফিরেছে সুনামগঞ্জের ২১৫ জন। ঘটনার অধিকাংশ চাপা থাকলেও ২১ মার্চ ভূমধ্যসাগরে সুনামগঞ্জের ১৩ তরুণের মৃত্যু দালাল চক্রের নির্মমতাকে সামনে নিয়ে আসে। এনজিও সংস্থা ও ভুক্তিভোগীদের দাবি, গ্রাম-গঞ্জের যুবকদের ইউরোপের ফাঁদে ফেলে নির্মমতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে চক্রটি।
সম্প্রতি সাগর পথে মৃত্যুর ঘটনায় দিরাই ও জগন্নাথপুর থানায় পৃথক মামলা হলেও মামলার পরবর্তী কার্যক্রম নিয়ে অসন্তোষ আছে ভিকটিমের পরিবারে। সম্প্রতি নির্যাতনের শিকার হয়ে বাড়ি ফিরেছেন জামালগঞ্জের নাজিমনগর গ্রামের নুরু মিয়ার দুই ছেলে ইয়াছিন মিয়া ও জীবন মিয়া এবং একই গ্রামের আব্দুস শহীদের ছেলে মো. মামুন মিয়া। গত ২১ ফেব্রুয়ারি তারাসহ ইতালি যাওয়ার উদ্দেশ্যে বাড়ি ছাড়ে ওই গ্রামের পাঁচ যুবক। নানা ঝক্কি-ঝামেলা পেরিয়ে সৌদিআরব থেকে মিসরের আলেকজান্দ্রা হয়ে লিবিয়ার বেনগাজিতে পৌঁছায় তারা। পরে ভূমধ্যসাগরের উপকূলীয় শহর ত্রিপোলির জুয়ারায় নিজেদের আস্তানায় নিয়ে নির্মম নির্যাতনের কথা জানিয়েছে ভুক্তভোগী তিন যুবক।
ভুক্তভোগীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, নাজিমনগর গ্রামের দিলুরা বেগম, তার ছেলে মো. হুমায়ুন ও মেয়ে জামাই নজরুল ইসলামের মাধ্যমে লিবিয়া যায় ওই গ্রামের ১২ জন। তাদের সাথে জনপ্রতি ১৪ লাখ টাকার মধ্যে লিবিয়া পর্যন্ত ৫ লাখ ও ইতালি পৌঁছামাত্র বাকি টাকা দেওয়ার চুক্তি হয়। চুক্তি অনুযায়ী লিবিয়া পৌঁছলে সেখানে দালাল সোহেল মিয়া ও ভৈরবের বেলাবরের মো. নিলয়ের খপ্পরে পড়েন তারা। স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় চুক্তির বাকি টাকা হাতিয়ে নেয় লিবিয়ার ওই দালালেরা। এরপর বন্দুকধারী মাফিয়াদের হাতে তুলে দেওয়া হয় তাদেরকে। সেখানে জনপ্রতি সাড়ে ২৬ লাখ টাকা মুক্তিপণ চেয়ে নির্যাতন শুরু করে মাফিয়া চক্রের সদস্যরা।
লোমহর্ষক নির্যাতনের বর্ণনা দিয়ে মো. মামুন বলেন, প্রচুর মাইড়-দুইড় (নির্যাতন) করছে। খাওনও ঠিকভাবে দিছে না। হাত-পা বাইন্ধা সারা রাইত বাথরুমে ফালাইয়া রাখছে। ভিডিও কইরা ফ্যামিলির মানুষরে দেখাইছে। জনপ্রতি সাড়ে ২৬ লাখ টেকা দিলে ছাড়ব, না হইলে মাইরা ফালাইয়া দিবো। বাড়ি পর্যন্ত আইতে ৫২ লাখ টাকা খরচ করছে আমার পরিবার।
লিবিয়ার মাফিয়া-দালাল সবাই বাঙালি উল্লেখ করে মামুন বলেন, টেকা দেওয়ার লাইগ্যা লিবিয়ার দালাল ভৈরবের কুলিয়ারচরের দাড়িয়াকান্দির ছয়সতী বাজারের মামুন নামে একজনের দোকানের ঠিকানা দিছে। বাড়ির জায়গা-জমি, গরু-বাচুর বিক্রি কইরা এইখানে টেকা জমা দেওয়ার পরে আমারে ছাড়ছে। অন্যরা রইয়া গেছে। যারা টেকা দিতে পারতাছে না তাদের উপরে অত্যাচার চলছে।
আরেক ভুক্তভোগী ইয়াছিন জানান, বাড়ি ছাড়ার আগে তারা দুই ভাইয়ের ১০ লাখ টাকা তুলে দেওয়া হয় স্থানীয় দালালের (দিলুরা-হুমায়ুন) হাতে। ত্রিপলি যাওয়ার পর রক্তে সমস্যা থাকায় আলাদা রাখা হয় তাকে। ভিন্নপথে ইতালি যাওয়ার প্রলোভনে দালালদের আরও দুই লাখ টাকা দেয় পরিবার। প্রতারিত হয়ে অন্য দালালের আস্তানায় গেলে সেখান থেকে পুলিশ ইয়াছিনকে ধরে নিয়ে বেনগাজির গাম্বুদা জেলে পাঠিয়ে দেয়।
গাম্বুদা জেলে এক মাস ১৮ দিনের তিক্ত অভিজ্ঞতা তুলে ধরে ইয়াছিন বলেন, জেল থেকে যোগাযোগ করলে আব্বা কইতাছে- জীবনরে ছাড়াইতে মাফিয়া ত্রিশ লাখ টাকা নিছে। পুত দেওয়ার মতো কিচ্ছু নাই, সব শেষ। পরে আইওএম (আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা) ধইরা বাড়ি আইছি। ইয়াছিনের ভাই জীবন মিয়া বলেন, মাফিয়ার আস্তানায় আমরা ৬০-৬৫ জন ছিলাম। এই আস্তানায় প্রতিদিনই লোক আসতেছে, বের হইতাছে। সব জিম্মিদেরকেই টর্চারিং করে। যারা টাকা দিতাছে তারা ছাড়া পাইতাছে। ছুইটা আইতে প্রায় ৪০ লাখ টাকা খরচ হইছে আমার।
এতে জড়িত না উল্লেখ করে নাজিমনগর গ্রামের অভিযুক্ত দিলুরা বেগমের ছেলে মো. হুমায়ুন বলেন, দোয়ারাবাজারের প্রতাপপুর গ্রামের দালাল সোহেলের মাধ্যমে সবাই লিবিয়া গেছে। আমার বোনজামাই, ভাগ্না, ভাতিজাও লিবিয়ায় বন্দী। গ্রামের কয়েকজন আমরারে দোষারোপ করতাছে। লিবিয়ায় অবস্থানরত সোহেল আমাদের কাছ থেকে তার পরিবারের মাধ্যমে টাকা নিছে। টাকা-পয়সা দিয়া আমরাও বিপদে আছি। ভূমধ্যসাগরে নিহত জগন্নাথপুরের ইছগাঁও গ্রামের আলী আহমদের মামা ফখর উদ্দিন বলেন, গ্রামের দালাল আজিজের সাথে ১৩ লাখ টাকার চুক্তিতে ৫ লাখ দিয়ে ২৬ ডিসেম্বর বাড়ি ছাড়ে ভাগ্না। গেইমঘরে অভুক্ত থেকে বাঁচার আকুতি জানিয়েছিল সে। একপর্যায়ে ৪২ জনকে গেইম দিলে সাগরে চারদিন থাকার পর আলীসহ ২২ জনের মৃত্যু হয়। পরে লিবিয়ায় থাকা আজিজের ফোন বন্ধ থাকায় যোগাযোগ করা যায়নি তার সাথে।  বেসরকারি এনজিও সংস্থা ব্র্যাকের মাইগ্রেশন রিসোর্চ অ্যান্ড সার্ভিস সেন্টার (এমআরএসসি) সুনামগঞ্জের কো-অর্ডিনেটর মো. নজরুল ইসলাম জানিয়েছেন, সাগরপথে মৃত্যু কিংবা মাফিয়া চক্রের নিপীড়নের সংখ্যা অগণিত। ২০২৪ সালের শুরু থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত নির্যাতিত হয়ে বাড়ি ফিরেছে সুনামগঞ্জের ২১৫ জন। আইওএম ও সরকারিভাবে প্রাপ্ত এই সংখ্যা ছাড়া নিজ খরচে বাড়ি ফেরাদের সংখ্যাও অনেক। এদের সবাই স্থানীয় ও বিভিন্ন জায়গার দালালের মাধ্যমে বিদেশ যাওয়ার চেষ্টা করেছে। কিন্তু মৃত্যু ও নির্যাতনের সুনির্দিষ্ট তথ্য কারও কাছে নেই।
দালালদের বিরুদ্ধে মামলার ব্যাপারে জগন্নাথপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. শফিকুল ইসলাম তালুকদার জানিয়েছেন, ভূমধ্যসাগরে নিহতের ঘটনায় জগন্নাথপুর থানায় মামলা হয়েছে। মামলাটি ঢাকার সিআইডি তদন্ত করছে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha

কমেন্ট বক্স