হাওরাঞ্চলে মাছের প্রজনন মৌসুমে এক মাসের জন্য মাছ আহরণে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। দেশীয় মাছের প্রজাতি রক্ষা, প্রাকৃতিক প্রজনন নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যৎ মৎস্যস¤পদ সংরক্ষণের জন্য এ ধরনের উদ্যোগ নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী ও প্রশংসনীয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো- যাদের জীবিকা মাছ আহরণের ওপর নির্ভরশীল, তাদের বিকল্প ব্যবস্থা নিশ্চিত না করে এমন নিষেধাজ্ঞা কতটা কার্যকর হবে?
হাওরাঞ্চলের অর্থনীতি মূলত কৃষি ও মৎস্যস¤পদের ওপর নির্ভরশীল। চলতি বছর অতিবৃষ্টি ও আগাম বন্যার কারণে বহু কৃষক বোরো ফসল হারিয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে অনেক পরিবারের জন্য মাছ ধরা হয়ে উঠেছে একমাত্র আয়ের উৎস। তাই যখন কোনো ধরনের খাদ্য সহায়তা, নগদ প্রণোদনা বা বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা ছাড়াই মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়, তখন তা জেলেদের জন্য বড় ধরনের মানবিক ও অর্থনৈতিক সংকট সৃষ্টি করে।
সরকার প্রতিবছর ইলিশের প্রজনন মৌসুমে উপকূলীয় জেলেদের জন্য খাদ্য সহায়তা প্রদান করে থাকে। ফলে জেলেরা কিছুটা হলেও নিষেধাজ্ঞা মেনে চলতে সক্ষম হন। অথচ হাওরাঞ্চলের জেলেদের ক্ষেত্রেও একই ধরনের বাস্তবতা বিদ্যমান।
সুনামগঞ্জে প্রায় ৯০ হাজার নিবন্ধিত জেলেসহ লক্ষাধিক মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে মাছ আহরণের সঙ্গে যুক্ত। তাদের জন্য কোনো সহায়তা না থাকলে জীবিকার তাগিদে অনেকেই বাধ্য হয়ে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করবেন। এতে একদিকে আইন প্রয়োগ কঠিন হবে, অন্যদিকে মাছ সংরক্ষণের মূল উদ্দেশ্যও ব্যাহত হবে।
প্রকৃতপক্ষে পরিবেশ সংরক্ষণ ও মানুষের জীবিকার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই টেকসই ব্যবস্থাপনার মূল চ্যালেঞ্জ। শুধু নিষেধাজ্ঞা দিয়ে নয়, বরং ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর জন্য সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করেই সফল সংরক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব। হাওরাঞ্চলের জেলেদের জন্য খাদ্যশস্য বিতরণ, নগদ সহায়তা, কর্মসৃজন কর্মসূচি কিংবা বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা গ্রহণ করা গেলে তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে মাছ ধরার বিরতি মেনে চলবেন।
মৎস্যস¤পদ রক্ষার স্বার্থে নিষেধাজ্ঞা প্রয়োজন, এতে কোনো দ্বিমত নেই। তবে সেই সঙ্গে জেলেদের বেঁচে থাকার নিশ্চয়তাও রাষ্ট্রকে দিতে হবে। কারণ ক্ষুধার্ত মানুষের কাছে আইন নয়, জীবিকার প্রশ্নই সবচেয়ে বড় বাস্তবতা। তাই হাওরের মাছ সংরক্ষণ কার্যক্রমকে কার্যকর ও মানবিক করতে অবিলম্বে জেলেদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা ও সহায়তা কর্মসূচি চালু করা জরুরি। জেলেদের বাঁচিয়ে রাখতে পারলেই টিকিয়ে রাখা যাবে হাওরের অমূল্য মৎস্যস¤পদ।