বাংলাদেশে বর্ষা ও আমাদের প্রস্তুতি

আপলোড সময় : ১৮-০৬-২০২৬ ১২:০০:১৬ পূর্বাহ্ন , আপডেট সময় : ১৮-০৬-২০২৬ ১২:০০:৫৩ পূর্বাহ্ন
মোহাম্মদ আব্দুল হক::
ঘুরে ঘুরে বারো মাসে আমাদের বাংলাদেশে ছয়টি ঋতুর পালাক্রমে গ্রীষ্ম শেষ হলে বর্ষা আসে। আমাদের একেকটি ঋতুতে প্রকৃতিতে আলাদা আলাদা রূপ ফুটে। তেমনি বর্ষাকালে ভিন্ন চেহারায় দেখি বাংলাদেশকে। এখন বাংলা আষাঢ় মাস। ছয়টি ঋতুর ধারাবাহিকতায় বর্ষার শুরু। আকাশের দিকে তাকালে দেখা যায় মেঘ বৃষ্টি এবং ভারী বর্ষণ। একদিকে নতুন সৌন্দর্য দেখা যায়, তেমনি এ ঋতুতে স্বাভাবিক জীবনের গতিতে ছেদ পড়ে। আষাঢ় ও শ্রাবণ দুই মাসে আমাদের বর্ষাকাল। এখানে ষড়ঋতুর এই বাংলাদেশে বর্ষাকাল যেমন এক অনাবিল ¯িœগ্ধতা ও সতেজতা নিয়ে আসে, তেমনি বাস্তব জীবনে এটি আমাদের সামনে বহুরকম চ্যালেঞ্জও ছুঁড়ে দেয়। একদিকে নতুন সৌন্দর্য হচ্ছে আষাঢ়-শ্রাবণের রিমঝিম বৃষ্টি, কদম-কেয়ার সুবাস আর নতুন পানিতে নদ-নদীর কানায় কানায় ভরে উঠার অপরূপ চেহারা। আবার অন্যদিকে বাংলাদেশের শহরে ও গ্রামে দেখা দেয় জলাবদ্ধতা, সৃষ্টি হয় বন্যা আর এতে রোগব্যাধির প্রকোপ বাড়ে। সেজন্যে আমাদেরকে অনেক ঝুঁকি মোকাবেলা করতে হয় বর্ষাকালে। তাই সৌন্দর্য পিপাসু মানুষ হিসেবে বর্ষার এই রূপকে উপভোগ করার পাশাপাশি এই ঋতুতে সুরক্ষিত ও সুস্থ থাকতে আমাদের জন্য বেশকিছু পূর্বপ্রস্তুতি নেওয়া অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়ে। বাংলাদেশে বর্ষাকালে একটু বেশি সতর্কতা অবলম্ব করতে হয়। কারণ, ষড়ঋতুর এই বাংলাদেশে বর্ষাকাল যেমন রূপের ডালি নিয়ে হাজির হয়, তেমনি সাধারণ মানুষের জীবনে বর্ষার বর্ষণ একটি বড়ো আতঙ্ক হয়ে আবির্ভূত হয়। বিশেষ করে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এবং মানুষের দ্বারা অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে বর্ষা ঋতুটি বহু মানুষের কাছে আশীর্বাদের চেয়ে ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই সতর্কতামূলক পূর্ব প্রস্তুতি নিতে হলে আতঙ্কের কারণগুলো আগে চিহ্নিত করা দরকার। বাংলাদেশে বর্ষাকাল ভয়ের কারণ হয়ে উঠার পিছনে প্রধান কয়েকট নিচে ধারাবাহিকভাবে আলোচনা করা হলো: প্রথম ভয় হলো ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার মতো মারাত্মক মহামারি। বর্তমানে বাংলাদেশের শহর ও গ্রামের মানুষের কাছে বর্ষার সবচেয়ে বড় আতঙ্কের নাম ডেঙ্গু। এ রোগটি এডিস মশা দ্বারা ছড়ায়। এডিস মশার বিস্তার হয় বর্ষাকালে। বর্ষার থেমে থেমে হওয়া বৃষ্টিতে ঘরের আনাচে-কানাচে, ছাদে, রাস্তার পাশে গাড়ির নষ্ট টায়ার, দইয়ের পাতিল কিংবা ডাবের খোসায় পরিষ্কার পানি জমে থাকে। এমন অবস্থা এডিস মশার বংশবৃদ্ধির মোক্ষম পরিবেশ। এতে দ্রুত মশার প্রকোপ বাড়ে, রোগ ছড়ায় এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর প্রচন্ড চাপ বাড়ে। প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা এতো জ্যামিতিক হারে বাড়ে যে, দেশের হাসপাতালগুলোতে শয্যা ও চিকিৎসার সংকট দেখা দেয়। শুধু তা-ই নয়, শত শত মানুষের প্রাণহানি ঘটে। এ কারণে মানুষের কাছে বর্ষা এক আতঙ্কের ঋতুতে পরিণত হয়েছে। দ্বিতীয় ভয় হিসেবে দেখা দেয় বন্যা এবং নদীভাঙন। বাংলাদেশ একটি নদীমাতৃক দেশ ও ভাটির দেশ হওয়ায় বর্ষার বিপুল পানিস¤পদ আশীর্বাদ না-হয়ে অনেক সময় বিপর্যয়ের কারণ হয়ে উঠে। বর্ষার অতি বর্ষণে আকস্মিক বন্যা দেখা দেয় এবং সেটি অনেক সময় স্থায়ী বন্যার রূপ নেয়। বাংলাদেশে বর্ষায় উজানের ঢল বিশেষ করে ভারতের অতিবৃষ্টির প্রভাবে প্রবাহিত জলের ¯্রােতধারা এবং দেশের ভিতরের অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে দেশের উত্তর, উত্তর-পূর্ব অঞ্চল, যেমন, সিলেট ও সুনামগঞ্জ এবং মধ্যাঞ্চলে ভয়াবহ বন্যা দেখা দেয়। এতে মানুষের ঘরবাড়ি, ফসল, ভিটের বাগানের শাকসবজি ও গবাদিপশু ভেসে যায়। দারিদ্র্য গ্রাসে পতিত হয় সাধারণ মানুষ। বর্ষার তীব্র ¯্রােতে নদীর পাড় ভেঙে যায় এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের লাখ লাখ মানুষ ভিটেমাটি হারিয়ে রাতারাতি নিঃস্ব বা উদ্বাস্তু হয়ে পড়ে। এই নদী ভাঙন বাংলাদেশের এক বড়ো সমস্যা হয়ে উঠেছে শহরে ও গ্রামে। তৃতীয় ভয় হিসেবে আবির্ভূত হয় শহরের স্থায়ী অভিশাপ যা জলাবদ্ধতা। আমাদের বড়ো শহরগুলো, বিশেষ করে ঢাকা, চট্টগ্রাম এবং সিলেটের অনেক এলাকা সামান্য বৃষ্টিতেই পানির নিচে তলিয়ে যায়। তখন জলবদ্ধতা দেখা দেয় ও যাতায়াতে মানুষের দুর্ভোগ বাড়ে। সাধারণ পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং খাল-বিল ভরাট করার কারণে বর্ষার অতিবৃষ্টির পানি নামতে পারে না। এর ফলে ড্রেন উপচে রাস্তাঘাট ড্রেনের নোংরা পানিতে সয়লাব হয়ে যায়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা জ্যামে আটকে থাকতে হয় শিক্ষার্থী এবং কর্মজীবী মানুষকে। এ পরিস্থিতিতে শিক্ষা-কার্যক্রম ব্যাহত হয় এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও নিচু ঘরবাড়িতে পানি ঢুকে কোটি কোটি টাকার মালামাল নষ্ট হয়। এভাবে অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়তে হয় মানুষকে। চতুর্থ ভয় হলো পাহাড় ধস। সিলেটে টিলা কাটা এবং বিশেষ করে পার্বত্য অঞ্চলে পাহাড় কেটে অপরিকল্পিত বসতি স্থাপনের কারণে বর্ষাকালে বাংলাদেশের পাহাড় ধস একটি নিয়মিত দুর্যোগ হয়ে দাঁড়িয়েছে। চট্টগ্রাম, রাঙামাটি, বান্দরবান ও কক্সবাজার এলাকায় বর্ষার ভারী বৃষ্টিতে পাহাড়ের মাটি নরম হয়ে ধসে পড়ে। প্রতিবছরই এতে ঘুমন্ত মানুষ মাটিচাপা পড়ে প্রাণ হারায়, যা অত্যন্ত বেদনাদায়ক। এখানে বর্ষা তখন আর আশীর্বাদ নয়, হয়ে যায় ভয়াবহ ভয়ের নাম। পঞ্চম যে ভয়টি সেটি বজ্রপাত। এ এক ভয়াবহ আতঙ্ক। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশে বিগত কয়েক বছরে বর্ষাকালে বজ্রপাতের সংখ্যা যেনো বেড়েছে এবং এর ফলে মৃত্যুর হারও আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। দেখা যায়, বিশেষ করে গ্রামীণ অঞ্চলে ফসলের মাঠে কাজ করা কৃষক এবং জলাশয়ে থাকা মাছ শিকারি জেলেরা হুট করে আসা বজ্রপাতের শিকার হচ্ছেন। বজ্রপাতের আতঙ্ক শহরেও প্রভাব পড়ে। ষষ্ঠ ভয় হলো পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব বেড়ে যাওয়া। বন্যা বা জলাবদ্ধতার কারণে অনেক এলাকায় বিশুদ্ধ পানির উৎসগুলো যেমন, নলকূপ নোংরা পানিতে তলিয়ে যায়। ফলে ডায়রিয়া, কলেরা, টাইফয়েড, জন্ডিস এবং চর্মরোগের মতো পানিবাহিত রোগ মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ে। উপর্যুক্ত বিষয় বিবেচনায় নিয়ে প্রস্তুতি নিতে হবে। বর্ষা ঋতুর আনন্দকে বিষাদমুক্ত রাখতে ডেঙ্গু প্রতিরোধে আমাদেরকে ব্যক্তিগত উদ্যোগে ঘরের ভিতরে ও বাহিরে কিছু সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। মনে রাখতে হবে এডিস মশা সাধারণত ঘরের ভিতরে বা আশেপাশে জমে থাকা পরিষ্কার ও স্থির পানিতে ডিম পাড়ে। তাই বর্ষার সময় প্রতি সপ্তাহে অন্তত একবার নিজের বাড়ি ও চারপাশ পরিদর্শন করা উচিত। তিন দিনের বেশি যেনো ফুলের টব, প্লাস্টিকের বোতল, ডাবের খোসা, টায়ার কিংবা ভাঙা মগে পানি জমে না-থাকে সেদিকটি বিশেষ নজরে রাখতে হবে। অর্থাৎ যেকোনো পাত্রে জমে থাকা পানি ৩ দিনের মধ্যে ফেলে দিতে হবে। ঘরের ভিতরের এসি এবং ফ্রিজের নিচে যে ট্রে থাকে, সেখানে নিয়মিত পানি জমে। এই পানি সপ্তাহে অন্তত একবার পরিষ্কার করা বাধ্যতামূলক। অব্যবহৃত কমোড বা ফ্ল্যাশ ট্যাংকে পানি জমিয়ে রাখা যাবে না। বাড়ির ছাদে যদি বাগান থাকে, তবে ছাদের ড্রেনেজ ব্যবস্থা পরিষ্কার রাখতে হবে যাতে বৃষ্টির পানি আটকে না-থাকে। তাহলে এডিস মশার বংশবৃদ্ধি হবে না। সরকারি উদ্যোগে অবশ্যই মশা নিধনে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে নিয়মিত। এডিস মশার বংশবৃদ্ধি রোধ করার পাশাপাশি ব্যক্তিগত সুরক্ষার চিন্তাও করতে হবে। নিজেদেরকে মশার কামড় থেকে বাঁচিয়ে রাখাও ডেঙ্গু প্রতিরোধের অন্যতম উপায়, মনে রাখতে হবে। তাই বর্ষার এই সময়ে বাহিরে বের হলে শরীর ভালোভাবে ঢেকে থাকে এমন পোশাক, যেমন: ফুল হাতা শার্ট ও ফুল প্যান্ট পরা ভালো। আরেকটি বিষয় মনে রাখা খুব জরুরি। ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশা সাধারণত সকাল ও সন্ধ্যার ঠিক আগে বেশি কামড়ায়। তবে সুরক্ষার জন্য দিনে বা রাতে ঘুমানোর সময় সবসময় মশারি ব্যবহার করা উচিত। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে আরো বেশি সতর্ক থাকা দরকার। বাহিরে বের হওয়ার সময় বা ঘরে মশার উপদ্রব কমাতে মশা তাড়ানোর ক্রিম বা লোশন ব্যবহার করা যেতে পারে। জানালা একেবারে বন্ধ করে রাখা সম্ভব নয়, তাই জানালায় নেট ব্যবহার করাও একটি ভালো সমাধান হতে পারে। পান করতে হবে নিরাপদ পানি ও খেতে হবে নিরাপদ খাবার। এ সময় সুয়ারেজের লাইনের নোংরা পানি অনেক সময় বিশুদ্ধ পানির লাইনে মিশে যেতে পারে। তাই পানি ভালো করে ফুটিয়ে পরে ঠা-া করে ফিল্টার করে পান করা উচিত। ডায়রিয়া বা জন্ডিস এড়াতে বাহিরের খোলা খাবার পরিহার করা বুদ্ধিমানের কাজ হবে। বাহিরে বের হওয়ার আগে রেইনকোট ও ছাতা সঙ্গে নিতে হবে। শহরের ফুটপাত, রাস্তা ও ম্যানহোল অনেক সময় ভাঙা থাকে। তাই খুব সতর্কতার সাথে পা ফেলতে হবে। রাতে আমাদের দেশের বিদ্যুতের নিশ্চয়তা থাকে না। তাই একটি ছোট্ট টর্চ লাইট সঙ্গে রাখা দরকার। ঘরের পুরোনো ছাদ ও দেয়াল মেরামত করা জরুরি। সবজি বাগানের অতিরিক্ত পানি নিষ্কাশনের জন্য নালা করে দিতে হবে। গোখাদ্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। বাংলাদেশে বর্ষাকালে একটি জরুরি উদ্যোগ নিতে হয়। বর্ষাকাল হলো বৃক্ষরোপণের সবচেয়ে উপযুক্ত সময়। তাই প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা ও পরিবেশের সুরক্ষায় আমাদের এই সময়ে বেশি বেশি ফলজ ও বনজ গাছ লাগানো উচিত। মনে রাখতে হবে বন ও গাছ হচ্ছে আমাদের প্রকৃতির প্রাণ। আর সবচেয়ে বেশি যেটি করতে হবে, সেটি হচ্ছে সরকারি ও বেসরকারি উন্নয়ন বিশেষ করে পরিকল্পিত খাল খনন, রাস্তা নির্মাণ এবং ড্রেনেজ ব্যবস্থায় মনোনিবেশ করতে হবে। এতোক্ষণ বর্ষার আতঙ্ক নিয়ে আলোচনা করলেও মনে রাখতে হবে, বর্ষার নিজস্ব কোনো দোষ নাই। আমাদের সচেতনতার অভাবেই বর্ষা আমাদের কাছে ভয়ের কারণ হয়েছে। তাই আমাদের ভৌগোলিক অবস্থান বিবেচনায় রেখে পরিকল্পিত নগরায়নে মনোযোগ দিতে হবে। তাহলে বর্ষা আর মানুষের অভিশাপ হিসেবে দেখা দিবে না। বর্ষা আমাদের সুজলা-সুফলা বাংলাদেশের প্রাণ। সঠিক পরিকল্পনা আর সামান্য একটু সচেতনতাই পারে বর্ষার নিদারুণ দুর্ভোগকে দূর করতে। সেই সাথে মানুষের জন্য বর্ষার শীতল ও শান্ত রূপ হয়ে উঠবে দারুণ উপভোগ্য।

[লেখক : মোহাম্মদ আব্দুল হক, কলামিস্ট ও কথাসাহিত্যিক]

সম্পাদকীয় :

  • সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি : মো. জিয়াউল হক
  • সম্পাদক ও প্রকাশক : বিজন সেন রায়
  • বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : মোক্তারপাড়া রোড, সুনামগঞ্জ-৩০০০।

অফিস :

  • ই-মেইল : [email protected]
  • ওয়েবসাইট : www.sunamkantha.com