সাইফুল আলম ছদরুল::
সুনামগঞ্জ তথা হাওর অঞ্চলের অবহেলিত লাখো মানুষের মানসম্মত চিকিৎসেবা এবং স্থানীয় পর্যায়ে চিকিৎসাবিদ্যা প্রসারের লক্ষ্যে ২০১৮ সালের ৮ নভেম্বর একনেকে অনুমোদিত হয়েছিল একটি আইকনিক প্রজেক্ট ‘সুনামগঞ্জ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল’। প্রায় হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয়ে ৩৫ একর জমিতে নির্মিত ২০টি সুদৃশ্য ভবন এখন দৃশ্যমান। ২০২১ সাল থেকে অস্থায়ী ক্যাম্পাসে পাঠদান শুরুর পর ২০২৪ সালে শিক্ষার্থীরা নতুন ও আধুনিক অবকাঠামোয় পা রাখলেও, সেই ঝকঝকে দেয়ালগুলোর আড়ালে লুকিয়ে আছে তীব্র ক্ষোভ, হতাশা ও বঞ্চনা। অবকাঠামো থাকলেও নেই পর্যাপ্ত শিক্ষক, নেই ক্লিনিক্যাল ক্লাসের জন্য হাসপাতাল। এই প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার বিরুদ্ধে দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া শিক্ষার্থীরা গত ২১ জুন ২০২৬ থেকে বেছে নিয়েছেন আন্দোলনের পথ। ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন করে রাজপথে নেমে আসা এই শিক্ষার্থীদের লড়াই এখন কেবল নিজেদের ক্যারিয়ার বাঁচানোর নয়, বরং পুরো সুনামগঞ্জবাসীর চিকিৎসাসেবা নিশ্চিতের এক ঐতিহাসিক গণদাবিতে পরিণত হয়েছে।
গত বছরও শিক্ষার্থীরা একই দাবিতে ক্লাস বর্জন ও আন্দোলন করেছিলেন। সে সময় অতি দ্রুত হাসপাতাল চালু ও শিক্ষক সংকট সমাধানের আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তবে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ দৃশ্যমান হয়নি। আধুনিক অবকাঠামো থাকা সত্ত্বেও পাঁচটি ব্যাচের ৩৫০ জন শিক্ষার্থী এক চরম অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। চিকিৎসাবিদ্যার মূল ভিত্তিই হলো ‘ক্লিনিক্যাল ক্লাস’, যা সরাসরি সচল হাসপাতালে রোগীদের সংস্পর্শে এসে শিখতে হয়। কিন্তু ৫০০ শয্যার হাসপাতালটি চালু না হওয়ায় শিক্ষার্থীরা তাত্ত্বিক শিক্ষার বাইরে ব্যবহারিক জ্ঞান থেকে স¤পূর্ণ বঞ্চিত হচ্ছেন।
শিক্ষক সংকট এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, পাঁচটি ব্যাচের পাঠদান কার্যক্রম প্রায় স্থবির। বারবার আশ্বাসের ফাঁদে পড়ে অবশেষে ২১ জুন থেকে শিক্ষার্থীরা বাধ্য হয়ে লাগাতার আন্দোলনে নামেন।
আন্দোলনের মুখে গত ১ জুলাই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সচিবের সভাপতিত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে শিক্ষক সংকট নিরসন, পরিচালক নিয়োগ এবং আগামী অক্টোবর ও ডিসেম্বরের মধ্যে যথাক্রমে মেডিসিন ও পূর্ণাঙ্গ অভ্যন্তরীণ বিভাগ চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তবে এই বৈঠককে প্রহসন আখ্যা দিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে তা প্রত্যাখ্যান করেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা।
শিক্ষার্থীদের মতে, সাধারণ শিক্ষার্থীদের কোনো প্রতিনিধি ছাড়াই এই বৈঠক হয়েছে এবং পূর্বের মতোই আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতার ছক আঁকা হয়েছে। এর প্রতিবাদে বুধবার রাতেই তারা ৬ দফা দাবি পেশ করেন:
১. আগামী ২ কর্মদিবসের মধ্যে হাসপাতালের পরিচালক (ডিরেক্টর) নিয়োগ করতে হবে। ২. আগামী ১ সপ্তাহের মধ্যে হাসপাতালের পূর্ণাঙ্গ জনবল নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। ৩. আগামী ৩ সপ্তাহের মধ্যে হাসপাতালের বহির্বিভাগ (আউটডোর) চালু করতে হবে। ৪. আগামী ৬ সপ্তাহের মধ্যে ৫০০ শয্যার পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল চালু করতে হবে। ৫. আগামী ৩ কর্মদিবসের মধ্যে সকল বিভাগের শিক্ষক সংকট দূর করে পদায়ন নিশ্চিত করতে হবে। ৬. এই রোডম্যাপের ব্যাপারে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর স্বশরীরে উপস্থিতি এবং তাঁর কাছ থেকে লিখিত নির্দেশনা আসতে হবে।
২১ জুন শুরু হওয়া এই আন্দোলন কেবল মেডিকেল কলেজের চার দেয়ালে সীমাবদ্ধ থাকেনি। এটি সুনামগঞ্জের সাধারণ মানুষের প্রাণের দাবিতে পরিণত হয়েছে। শিক্ষার্থীদের এই যৌক্তিক আন্দোলনের পক্ষে দাঁড়িয়েছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন।
বিভিন্ন প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠন, নাগরিক সমাজ এবং সুনামগঞ্জের সচেতন মহল থেকে আসা বিবৃতিতে ¯পষ্ট বলা হয়েছে- হাজার কোটি টাকার প্রকল্প কেবল ভবন দাঁড়িয়ে থাকার জন্য নয়।
হাওরাঞ্চলের সাধারণ মানুষ যেখানে সামান্য চিকিৎসার জন্য সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজে
যাওয়ার পথে প্রাণ হারায়, সেখানে এই হাসপাতালটি ফেলে রাখা এক ধরণের অপরাধ।
রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে সরকারকে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে যে, অনতিবিলম্বে শিক্ষার্থীদের দাবি মেনে হাসপাতাল ও শিক্ষা কার্যক্রম সচল না করা হলে সাধারণ জনগণকে সাথে নিয়ে তীব্র গণআন্দোলন গড়ে তোলা হবে।
সুনামগঞ্জ-সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়কের পাশে নির্মিত এই দৃষ্টিনন্দন মেডিকেল ক্যা¤পাসে ৫০০ শয্যার হাসপাতাল ভবন, অডিটোরিয়াম, ছাত্রাবাস, ডক্টরস ডরমিটরিসহ প্রায় ২০টি বহুতল ভবন নির্মাণের কাজ শেষ পর্যায়ে। যেখানে ১ হাজার কোটি টাকারও বেশি অর্থ ইতোমধ্যে ব্যয় হয়ে গেছে, সেখানে সামান্য প্রশাসনিক ও কারিগরি জটিলতার দোহাই দিয়ে বছরের পর বছর হাসপাতালটি চালু না রাখা রাষ্ট্রের স¤পদের এক চরম অপচয়। অবকাঠামো আছে কিন্তু ডাক্তার-
শিক্ষক নেই— এই কাঠামোগত বৈপরীত্য আমাদের স্বাস্থ্য খাতের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের এক বড় গলদকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।
মেডিকেল শিক্ষার প্রতিটি দিন অত্যন্ত মূল্যবান। আন্দোলনের কারণে ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ থাকায় ৩৫০ জন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ এক গভীর সেশনজটের হুমকিতে পড়েছে। ক্লিনিক্যাল ক্লাস না করতে পারার কারণে তাদের মনে এক ধরণের হীনমন্যতা ও ভীতি তৈরি হচ্ছে যে, তারা আদৌ দক্ষ চিকিৎসক হিসেবে নিজেদের গড়তে পারবেন কি না। শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, তারা সানন্দে টেবিলে পড়াশোনায় ফিরে যেতে চান, কিন্তু কর্তৃপক্ষ তাদের দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে রাজপথে থাকতে বাধ্য করছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর লিখিত প্রতিশ্রুতি ছাড়া তারা আর কোনো মৌখিক আশ্বাসে বিশ্বাস রাখতে রাজি নন।
সংকটের সমাধান কোন পথে? :
সুনামগঞ্জ মেডিকেল কলেজের এই অচলাবস্থা নিরসনে আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা পরিহার করে জরুরি ভিত্তিতে ‘ক্র্যাশ প্রোগ্রাম’ বা বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। রুটিন বদলির অপেক্ষা না করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে বিশেষ আদেশে জরুরি ভিত্তিতে এখানে অভিজ্ঞ শিক্ষক ও চিকিৎসক পদায়ন করতে হবে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বা মন্ত্রণালয়ের নীতিনির্ধারকদের সরাসরি আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের মুখোমুখি হয়ে একটি বাস্তবসম্মত ও দ্রুত কার্যকরযোগ্য রোডম্যাপ দিতে হবে। এছাড়া স্থানীয় প্রশাসন, কলেজের অধ্যক্ষ এবং প্রকল্প পরিচালকের মধ্যে সমন্বয়হীনতা দূর করে দ্রুত আউটডোর ও ইনডোর সেবা চালুর কারিগরি বাধাগুলো দূর করতে হবে।
সুনামগঞ্জ মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীদের ২১ জুনের আন্দোলন কেবল কিছু তরুণের ক্লাস বর্জনের ঘটনা নয়; এটি মূলত হাওর অঞ্চলের মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষার অধিকার নিশ্চিতের লড়াই।
যে শিক্ষার্থীরা আগামীকাল মানুষের জীবন বাঁচানোর শপথ নেবেন, আজ তাদের নিজেদের ক্যারিয়ার বাঁচাতে এবং জনগণের চিকিৎসার অধিকার আদায়ে রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে শ্লোগান দিতে হচ্ছে- এটি অত্যন্ত দুঃখজনক। সরকারের উচিত এই আন্দোলনকে কোনো প্রশাসনিক অহমিকার জায়গা থেকে না দেখে, সুনামগঞ্জের মানুষের মৌলিক অধিকারের স্বার্থে শিক্ষার্থীদের ৬ দফা দাবি দ্রুত বাস্তবায়ন করা। এই অচলাবস্থার দ্রুত অবসান ঘটুক, হাজার কোটি টাকার এই ক্যা¤পাস ডাক্তার ও রোগীর প্রাণচঞ্চলতায় মুখরিত হয়ে উঠুক - এটাই আজ সুনামগঞ্জবাসীর একমাত্র প্রত্যাশা।