জনসংখ্যাকে জনশক্তিতে রূপান্তরই হোক উন্নয়নের মূল কৌশল

আপলোড সময় : ১৪-০৭-২০২৬ ০১:২৪:৩৮ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ১৪-০৭-২০২৬ ০১:২৪:৩৮ অপরাহ্ন
প্রতি বছর বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরে - বর্ধমান জনসংখ্যা কি দেশের জন্য বোঝা, নাকি সম্ভাবনা? এর উত্তর নির্ভর করে রাষ্ট্রের পরিকল্পনা, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থান এবং মানবস¤পদ উন্নয়নের ওপর। সুনামগঞ্জে বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমান যথার্থই বলেছেন, পরিকল্পিত পরিবার, মানসম্মত শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং উন্নত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা গেলে জনসংখ্যাকেই দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করা সম্ভব। এ বক্তব্য শুধু একটি অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য নয়, বরং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের অন্যতম বাস্তব রূপরেখা। বাংলাদেশ বর্তমানে জনমিতিক সুবিধা অর্জনের গুরুত্বপূর্ণ সময় অতিক্রম করছে। দেশের মোট জনসংখ্যার বড় একটি অংশ কর্মক্ষম বয়সের। এই জনগোষ্ঠীকে যদি দক্ষতা, প্রযুক্তিগত শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং আধুনিক কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত করা যায়, তবে এটি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে আরও গতিশীল করবে। অন্যদিকে এই বিপুল জনগোষ্ঠী যদি বেকার, অদক্ষ ও অনুৎপাদনশীল থেকে যায়, তাহলে সেটিই পরিণত হবে সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপের কারণ। পরিকল্পিত পরিবার গঠন এখনো সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যু হ্রাস, নারীর স্বাস্থ্য সুরক্ষা, শিশুদের পুষ্টি ও শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রমের বিকল্প নেই। পরিবার পরিকল্পনা কেবল জন্মনিয়ন্ত্রণের বিষয় নয়; এটি একটি সুস্থ, শিক্ষিত ও সক্ষম প্রজন্ম গড়ে তোলার ভিত্তি। বিশেষ করে কিশোর-কিশোরীদের প্রজনন স্বাস্থ্য শিক্ষা, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ এবং নারীর ক্ষমতায়নকে এই কার্যক্রমের সঙ্গে আরও কার্যকরভাবে স¤পৃক্ত করতে হবে। বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষিত বেকারের সংখ্যা যেমন বাড়ছে, তেমনি শিল্প, কৃষি, নির্মাণ, স্বাস্থ্যসেবা ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে দক্ষ জনবলেরও ঘাটতি রয়েছে। এই বৈপরীত্য দূর করতে শিক্ষা ব্যবস্থাকে শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে সমন্বয় করা জরুরি। কারিগরি ও প্রযুক্তিগত শিক্ষার বিস্তার, উদ্যোক্তা তৈরির উদ্যোগ এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে বিদেশগামী কর্মীদের আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা গেলে বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও রেমিট্যান্স উভয়ই বৃদ্ধি পাবে। সুনামগঞ্জের মতো হাওরাঞ্চলেও মানবসম্পদ উন্নয়নে বিশেষ উদ্যোগ প্রয়োজন। এখানকার তরুণদের জন্য তথ্যপ্রযুক্তি প্রশিক্ষণ, কৃষিভিত্তিক আধুনিক উদ্যোক্তা সৃষ্টি, মৎস্যস¤পদ ব্যবস্থাপনা, পর্যটন ও ক্ষুদ্র শিল্পে দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা সম্ভব। এতে স্থানীয় অর্থনীতি যেমন শক্তিশালী হবে, তেমনি অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানের সুযোগও বাড়বে। এ ক্ষেত্রে পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের মাঠপর্যায়ের কর্মীদের অবদানও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁদের নিরলস প্রচেষ্টায় মা ও শিশুস্বাস্থ্য, টিকাদান, পরিবার পরিকল্পনা এবং স্বাস্থ্যসচেতনতা কার্যক্রম দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও পৌঁছে যাচ্ছে। বিশ্ব জনসংখ্যা দিবসে তাঁদের সম্মাননা প্রদান নিঃসন্দেহে উৎসাহব্যঞ্জক উদ্যোগ। তবে শুধু পুরস্কার নয়, তাঁদের জন্য প্রয়োজন পর্যাপ্ত জনবল, আধুনিক প্রশিক্ষণ, প্রয়োজনীয় উপকরণ এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা। সরকার ইতোমধ্যে স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার যে লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, তা বাস্তবায়নের অন্যতম শর্ত হলো দক্ষ মানবস¤পদ সৃষ্টি। তাই জনসংখ্যাকে কেবল সংখ্যার হিসেবে না দেখে উন্নয়নের শক্তিতে পরিণত করার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রযুক্তি, কর্মসংস্থান ও সামাজিক সচেতনতার সমন্বিত উদ্যোগই পারে এই লক্ষ্য অর্জন করতে। জনসংখ্যা কখনোই নিজে সমস্যা নয়; সমস্যা হয় তখনই, যখন সেই জনসংখ্যা দক্ষতা, কর্মসংস্থান ও উন্নয়নের সুযোগ থেকে বঞ্চিত থাকে। তাই সময়ের দাবি- জনসংখ্যাকে বোঝা নয়, স¤পদ হিসেবে বিবেচনা করে পরিকল্পিত বিনিয়োগের মাধ্যমে জনশক্তিতে রূপান্তর করা। তাহলেই টেকসই উন্নয়ন, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং একটি উন্নত বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নেবে।

সম্পাদকীয় :

  • সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি : মো. জিয়াউল হক
  • সম্পাদক ও প্রকাশক : বিজন সেন রায়
  • বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : মোক্তারপাড়া রোড, সুনামগঞ্জ-৩০০০।

অফিস :

  • ই-মেইল : [email protected]
  • ওয়েবসাইট : www.sunamkantha.com