বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ দীর্ঘসূত্রতা ও মামলাজট। একটি মামলার নিষ্পত্তিতে বছরের পর বছর সময় লেগে যাওয়ায় অনেক সাধারণ মানুষ ন্যায়বিচার থেকে কার্যত বঞ্চিত হন। এমন বাস্তবতায় বাধ্যতামূলক প্রি-কেস মেডিয়েশন বা মামলা দায়েরের আগেই বিরোধ নি®পত্তির উদ্যোগ একটি সময়োপযোগী ও ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সুনামগঞ্জ জেলা লিগ্যাল এইড অফিসের সাম্প্রতিক কার্যক্রমের পরিসংখ্যান সেই সম্ভাবনারই বাস্তব প্রতিফলন তুলে ধরেছে।
২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে সুনামগঞ্জে ১ হাজার ৮৩২টি বিরোধ নিষ্পত্তি, আপোষের মাধ্যমে ২৬ লাখ ৫৯ হাজার ৮০০ টাকা আদায় এবং সরকারি আইনগত সহায়তা গ্রহণকারীর উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি প্রমাণ করে যে, মানুষ এখন আদালতের দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল প্রক্রিয়ার পরিবর্তে দ্রুত, সহজ ও সম্মানজনক সমাধানের পথকে গ্রহণ করছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এসব সমাধানের মাধ্যমে কেবল মামলা কমছে না, পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্কও অটুট থাকছে।
মেডিয়েশন এমন একটি পদ্ধতি, যেখানে কোনো পক্ষকে বিজয়ী বা পরাজিত হিসেবে চিহ্নিত করা হয় না; বরং আলোচনার মাধ্যমে উভয়পক্ষের গ্রহণযোগ্য সমাধান বের করে আনা হয়। ফলে পারস্পরিক বিরোধের অবসানের পাশাপাশি সামাজিক সম্প্রীতিও বজায় থাকে। বিশেষ করে পারিবারিক, দেনা-পাওনা, জমিজমা ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়িক বিরোধের ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি অত্যন্ত কার্যকর।
জেলা লিগ্যাল এইড অফিসারের বক্তব্য অনুযায়ী, লিগ্যাল এইড অফিসের মাধ্যমে সম্পাদিত আপোষনামা আদালতের ডিক্রির সমমর্যাদা লাভ করে। অর্থাৎ এটি শুধু একটি সমঝোতা নয়, বরং আইনগতভাবে কার্যকর ও বলবৎযোগ্য একটি দলিল। পাশাপাশি অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ প্রদানের ক্ষমতা যুক্ত হওয়ায় বিরোধ চলাকালে কোনো পক্ষ যাতে অন্যায় সুবিধা নিতে না পারে, সে ব্যবস্থাও নিশ্চিত হয়েছে। এসব উদ্যোগ বিচারপ্রার্থীদের আস্থা আরও বাড়াবে।
তবে এই সাফল্য ধরে রাখতে হলে সচেতনতা আরও বাড়াতে হবে। এখনও অনেক মানুষ সরকারি আইনগত সহায়তা এবং প্রি-কেস মেডিয়েশনের সুযোগ স¤পর্কে অবগত নন। ইউনিয়ন, উপজেলা ও গ্রাম পর্যায়ে ব্যাপক প্রচার, গণমাধ্যমের সক্রিয় অংশগ্রহণ, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, আইনজীবী, শিক্ষক, ধর্মীয় নেতা ও সামাজিক সংগঠনগুলোর স¤পৃক্ততা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
ন্যায়বিচার শুধু আদালতের রায়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; দ্রুত, সহজলভ্য ও গ্রহণযোগ্য সমাধানও ন্যায়বিচারেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সুনামগঞ্জের অভিজ্ঞতা প্রমাণ করেছে, যথাযথ বাস্তবায়ন হলে বাধ্যতামূলক মেডিয়েশন বিচারব্যবস্থায় একটি কার্যকর সংস্কার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। এই উদ্যোগকে আরও শক্তিশালী ও দেশব্যাপী সফল করতে সরকার, বিচার বিভাগ, আইনজীবী সমাজ, গণমাধ্যম এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই হতে পারে একটি অধিক ন্যায়ভিত্তিক ও বিরোধমুক্ত সমাজ গঠনের ভিত্তি।