বাংলাদেশে পানিতে ডুবে মৃত্যু একটি নীরব দুর্যোগ। প্রতিবছর শত শত নয়, হাজারো শিশু এই প্রতিরোধযোগ্য দুর্ঘটনায় প্রাণ হারাচ্ছে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই পানিতে ডুবে ৫৮২ জনের মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে ৫২৬ জনই শিশু। এই পরিসংখ্যান শুধু উদ্বেগজনক নয়, বরং রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবারের জন্য এক গভীর সতর্কবার্তা।
সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয় হলো- এসব মৃত্যুর অধিকাংশই প্রতিরোধ করা সম্ভব। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ছয় বছর বয়সে সাঁতার শেখানো হলে একটি শিশু পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঝুঁকি থেকে প্রায় ৯০ শতাংশেরও বেশি সুরক্ষিত থাকতে পারে। অথচ আমাদের দেশে সাঁতার শেখাকে এখনো জীবনরক্ষাকারী দক্ষতা হিসেবে নয়, বরং একটি বিনোদনমূলক বা খেলাধুলার বিষয় হিসেবে দেখা হয়। এই মানসিকতার পরিবর্তন জরুরি।
বাংলাদেশের গ্রামীণ বাস্তবতায় বাড়ির পাশের পুকুর, ডোবা, খাল কিংবা নদী শিশুদের জন্য প্রতিনিয়ত মৃত্যুফাঁদ হয়ে দাঁড়ায়। অধিকাংশ দুর্ঘটনা ঘটে সকালবেলায়, যখন পরিবারের সদস্যরা গৃহস্থালির কাজে ব্যস্ত থাকেন। বিশেষ করে মায়েদের ওপর শিশুর নিরাপত্তার পুরো দায়িত্ব চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতা সমস্যাটিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এটি কেবল পরিবারের দায়িত্ব নয়; রাষ্ট্র ও সমাজেরও সমান দায়িত্ব রয়েছে নিরাপদ শিশুযতেœর ব্যবস্থা গড়ে তোলার।
দুঃখজনক হলেও সত্য, দেশে এখনো পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধে কোনো সমন্বিত জাতীয় কর্মপরিকল্পনা, নির্দিষ্ট বাজেট বা তথ্যভিত্তিক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। যক্ষ্মা, ডেঙ্গু কিংবা মাতৃমৃত্যু প্রতিরোধে যেমন জাতীয় কর্মসূচি রয়েছে, তেমনি পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধেও সময়োপযোগী ও বাস্তবভিত্তিক উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। সাঁতার প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন, বিদ্যালয়ে জীবনরক্ষাকারী সাঁতার শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা, কমিউনিটি পর্যায়ে শিশু তদারকির ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং অভিভাবকদের সচেতন করতে ব্যাপক প্রচারণা চালানো এখন সময়ের দাবি।
একই সঙ্গে উদ্ধার-পরবর্তী প্রাথমিক চিকিৎসা, বিশেষ করে সিপিআর (কার্ডিওপালমোনারি রিসাসিটেশন) সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে প্রশিক্ষিত করা প্রয়োজন। এখনো অনেকেই প্রচলিত ভুল পদ্ধতি অনুসরণ করেন, যা আহত শিশুর জীবনকে আরও ঝুঁকির মুখে ফেলে।
সরকারের উদ্যোগ অবশ্যই প্রয়োজন, তবে শুধু সরকারের দিকে তাকিয়ে থাকলে চলবে না। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সরকার, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং গণমাধ্যম - সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। সন্তানকে যেমন হাঁটতে শেখানো হয়, তেমনি উপযুক্ত বয়সে সাঁতার শেখানোও প্রতিটি পরিবারের দায়িত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।
একটি শিশু হারানো মানে একটি সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ হারিয়ে যাওয়া। তাই পানিতে ডুবে মৃত্যু আর নিছক দুর্ঘটনা হিসেবে নয়, একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করে জাতীয় অগ্রাধিকার দিতে হবে। সচেতনতা, পরিকল্পনা এবং সমন্বিত উদ্যোগই পারে এই নীরব মৃত্যুমিছিল থামাতে। প্রতিটি শিশুর নিরাপদ শৈশব নিশ্চিত করাই হোক আমাদের অঙ্গীকার।