আকরাম উদ্দিন::
সেদিন প্রচন্ড গরম। সুনামগঞ্জ শহরের ট্রাফিক পয়েন্টে একটি ভবনের ছায়ায় দাঁড়িয়ে একটু স্বস্তি নেওয়ার চেষ্টা করছিলাম। হঠাৎই মনে পড়ে গেল একজন গুণী মানুষের কথা- ধূর্জটি কুমার বসু, শহরের ভেতরে-বাইরে ‘রাখাল স্যার’ বললেই মানুষ সহজেই তাঁকে চিনে নেয়। দুপুর তখন প্রায় একটা। সিদ্ধান্ত নিলাম, রাখাল স্যারকে নিয়েই আজ লিখবো। তাই সেদিনই তাঁর সঙ্গে দেখা করতে গেলাম। পাশের গেট দিয়ে বাড়িতে পৌঁছাতেই একজন বললেন, স্যার খাবার ঘরে আছেন। আপনি পাশের ঘরে বসুন। ঘরে ঢুকেই যেন অন্য এক সময়ের আবহে চলে গেলাম। সাধারণ একটি কক্ষ। পুরোনো একটি ফ্যান ধীরে ধীরে ঘুরছে, তবু তার বাতাসে অদ্ভুত এক প্রশান্তি। দেয়ালে কালো রঙের চিনামাটির পুরোনো ‘ট্রাম্বুলার’ সুইচ, চালু বা বন্ধ করলেই ‘ঠাস-ঠাস’ শব্দ। দু’টি খাট, দু’টি ছোট চেয়ার, একটি টেবিল, পরিপাটি করে সাজানো বই-পত্রিকা, বাঁশের তৈরি সাধারণ সিলিং আর টিনের বেড়া-সব মিলিয়ে অনাড়ম্বর জীবনযাপনের এক অনন্য প্রতিচ্ছবি। মনে হলো, বাহ্যিক চাকচিক্য নয়; জ্ঞানের আলোই যেন এই ঘরের প্রকৃত সৌন্দর্য্য। কিছুক্ষণ পর রাখাল স্যার এলেন। বয়স আশির কোঠা পেরিয়ে ৮৮-তে পা রেখেছেন। হাতে একটি লাঠি, হাঁটতে কিছুটা কষ্ট হয়। কিন্তু মুখে সেই চিরচেনা প্রশান্তি, চোখে প্রজ্ঞার দীপ্তি। সাদামাটা জীবনযাপন, ঝঞ্ঝাটমুক্ত নিরিবিলি পরিবেশে তিনি যেন জীবনের প্রহরগুলো শান্তিতে কাটাচ্ছেন। তাঁকে দেখে মনে হলো, হৃদয়জুড়ে এক গভীর স্বস্তি বিরাজ করছে। আমাকে দেখে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, কী বিষয়? আমি বললাম, আপনার শিক্ষকতা জীবন নিয়ে লিখতে চাই। তিনি মৃদু হেসে বললেন, আজ শরীরটা ভালো নেই, অন্যদিন এসো। পরদিন আবার দুপুরে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করলাম, কিন্তু দেখা হলো না। তিনি তখন বিশ্রামে ছিলেন। এর পরদিন সকালে আবার গেলাম। সেদিনও তাঁকে বিছানায় শুয়ে বিশ্রাম নিতে দেখলাম। মনে হলো, হয়তো আজও কথা বলা হবে না। প্রচারবিমুখ মানুষগণ এমনই হয়ে থাকেন। কিন্তু আমাকে দেখেই তিনি বললেন, এসো। আমি ঘরে প্রবেশ করে বসলাম। কুশল বিনিময়ের পর শুরু হলো দীর্ঘ আলাপ, তাঁর শিক্ষকতা জীবন, স্মৃতি আর অভিজ্ঞতার গল্প। দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে কথা বললেন। তাঁর প্রতিটি কথায় ছিল দীর্ঘ অভিজ্ঞতার নির্যাস। অতীত ও বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার তুলনা নিয়ে তিনি দীর্ঘ আলোচনা করলেন না। হয়তো তিনি জানতেন, এনালগ থেকে ডিজিটাল যুগে সমাজ ও শিক্ষার পরিবর্তন এতটাই বিস্তৃত যে কয়েকটি কথায় তার ব্যাখ্যা সম্ভব নয়। শুধু বললেন, আগেকার দিনের শিক্ষা ব্যবস্থা তৎকালীন সময়ের জন্য উপযোগী ছিল। বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থাও বর্তমান সময়ের চাহিদা অনুযায়ী উপযোগী। তবে যে শিক্ষা ব্যবস্থাই হোক না কেন, এর সাফল্য নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট সবার নিজ নিজ অবস্থান থেকে সততা, আন্তরিকতা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের ওপর। সেদিন মনে হলো, এই মানুষটিকে জানার এখনও অনেক বাকি। ধূর্জটি কুমার বসু শুধু একজন শিক্ষক নন; তিনি সুনামগঞ্জের শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও নাগরিক সমাজের এক উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা। দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে তিনি হাজারো শিক্ষার্থীর হাতে জ্ঞানের প্রদীপ তুলে দিয়েছেন। অবসরের পরও থেমে থাকেননি বরং শিক্ষা, সমাজ ও সংস্কৃতির নানা ক্ষেত্রে আজও সক্রিয় রয়েছেন। তিনি বিশ্বাস করেন, একটি জাতির উন্নয়নের সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি হলো শিক্ষা। তাই শিক্ষার মানোন্নয়ন, শিক্ষক সংকট নিরসন এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে তিনি বিভিন্ন সভা-সেমিনার ও নাগরিক উদ্যোগে নিয়মিত মতামত দিয়েছেন। শিক্ষাকে তিনি কখনো কেবল পেশা হিসেবে দেখেননি, দেখেছেন জাতি গঠনের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে। সংস্কৃতির প্রতিও তাঁর গভীর অনুরাগ। সুনামগঞ্জের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সাহিত্যচর্চার বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তাঁর উপস্থিতি যেন অনিবার্য। তিনি মনে করেন, একটি অঞ্চলের ইতিহাস ও সংস্কৃতি সংরক্ষণ করা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। গুণীজনদের মূল্যায়ন এবং সাহিত্যচর্চার প্রসারেও তাঁর আন্তরিকতা সর্বজনবিদিত। সামাজিক দায়িত্ববোধেও তিনি অনন্য। কমরেড বরুণ রায় স্মৃতি সংসদের সভাপতি হিসেবে মানবিক মূল্যবোধ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠার পক্ষে তিনি সবসময় সোচ্চার থেকেছেন। জনস্বাস্থ্য বিষয়েও তাঁর অবদান উল্লেখযোগ্য। জাতীয় যক্ষ্মা রোগ প্রতিরোধ সমিতি (নাটাব), সুনামগঞ্জ জেলা শাখার সভাপতি হিসেবে তিনি দীর্ঘদিন ধরে যক্ষ্মা প্রতিরোধ ও জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ করে যাচ্ছেন। সমাজ, রাজনীতি ও নাগরিক ভাবনায়ও তাঁর গ্রহণযোগ্যতা ঈর্ষণীয়। শেকড়ের গল্প : আলাপচারিতায় জানা যায়, ধূর্জটি কুমার বসুর আদি নিবাস বিক্রমপুর পরগণায়, বর্তমান মুন্সিগঞ্জ জেলার শ্রীনগর উপজেলায়। তাঁর দাদা প্রয়াত গোবিন্দচন্দ্র বসু ছিলেন একজন প-িত ব্যক্তি। জীবিকা ও কর্মসংস্থানের প্রয়োজনে পরিবারটি প্রায় একশ বিশ বছর আগে ১৩০৪ বঙ্গাব্দে সুনামগঞ্জে এসে বসতি স্থাপন করে। তিনি জানান, তাঁর ডাকনাম ‘রাখাল’। ছোটবেলায় জ্যেষ্ঠ কাকার দেওয়া এই নামেই তিনি আজ সবার কাছে পরিচিত। তাঁর বাবা প্রয়াত উমেশ চন্দ্র বসু (চেলা বসু) এবং মা প্রয়াত তরুলতা বসু। বাবা প্রথমে নায়েব হিসেবে কাজ করলেও পরে মোক্তারি পেশায় যুক্ত হন এবং ১৯৮১ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এ পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। সাত ভাই ও দুই বোনের সংসারে রাখাল স্যারের অবস্থান পঞ্চম। তিনি ১৯৩৭ সালের ২২ জুলাই জন্মগ্রহণ করেন। শিক্ষা ও শিক্ষকতা : ১৯৪৪ সালে কালীবাড়ী স্কুলে প্রথম ভাগে ভর্তি হন। পরবর্তীতে বুলচান্দ উচ্চবিদ্যালয়ে তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে ১৯৫৭ সালে দ্বিতীয় বিভাগে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন। এরপর তৎকালীন শহরের ট্রাফিক পয়েন্ট এলাকায় অবস্থিত সুনামগঞ্জ কলেজ থেকে ১৯৫৯ সালে উচ্চ মাধ্যমিক এবং ১৯৬১ সালে ডিগ্রি স¤পন্ন করেন। ডিগ্রি পাসের পর প্রথমে চরমহল্লা জুনিয়র হাইস্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন। এক বছর পর যোগ দেন শহরের এইচএমপি স্কুলে। তখন ১৯৬২ সালের ২২ জুলাই। তখন তিনি পেয়েছেন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও শহরতলির মাইজবাড়ি গ্রামের বাসিন্দা মো. আব্দুল জব্বার এবং সহকারী শিক্ষক হিসাবে পেয়েছেন শহরতলির ইব্রাহীমপুর গ্রামের ফজল আহমদ নামের সহকর্মীকে। তখন প্রতিষ্ঠানটি এম.ই. মাদ্রাসা পর্যায়ের ছিল। তাঁর নিরলস প্রচেষ্টায় সেটি প্রথমে জুনিয়র হাইস্কুল এবং পরে পূর্ণাঙ্গ উচ্চবিদ্যালয়ে উন্নীত হয়। তবে কুমিল্লা বোর্ডের বেলায়েত হোসেন নামের একজন কর্মকর্তা বিদ্যালয় পরিদর্শনের সময় পূর্ণাঙ্গ উচ্চ বিদ্যালয়ে উন্নীত করার প্রস্তাব রাখলে তিনি সহযোগিতা করেন। এ সময় রাখাল স্যার সরাসরি তাঁর সাথে যোগাযোগ রক্ষা করেন। একই প্রতিষ্ঠানে টানা ৪১ বছর শিক্ষকতা করে তিনি বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। ২০০০ সালের ২২ জুলাই অবসরে যাওয়ার কথা থাকলেও দক্ষতা ও কর্মনিষ্ঠার স্বীকৃতিস্বরূপ চাকরির মেয়াদ আরও দুই বছর বাড়ানো হয়। অবশেষে ২০০৩ সালে অবসর গ্রহণ করেন। ভাষা আন্দোলন, গণআন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধ : ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সময় তিনি ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র। সেই সময় সুনামগঞ্জে আব্দুল হক, আব্দুল হাই, হোসেন বখত, আলফাত উদ্দিন আহমদ, যোগেন্দ্র শর্মাসহ অনেক ছাত্রনেতা আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ১৯৫৬ সালের খাদ্যসংকট ও লঙ্গরখানার কার্যক্রম, ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খানের সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন-সব ক্ষেত্রেই তিনি প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত ছিলেন। কমিউনিস্ট পার্টির কর্মী হিসেবে গণতন্ত্র ও মানুষের অধিকারের পক্ষে তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। ১৯৫৭ সালে সুনামগঞ্জ কলেজ ছাত্র সংসদ নির্বাচনে সমাজসেবা সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৫৮ সালে তাঁদের ছাত্রসংগঠনের নাম ছিল ‘ক্রিসেন্ট পার্টি’। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি প্রথমে শহরতলিতে আশ্রয় নেন। পরে পরিবার নিয়ে বালাট এলাকায় চলে যান। যুদ্ধকালীন সময়ে শরণার্থীদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণে নিরলসভাবে কাজ করেন এবং ভারতের বিভিন্ন দায়িত্বশীল ব্যক্তির সঙ্গে সমন্বয় করে মানবিক সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনা করেন। শিক্ষক আন্দোলন ও সামাজিক নেতৃত্ব : বেসরকারি শিক্ষকদের ন্যায্য দাবি আদায়ের আন্দোলনে ১৯৬৩ সাল থেকে অবসর গ্রহণ পর্যন্ত তিনি সক্রিয় ছিলেন। অথচ ২০০৩ সালে অবসরে যাওয়ার সময় তাঁর জন্য কোনো পেনশনের ব্যবস্থা ছিল না। তবুও শিক্ষকতাকে তিনি কখনো ব্যবসা হিসেবে দেখেননি, এটিকে মানুষের সেবার ব্রত হিসেবেই গ্রহণ করেছিলেন। অবসর জীবনে তাঁর সামাজিক কর্মকা- আরও বিস্তৃত হয়েছে। ১৯৬৪ সাল থেকে স্কাউট আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। তিনি জেলা স্কাউট ও সিলেট আঞ্চলিক স্কাউটের সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। স্কাউটিংয়ে বিশেষ অবদানের জন্য ২০১০ সালে বাংলাদেশ স্কাউটের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সম্মাননা ‘রৌপ্য ইলিশ’ পদকে ভূষিত হন। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমান তাঁর হাতে এই পদক তুলে দেন। ২০০৫ সাল থেকে বাংলাদেশ জাতীয় যক্ষ্মা নিরোধ সমিতি (নাটাব), সুনামগঞ্জ জেলা শাখার সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। সেবামূলক কর্মকা-ের স্বীকৃতিস্বরূপ সংগঠনটি তাঁকে আজীবন সম্মাননা প্রদান করেছে। এ ছাড়া তিনি সুশাসনের জন্য প্রচারাভিযান (সুপ্র)-এর সভাপতি, সনাক নির্বাহী কমিটির সদস্য, শ্রীশ্রী জগন্নাথ মন্দির কমিটির সিনিয়র সহ-সভাপতি, সুনামগঞ্জ সংস্কৃত কলেজের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং সুনামগঞ্জ পৌর ডিগ্রী কলেজের গভর্নিং বডির সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করে আসছেন। ব্যক্তিজীবন : ১৯৬৭ সালে সাধুহাটি গ্রামের শক্তিদত্তা বসুর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন তিনি। দীর্ঘ ৫৬ বছরের জুটি তাঁদের। তাঁদের পরিবারে এক ছেলে ও তিন মেয়ে। জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে তাঁর সহধর্মিণী শক্তিদত্তা বসু নীরবে তাঁকে সাহস ও অনুপ্রেরণা দিয়ে পাশে আছেন। শেষকথা : রাখাল স্যারের বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসার সময় বারবার মনে হচ্ছিল, একজন মানুষের প্রকৃত পরিচয় তাঁর বাড়ির আড়ম্বর নয়; তাঁর চিন্তা, আদর্শ ও কর্মে। সাদামাটা সেই ঘরটি যেন আমাকে শিখিয়ে গেল-জীবনের সবচেয়ে বড় স¤পদ হলো জ্ঞান, সততা এবং মানুষের জন্য কাজ করার মানসিকতা। আজও ধূর্জটি কুমার বসু আমাদের রাখাল স্যার সুনামগঞ্জের মানুষের কাছে শ্রদ্ধা, প্রজ্ঞা ও মানবিকতার এক উজ্জ্বল প্রতীক। তাঁর দীর্ঘ কর্মময় জীবন নতুন প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করবে, আর তাঁর আদর্শ ভবিষ্যতের পথচলায় আলোর দিশা হয়ে থাকবে।
[লেখক আকরাম উদ্দিন : গল্পকার এবং সাংবাদিক]
সেদিন প্রচন্ড গরম। সুনামগঞ্জ শহরের ট্রাফিক পয়েন্টে একটি ভবনের ছায়ায় দাঁড়িয়ে একটু স্বস্তি নেওয়ার চেষ্টা করছিলাম। হঠাৎই মনে পড়ে গেল একজন গুণী মানুষের কথা- ধূর্জটি কুমার বসু, শহরের ভেতরে-বাইরে ‘রাখাল স্যার’ বললেই মানুষ সহজেই তাঁকে চিনে নেয়। দুপুর তখন প্রায় একটা। সিদ্ধান্ত নিলাম, রাখাল স্যারকে নিয়েই আজ লিখবো। তাই সেদিনই তাঁর সঙ্গে দেখা করতে গেলাম। পাশের গেট দিয়ে বাড়িতে পৌঁছাতেই একজন বললেন, স্যার খাবার ঘরে আছেন। আপনি পাশের ঘরে বসুন। ঘরে ঢুকেই যেন অন্য এক সময়ের আবহে চলে গেলাম। সাধারণ একটি কক্ষ। পুরোনো একটি ফ্যান ধীরে ধীরে ঘুরছে, তবু তার বাতাসে অদ্ভুত এক প্রশান্তি। দেয়ালে কালো রঙের চিনামাটির পুরোনো ‘ট্রাম্বুলার’ সুইচ, চালু বা বন্ধ করলেই ‘ঠাস-ঠাস’ শব্দ। দু’টি খাট, দু’টি ছোট চেয়ার, একটি টেবিল, পরিপাটি করে সাজানো বই-পত্রিকা, বাঁশের তৈরি সাধারণ সিলিং আর টিনের বেড়া-সব মিলিয়ে অনাড়ম্বর জীবনযাপনের এক অনন্য প্রতিচ্ছবি। মনে হলো, বাহ্যিক চাকচিক্য নয়; জ্ঞানের আলোই যেন এই ঘরের প্রকৃত সৌন্দর্য্য। কিছুক্ষণ পর রাখাল স্যার এলেন। বয়স আশির কোঠা পেরিয়ে ৮৮-তে পা রেখেছেন। হাতে একটি লাঠি, হাঁটতে কিছুটা কষ্ট হয়। কিন্তু মুখে সেই চিরচেনা প্রশান্তি, চোখে প্রজ্ঞার দীপ্তি। সাদামাটা জীবনযাপন, ঝঞ্ঝাটমুক্ত নিরিবিলি পরিবেশে তিনি যেন জীবনের প্রহরগুলো শান্তিতে কাটাচ্ছেন। তাঁকে দেখে মনে হলো, হৃদয়জুড়ে এক গভীর স্বস্তি বিরাজ করছে। আমাকে দেখে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, কী বিষয়? আমি বললাম, আপনার শিক্ষকতা জীবন নিয়ে লিখতে চাই। তিনি মৃদু হেসে বললেন, আজ শরীরটা ভালো নেই, অন্যদিন এসো। পরদিন আবার দুপুরে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করলাম, কিন্তু দেখা হলো না। তিনি তখন বিশ্রামে ছিলেন। এর পরদিন সকালে আবার গেলাম। সেদিনও তাঁকে বিছানায় শুয়ে বিশ্রাম নিতে দেখলাম। মনে হলো, হয়তো আজও কথা বলা হবে না। প্রচারবিমুখ মানুষগণ এমনই হয়ে থাকেন। কিন্তু আমাকে দেখেই তিনি বললেন, এসো। আমি ঘরে প্রবেশ করে বসলাম। কুশল বিনিময়ের পর শুরু হলো দীর্ঘ আলাপ, তাঁর শিক্ষকতা জীবন, স্মৃতি আর অভিজ্ঞতার গল্প। দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে কথা বললেন। তাঁর প্রতিটি কথায় ছিল দীর্ঘ অভিজ্ঞতার নির্যাস। অতীত ও বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার তুলনা নিয়ে তিনি দীর্ঘ আলোচনা করলেন না। হয়তো তিনি জানতেন, এনালগ থেকে ডিজিটাল যুগে সমাজ ও শিক্ষার পরিবর্তন এতটাই বিস্তৃত যে কয়েকটি কথায় তার ব্যাখ্যা সম্ভব নয়। শুধু বললেন, আগেকার দিনের শিক্ষা ব্যবস্থা তৎকালীন সময়ের জন্য উপযোগী ছিল। বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থাও বর্তমান সময়ের চাহিদা অনুযায়ী উপযোগী। তবে যে শিক্ষা ব্যবস্থাই হোক না কেন, এর সাফল্য নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট সবার নিজ নিজ অবস্থান থেকে সততা, আন্তরিকতা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের ওপর। সেদিন মনে হলো, এই মানুষটিকে জানার এখনও অনেক বাকি। ধূর্জটি কুমার বসু শুধু একজন শিক্ষক নন; তিনি সুনামগঞ্জের শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও নাগরিক সমাজের এক উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা। দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে তিনি হাজারো শিক্ষার্থীর হাতে জ্ঞানের প্রদীপ তুলে দিয়েছেন। অবসরের পরও থেমে থাকেননি বরং শিক্ষা, সমাজ ও সংস্কৃতির নানা ক্ষেত্রে আজও সক্রিয় রয়েছেন। তিনি বিশ্বাস করেন, একটি জাতির উন্নয়নের সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি হলো শিক্ষা। তাই শিক্ষার মানোন্নয়ন, শিক্ষক সংকট নিরসন এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে তিনি বিভিন্ন সভা-সেমিনার ও নাগরিক উদ্যোগে নিয়মিত মতামত দিয়েছেন। শিক্ষাকে তিনি কখনো কেবল পেশা হিসেবে দেখেননি, দেখেছেন জাতি গঠনের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে। সংস্কৃতির প্রতিও তাঁর গভীর অনুরাগ। সুনামগঞ্জের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সাহিত্যচর্চার বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তাঁর উপস্থিতি যেন অনিবার্য। তিনি মনে করেন, একটি অঞ্চলের ইতিহাস ও সংস্কৃতি সংরক্ষণ করা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। গুণীজনদের মূল্যায়ন এবং সাহিত্যচর্চার প্রসারেও তাঁর আন্তরিকতা সর্বজনবিদিত। সামাজিক দায়িত্ববোধেও তিনি অনন্য। কমরেড বরুণ রায় স্মৃতি সংসদের সভাপতি হিসেবে মানবিক মূল্যবোধ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠার পক্ষে তিনি সবসময় সোচ্চার থেকেছেন। জনস্বাস্থ্য বিষয়েও তাঁর অবদান উল্লেখযোগ্য। জাতীয় যক্ষ্মা রোগ প্রতিরোধ সমিতি (নাটাব), সুনামগঞ্জ জেলা শাখার সভাপতি হিসেবে তিনি দীর্ঘদিন ধরে যক্ষ্মা প্রতিরোধ ও জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ করে যাচ্ছেন। সমাজ, রাজনীতি ও নাগরিক ভাবনায়ও তাঁর গ্রহণযোগ্যতা ঈর্ষণীয়। শেকড়ের গল্প : আলাপচারিতায় জানা যায়, ধূর্জটি কুমার বসুর আদি নিবাস বিক্রমপুর পরগণায়, বর্তমান মুন্সিগঞ্জ জেলার শ্রীনগর উপজেলায়। তাঁর দাদা প্রয়াত গোবিন্দচন্দ্র বসু ছিলেন একজন প-িত ব্যক্তি। জীবিকা ও কর্মসংস্থানের প্রয়োজনে পরিবারটি প্রায় একশ বিশ বছর আগে ১৩০৪ বঙ্গাব্দে সুনামগঞ্জে এসে বসতি স্থাপন করে। তিনি জানান, তাঁর ডাকনাম ‘রাখাল’। ছোটবেলায় জ্যেষ্ঠ কাকার দেওয়া এই নামেই তিনি আজ সবার কাছে পরিচিত। তাঁর বাবা প্রয়াত উমেশ চন্দ্র বসু (চেলা বসু) এবং মা প্রয়াত তরুলতা বসু। বাবা প্রথমে নায়েব হিসেবে কাজ করলেও পরে মোক্তারি পেশায় যুক্ত হন এবং ১৯৮১ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এ পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। সাত ভাই ও দুই বোনের সংসারে রাখাল স্যারের অবস্থান পঞ্চম। তিনি ১৯৩৭ সালের ২২ জুলাই জন্মগ্রহণ করেন। শিক্ষা ও শিক্ষকতা : ১৯৪৪ সালে কালীবাড়ী স্কুলে প্রথম ভাগে ভর্তি হন। পরবর্তীতে বুলচান্দ উচ্চবিদ্যালয়ে তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে ১৯৫৭ সালে দ্বিতীয় বিভাগে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন। এরপর তৎকালীন শহরের ট্রাফিক পয়েন্ট এলাকায় অবস্থিত সুনামগঞ্জ কলেজ থেকে ১৯৫৯ সালে উচ্চ মাধ্যমিক এবং ১৯৬১ সালে ডিগ্রি স¤পন্ন করেন। ডিগ্রি পাসের পর প্রথমে চরমহল্লা জুনিয়র হাইস্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন। এক বছর পর যোগ দেন শহরের এইচএমপি স্কুলে। তখন ১৯৬২ সালের ২২ জুলাই। তখন তিনি পেয়েছেন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও শহরতলির মাইজবাড়ি গ্রামের বাসিন্দা মো. আব্দুল জব্বার এবং সহকারী শিক্ষক হিসাবে পেয়েছেন শহরতলির ইব্রাহীমপুর গ্রামের ফজল আহমদ নামের সহকর্মীকে। তখন প্রতিষ্ঠানটি এম.ই. মাদ্রাসা পর্যায়ের ছিল। তাঁর নিরলস প্রচেষ্টায় সেটি প্রথমে জুনিয়র হাইস্কুল এবং পরে পূর্ণাঙ্গ উচ্চবিদ্যালয়ে উন্নীত হয়। তবে কুমিল্লা বোর্ডের বেলায়েত হোসেন নামের একজন কর্মকর্তা বিদ্যালয় পরিদর্শনের সময় পূর্ণাঙ্গ উচ্চ বিদ্যালয়ে উন্নীত করার প্রস্তাব রাখলে তিনি সহযোগিতা করেন। এ সময় রাখাল স্যার সরাসরি তাঁর সাথে যোগাযোগ রক্ষা করেন। একই প্রতিষ্ঠানে টানা ৪১ বছর শিক্ষকতা করে তিনি বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। ২০০০ সালের ২২ জুলাই অবসরে যাওয়ার কথা থাকলেও দক্ষতা ও কর্মনিষ্ঠার স্বীকৃতিস্বরূপ চাকরির মেয়াদ আরও দুই বছর বাড়ানো হয়। অবশেষে ২০০৩ সালে অবসর গ্রহণ করেন। ভাষা আন্দোলন, গণআন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধ : ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সময় তিনি ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র। সেই সময় সুনামগঞ্জে আব্দুল হক, আব্দুল হাই, হোসেন বখত, আলফাত উদ্দিন আহমদ, যোগেন্দ্র শর্মাসহ অনেক ছাত্রনেতা আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ১৯৫৬ সালের খাদ্যসংকট ও লঙ্গরখানার কার্যক্রম, ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খানের সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন-সব ক্ষেত্রেই তিনি প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত ছিলেন। কমিউনিস্ট পার্টির কর্মী হিসেবে গণতন্ত্র ও মানুষের অধিকারের পক্ষে তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। ১৯৫৭ সালে সুনামগঞ্জ কলেজ ছাত্র সংসদ নির্বাচনে সমাজসেবা সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৫৮ সালে তাঁদের ছাত্রসংগঠনের নাম ছিল ‘ক্রিসেন্ট পার্টি’। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি প্রথমে শহরতলিতে আশ্রয় নেন। পরে পরিবার নিয়ে বালাট এলাকায় চলে যান। যুদ্ধকালীন সময়ে শরণার্থীদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণে নিরলসভাবে কাজ করেন এবং ভারতের বিভিন্ন দায়িত্বশীল ব্যক্তির সঙ্গে সমন্বয় করে মানবিক সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনা করেন। শিক্ষক আন্দোলন ও সামাজিক নেতৃত্ব : বেসরকারি শিক্ষকদের ন্যায্য দাবি আদায়ের আন্দোলনে ১৯৬৩ সাল থেকে অবসর গ্রহণ পর্যন্ত তিনি সক্রিয় ছিলেন। অথচ ২০০৩ সালে অবসরে যাওয়ার সময় তাঁর জন্য কোনো পেনশনের ব্যবস্থা ছিল না। তবুও শিক্ষকতাকে তিনি কখনো ব্যবসা হিসেবে দেখেননি, এটিকে মানুষের সেবার ব্রত হিসেবেই গ্রহণ করেছিলেন। অবসর জীবনে তাঁর সামাজিক কর্মকা- আরও বিস্তৃত হয়েছে। ১৯৬৪ সাল থেকে স্কাউট আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। তিনি জেলা স্কাউট ও সিলেট আঞ্চলিক স্কাউটের সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। স্কাউটিংয়ে বিশেষ অবদানের জন্য ২০১০ সালে বাংলাদেশ স্কাউটের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সম্মাননা ‘রৌপ্য ইলিশ’ পদকে ভূষিত হন। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমান তাঁর হাতে এই পদক তুলে দেন। ২০০৫ সাল থেকে বাংলাদেশ জাতীয় যক্ষ্মা নিরোধ সমিতি (নাটাব), সুনামগঞ্জ জেলা শাখার সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। সেবামূলক কর্মকা-ের স্বীকৃতিস্বরূপ সংগঠনটি তাঁকে আজীবন সম্মাননা প্রদান করেছে। এ ছাড়া তিনি সুশাসনের জন্য প্রচারাভিযান (সুপ্র)-এর সভাপতি, সনাক নির্বাহী কমিটির সদস্য, শ্রীশ্রী জগন্নাথ মন্দির কমিটির সিনিয়র সহ-সভাপতি, সুনামগঞ্জ সংস্কৃত কলেজের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং সুনামগঞ্জ পৌর ডিগ্রী কলেজের গভর্নিং বডির সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করে আসছেন। ব্যক্তিজীবন : ১৯৬৭ সালে সাধুহাটি গ্রামের শক্তিদত্তা বসুর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন তিনি। দীর্ঘ ৫৬ বছরের জুটি তাঁদের। তাঁদের পরিবারে এক ছেলে ও তিন মেয়ে। জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে তাঁর সহধর্মিণী শক্তিদত্তা বসু নীরবে তাঁকে সাহস ও অনুপ্রেরণা দিয়ে পাশে আছেন। শেষকথা : রাখাল স্যারের বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসার সময় বারবার মনে হচ্ছিল, একজন মানুষের প্রকৃত পরিচয় তাঁর বাড়ির আড়ম্বর নয়; তাঁর চিন্তা, আদর্শ ও কর্মে। সাদামাটা সেই ঘরটি যেন আমাকে শিখিয়ে গেল-জীবনের সবচেয়ে বড় স¤পদ হলো জ্ঞান, সততা এবং মানুষের জন্য কাজ করার মানসিকতা। আজও ধূর্জটি কুমার বসু আমাদের রাখাল স্যার সুনামগঞ্জের মানুষের কাছে শ্রদ্ধা, প্রজ্ঞা ও মানবিকতার এক উজ্জ্বল প্রতীক। তাঁর দীর্ঘ কর্মময় জীবন নতুন প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করবে, আর তাঁর আদর্শ ভবিষ্যতের পথচলায় আলোর দিশা হয়ে থাকবে।
[লেখক আকরাম উদ্দিন : গল্পকার এবং সাংবাদিক]