শেরগুল আহমেদ:
ভূমিকা:
‘সমাজ’ ও অনুভূতিসম্পন্ন প্রাণের সমষ্টি সমাজবিজ্ঞানের তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে সমাজকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে প্রায়শই একটি ইংরেজি শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করা হয়- “অ মৎড়ঁঢ় ড়ভ ংবহঃরবহঃ নবরহমং”। এর সহজ বাংলা রূপ হলো “অনুভূতিক্ষম বা অনুভূতিস¤পন্ন প্রাণের সমষ্টি”। সাধারণ অর্থে আমরা কেবল মানুষের বসবাসকেই সমাজ মনে করি, কিন্তু প্রকৃতির নিয়মে যেকোনো অনুভূতি এবং চিন্তাশক্তি স¤পন্ন প্রাণী যখন কোনো বিশেষ উদ্দেশ্য সাধনের জন্য দলবদ্ধ হয়, তখনই সেখানে একটি সমাজের সৃষ্টি হয়। উদাহরণস্বরূপ, একটি বানর যখন একা চলে, তখন তা কোনো সমাজ নয়। কিন্তু যখন তারা খাদ্য সংগ্রহ, আত্মরক্ষা বা বংশবৃদ্ধির মতো বিশেষ উদ্দেশ্যে একত্রিত ও সংঘবদ্ধ হয়, তখন সেটি হয়ে ওঠে একটি ‘বানর সমাজ’। পাখি, মৌমাছি, পিঁপড়ে বা বন্য পশুর মধ্যেও এই সামাজিক মেলবন্ধন স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। সৃষ্টির ঊষালগ্ন থেকে আজ পর্যন্ত এই প্রাণীদের সামাজিক স্বভাব ও চরিত্র প্রায় অপরিবর্তিত রয়েছে।
২. মানুষকে আলাদা করার মূল হাতিয়ার: সৃজনশীলতা চিন্তাশক্তি ও অনুভূতি অন্য অনেক প্রাণীর থাকলেও, একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য মানুষকে পৃথিবীর অন্য সব জীব থেকে সম্পূর্ণ আলাদা এবং অনন্য করে তুলেছে- আর তা হলো “সৃজনশীলতা” (ঈৎবধঃরারঃু)। মানুষ সৃষ্টি করতে জানে, রূপান্তর করতে জানে। মানবজাতির পুরো ইতিহাস মূলত এই সৃজনশীলতারই এক অবিরাম ইতিহাস। যেখানে পৃথিবীর অন্যান্য প্রাণী হাজার হাজার বছর ধরে তাদের আদিম স্বভাব ও বৈশিষ্ট্য হুবহু অপরিবর্তিত রেখেছে, সেখানে মানুষ প্রতিনিয়ত নিজেকে এবং নিজের চারপাশকে বদলে ফেলেছে। বাঘ আজ থেকে পাঁচ হাজার বছর আগেও যেভাবে গুহায় বা বনে শিকার করত, আজও ঠিক সেভাবেই করে। কিন্তু মানুষ? মানুষ তার আদিম গুহা সভ্যতা, পাথরের হাতিয়ার আর যাযাবর জীবন পেছনে ফেলে আজ আধুনিক সভ্যতার চূড়ায় এসে পৌঁছেছে। মানুষের এই পরিবর্তনশীল এবং বৈচিত্র্যময় চরিত্র পৃথিবীর আর কোনো প্রাণীর মধ্যে দেখা যায় না।
৩. সভ্যতার বিবর্তনে সৃজনশীলতার প্রতিফলন: সিন্ধু সভ্যতার দৃষ্টান্ত মানুষের এই পরিবর্তনশীল ও সৃজনশীল চরিত্রের শ্রেষ্ঠ প্রমাণ মেলে ইতিহাসের বিভিন্ন প্রাচীন সভ্যতার দিকে তাকালে। আজ থেকে প্রায় ৫০০০ বছর আগে গড়ে ওঠা সিন্ধু সভ্যতার (ওহফঁং ঠধষষবু ঈরারষরুধঃরড়হ) কথাই ধরা যাক। তৎকালীন মানুষ শুধু টিকে থাকার জন্য দলবদ্ধ বা সামাজিক জীব হয়নি, তারা তাদের অনন্য চিন্তাশক্তি দিয়ে এমন এক নগর সভ্যতা গড়ে তুলেছিল যা আজকের আধুনিক স্থপতিদেরও চমকে দেয়: পরিকল্পিত নগর পরিকল্পনা: হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারোর মানুষ গ্রিড সিস্টেমে সোজা রাস্তা এবং পোড়া ইটের বহুতল বাড়ি বানাতে শিখেছিল। উন্নত পয়ঃনিষ্কাশন: গৃহস্থালির বর্জ্য ও পানি নিষ্কাশনের জন্য তারা যে ঢাকা ড্রেন ও ডাস্টবিনের ব্যবস্থা করেছিল, তা সমসাময়িক যুগে অভাবনীয় ছিল। শিল্প ও বাণিজ্যের প্রসার: তারা চাকা আবিষ্কার করেছিল, নিখুঁত পরিমাপের জন্য বাটখারা বা ওজনের স্কেল বানিয়েছিল এবং তামা ও ব্রোঞ্জের নান্দনিক শিল্পকর্ম তৈরি করেছিল। এই সিন্ধু সভ্যতার মাটির পাত্র আর ইটের ঘর থেকে যাত্রা শুরু করে মানুষ আজ বহুতল স্কাইস্ক্র্যাপার বানাচ্ছে, সাগর তলে টানেল তৈরি করছে এবং পৃথিবী ছাড়িয়ে মঙ্গল গ্রহে বসতি স্থাপনের স্বপ্ন দেখছে। মানুষের এই অসীম বৈচিত্র্যের কারণেই পৃথিবীর ইতিহাসে মানুষকে নিয়েই সবচেয়ে বেশি গবেষণা হয়েছে এবং পৃথিবীর অস্তিত্ব যতদিন থাকবে, এই গবেষণা চলতেই থাকবে। ৪. মুদ্রার ওপিঠ: সৃষ্টি বনাম ধ্বংসের দ্বন্দ্ব মানুষের এই পরিবর্তনশীল এবং সৃজনশীল চরিত্র তাকে সৃষ্টির সেরা জীবে (আশরাফুল মখলুকাত) পরিণত করেছে ঠিকই, কিন্তু এর একটি চরম অন্ধকার দিকও রয়েছে। পৃথিবী টিকে থাকার লড়াইয়ে মানুষ যেমন প্রতিনিয়ত নতুন প্রযুক্তি, চিকিৎসা বিজ্ঞান ও পরিবেশবান্ধব সমাধান আবিষ্কার করছে, ঠিক একইভাবে পৃথিবীর ধ্বংসের কারণগুলোও মানুষের হাতেই তৈরি হচ্ছে। অন্যান্য প্রাণীর ভূমিকা: সৃষ্টির শুরু থেকে আজ পর্যন্ত প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় অন্য সব প্রাণীর ভূমিকা অপরিবর্তিত ও ইতিবাচক। তারা প্রকৃতি থেকে যতটুকু নেয়, প্রকৃতিকে ততটুকুই ফিরিয়ে দেয়। তারা পরিবেশ দূষণ করে না, জলবায়ু পরিবর্তন ঘটায় না মানুষের ভূমিকা: মানুষ নিজের স্বার্থে অরণ্য ধ্বংস করছে, নদী দূষণ করছে। মানুষের তৈরি যুদ্ধ, পারমাণবিক অস্ত্র এবং লাগামহীন কার্বন নিঃসরণ আজ পুরো গ্রহের অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলেছে। অর্থাৎ, যে সৃজনশীল হাত দিয়ে মানুষ সভ্যতা গড়ে তুলেছে, সেই একই হাত দিয়ে সে ধ্বংসের রাজত্বও তৈরি করছে। ৫. উপসংহার : মানুষের সমাজ কেবল বেঁচে থাকার মাধ্যম নয়, এটি প্রতিনিয়ত রূপান্তরের এক জীবন্ত ল্যাবরেটরি। মানুষের অসীম ক্ষমতা আর বৈচিত্র্যই তাকে মহিমান্বিত করেছে, আবার একই সাথে তাকে প্রকৃতির কাঠগড়ায় এনে দাঁড় করিয়েছে। আদিম গুহা থেকে আধুনিক সভ্যতার এই দীর্ঘ যাত্রায় মানুষের চরিত্র ও কর্ম প্রমাণ করে যে, এই পৃথিবীর ভবিষ্যৎ সম্পূর্ণভাবে মানুষের আচরণের ওপর নির্ভরশীল। সৃষ্টি আর ধ্বংসের এই চিরন্তন খেলায় শেষ পর্যন্ত মানুষের সুপ্ত বিবেক ও সৃজনশীলতার ইতিবাচক দিকটিই জয়ী হোক - এটাই হোক সমকালীন মানব সমাজের মূল লক্ষ্য।
ভূমিকা:
‘সমাজ’ ও অনুভূতিসম্পন্ন প্রাণের সমষ্টি সমাজবিজ্ঞানের তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে সমাজকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে প্রায়শই একটি ইংরেজি শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করা হয়- “অ মৎড়ঁঢ় ড়ভ ংবহঃরবহঃ নবরহমং”। এর সহজ বাংলা রূপ হলো “অনুভূতিক্ষম বা অনুভূতিস¤পন্ন প্রাণের সমষ্টি”। সাধারণ অর্থে আমরা কেবল মানুষের বসবাসকেই সমাজ মনে করি, কিন্তু প্রকৃতির নিয়মে যেকোনো অনুভূতি এবং চিন্তাশক্তি স¤পন্ন প্রাণী যখন কোনো বিশেষ উদ্দেশ্য সাধনের জন্য দলবদ্ধ হয়, তখনই সেখানে একটি সমাজের সৃষ্টি হয়। উদাহরণস্বরূপ, একটি বানর যখন একা চলে, তখন তা কোনো সমাজ নয়। কিন্তু যখন তারা খাদ্য সংগ্রহ, আত্মরক্ষা বা বংশবৃদ্ধির মতো বিশেষ উদ্দেশ্যে একত্রিত ও সংঘবদ্ধ হয়, তখন সেটি হয়ে ওঠে একটি ‘বানর সমাজ’। পাখি, মৌমাছি, পিঁপড়ে বা বন্য পশুর মধ্যেও এই সামাজিক মেলবন্ধন স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। সৃষ্টির ঊষালগ্ন থেকে আজ পর্যন্ত এই প্রাণীদের সামাজিক স্বভাব ও চরিত্র প্রায় অপরিবর্তিত রয়েছে।
২. মানুষকে আলাদা করার মূল হাতিয়ার: সৃজনশীলতা চিন্তাশক্তি ও অনুভূতি অন্য অনেক প্রাণীর থাকলেও, একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য মানুষকে পৃথিবীর অন্য সব জীব থেকে সম্পূর্ণ আলাদা এবং অনন্য করে তুলেছে- আর তা হলো “সৃজনশীলতা” (ঈৎবধঃরারঃু)। মানুষ সৃষ্টি করতে জানে, রূপান্তর করতে জানে। মানবজাতির পুরো ইতিহাস মূলত এই সৃজনশীলতারই এক অবিরাম ইতিহাস। যেখানে পৃথিবীর অন্যান্য প্রাণী হাজার হাজার বছর ধরে তাদের আদিম স্বভাব ও বৈশিষ্ট্য হুবহু অপরিবর্তিত রেখেছে, সেখানে মানুষ প্রতিনিয়ত নিজেকে এবং নিজের চারপাশকে বদলে ফেলেছে। বাঘ আজ থেকে পাঁচ হাজার বছর আগেও যেভাবে গুহায় বা বনে শিকার করত, আজও ঠিক সেভাবেই করে। কিন্তু মানুষ? মানুষ তার আদিম গুহা সভ্যতা, পাথরের হাতিয়ার আর যাযাবর জীবন পেছনে ফেলে আজ আধুনিক সভ্যতার চূড়ায় এসে পৌঁছেছে। মানুষের এই পরিবর্তনশীল এবং বৈচিত্র্যময় চরিত্র পৃথিবীর আর কোনো প্রাণীর মধ্যে দেখা যায় না।
৩. সভ্যতার বিবর্তনে সৃজনশীলতার প্রতিফলন: সিন্ধু সভ্যতার দৃষ্টান্ত মানুষের এই পরিবর্তনশীল ও সৃজনশীল চরিত্রের শ্রেষ্ঠ প্রমাণ মেলে ইতিহাসের বিভিন্ন প্রাচীন সভ্যতার দিকে তাকালে। আজ থেকে প্রায় ৫০০০ বছর আগে গড়ে ওঠা সিন্ধু সভ্যতার (ওহফঁং ঠধষষবু ঈরারষরুধঃরড়হ) কথাই ধরা যাক। তৎকালীন মানুষ শুধু টিকে থাকার জন্য দলবদ্ধ বা সামাজিক জীব হয়নি, তারা তাদের অনন্য চিন্তাশক্তি দিয়ে এমন এক নগর সভ্যতা গড়ে তুলেছিল যা আজকের আধুনিক স্থপতিদেরও চমকে দেয়: পরিকল্পিত নগর পরিকল্পনা: হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারোর মানুষ গ্রিড সিস্টেমে সোজা রাস্তা এবং পোড়া ইটের বহুতল বাড়ি বানাতে শিখেছিল। উন্নত পয়ঃনিষ্কাশন: গৃহস্থালির বর্জ্য ও পানি নিষ্কাশনের জন্য তারা যে ঢাকা ড্রেন ও ডাস্টবিনের ব্যবস্থা করেছিল, তা সমসাময়িক যুগে অভাবনীয় ছিল। শিল্প ও বাণিজ্যের প্রসার: তারা চাকা আবিষ্কার করেছিল, নিখুঁত পরিমাপের জন্য বাটখারা বা ওজনের স্কেল বানিয়েছিল এবং তামা ও ব্রোঞ্জের নান্দনিক শিল্পকর্ম তৈরি করেছিল। এই সিন্ধু সভ্যতার মাটির পাত্র আর ইটের ঘর থেকে যাত্রা শুরু করে মানুষ আজ বহুতল স্কাইস্ক্র্যাপার বানাচ্ছে, সাগর তলে টানেল তৈরি করছে এবং পৃথিবী ছাড়িয়ে মঙ্গল গ্রহে বসতি স্থাপনের স্বপ্ন দেখছে। মানুষের এই অসীম বৈচিত্র্যের কারণেই পৃথিবীর ইতিহাসে মানুষকে নিয়েই সবচেয়ে বেশি গবেষণা হয়েছে এবং পৃথিবীর অস্তিত্ব যতদিন থাকবে, এই গবেষণা চলতেই থাকবে। ৪. মুদ্রার ওপিঠ: সৃষ্টি বনাম ধ্বংসের দ্বন্দ্ব মানুষের এই পরিবর্তনশীল এবং সৃজনশীল চরিত্র তাকে সৃষ্টির সেরা জীবে (আশরাফুল মখলুকাত) পরিণত করেছে ঠিকই, কিন্তু এর একটি চরম অন্ধকার দিকও রয়েছে। পৃথিবী টিকে থাকার লড়াইয়ে মানুষ যেমন প্রতিনিয়ত নতুন প্রযুক্তি, চিকিৎসা বিজ্ঞান ও পরিবেশবান্ধব সমাধান আবিষ্কার করছে, ঠিক একইভাবে পৃথিবীর ধ্বংসের কারণগুলোও মানুষের হাতেই তৈরি হচ্ছে। অন্যান্য প্রাণীর ভূমিকা: সৃষ্টির শুরু থেকে আজ পর্যন্ত প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় অন্য সব প্রাণীর ভূমিকা অপরিবর্তিত ও ইতিবাচক। তারা প্রকৃতি থেকে যতটুকু নেয়, প্রকৃতিকে ততটুকুই ফিরিয়ে দেয়। তারা পরিবেশ দূষণ করে না, জলবায়ু পরিবর্তন ঘটায় না মানুষের ভূমিকা: মানুষ নিজের স্বার্থে অরণ্য ধ্বংস করছে, নদী দূষণ করছে। মানুষের তৈরি যুদ্ধ, পারমাণবিক অস্ত্র এবং লাগামহীন কার্বন নিঃসরণ আজ পুরো গ্রহের অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলেছে। অর্থাৎ, যে সৃজনশীল হাত দিয়ে মানুষ সভ্যতা গড়ে তুলেছে, সেই একই হাত দিয়ে সে ধ্বংসের রাজত্বও তৈরি করছে। ৫. উপসংহার : মানুষের সমাজ কেবল বেঁচে থাকার মাধ্যম নয়, এটি প্রতিনিয়ত রূপান্তরের এক জীবন্ত ল্যাবরেটরি। মানুষের অসীম ক্ষমতা আর বৈচিত্র্যই তাকে মহিমান্বিত করেছে, আবার একই সাথে তাকে প্রকৃতির কাঠগড়ায় এনে দাঁড় করিয়েছে। আদিম গুহা থেকে আধুনিক সভ্যতার এই দীর্ঘ যাত্রায় মানুষের চরিত্র ও কর্ম প্রমাণ করে যে, এই পৃথিবীর ভবিষ্যৎ সম্পূর্ণভাবে মানুষের আচরণের ওপর নির্ভরশীল। সৃষ্টি আর ধ্বংসের এই চিরন্তন খেলায় শেষ পর্যন্ত মানুষের সুপ্ত বিবেক ও সৃজনশীলতার ইতিবাচক দিকটিই জয়ী হোক - এটাই হোক সমকালীন মানব সমাজের মূল লক্ষ্য।