প্রাথমিক শিক্ষা একটি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার ভিত্তি। এই ভিত্তি যত শক্তিশালী হবে, ততই সমৃদ্ধ হবে জাতির ভবিষ্যৎ। কিন্তু দেশের হাওরাঞ্চল, বিশেষ করে সুনামগঞ্জের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার চিত্র উদ্বেগজনক। শিক্ষক, প্রধান শিক্ষক, শিক্ষা কর্মকর্তা ও কর্মচারীর বিপুল সংখ্যক পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য থাকায় বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এটি শুধু প্রশাসনিক দুর্বলতার বিষয় নয়; এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিক্ষা অধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ।
জেলায় ১ হাজার ৪৭৫টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৪৫১টিতে প্রধান শিক্ষক নেই। সহকারী শিক্ষকের ১ হাজার ১৬২টি পদও শূন্য। পাশাপাশি উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ও সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার বহু পদ দীর্ঘদিন ধরে খালি থাকায় বিদ্যালয়গুলোর নিয়মিত তদারকি, শিক্ষার মান মূল্যায়ন এবং প্রশাসনিক কার্যক্রম কার্যত দুর্বল হয়ে পড়েছে। এর ফলে শিক্ষকদের জবাবদিহিতা কমছে, শ্রেণিকক্ষে পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে এবং শিক্ষার্থীরা কাক্সিক্ষত শিক্ষাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
হাওরাঞ্চলের ভৌগোলিক বাস্তবতা দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন। বর্ষা মৌসুমে দীর্ঘ সময় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকে, অনেক বিদ্যালয়ে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে। এই বাস্তবতায় সাধারণ নীতিমালা দিয়ে হাওরের শিক্ষা সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। বরং এ অঞ্চলের জন্য বিশেষ পরিকল্পনা, বিশেষ প্রণোদনা এবং প্রয়োজনভিত্তিক জনবল ব্যবস্থাপনা জরুরি।
সম্প্রতি প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রীর দুর্গম হাওর এলাকা পরিদর্শন এবং শিক্ষার মান নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ পরিস্থিতির গুরুত্বই তুলে ধরেছে। তবে শুধু নির্দেশনা দিয়ে এই সংকট দূর করা সম্ভব হবে না। প্রয়োজন দ্রুত শূন্য পদে নিয়োগ, বিদ্যালয়ভিত্তিক শিক্ষক বণ্টনে ভারসাম্য নিশ্চিত করা এবং শিক্ষা প্রশাসনের সব স্তরে প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগের কার্যকর উদ্যোগ।
একই সঙ্গে হাওরে কর্মরত শিক্ষক ও শিক্ষা কর্মকর্তাদের জন্য বিশেষ ভাতা, আবাসন সুবিধা, নিরাপদ যাতায়াত ব্যবস্থা এবং পদোন্নতিতে প্রণোদনার মতো নীতিগত ব্যবস্থা বিবেচনা করা যেতে পারে। এতে দুর্গম এলাকায় দায়িত্ব পালনে দক্ষ ও অভিজ্ঞ জনবল উৎসাহিত হবে। পাশাপাশি ডিজিটাল মনিটরিং, নিয়মিত প্রশিক্ষণ এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করলে শিক্ষা ব্যবস্থাপনায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব।
শিক্ষার মানোন্নয়নে শুধু সরকার নয়, জনপ্রতিনিধি, স্থানীয় প্রশাসন, অভিভাবক ও নাগরিক সমাজকেও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। কারণ প্রাথমিক শিক্ষা কোনো একক প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নয়; এটি জাতীয় উন্নয়নের অন্যতম প্রধান ভিত্তি।
হাওরের শিশুদেরও দেশের অন্য অঞ্চলের শিশুদের মতো মানসম্মত শিক্ষার সমান অধিকার রয়েছে। ভৌগোলিক বৈচিত্র্য যেন তাদের শিক্ষার পথে বাধা না হয়, তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব। তাই সুনামগঞ্জসহ হাওরাঞ্চলের প্রাথমিক শিক্ষাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত জনবল সংকট নিরসন, প্রশাসনিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের বিকল্প নেই। শিক্ষার ভিত্তি যত মজবুত হবে, ততই সমৃদ্ধ হবে হাওর, আর শক্তিশালী হবে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ।