হাওরে স্কুলযাত্রায় জীবনের ঝুঁকি, নিরাপদ নৌযান এখনো অধরা

আপলোড সময় : ০৩-০৮-২০২৬ ০১:২৩:০৮ পূর্বাহ্ন , আপডেট সময় : ০৩-০৮-২০২৬ ০১:২৬:০৩ পূর্বাহ্ন
বিশ্বজিত রায়::
বর্ষাকালে বৈরি আবহাওয়ায় চরম ভোগান্তির শিকার হয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কোমলমতি শিক্ষার্থীরা। হাওর অধ্যুষিত সুনামগঞ্জের বেশির ভাগ এলাকা দুর্গম হওয়ায় জীবন ঝুঁকি নিয়ে বিদ্যালয়ে যেতে হয় ছাত্রছাত্রীদের। বিভিন্ন ক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তন হলেও হাওরাঞ্চলের শিক্ষা ক্ষেত্রে ঝুঁকিমুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি না হওয়ায় অস্বস্তি আছে হাওরবাসীর মনে।
গত সপ্তাহের সোমবার প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ সুনামগঞ্জের দুর্গম হাওরাঞ্চলের একাধিক বিদ্যালয় পরিদর্শন করেন। প্রতিমন্ত্রী হাওর এলাকার পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের শিখন ঘাটতি দূর করতে বিষয়ভিত্তিক মৌলিক পাঠদানের ওপর গুরুত্বারূপ করেন। দুর্গম এলাকার শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ পরিকল্পনার মাধ্যমে শিক্ষা সেবা কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন তিনি। হাওর এলাকার শিক্ষক, শিক্ষাবিদ ও অভিভাবকের সাথে কথা বলে জানা যায়, বর্ষাকালে সব পানিতে তলিয়ে গেলে নৌকানির্ভর হয়ে পড়ে গোটা হাওরাঞ্চল। দুর্গম হাওরের একেকটা গ্রাম বিচ্ছিন্ন দ্বীপে পরিণত হয়। এ সময় পানিবন্দী মানুষ দৈনন্দিন কাজ সারতে নৌকাযোগে যত্রতত্র যেতে পারলেও প্রতিকূল আবহাওয়ায় চরম ভোগান্তির শিকার হয় ক্ষুদে শিক্ষার্থীরা। বর্ষায় ঝড়-বৃষ্টি, আফাল, বজ্রপাত ও নৌকাডুবির মতো ভয়ংকর ঝুঁকি নিয়ে নৌকায় করে হাওর ও নদী পাড়ি দিয়ে বিদ্যালয়ে আসা-যাওয়া করে বেশির ভাগ ছাত্রছাত্রী। ফলে পাঠ গ্রহণে অনীহা, শিখন ঘাটতি ও ঝরে পড়ার প্রবণতা দেখা দেয়। কোমলমতি ছাত্রছাত্রীদের ঝুঁকিমুক্ত যাতায়াত নিশ্চিতে নিরাপদ নৌযানের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের তাগিদ দেন শিক্ষা সচেতন মানুষেরা।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সুনামগঞ্জে প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে ১ হাজার ৪৭৩টি। এর মধ্যে সুনামগঞ্জ সদর উপজেলায় ১২৯টি, দোয়ারাবাজারে ১০৪টি, বিশ্বম্ভরপুরে ৭৮টি, ছাতকে ১৮৫টি, তাহিরপুরে ১৩৪টি, জামালগঞ্জে ১২৬টি, ধর্মপাশায় ১১০টি, শাল্লায় ১০৫টি, দিরাইয়ে ১৬৩টি, জগন্নাথপুরে ১৫৮টি, শান্তিগঞ্জে ৯৭টি ও মধ্যনগরে ৮৪টি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। সুনামগঞ্জের বেশির ভাগ বিদ্যালয় দুর্গম এলাকায় অবস্থিত।
মধ্যনগর উপজেলার রংচি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, দক্ষিণ আমজোড়া নূরুনাহার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, আমজোড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। তাহিরপুর উপজেলার জয়পুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, সাহেবনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। জামালগঞ্জ উপজেলার হরিপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ফেনারবাঁক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। শাল্লা উপজেলার শান্তিপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ইয়ারাবাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও যাত্রাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ জেলার বেশির ভাগ বিদ্যালয় বর্ষায় জলাবদ্ধতার দুর্ভোগে পতিত হয়। শাল্লা উপজেলার বাহাড়া ইউনিয়নের ভেড়াডহর হাওর এলাকায় মির্জাকান্দা নতুন হাটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও মির্জাকান্দা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবস্থান। দুই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের একটিতে শিক্ষার্থী আছে ৭৬ জন ও অন্যটিতে ৯৪ জন। হাওরের মাঝ বরাবর খ- খ- পাড়া মিলে মির্জাপুর গ্রাম। উপজেলা সদর থেকে প্রায় দশ কিলোমিটার দূরের ওই গ্রামের সব ছাত্রছাত্রী অসচেতন ও দরিদ্র পরিবারের। তারা নিজেরা নৌকা বেয়ে স্কুলে আসা-যাওয়া করে। ঝড়-বৃষ্টি থাকলে উপস্থিতি কমে যায় বলছেন শিক্ষক ও স্থানীয়রা। বিদ্যালয়ের পার্শ্ববর্তী নতুন হাটির সাইদুর রহমানের তিন ছেলেমেয়ে। ছোট ছেলে আইজুল প্রথম শ্রেণির ছাত্র। একমাত্র মেয়ে রিয়া মনির পড়ালেখা চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত সমাপ্ত। বড় ছেলে কোনরকম প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করলেও নানা বাধ্য-বাধকতায় শিক্ষাজীবন আর এগোয়নি।
স্কুলে যাওয়ার পথে বাড়ির পার্শ্ববর্তী প্রায় তিন’শ ফুট রাস্তায় মাটি ফেলার অনুরোধ জানিয়ে সাইদুর রহমান বলেন, কেউ পানি ভাইঙ্গা যায়। কেউ নৌকা দিয়া। স্কুলে আসা-যাওয়ার একটা নৌকা দিলে খুব ভালো হয়। মির্জাকান্দা নতুন হাটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক চমক কান্তি তালুকদার বলেন, আমরা এক্কেবারে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। চারপাশে শুধু পানি। ছাত্রছাত্রীরা নৌকা বেয়েই স্কুলে আসে। আবহাওয়া খারাপ থাকলে ছাত্ররা তেমন আসে না।
লামাগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবস্থান তাহিরপুরের টাঙ্গুয়ার হাওরপাড়ে। ১৪২ জন ছাত্রছাত্রী পড়ালেখা করছে ওই বিদ্যালয়ে। ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক নাসরিন আক্তারের ভাষ্য, আবহাওয়া খারাপ থাকলে অনেক ছাত্রছাত্রী স্কুলে আসে না। নানা সমস্যার কথা উল্লেখ করে নাসরিন আক্তার বলেন, ছাত্রছাত্রী নিজেরা নৌকা বেয়ে ও সাঁকো পার হয়ে অনেকটা ঝুঁকি নিয়ে বিদ্যালয়ে আসে। ঝড়-বৃষ্টিসহ নানা দুর্যোগের মুখোমুখী হতে হয় তাদের। সরকারিভাবে নৌকার ব্যবস্থা করতে পারলে ঝুঁকি এড়ানো অনেকটা সম্ভব। লামাগাঁও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী মো. আরিফ ও ইসরাত জাহান নোহা জানিয়েছেন, তাদেরকে নৌকা বেয়ে ও সাঁকো পার হয়ে বিদ্যালয়ে আসতে হয়। অনেকের নৌকা নেই। দিন খারাপ থাকলে তারা আসে না। বৃষ্টি থাকলে বইপত্র ও কাপড়চোপড় ভিজে যায়। ভেজা শরীরে ক্লাস করতে হয় বলে জানিয়েছেন তারা। রংচি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মহেন্দ্র চন্দ্র সরকার বলেন, শিশু ছাত্রছাত্রীরা হরহামেশাই ঝুঁকি নিয়ে বিদ্যালয়ে আসে। তাদের স্কুলে যাতায়াতের মাধ্যম একমাত্র নৌকা। হাওরপাড়ের শিক্ষার্থীদের সুরক্ষায় প্রয়োজন সরকারি বিশেষ উদ্যোগ। সুনামগঞ্জ পৌর কলেজের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক চিত্তরঞ্জন তালুকদার বলেন, প্রকৃতিনির্ভর জীবন-জীবিকা বাদ দিলে সামনে চলে আসে হাওরের দুর্যোগপূর্ণ শিক্ষা পরিস্থিতি। বর্ষায় প্রতিকূল আবহাওয়ার মাঝে নৌকা বেয়ে বিদ্যালয়ে যায় শিশুরা। নৌকাডুবি, ঝড়-ঝাপ্টা ও বজ্রপাতের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ঝুঁকিমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিতে বর্ষা মৌসুমের মাসছয়েক বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণের পাশাপাশি নিরাপদ নৌযানের ব্যবস্থা করা জরুরি। না হলে দিন দিন শিক্ষার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে শিক্ষার্থীরা।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহন লাল দাস বলেন, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী মহোদয় তাহিরপুরের চারটি বিদ্যালয় পরিদর্শন করেছেন। হাওর এলাকার শিক্ষার বিভিন্ন সমস্যা উনাকে বলা হয়েছে। বর্ষাকালে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের ঝুঁকিপূর্ণ যাতায়াতের বিষয়টি তিনি অবহিত হয়েছেন। আশা করি এ ব্যাপারে উদ্যোগ নেওয়া হবে।

সম্পাদকীয় :

  • সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি : মো. জিয়াউল হক
  • সম্পাদক ও প্রকাশক : বিজন সেন রায়
  • বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : মোক্তারপাড়া রোড, সুনামগঞ্জ-৩০০০।

অফিস :

  • ই-মেইল : [email protected]
  • ওয়েবসাইট : www.sunamkantha.com