সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলের শিশুরা আজও বিদ্যালয়ে যেতে জীবনের ঝুঁকি নেয় - এ বাস্তবতা স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী পরও আমাদের জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়। যখন দেশের শিক্ষা, যোগাযোগ ও প্রযুক্তি খাতে উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন হয়েছে, তখন হাওরের কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ঝড়-বৃষ্টি, বজ্রপাত, নৌকাডুবি ও উত্তাল ঢেউয়ের সঙ্গে লড়াই করে বিদ্যালয়ে যেতে হওয়া উন্নয়নের অসম বাস্তবতাকেই সামনে আনে।
বর্ষাকালে হাওরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়। গ্রামগুলো বিচ্ছিন্ন দ্বীপে পরিণত হয়। তখন বিদ্যালয়ে যাতায়াতের একমাত্র ভরসা ছোট ছোট নৌকা, যেগুলোর অধিকাংশই নিরাপত্তাহীন। অনেক ক্ষেত্রে শিশুরা নিজেরাই বৈঠা বেয়ে বিদ্যালয়ে যায়, আবার কেউ কেউ সাঁকো পার হয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পথে চলাচল করে। বৈরি আবহাওয়ায় উপস্থিতি কমে যায়, পাঠদান ব্যাহত হয় এবং ধীরে ধীরে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিদ্যালয়বিমুখতা ও ঝরে পড়ার প্রবণতা বাড়ে। এটি শুধু একটি শিক্ষা-সংকট নয়; এটি শিশুদের নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ নিয়েও বড় প্রশ্ন।
সম্প্রতি প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রীর হাওরাঞ্চল পরিদর্শন এবং বিশেষ পরিকল্পনার আশ্বাস ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে হাওরের বাস্তবতা বিবেচনায় কেবল আশ্বাস যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ। কারণ প্রতিবছর একই সমস্যার পুনরাবৃত্তি হলেও স্থায়ী সমাধান এখনো অধরাই রয়ে গেছে।
হাওরাঞ্চলের জন্য আলাদা শিক্ষা পরিকল্পনা গ্রহণের সময় এসেছে। প্রথমত, শিক্ষার্থীদের জন্য সরকারিভাবে নিরাপদ স্কুল নৌযান চালু করতে হবে। প্রতিটি ঝুঁকিপূর্ণ বিদ্যালয়ে লাইফ জ্যাকেট, প্রশিক্ষিত মাঝি এবং প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সরঞ্জাম নিশ্চিত করা জরুরি। দ্বিতীয়ত, বিদ্যালয়ে যাতায়াতের সংযোগ সড়ক, ঘাট ও সাঁকোগুলোর উন্নয়ন করতে হবে। তৃতীয়ত, বর্ষা মৌসুমে পাঠদানের বিকল্প ব্যবস্থা, নমনীয় শিক্ষাসূচি ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা কার্যক্রম চালুর বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। পাশাপাশি শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য দুর্যোগকালীন বিশেষ সহায়তা ব্যবস্থাও গড়ে তুলতে হবে।
হাওরের শিশুরা অন্য অঞ্চলের শিশুদের তুলনায় কম মেধাবী নয়; তারা কেবল বৈরী প্রকৃতি ও অবকাঠামোগত বৈষম্যের শিকার। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো তাদের জন্য সমান ও নিরাপদ শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা। নিরাপদ স্কুলযাত্রা নিশ্চিত করা গেলে শুধু দুর্ঘটনার ঝুঁকিই কমবে না, বিদ্যালয়ে উপস্থিতি বাড়বে, ঝরে পড়া কমবে এবং হাওরাঞ্চলের শিক্ষা ব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
শিক্ষা একটি মৌলিক অধিকার। সেই অধিকার প্রতিষ্ঠায় কোনো শিশুকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিদ্যালয়ে যেতে হবে - এমন বাস্তবতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। তাই হাওরাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সমন্বিত ও দ্রুত উদ্যোগ এখন সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দাবি।