সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে গরু চুরির ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে গেছে। গত এক মাসে জামালগঞ্জ ও বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম থেকে অর্ধশতাধিক গরু চুরির খবর নিছক কিছু বিচ্ছিন্ন অপরাধের ঘটনা নয়; এটি হাওরাঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকা ও নিরাপত্তার ওপর সরাসরি আঘাত। স্থানীয়দের হিসাবে চুরি যাওয়া গরুগুলোর আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় অর্ধকোটি টাকা। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বহু পরিবারের সঞ্চয়, শ্রম ও ভবিষ্যতের স্বপ্ন।
হাওরাঞ্চলের মানুষের কাছে গরু কেবল একটি গৃহপালিত প্রাণী নয়। কৃষিকাজের পাশাপাশি গরু পালন বহু পরিবারের অন্যতম আয়ের উৎস। বছরের পর বছর কষ্ট করে একটি বা দুটি গরু লালন-পালন করে অনেক পরিবার প্রয়োজনের সময়ে তা বিক্রি করে সংসারের ব্যয় মেটায়, সন্তানের পড়াশোনা কিংবা চিকিৎসার খরচ চালায়। সেই গরু রাতের আঁধারে চুরি হয়ে গেলে ক্ষতির পরিমাণ শুধু বাজারমূল্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; একটি পরিবার অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, চোরেরা হাওরের ভৌগোলিক বাস্তবতাকে কাজে লাগাচ্ছে। ইঞ্জিনচালিত দ্রুতগতির নৌকা নিয়ে রাতের অন্ধকারে তারা এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে যাচ্ছে। বাড়ির পেছনে নৌকা ভিড়িয়ে গোয়ালঘর থেকে গরু নিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে। পরে দূরবর্তী হাটে এসব গরু বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের ধারণা, কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্থানীয় সহযোগিতা ছাড়া দূরের চোরচক্রের পক্ষে এভাবে ধারাবাহিকভাবে চুরি করা সম্ভব নয়। ফলে শুধু চোর ধরলেই হবে না, চুরির সঙ্গে স্থানীয়ভাবে জড়িত বা সহযোগিতাকারীদেরও চিহ্নিত করতে হবে।
আরও হতাশাজনক হলো, গরু চুরির ধারাবাহিক ঘটনার পরও অনেক ভুক্তভোগী থানায় অভিযোগ করতে আগ্রহী নন। একটি গ্রামের মানুষ জানিয়েছেন, আগে গরু চুরি করে জিডি করেও কোনো ফল না পাওয়ায় এবার তাঁরা পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করেননি। এই মনোভাব আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। কারণ, অভিযোগ না করলে অপরাধের প্রকৃত চিত্র প্রশাসনের নথিতে উঠে আসে না; আর অপরাধীরা আরও উৎসাহিত হয়।
পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, কেউ অভিযোগ নিয়ে আসেনি। অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আইনগতভাবে অভিযোগের গুরুত্ব অবশ্যই রয়েছে। কিন্তু একটি এলাকায় ধারাবাহিকভাবে একই ধরনের অপরাধ ঘটতে থাকলে শুধু অভিযোগের অপেক্ষায় বসে থাকা যথেষ্ট নয়। পুলিশের গোয়েন্দা তৎপরতা, নৌপথে টহল, চোরাই গরু বিক্রির সম্ভাব্য হাট ও পরিবহনপথে নজরদারি এবং আন্তঃথানা সমন্বিত অভিযান প্রয়োজন। অপরাধ প্রতিরোধের দায়িত্ব কেবল ভুক্তভোগীর অভিযোগের ওপর নির্ভর করতে পারে না।
হাওরাঞ্চলের বিশেষ ভৌগোলিক অবস্থার কারণে এখানে প্রচলিত পুলিশি টহলের পাশাপাশি নৌপুলিশিং জোরদার করা জরুরি। রাতের বেলায় ঝুঁকিপূর্ণ নৌপথ ও গরু চুরিপ্রবণ গ্রামগুলো চিহ্নিত করে নিয়মিত টহল দিতে হবে। চোরাই গরু কোন কোন হাটে যাচ্ছে, কারা সেগুলো কিনছে কিংবা বিক্রি করছে - সেই নেটওয়ার্কও তদন্তের আওতায় আনতে হবে। প্রয়োজন হলে পার্শ্ববর্তী উপজেলা ও জেলার পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করতে হবে।
একই সঙ্গে গ্রামবাসীকেও সংগঠিত উদ্যোগ নিতে হবে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, পুলিশ ও গ্রামবাসীর সমন্বয়ে রাতের পাহারা, সন্দেহজনক নৌযান স¤পর্কে দ্রুত তথ্য আদান-প্রদান এবং জরুরি যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে। তবে গ্রামবাসীকে নিজেরাই আইন হাতে তুলে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া যাবে না। সন্দেহভাজন কাউকে আটক বা শাস্তি দেওয়ার দায়িত্ব পুলিশেরই।
গরু চুরির ঘটনাকে ছোটখাটো অপরাধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। একের পর এক গরু চুরি চলতে থাকলে মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা বাড়বে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর আস্থার সংকট তৈরি হবে এবং হাওরাঞ্চলের ক্ষুদ্র ও নি¤œআয়ের পরিবারগুলো আরও বেশি অর্থনৈতিক ঝুঁকিতে পড়বে।
আমরা আশা করি, সংশ্লিষ্ট থানা ও জেলা পুলিশ বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেবে। গরু চুরির ঘটনাগুলোকে একত্রে বিশ্লেষণ করে একটি সংঘবদ্ধ চক্রের অস্তিত্ব আছে কি না, তা খুঁজে বের করতে হবে। শুধু চুরি যাওয়া গরু উদ্ধার নয়, এর পেছনের মূল হোতাদের গ্রেপ্তার এবং স্থানীয় সহযোগীদের আইনের আওতায় আনাই হতে হবে তদন্তের লক্ষ্য।