মার্চে শুরু, মে-তে চূড়ায়, বজ্রপাতে সবচেয়ে ঝুঁকিতে হাওরাঞ্চল

আপলোড সময় : ১৪-০৮-২০২৬ ০৭:৫১:২০ পূর্বাহ্ন , আপডেট সময় : ১৪-০৮-২০২৬ ০৭:৫১:২০ পূর্বাহ্ন
ড. মো. ফোরকান আলী বাংলাদেশে বজ্রপাত এখন আর শুধু মৌসুমি প্রাকৃতিক ঘটনা নয়। ক্রমেই তা বড় জননিরাপত্তা সংকটে রূপ নিচ্ছে। উন্নত পূর্বাভাস প্রযুক্তি ও সতর্কবার্তা ব্যবস্থা চালু হলেও মাঠপর্যায়ে প্রাণহানি কমানোর বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়ে গেছে। সময়মতো মানুষের কাছে বার্তা পৌঁছে দেওয়া। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে দেশের হাওরাঞ্চল। বিস্তীর্ণ খোলা প্রান্তর, মৌসুমি কৃষিকাজ, জলাভূমি নির্ভর জীবিকা, উন্মুক্ত পরিবেশে দীর্ঘ সময় অবস্থান এবং পর্যাপ্ত নিরাপদ আশ্রয়ের অভাবে নেত্রকোণা, সুনামগঞ্জ ও মৌলভীবাজার এখন বজ্রপাতের ‘হটস্পট’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের তথ্য ও পর্যবেক্ষণ বলছে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, পরিবর্তিত মৌসুমি আচরণ এবং সীমিত প্রস্তুতির কারণে এসব এলাকায় বজ্রপাতজনিত প্রাণহানির ঝুঁকি অন্য অঞ্চলের তুলনায় বেশি রয়ে গেছে। বজ্রপাতের ফ্ল্যাশের ভোল্টেজ কত জানেন? দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের (ডিডিএম) তথ্য ও বৈশ্বিক পরিসংখ্যান পর্যালোচনায় দেখা যায়, বাংলাদেশে প্রতি বর্গকিলোমিটারে বছরে গড়ে ৮২ দশমিক ৪৪টি বজ্রপাত ঘটে। বিশ্বের কিছু দেশে বজ্রপাতের ঘনত্ব আরও বেশি হলেও উন্নত অবকাঠামো, কার্যকর আগাম সতর্কতা ও নিরাপদ আশ্রয়ব্যবস্থার কারণে প্রাণহানি তুলনামূলক কম। যার মধ্যে রয়েছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দ্বীপরাষ্ট্র সিঙ্গাপুর। এখানে বজ্রপাতের ঘনত্ব বেশি হলেও উন্নত অবকাঠামো, আগাম সতর্কতা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার কারণে প্রাণহানি তুলনামূলকভাবে খুব কম। বিপরীতে বাংলাদেশে বজ্রপাতের সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছেন খোলা মাঠে কাজ করা কৃষক, জেলে ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। সংশ্লিষ্ট গবেষণা বলছে, দক্ষিণ এশিয়ায় মোট মৃত্যুর সংখ্যায় বড় আয়তনের দেশ ভারত এগিয়ে থাকলেও আয়তনের তুলনায় বজ্রপাতজনিত মৃত্যুঝুঁকিতে বাংলাদেশ উদ্বেগজনক অবস্থানে রয়েছে। প্রতি ১ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকায় বজ্রপাতজনিত মৃত্যুহারে বাংলাদেশের অবস্থান শীর্ষে রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে গবেষণা করা রিজিওনাল ইন্টিগ্রেটেড মাল্টি-হ্যাজার্ড আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেমের (রাইমস) গবেষক গোলাম রাব্বানী জানান, একক কোনো স্থানের হিসাব বিবেচনায় বৈশ্বিকভাবে ভেনেজুয়েলার লেক মারাকাইবো (বছরে প্রতি বর্গকিলোমিটারে ২৩৩টি ফ্ল্যাশ নিয়ে) বিশ্বের সর্বোচ্চ বজ্রপাতঘন অঞ্চলগুলোর একটি। আর বাংলাদেশের মধ্যে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ উপজেলা, যেখানে বার্ষিক ফ্ল্যাশের সংখ্যা ১০৩। এছাড়া সুনামগঞ্জ সদর ও বিশ্বম্ভরপুর উপজেলাও উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার তালিকায় রয়েছে। বিপরীতে দেশের দক্ষিণ ও পশ্চিমাঞ্চলের কিছু জেলা তুলনামূলক কম বজ্রপাতপ্রবণ। গবেষকদের ভাষায় এগুলো ‘কোল্ডস্পট’। সবচেয়ে কম বজ্রপাত হয় ঝালকাঠি, পিরোজপুর, পটুয়াখালী ও ঝিনাইদহ জেলায়। উপজেলা হিসেবে রাজাপুর, কাঁঠালিয়া ও মঠবাড়িয়াকে তুলনামূলক কম ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। মার্চে শুরু, মে মাসে চূড়ায় : বাংলাদেশে বজ্রপাতের মাসভিত্তিক প্রবণতা বিশ্লেষণে দেখা যায়, জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে সংখ্যা কম থাকলেও মার্চ থেকে তা বাড়তে শুরু করে। এপ্রিলে তা তীব্র হয়, আর মে মাসে পৌঁছায় সর্বোচ্চ পর্যায়ে। এরপর জুন-জুলাইয়ে কমতে শুরু করে। সেপ্টেম্বরে আবার কিছুটা বাড়ে। বজ্রপাত থেকে রক্ষা পেতে যা করা জরুরি : আন্তর্জাতিক আবহাওয়া প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান আর্থ নেটওয়ার্কসের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে মোট পালস কাউন্ট বা বজ্রঝলক মে মাসে হয় সর্বোচ্চ। মার্চ থেকে জুলাই পর্যন্ত সময়টিই এর জন্য সবচেয়ে সক্রিয় মৌসুম। এ প্রবণতার সঙ্গে মিলে যায় প্রাণহানির তথ্যও। গত ১৫ বছরের বড় বড় মৃত্যুর ঘটনাগুলোর বেশির ভাগই এপ্রিল, মে বা জুনে ঘটেছে। এক দিনের বড় প্রাণহানি : ইতিহাস যা বলছে, বাংলাদেশে বজ্রপাতে নিহত-আহত ব্যক্তিদের সংখ্যা নিয়মিত নথিভুক্ত করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন ফর ডিজাস্টার ফোরাম (বিএফডিএফ)। প্রতিষ্ঠানটির তথ্যে এক দিনে বজ্রপাতে বড় প্রাণহানির কয়েকটি ঘটনা পাওয়া গেছে। তাতে দেখা যায়, এক দিনে সর্বোচ্চসংখ্যক মৃত্যুর ঘটনাটি ঘটেছে ২০১১ সালের ২৩ মে, ৫৮ জন। ২০১৬ সালের ১২ ও ১৩ মে দুই দিনে ৮৭ জন নিহত হয়েছিলেন। দুই দিনে ৩৩ জন নিহত হন ২০১৪ সালের ১৩ ও ১৪ আগস্ট। এছাড়া ২০২১ সালের ৬ জুন ৩৭ জন, ২০১৩ সালের ৬ মে ৩৩ জন, ২০২৪ সালের ৪ জুন ২৯ জন, ২০১৮ সালের ১০ মে ২৯ জন, ২০২২ সালের ১৭ জুন ২৪ জন, ২০২৩ সালের ২৩ মে ২৩ জন, ২০২৫ সালের ২৮ এপ্রিল ২২ জন, ২০১২ সালের ৬ এপ্রিল ২০ জন, ২০১৫ সালের ২ মে ১৯ জন, ২০১৭ সালের ৯ মে ১৬ জন, ২০১৯ সালের ৭ জুলাই ১৫ জন, ২০২৪ সালের ৬ মে ১৫ জন, ২০২৬ সালের ২৬ এপ্রিল ১৪ জন নিহত হন বজ্রপাতে। অপরদিকে এই তালিকা বলছে, বজ্রপাতের বড় ট্র্যাজেডি ঘুরেফিরে বছরের একই সময়ে হচ্ছে। সরকারের অন্য এক পরিসংখ্যান বলছে, ১ যুগে ৩৮৬০ মৃত্যু, কমছে কি প্রাণহানি? সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালে বজ্রপাতকে জাতীয় দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, গত এক যুগে দেশে বজ্রপাতে মোট ৩ হাজার ৮৬০ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে। বছরভিত্তিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৫ সালে ২২৬ জন, ২০১৬ সালে ৩৯১ জন, ২০১৭ সালে ৩৮৮ জন, ২০১৮ সালে ৩৫৯ জন, ২০১৯ সালে ৪০১ জন, ২০২০ সালে ৪২৭ জন, ২০২১ সালে ৩৬৩ জন, ২০২২ সালে ৩৩৭ জন, ২০২৩ সালে ৩২২ জন, ২০২৪ সালে ২৭১ জন, ২০২৫ সালে ২৪৩ জন এবং ২০২৬ সালের ১৪ জুন পর্যন্ত ১৩২ জন মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। উপাত্ত পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সাম্প্রতিক কয়েক বছরে মৃত্যুর সংখ্যা কিছুটা কমতির দিকে। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বজ্রপাতের তীব্রতা ও প্রবণতা কমছে নাকি বাড়ছে-এ নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে এখনো গবেষণা ও আলোচনা চলছে। যদিও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মৃত্যুর সংখ্যা কিছুটা কমলেও মাঠপর্যায়ের ঝুঁকি এখনো উল্লেখযোগ্যভাবে রয়ে গেছে। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের জ্যেষ্ঠ আবহাওয়াবিদ ড. আবুল কালাম মল্লিক বলেন, দেশে বজ্রপাত সারা বছরই কমবেশি হয়। তবে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটে মার্চ, এপ্রিল ও মে মাসে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেশে মোট বজ্রপাতের প্রায় ৩৮ শতাংশ এই সময়ে ঘটে। অন্যদিকে জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ে ঘটে প্রায় ৫১ শতাংশ বজ্রপাত। অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে এ হার প্রায় ৮ শতাংশ এবং ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারিতে প্রায় ২-৩ শতাংশ। তিনি বলেন, সংখ্যায় কম হলেও মার্চ থেকে মে সময়ের বজ্রপাত তুলনামূলক বেশি শক্তিশালী ও প্রাণঘাতী হয়ে থাকে। তবে আবহাওয়াবিদদের নতুন উদ্বেগের জায়গা হয়ে উঠেছে জলবায়ু পরিবর্তন। আবহাওয়া অধিদপ্তরের জলবায়ু মহাশাখার উপপরিচালক ড. রাশেদুজ্জামান বলেন, আগে বজ্রপাতের প্রকোপ মূলত প্রাক-বর্ষা মৌসুমে বেশি থাকলেও ২০১৬ সালের পর থেকে বর্ষা মৌসুমেও বজ্রপাতের প্রবণতা ও এর প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তিনি বলেন, বঙ্গোপসাগর থেকে আসা গরম ও আর্দ্র বায়ু এবং উত্তর দিকের অপেক্ষাকৃত ঠান্ডা বায়ুর পার¯পরিক ক্রিয়ায় বড় আকারের বজ্রমেঘ তৈরি হয়। বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে বাতাসে জলীয় বা®েপর উপস্থিতি বাড়ায় এই প্রক্রিয়ার তীব্রতাও বাড়তে পারে বলে বিভিন্ন পর্যবেক্ষণে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। ড. রাশেদুজ্জামান বলেন, দেশে প্রতি বছর গড়ে ৩০০ এর বেশি মানুষ বজ্রপাতে মারা যান। ঘূর্ণিঝড়সহ অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের পাশাপাশি বজ্রপাতও এখন বড় জননিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তাই আগাম সতর্কবার্তা দ্রুত মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি আচরণগত সচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে সংশ্লিষ্টরা। [ড. মো. ফোরকান আলী , গবেষক ও সাবেক অধ্যক্ষ]

সম্পাদকীয় :

  • সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি : মো. জিয়াউল হক
  • সম্পাদক ও প্রকাশক : বিজন সেন রায়
  • বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : মোক্তারপাড়া রোড, সুনামগঞ্জ-৩০০০।

অফিস :

  • ই-মেইল : [email protected]
  • ওয়েবসাইট : www.sunamkantha.com