হাওরে শিক্ষক সংকট : কারণ ও প্রতিকার

আপলোড সময় : ১৭-০৮-২০২৬ ০৮:৫০:১৫ পূর্বাহ্ন , আপডেট সময় : ১৭-০৮-২০২৬ ০৮:৫১:৩৮ পূর্বাহ্ন
প্রফেসর মোঃ শাহাদত হোসেন:
বাংলাদেশে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকট পুরোনো কথা। দেশে প্রায় ১,১৮,৬০৭টি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। তন্মধ্যে ৬৫,৫৬৯টি সরকারি ও ৫৩,০৩৮টি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। আমাদের মূল আলোচনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। দেশের ৬৫,৫৬৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৩,৭৬,৪৮৯ জন শিক্ষক রয়েছেন। আর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে পড়াশোনা করছে ১,০৬,১৭,৯৬২ জন শিক্ষার্থী। অন্যদিকে ৫৩,০৩৮টি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৯৫,৬৫,০৮৬ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে ৩,৩০,৭২৭ জন শিক্ষক রয়েছেন। দৈনিক প্রথম আলোর এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে প্রায় ৩৫ হাজার শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে। এর মানে হলো বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী সঠিক শিক্ষা কার্যক্রম থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। বিশেষ করে হাওরাঞ্চলের শিক্ষার্থীরা। কেননা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকের পদ হাওরাঞ্চলের বিদ্যালয়গুলোতেই শূন্য থাকে বেশি। অপ্রতুল যোগাযোগ ব্যবস্থা, আবাসনের সংকট প্রভৃতি কারণে হাওরাঞ্চলে কোন শিক্ষক পোস্টিং নিতে চাননা। কাউকে সেখানে পদায়ন করা হলেও কয়েক বছরের মধ্যেই তদবির করে তিনি উপজেলা সদর বা হাইল্যান্ডের কোন স্কুলে চলে আসেন। এই লেখা যখন লিখছি তখন সুনামগঞ্জ জেলার ধর্মপাশা উপজেলার সরিষাকান্দা ইসলামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঁচটি পদের বিপরীতে মাত্র দু’জন শিক্ষক কর্মরত আছেন। এ থেকেই হাওরের স্কুলগুলোর সার্বিক অবস্থা অনুধাবন করা যায়। কয়েকদিন আগে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. লাল হোসেনের সাথে আলাপ হচ্ছিলো। স্বাভাবিকভাবেই প্রাথমিক শিক্ষা নিয়ে। আলাপচারিতায় তিনি জানালেন যে, হাওরের প্রত্যন্ত স্কুলগুলোতে শিক্ষক সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। এই সমস্যা সমাধানকল্পে স্কুলগুলোর সাথে হোস্টেল সুবিধা নিশ্চিত করা আবশ্যক। এসব হোস্টেলে শিক্ষার্থী ছাড়াও শিক্ষকদের জন্যও আবাসন ব্যবস্থা থাকতে হবে। তার এই মতামত শুনে খুবই ভালো লাগলো। উপজেলা সদর থেকে ৩/৪ কিলোমিটার দূরে হাওরের প্রত্যন্ত অঞ্চলের স্কুলগুলোতে শিক্ষকদের বিদ্যালয়ে উপস্থিতি ও অবস্থানের হার খুবই কম। সেজন্য আমরা বরাবরই শিক্ষকদের দায়ী করে থাকি। কিন্তু এর প্রকৃত কারণ খুঁজে দেখি না, সমাধানেরও চেষ্টা করি না। উল্লেখ্য যে, বর্তমানে হাওরের প্রত্যন্ত গ্রামে শিক্ষকদের থাকার কোন ব্যবস্থা নেই। অতীতে গ্রামে লজিং প্রথা প্রচলিত ছিল। অবস্থাসম্পন্ন পরিবারগুলো তাদের সন্তানদের লেখাপড়ার জন্য বাড়িতে স্থায়ীভাবে শিক্ষক রাখতেন। তারা থাকা খাওয়ার বিনিময়ে বাড়ির সন্তানদের পড়াতেন। লজিং মাস্টারগণ কিছু সম্মানীও পেতেন। আশি-নব্বইয়ের দশকেও স্কুলের শিক্ষকদেরকে লজিং নেয়ার জন্য গ্রামের স্বচ্ছল পরিবারগুলোর মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা চলতো। কোন স্কুলে নতুন কোন শিক্ষক পদায়িত হলে তাকে কে লজিং মাস্টার হিসেবে নিতে পারবে সেজন্য প্রতিযোগিতা কখনো কখনো এতটাই তীব্র হতো যে তা কখনো কখনো গোষ্ঠীগত ঝগড়ায় পরিণত হতো। কিন্তু বর্তমানে সে ব্যবস্থা আর নেই। আর্থিক দুরবস্থা, ঘরের সংকট, পরিবারের নিরাপত্তা প্রভৃতি নানা কারণে এখন আর কেউ লজিং রাখে না। গ্রামের মানুষও এখন তাদের ছেলেমেয়েদেরকে টিউটরের কাছে বা কোচিং সেন্টারে পাঠিয়ে লেখাপড়া করায়। কেউ কেউ সন্তানের জন্য টিউটর রাখেন, তবে কেউ আর লজিং রাখেন না। অন্যদিকে হাওরাঞ্চলের প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতে ভাড়া বাসাও পাওয়া যায় না। ফলে দূরের কোন গ্রামের কোন শিক্ষকের পক্ষে তার কর্মস্থলে অবস্থান করা সম্ভব হয় না। এমতাবস্থায় তাকে দূরের কোন গ্রাম থেকে বা উপজেলা সদর থেকে প্রতিদিন যাতায়াত করতে হয়। কিন্তু হাওরের যাতায়াত ব্যবস্থা কতটা ভয়াবহ সেটাতো আমাদের সবারই জানা। ‘বর্ষায় নাও, হেমন্তে পাও’ প্রবাদপ্রবচনটি হাওরের যাতায়াত ব্যবস্থাকে উদ্দেশ্য করেই রচিত হয়েছে। হেমন্তে মোটর সাইকেল, ফেরি ও পায়ে হেঁটে স্কুলে পৌঁছতে পৌঁছতে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের শক্তি ও কর্মস্পৃহা দুটোই নিঃশ্বেষ হয়ে যায়। আর বর্ষায়? উত্তাল হাওর, কখনো প্রলংকারী ঢেউ, কখনো বৃষ্টি, কখনো ঝড়ের ঝুঁকি নিয়ে স্কুলে যাতায়াত করতে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেন প্রত্যেক শিক্ষক-শিক্ষিকা। অতিরিক্ত সচিব মো. লাল হোসেনের সাথে আলাপচারিতায় এসবই ছিল মূল বিষয়। তিনি এসব সমস্যা সমাধানকল্পে একটি প্রস্তাবনাও দিয়েছেন। আর তা হলো হাওরাঞ্চলের প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাথে হোস্টেল সুবিধা নিশ্চিত করা। নতুন ও অভিনব এ প্রস্তাবটি হাওরাঞ্চলের শিক্ষক সংকটের সমাধান করতে পারবে বলেই মনে করি। যেসব স্কুল উপজেলা সদর থেকে ৩/৪ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত শুধুমাত্র সেগুলোতেই এই সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে অর্থাৎ স্কুলের সাথেই হোস্টেল নির্মাণ করতে হবে। কেননা ব্যতিক্রম বাদে উপজেলা সদরের ৩/৪ কিলোমিটারের মধ্যে অবস্থিত স্কুলগুলোতে উপজেলা সদর থেকে সহজেই যাতায়াত করা সম্ভব। সম্প্রতি একটি সভায় অতিরিক্ত সচিব তার এই প্রস্তাবটি তুলে ধরেন। সেখানে উপস্থিত কর্মকর্তাবৃন্দ তার এই প্রস্তাবকে সাধুবাদ জানান। আমরা আশা করি ভবিষ্যতে সরকার এটি গ্রহণ করে হাওরাঞ্চলের প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে ভূমিকা রাখবে। আমিও মনে করি, হাওরাঞ্চলের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের আবাসন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে হাওরের শিক্ষাক্ষেত্রে যুগান্তকারী পরিবর্তন আসবে। আমাদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও হাওরের অভিভাবকদের এ বিষয়ে সোচ্চার হতে হবে। স্থানীয় প্রশাসন, সংসদ সদস্য ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীকে এ বিষয়ে অবহিত করতে হবে। জনগণের পক্ষ থেকে দাবি জোরালো হলে সরকার নিশ্চয় তা বিবেচনায় নিয়ে কার্যকর করবে।

[লেখক- প্রফেসর মোঃ শাহাদত হোসেন, অধ্যক্ষ, সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজ, সুনামগঞ্জ]

সম্পাদকীয় :

  • সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি : মো. জিয়াউল হক
  • সম্পাদক ও প্রকাশক : বিজন সেন রায়
  • বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : মোক্তারপাড়া রোড, সুনামগঞ্জ-৩০০০।

অফিস :

  • ই-মেইল : [email protected]
  • ওয়েবসাইট : www.sunamkantha.com