সুনামগঞ্জে লিগ্যাল এইডের কার্যক্রমে ব্যাপক অগ্রগতি

৭ মাসে ২২০৮ বিরোধ নিষ্পত্তি, বেড়েছে প্রি-কেস আবেদনের সংখ্যা, ৩৬ লাখ ৮৮ হাজার টাকা জরিমানা আদায়

আপলোড সময় : ২১-০৮-২০২৬ ০৬:৫৬:০০ পূর্বাহ্ন , আপডেট সময় : ২১-০৮-২০২৬ ০৬:৫৭:০৭ পূর্বাহ্ন
আকরাম উদ্দিন::
সুনামগঞ্জে লিগ্যাল এইডের মাধ্যমে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (এডিআর) কার্যক্রমে ব্যাপক অগ্রগতি হয়েছে। এক বছরের ব্যবধানে বিরোধ নি®পত্তির সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ১১ গুণ। জেলা লিগ্যাল এইড অফিসের জানুয়ারি-জুলাই ২০২৫ ও ২০২৬ সালের তুলনামূলক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম সাত মাসে যেখানে ২০১টি বিরোধ নিষ্পত্তি হয়েছিল, ২০২৬ সালের একই সময়ে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ২০৮টিতে। অর্থাৎ এক বছরে বিরোধ নিষ্পত্তি বেড়েছে ২ হাজার ৭টি। শতকরা হিসাবে এ প্রবৃদ্ধি প্রায় ৯৯৯ শতাংশ। জেলা লিগ্যাল এইড অফিস সূত্রে জানা গেছে, লিগ্যাল এইড সার্ভিসেস (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫ কার্যকর হওয়ার পর নির্দিষ্ট শ্রেণির বিরোধে বাধ্যতামূলক প্রাক-মামলা মধ্যস্থতা বা প্রি-কেস মিডিয়েশন চালু হওয়ায় এ কার্যক্রমে গতি এসেছে। মামলা আদালতে গড়ানোর আগেই বিরোধ নি®পত্তির সুযোগ তৈরি হওয়ায় সাধারণ মানুষের সময়, অর্থ ও ভোগান্তি কমানোর পাশাপাশি আদালতের ওপর মামলার চাপও কমানোর সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। প্রি-কেস আবেদনে ব্যাপক বৃদ্ধি : জেলা লিগ্যাল এইড অফিসের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত প্রি-কেস আবেদনের সংখ্যা ছিল ২৮৫টি। ২০২৬ সালের একই সময়ে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৮০৮টিতে। অর্থাৎ এক বছরে প্রি-কেস আবেদনের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ১০ গুণ। একই সময়ে প্রি-কেস মীমাংসার সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২৫ সালের প্রথম সাত মাসে ৯৪টি প্রি-কেস মীমাংসা হলেও ২০২৬ সালের একই সময়ে তা বেড়ে হয়েছে ৩৫৪টি। এসব মীমাংসার মাধ্যমে ২০২৫ সালের জানুয়ারি-জুলাই সময়ে ২ লাখ ৬৩ হাজার ৮৬৩ টাকা আদায় হয়েছিল। ২০২৬ সালের একই সময়ে আদায়ের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৬ লাখ ৮৮ হাজার টাকা। এছাড়া ২০২৬ সালের প্রথম সাত মাসে পোস্ট-কেস মীমাংসার মাধ্যমে আরও ৪৩টি বিরোধ নি®পত্তি হয়েছে। ২০২৫ সালের একই সময়ে পোস্ট-কেস মীমাংসায় কোনো নিষ্পত্তি ছিল না। বাড়ছে আইনগত সহায়তা ও পরামর্শ গ্রহণ : লিগ্যাল এইডের অন্যান্য কার্যক্রমেও অগ্রগতি দেখা গেছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারি-জুলাই সময়ে আইনগত সহায়তা গ্রহণকারীর সংখ্যা ছিল ২২৯ জন। ২০২৬ সালের একই সময়ে এ সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৯০৫ জন। একইভাবে আইনি পরামর্শ গ্রহণকারীর সংখ্যা ৮৬১ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৩৫৫ জনে। সব মিলিয়ে মোট উপকারভোগীর সংখ্যা ৬৮৭ থেকে বেড়ে ২০২৬ সালে হয়েছে ২ হাজার ৯৮২ জন। এছাড়া সচেতনতামূলক কার্যক্রমেও ব্যাপক সম্প্রসারণ ঘটেছে। ২০২৫ সালের প্রথম সাত মাসে চারটি সচেতনতামূলক অনুষ্ঠান হলেও ২০২৬ সালের একই সময়ে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৯টিতে। এসব কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যাও ১০৭ থেকে বেড়ে হয়েছে ২ হাজার ৮৫ জন। আদালতের বাইরে দ্রুত বিরোধ নিষ্পত্তির সুযোগ : সুনামগঞ্জের ভৌগোলিক বাস্তবতায় লিগ্যাল এইডের মাধ্যমে বিকল্প বিরোধ নি®পত্তির এই অগ্রগতি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। জেলার বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চলের প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের জন্য বারবার আদালতে যাতায়াত করা সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল। ফলে মামলা দায়েরের আগেই মধ্যস্থতার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির সুযোগ তৈরি হওয়ায় সাধারণ মানুষের সময় ও অর্থ দুটিই সাশ্রয় হচ্ছে। সুনামগঞ্জ জেলা লিগ্যাল এইড অফিসের মাধ্যমে দুস্থ, দরিদ্র ও আর্থিকভাবে অসচ্ছল ব্যক্তিদের বিনামূল্যে আইনগত সহায়তা, আইনি পরামর্শ এবং বিরোধ নিষ্পত্তির সেবা দেওয়া হয়। জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থার ব্যবস্থাপনায় যোগ্য ব্যক্তিদের বিভিন্ন ধরনের মামলায় আইনজীবী নিয়োগসহ প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হয়। পাশাপাশি মামলা দায়েরের আগে কিংবা মামলা চলমান অবস্থায় পক্ষগুলোর সম্মতির ভিত্তিতে মধ্যস্থতা ও আপস-মীমাংসার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়। যেসব বিষয়ে লিগ্যাল এইডে সহায়তা পাওয়া যায় : লিগ্যাল এইডের মাধ্যমে জমি-জমা, সম্পত্তি, পাওনা টাকা, চুক্তিসহ বিভিন্ন দেওয়ানি বিরোধে যোগ্য ব্যক্তিদের আইনগত সহায়তা দেওয়া হয়। আর্থিকভাবে অসচ্ছল আসামি বা ভুক্তভোগী যোগ্য হলে ফৌজদারি মামলাতেও আইনজীবী নিয়োগসহ সহায়তার ব্যবস্থা রয়েছে। এছাড়া বিবাহ, বিবাহবিচ্ছেদ, দেনমোহর, ভরণপোষণ, সন্তানের অভিভাবকত্বসহ পারিবারিক বিরোধ; নারী ও শিশু-সংক্রান্ত মামলা; মালিকানা, দখল, উত্তরাধিকারসহ জমি ও স¤পত্তি-সংক্রান্ত বিরোধেও আইনগত পরামর্শ ও সহায়তা পাওয়া যায়। কারাগারে থাকা আর্থিকভাবে অসচ্ছল ও আইনগত সহায়তার যোগ্য ব্যক্তিদের জন্যও আইনজীবী নিয়োগসহ প্রয়োজনীয় সহায়তার ব্যবস্থা রয়েছে। পাশাপাশি মামলা দায়েরের আগে কিংবা চলমান বিরোধে পক্ষগুলোর সম্মতিতে মধ্যস্থতার মাধ্যমে আপস-মীমাংসার উদ্যোগ নেওয়া হয়। বৃহ¯পতিবার সকালে বিচারপ্রার্থী রাফিনা বিবি বলেন, দীর্ঘদিনের বিরোধ লিগ্যাল এইডের মাধ্যমে অল্প সময়ের মধ্যেই সমাধান হয়েছে। এজন্য সংশ্লিষ্টদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই। বিচারপ্রার্থী সজল মিয়া বলেন, আমি একজন গরিব মানুষ। অনেক খোঁজখবর নিয়ে ও চিন্তাভাবনা করে জায়গা-সংক্রান্ত জটিলতা নিরসনের জন্য লিগ্যাল এইডে আবেদন করি। পরে বিষয়টি সুষ্ঠুভাবে সমাধান হয়েছে। দরিদ্র হয়েও লিগ্যাল এইডের মাধ্যমে সঠিক বিচার পেয়েছি। লিগ্যাল এইডের জুনিয়র স্পেশাল মেডিয়েটর আইনজীবী নূর আলম বলেন, দূর-দূরান্ত থেকে আসা অসহায় ও দরিদ্র মানুষ লিগ্যাল এইডের মাধ্যমে স্বল্প সময়ে বিভিন্ন ধরনের আইনগত সেবা পাচ্ছেন। প্রতিটি মানুষের কাছে সহজ পদ্ধতিতে, বিনামূল্যে ও স্বল্প সময়ে প্রয়োজনীয় সেবা পৌঁছে দিতে আমরা আন্তরিকভাবে কাজ করে যাচ্ছি। সুনামগঞ্জের লিগ্যাল এইডের ¯েপশাল মেডিয়েটর অ্যাডভোকেট আব্দুল হক বলেন, লিগ্যাল এইডের আইন সহায়তা কেন্দ্রে অসহায় ও হয়রানির শিকার মানুষ এসে ভালো সেবা পাচ্ছেন। একজন বিচারক ত্যাগ ও নিষ্ঠার মাধ্যমে সেবা প্রদানের যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। সুনামগঞ্জ জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার সিনিয়র সিভিল জজ মো. জুনাইদ বলেন, প্রাক-মামলা মধ্যস্থতার মাধ্যমে আদালতে মামলা দায়েরের আগেই অনেক বিরোধ নি®পত্তি করা সম্ভব হচ্ছে। এতে একদিকে নাগরিকের ভোগান্তি ও ব্যয় কমছে, অন্যদিকে আদালতের ওপর নতুন মামলার চাপও কমানোর সুযোগ তৈরি হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, পক্ষগুলোর সম্মতিতে স¤পাদিত মীমাংসাপত্র আইন অনুযায়ী কার্যকর ও বলবৎযোগ্য হওয়ায় এডিআর ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থাও ধীরে ধীরে বাড়ছে। উল্লেখ্য, সুনামগঞ্জ জেলা লিগ্যাল এইড অফিসের কার্যক্রম বর্তমানে চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ভবনে পরিচালিত হচ্ছে। আইনগত সহায়তা কিংবা বিরোধ নিষ্পত্তির প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্টদের নিকটস্থ লিগ্যাল এইড অফিসে যোগাযোগ করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

সম্পাদকীয় :

  • সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি : মো. জিয়াউল হক
  • সম্পাদক ও প্রকাশক : বিজন সেন রায়
  • বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : মোক্তারপাড়া রোড, সুনামগঞ্জ-৩০০০।

অফিস :

  • ই-মেইল : [email protected]
  • ওয়েবসাইট : www.sunamkantha.com