বিশ্বজিত রায়, হাওরাঞ্চল থেকে ফিরে:
হাওরবেষ্টিত সুনামগঞ্জের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকের অনুপস্থিতি, শিক্ষক স্বল্পতাসহ নানা অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও অবকাঠামোগত দুর্বলতায় ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষা কার্যক্রম। এতে ছাত্রছাত্রীদের পাঠভ্যাস পরিবর্তন, পড়ালেখায় অমনোযোগী ভাব ও ঝরেপড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সম্প্রতি সরেজমিনে ধর্মপাশা, জামালগঞ্জ ও তাহিরপুরের বেশ কয়েকটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে শিক্ষার বাস্তব চিত্র বেশ উদ্বেগজনক মনে হয়েছে। এ দুরাবস্থার জন্য কর্তৃপক্ষের দায়সারা কার্যক্রম, শিক্ষক ও অভিভাবকের দায়িত্বহীনতাই দায়ী বলছেন সচেতনমহল।
জামালগঞ্জের প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সাবেক সভাপতি ও অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক বিদ্যুৎ জ্যোতি চক্রবর্ত্তী বলেন, দূরের স্কুলগুলোতে পদায়ন না হওয়ায় শিক্ষার অবস্থা শোচনীয়।
অনিয়মতান্ত্রিকতাও অনেক ক্ষেত্রে দায়ী। শিক্ষক-অভিভাবকের সচেতনতার পাশাপাশি শিক্ষার মানোন্নয়নে দরকার শূন্যপদ পূরণ, তদারকি ও কঠোর জবাবদিহিতা।
সুনামগঞ্জ প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে ১ হাজার ৪৭৫টি। যেখানে পড়ালেখা করছে ৩ লাখ ১৯ হাজার ৫৪৯ জন শিক্ষার্থী। জেলায় ছাত্রছাত্রীদের ঝরে পড়ার হার ৮ দশমিক ১৭ শতাংশ। তবে বাস্তবতা ভিন্ন। পড়ালেখাহীন নিয়ম ভঙ্গের বিদ্যালয় : পাঠদানের সময় সকাল সাড়ে ৯টার বেশ পরেও তালাবদ্ধ থাকছে হাওরাঞ্চলের অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। আবার বিকাল ৪টায় ছুটির বেশ আগে বিদ্যালয় ত্যাগ করছেন অনেক শিক্ষক। মাঝখানে যে সময়টুকু শিক্ষার্থীরা পাচ্ছে তাতেও শিক্ষকের ঢের গাফিলতি আছে। সঠিক তদারকি ও জবাবদিহিতার অভাবে শিক্ষা কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
১১ আগস্ট সকাল ১০টায় গিয়ে তালাবদ্ধ পাওয়া যায় জামালগঞ্জের বেহেলী ইউনিয়নের যতীন্দ্রপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। বারান্দায় খেলারত শিক্ষার্থীদের ‘স্যার কয়জন?’ জিজ্ঞেস করলে- পার্শ্ববর্তী সুধীর দাস এগিয়ে এসে জানান, ‘শিক্ষক দুইজন। একজন গ্রামের, অন্যজন পাশের উলুকান্দি গ্রামের।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘কিয়ের স্কুলে আইয়ে! কিছুক্ষণ বইয়া যায় গা। ওই দেখইন, ছাত্ররা বইয়া রইছে। মাস্টরের খবর নাই।’
৩৭ শিক্ষার্থীর ওই বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক প্রাণনাথ চৌধুরীর বাড়ি এই গ্রামে। এ প্রতিবেদক তাঁর খোঁজ করলে ডেকে আনা হয় তাঁকে। এর আগে তড়িঘড়ি তালা খোলে অফিসকক্ষে ঢুকেন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক বিশ্বজিত তালুকদার। বিলম্বে স্কুল খোলার ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘আমি পাশের গ্রামের হলেও পরিবার নিয়ে জামালগঞ্জে থাকি। যে কারণে আসতে দেরি হয়েছে। প্রতিদিন যথাসময়েই স্কুল খোলা হয়।’
একই দিন বেলা সোয়া ২টায় তালাবদ্ধ পাওয়া যায় ধর্মপাশা উপজেলার ঘিরইল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। পার্শ্ববর্তী নৌকায় থাকা কিশোরদের প্রশ্ন করলে তারা জানায়- ‘আরও আগে স্কুল ছুটি দিয়ে স্যারেরা চলে গেছেন।’
মুঠোফোনে প্রধান শিক্ষক (ভারপ্রাপ্ত) মো. আব্দুর রাজ্জাক জানিয়েছেন, বিদ্যালয়ে ছাত্রছাত্রী ৮৭ জন। উপস্থিতি খুব কম। পরীক্ষায় অংশগ্রহণের তাগিদ দিতে তিন শিক্ষক তিন পাড়াতে গিয়েছিলেন। তাই একটু আগেই বিদ্যালয় ছুটি দেওয়া হয়েছে।
দুর্বল অবকাঠামো, ঝুঁকিপূর্ণ শিক্ষা : জেলার ১৮৭টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোগত অবস্থা খুবই নাজুক। দীর্ঘ ২৫ বছরেও বিদ্যালয়গুলোতে নির্মিত হয়নি কোন ভবন, এমন তথ্য শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয়ের। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ একেবারে উদাসীন অভিযোগ শিক্ষক ও অভিভাবকের।
১৭ আগস্ট সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, তাহিরপুরের মেঞ্জারগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবস্থা পড়ালেখার সম্পূর্ণ অনুপযোগী। ছাদ ও ওয়ালের পলেস্তারা উঠে খানাখন্দে রূপ নিয়েছে বিদ্যালয়ের সবক’টি কক্ষ। ছাদের বিমে দেখা দিয়েছে বড় ফাটল। এ সংক্রান্ত একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তড়িঘড়ি পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয় ভবনটি। ঝুঁকিপূর্ণ জেনেও পাঠ কার্যক্রম চলছে ভবনটিতে। বিদ্যালয়ের ভবন পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছে উল্লেখ করে প্রধান শিক্ষক মো. আবুল লেইছ জানিয়েছেন, টিনসেড ঘর নির্মাণে ৩ লাখ টাকা বরাদ্দের ঘোষণা দিলেও তাৎক্ষণিক ঘর বানানো সম্ভব না। বিদ্যালয়টিতে ২০২ জন ছাত্রছাত্রী অধ্যয়নরত। পরীক্ষার মুহূর্তে পাঠদান বন্ধ করে অন্যত্র যাওয়ারও সুযোগ নেই। সামনে পরীক্ষা থাকায় ঝুঁকি নিয়েই পড়ানো হচ্ছে। মেঞ্জারগাঁওয় গ্রামের মো. ফখরুল ইসলাম ও আবুল কাসেম বলেন, মারাত্বক ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা। টুকরা টুকরা হইয়া ভাইঙ্গা পড়তাছে। আগ থাইক্যা কোন ব্যবস্থা নেওয়া হইছে না। হুট কইরা খওয়া হইলো পরিত্যক্ত। পরীক্ষার মুহূর্তে বাচ্চা-কাচ্চারা এখন কই পড়ালেখা করবো? একই রকম অবস্থা জামালগঞ্জের উলুকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের। দুর্গন্ধময় ও ভাঙাচোরা শ্রেণিকক্ষে পাঠ নিতে দেখা যায় শিক্ষার্থীদের। প্রতিষ্ঠানের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সুধারঞ্জন তালুকদার জানিয়েছেন, তাঁর বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী ১০৯ জন। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে ঝুঁকি নিয়ে পাঠদান করতে হয়। বৃষ্টি দিলে ছাদ চুয়ে পানি পড়ে। মাসচারেক আগে ভবন নির্মাণের আবেদন করলেও সাড়া পাওয়া যায়নি। এ ব্যাপারে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহন লাল দাসের ভাষ্য, ঝুঁকিপূর্ণ বিদ্যালয়ের তালিকা অধিদপ্তরে পাঠানো হয়েছে। পিইডিপি ৫ প্রকল্পের আওতায় বিদ্যালয়গুলো পুনঃনির্মাণ করা হবে।
শূন্যপদে প্রাথমিকের নাজেহাল অবস্থা: প্রাক-প্রাথমিকসহ ছয়টি শ্রেণি আছে প্রায় প্রতিটি বিদ্যালয়ে। একজন শিক্ষক কোনো এক শ্রেণিতে পাঠদানে গেলে ফাঁকা থাকছে অন্য শ্রেণিকক্ষ। দু’একজন শিক্ষকে নামেমাত্র বিদ্যালয় খোলা হলেও প্রয়োজনীয় শিক্ষা পাচ্ছে না হাওরাঞ্চলের শিক্ষার্থীরা।
জেলার প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে প্রধান শিক্ষকের ১ হাজার ৪৭৫টি অনুমোদিত পদ থাকলেও কর্মরত ১ হাজার ২৪ জন। ৪৫১টি শূন্য পদের সবগুলো চলছে ভারপ্রাপ্ত দিয়ে। সহকারী শিক্ষকের ৭ হাজার ২৫৭টি অনুমোদিত পদের মধ্যে কর্মরত ৬ হাজার ৯৫ জন। শূন্য পদ ১ হাজার ১৬২টি। এর মধ্যে ৪৪টি বিদ্যালয়ে একজন, ১০১টি বিদ্যালয়ে ২ জন এবং ২০৯টি বিদ্যালয়ে ৩ জন শিক্ষক দিয়ে খুঁড়িয়ে চলছে কার্যক্রম।** ধর্মপাশা উপজেলার মহেশপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটিতে শিক্ষক আছে মাত্র একজন। উপজেলা সদর থেকে ১২ কিলোমিটার দূরত্বের ওই বিদ্যালয়ের পাঠদানসহ দাপ্তরিক কাজ একাই সামলাচ্ছেন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আল আমীন। কথা প্রসঙ্গে বলেন, ১৩২ ছাত্রছাত্রীর বিদ্যালয় একা চালানো কষ্টকর। ডেপুটেশনে একজন আছে। ছুটিতে থাকায় আজ আসেননি। শিক্ষক পদায়ন জরুরি।
পরিচয়ে অনিচ্ছুক এক অভিভাবক জানিয়েছেন, কম শিক্ষকে পড়ালেখা যা হওয়ার তাই হচ্ছে। এ অবস্থায় ভালো কিছু আশা করা যায় না।
অক্টোবর মাসে নতুন শিক্ষক পদায়ন হলে সংকট কিছুটা কমবে উল্লেখ করে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহন লাল দাস বলেন, শিক্ষকের আগমন ও প্রস্থানের বিষয়ে অনিয়ম পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। জনবল না থাকায় তদারকিও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
হাওরবেষ্টিত সুনামগঞ্জের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকের অনুপস্থিতি, শিক্ষক স্বল্পতাসহ নানা অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও অবকাঠামোগত দুর্বলতায় ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষা কার্যক্রম। এতে ছাত্রছাত্রীদের পাঠভ্যাস পরিবর্তন, পড়ালেখায় অমনোযোগী ভাব ও ঝরেপড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সম্প্রতি সরেজমিনে ধর্মপাশা, জামালগঞ্জ ও তাহিরপুরের বেশ কয়েকটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে শিক্ষার বাস্তব চিত্র বেশ উদ্বেগজনক মনে হয়েছে। এ দুরাবস্থার জন্য কর্তৃপক্ষের দায়সারা কার্যক্রম, শিক্ষক ও অভিভাবকের দায়িত্বহীনতাই দায়ী বলছেন সচেতনমহল।
জামালগঞ্জের প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সাবেক সভাপতি ও অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক বিদ্যুৎ জ্যোতি চক্রবর্ত্তী বলেন, দূরের স্কুলগুলোতে পদায়ন না হওয়ায় শিক্ষার অবস্থা শোচনীয়।
অনিয়মতান্ত্রিকতাও অনেক ক্ষেত্রে দায়ী। শিক্ষক-অভিভাবকের সচেতনতার পাশাপাশি শিক্ষার মানোন্নয়নে দরকার শূন্যপদ পূরণ, তদারকি ও কঠোর জবাবদিহিতা।
সুনামগঞ্জ প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে ১ হাজার ৪৭৫টি। যেখানে পড়ালেখা করছে ৩ লাখ ১৯ হাজার ৫৪৯ জন শিক্ষার্থী। জেলায় ছাত্রছাত্রীদের ঝরে পড়ার হার ৮ দশমিক ১৭ শতাংশ। তবে বাস্তবতা ভিন্ন। পড়ালেখাহীন নিয়ম ভঙ্গের বিদ্যালয় : পাঠদানের সময় সকাল সাড়ে ৯টার বেশ পরেও তালাবদ্ধ থাকছে হাওরাঞ্চলের অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। আবার বিকাল ৪টায় ছুটির বেশ আগে বিদ্যালয় ত্যাগ করছেন অনেক শিক্ষক। মাঝখানে যে সময়টুকু শিক্ষার্থীরা পাচ্ছে তাতেও শিক্ষকের ঢের গাফিলতি আছে। সঠিক তদারকি ও জবাবদিহিতার অভাবে শিক্ষা কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
১১ আগস্ট সকাল ১০টায় গিয়ে তালাবদ্ধ পাওয়া যায় জামালগঞ্জের বেহেলী ইউনিয়নের যতীন্দ্রপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। বারান্দায় খেলারত শিক্ষার্থীদের ‘স্যার কয়জন?’ জিজ্ঞেস করলে- পার্শ্ববর্তী সুধীর দাস এগিয়ে এসে জানান, ‘শিক্ষক দুইজন। একজন গ্রামের, অন্যজন পাশের উলুকান্দি গ্রামের।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘কিয়ের স্কুলে আইয়ে! কিছুক্ষণ বইয়া যায় গা। ওই দেখইন, ছাত্ররা বইয়া রইছে। মাস্টরের খবর নাই।’
৩৭ শিক্ষার্থীর ওই বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক প্রাণনাথ চৌধুরীর বাড়ি এই গ্রামে। এ প্রতিবেদক তাঁর খোঁজ করলে ডেকে আনা হয় তাঁকে। এর আগে তড়িঘড়ি তালা খোলে অফিসকক্ষে ঢুকেন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক বিশ্বজিত তালুকদার। বিলম্বে স্কুল খোলার ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘আমি পাশের গ্রামের হলেও পরিবার নিয়ে জামালগঞ্জে থাকি। যে কারণে আসতে দেরি হয়েছে। প্রতিদিন যথাসময়েই স্কুল খোলা হয়।’
একই দিন বেলা সোয়া ২টায় তালাবদ্ধ পাওয়া যায় ধর্মপাশা উপজেলার ঘিরইল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। পার্শ্ববর্তী নৌকায় থাকা কিশোরদের প্রশ্ন করলে তারা জানায়- ‘আরও আগে স্কুল ছুটি দিয়ে স্যারেরা চলে গেছেন।’
মুঠোফোনে প্রধান শিক্ষক (ভারপ্রাপ্ত) মো. আব্দুর রাজ্জাক জানিয়েছেন, বিদ্যালয়ে ছাত্রছাত্রী ৮৭ জন। উপস্থিতি খুব কম। পরীক্ষায় অংশগ্রহণের তাগিদ দিতে তিন শিক্ষক তিন পাড়াতে গিয়েছিলেন। তাই একটু আগেই বিদ্যালয় ছুটি দেওয়া হয়েছে।
দুর্বল অবকাঠামো, ঝুঁকিপূর্ণ শিক্ষা : জেলার ১৮৭টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোগত অবস্থা খুবই নাজুক। দীর্ঘ ২৫ বছরেও বিদ্যালয়গুলোতে নির্মিত হয়নি কোন ভবন, এমন তথ্য শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয়ের। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ একেবারে উদাসীন অভিযোগ শিক্ষক ও অভিভাবকের।
১৭ আগস্ট সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, তাহিরপুরের মেঞ্জারগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবস্থা পড়ালেখার সম্পূর্ণ অনুপযোগী। ছাদ ও ওয়ালের পলেস্তারা উঠে খানাখন্দে রূপ নিয়েছে বিদ্যালয়ের সবক’টি কক্ষ। ছাদের বিমে দেখা দিয়েছে বড় ফাটল। এ সংক্রান্ত একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তড়িঘড়ি পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয় ভবনটি। ঝুঁকিপূর্ণ জেনেও পাঠ কার্যক্রম চলছে ভবনটিতে। বিদ্যালয়ের ভবন পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছে উল্লেখ করে প্রধান শিক্ষক মো. আবুল লেইছ জানিয়েছেন, টিনসেড ঘর নির্মাণে ৩ লাখ টাকা বরাদ্দের ঘোষণা দিলেও তাৎক্ষণিক ঘর বানানো সম্ভব না। বিদ্যালয়টিতে ২০২ জন ছাত্রছাত্রী অধ্যয়নরত। পরীক্ষার মুহূর্তে পাঠদান বন্ধ করে অন্যত্র যাওয়ারও সুযোগ নেই। সামনে পরীক্ষা থাকায় ঝুঁকি নিয়েই পড়ানো হচ্ছে। মেঞ্জারগাঁওয় গ্রামের মো. ফখরুল ইসলাম ও আবুল কাসেম বলেন, মারাত্বক ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা। টুকরা টুকরা হইয়া ভাইঙ্গা পড়তাছে। আগ থাইক্যা কোন ব্যবস্থা নেওয়া হইছে না। হুট কইরা খওয়া হইলো পরিত্যক্ত। পরীক্ষার মুহূর্তে বাচ্চা-কাচ্চারা এখন কই পড়ালেখা করবো? একই রকম অবস্থা জামালগঞ্জের উলুকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের। দুর্গন্ধময় ও ভাঙাচোরা শ্রেণিকক্ষে পাঠ নিতে দেখা যায় শিক্ষার্থীদের। প্রতিষ্ঠানের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সুধারঞ্জন তালুকদার জানিয়েছেন, তাঁর বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী ১০৯ জন। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে ঝুঁকি নিয়ে পাঠদান করতে হয়। বৃষ্টি দিলে ছাদ চুয়ে পানি পড়ে। মাসচারেক আগে ভবন নির্মাণের আবেদন করলেও সাড়া পাওয়া যায়নি। এ ব্যাপারে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহন লাল দাসের ভাষ্য, ঝুঁকিপূর্ণ বিদ্যালয়ের তালিকা অধিদপ্তরে পাঠানো হয়েছে। পিইডিপি ৫ প্রকল্পের আওতায় বিদ্যালয়গুলো পুনঃনির্মাণ করা হবে।
শূন্যপদে প্রাথমিকের নাজেহাল অবস্থা: প্রাক-প্রাথমিকসহ ছয়টি শ্রেণি আছে প্রায় প্রতিটি বিদ্যালয়ে। একজন শিক্ষক কোনো এক শ্রেণিতে পাঠদানে গেলে ফাঁকা থাকছে অন্য শ্রেণিকক্ষ। দু’একজন শিক্ষকে নামেমাত্র বিদ্যালয় খোলা হলেও প্রয়োজনীয় শিক্ষা পাচ্ছে না হাওরাঞ্চলের শিক্ষার্থীরা।
জেলার প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে প্রধান শিক্ষকের ১ হাজার ৪৭৫টি অনুমোদিত পদ থাকলেও কর্মরত ১ হাজার ২৪ জন। ৪৫১টি শূন্য পদের সবগুলো চলছে ভারপ্রাপ্ত দিয়ে। সহকারী শিক্ষকের ৭ হাজার ২৫৭টি অনুমোদিত পদের মধ্যে কর্মরত ৬ হাজার ৯৫ জন। শূন্য পদ ১ হাজার ১৬২টি। এর মধ্যে ৪৪টি বিদ্যালয়ে একজন, ১০১টি বিদ্যালয়ে ২ জন এবং ২০৯টি বিদ্যালয়ে ৩ জন শিক্ষক দিয়ে খুঁড়িয়ে চলছে কার্যক্রম।** ধর্মপাশা উপজেলার মহেশপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটিতে শিক্ষক আছে মাত্র একজন। উপজেলা সদর থেকে ১২ কিলোমিটার দূরত্বের ওই বিদ্যালয়ের পাঠদানসহ দাপ্তরিক কাজ একাই সামলাচ্ছেন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আল আমীন। কথা প্রসঙ্গে বলেন, ১৩২ ছাত্রছাত্রীর বিদ্যালয় একা চালানো কষ্টকর। ডেপুটেশনে একজন আছে। ছুটিতে থাকায় আজ আসেননি। শিক্ষক পদায়ন জরুরি।
পরিচয়ে অনিচ্ছুক এক অভিভাবক জানিয়েছেন, কম শিক্ষকে পড়ালেখা যা হওয়ার তাই হচ্ছে। এ অবস্থায় ভালো কিছু আশা করা যায় না।
অক্টোবর মাসে নতুন শিক্ষক পদায়ন হলে সংকট কিছুটা কমবে উল্লেখ করে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহন লাল দাস বলেন, শিক্ষকের আগমন ও প্রস্থানের বিষয়ে অনিয়ম পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। জনবল না থাকায় তদারকিও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।