ঐতিহ্য রক্ষায় পদক্ষেপ নিতে হবে

আপলোড সময় : ৩০-০৮-২০২৬ ০৭:৫১:২৩ পূর্বাহ্ন , আপডেট সময় : ৩০-০৮-২০২৬ ০৭:৫১:২৩ পূর্বাহ্ন
শিল্পশহর ছাতকের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও শিল্পায়নের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে থাকা ১৭৬ বছরের পুরোনো ‘ইংলিশ টিলা’ আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে -এ খবর নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। দীর্ঘদিনের অবহেলা, সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাব, দখল এবং নির্বিচারে টিলা কাটার কারণে ঐতিহাসিক এই স্থাপনাটি যেমন অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে, তেমনি ঝুঁকিতে পড়েছে এর আশপাশে বসবাসকারী মানুষও। টিলার চূড়ায় থাকা শতবর্ষী স্মৃতিস্তম্ভে বড় বড় ফাটল দেখা দিয়েছে, স্থাপনাটি একদিকে হেলে পড়েছে। প্রবল বর্ষণ কিংবা ভূমিকম্পে এটি ধসে পড়লে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে - স্থানীয়দের এই আশঙ্কা অমূলক নয়। ইংলিশ টিলা নিছক একটি পুরোনো স্থাপনা নয়; এটি ছাতকের শিল্পায়ন ও সামাজিক-অর্থনৈতিক বিকাশের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য। জর্জ ইংলিশের হাত ধরে ছাতক অঞ্চলে চুন ও চুনাপাথরের ব্যবসার যে প্রসার ঘটেছিল, পরবর্তী সময়ে তার ওপর ভিত্তি করেই এ অঞ্চলে শিল্পের বিকাশ ঘটে। ফলে ইংলিশ টিলার সঙ্গে ছাতকের অর্থনৈতিক ইতিহাসও নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত। একটি জনপদের অতীতকে বুঝতে হলে এ ধরনের স্থাপনা, স্মৃতিচিহ্ন ও প্রতœনিদর্শন সংরক্ষণ করা জরুরি। দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের দেশে ঐতিহাসিক স্থাপনা সংরক্ষণের ক্ষেত্রে অবহেলা ও উদাসীনতার চিত্র নতুন নয়। কোনো স্থাপনা ভেঙে পড়ার উপক্রম হলে তবেই আমাদের নজরে আসে; অথচ সংরক্ষণের মূলনীতি হওয়া উচিত - ঝুঁকি তৈরি হওয়ার আগেই ব্যবস্থা নেওয়া। ইংলিশ টিলার বর্তমান পরিস্থিতি সেই পুরোনো ব্যর্থতারই আরেকটি উদাহরণ। শুধু স্মৃতিস্তম্ভটি সংস্কার করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। টিলার আয়তন কমে যাওয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে। দখল ও টিলা কাটা বন্ধ করতে হবে, সরকারি জমির সীমানা নির্ধারণ করে তা রক্ষা করতে হবে এবং টিলার স্থিতিশীলতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় কারিগরি ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে আশপাশে বসবাসকারী পরিবারগুলোর নিরাপত্তার বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে। প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী ও প্রতœতত্ত্ববিদদের সমন্বয়ে একটি কারিগরি সমীক্ষা করে স্থাপনাটির যথাযথ সংস্কার ও সংরক্ষণ পরিকল্পনা গ্রহণ করা যেতে পারে। তবে প্রশ্নটি শুধু ইংলিশ টিলা নিয়ে নয়। সুনামগঞ্জের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা বহু ঐতিহাসিক স্থাপনা, পুরোনো ভবন, স্মৃতিচিহ্ন, প্রতœস¤পদ ও লোকঐতিহ্যও একইভাবে অযতœ ও অবহেলায় হারিয়ে যাওয়ার পথে। হাওরাঞ্চলের ইতিহাস কেবল লিখিত দলিলে সীমাবদ্ধ নয়; মানুষের জীবনযাপন, পুরোনো স্থাপত্য, জমিদারি নিদর্শন, ধর্মীয় স্থাপনা, স্মৃতিসৌধ, প্রাচীন বাণিজ্যকেন্দ্র এবং নানা লোকঐতিহ্যের মধ্যেও সেই ইতিহাসের ছাপ রয়েছে। এসব হারিয়ে গেলে শুধু একটি স্থাপনা হারাবে না, হারাবে একটি জনপদের স্মৃতি ও পরিচয়ের অংশ। সুনামগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাগুলোর একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রণয়ন করা জরুরি। কোন স্থাপনা কত বছরের পুরোনো, তার ঐতিহাসিক গুরুত্ব কী, বর্তমান অবস্থা কেমন, মালিকানা বা ভূমির অবস্থান কী এবং কোনগুলো তাৎক্ষণিক সংরক্ষণের দাবি রাখে - এসব তথ্য সমন্বিতভাবে সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। জেলা ও উপজেলা প্রশাসন, প্রতœতত্ত্ব অধিদপ্তর, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, ইতিহাসবিদ, গবেষক ও নাগরিক সমাজকে নিয়ে এ বিষয়ে একটি সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। ঐতিহ্য সংরক্ষণ মানে শুধু পুরোনো ইট-পাথর রক্ষা করা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি এলাকার আত্মপরিচয়, ইতিহাস ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে অতীতকে তুলে ধরার দায়িত্ব। সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা গেলে এসব স্থাপনা শিক্ষা, গবেষণা ও পর্যটনেরও গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে। এতে স্থানীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়ার সুযোগ রয়েছে। তাই ইংলিশ টিলা রক্ষার উদ্যোগকে একটি বিচ্ছিন্ন প্রকল্প হিসেবে না দেখে সুনামগঞ্জের সামগ্রিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের বৃহত্তর কর্মসূচির অংশ করা প্রয়োজন। ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনাগুলো চিহ্নিত করে জরুরি ভিত্তিতে সংস্কার, দখলমুক্তকরণ ও নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা রক্ষায় স্থানীয় জনগণকে স¤পৃক্ত করে জনসচেতনতা গড়ে তুলতে হবে। ইংলিশ টিলা ধসে পড়ার পর তার ছবি তুলে শোক প্রকাশ করার চেয়ে এখনই তাকে রক্ষা করা অনেক বেশি জরুরি। ইতিহাস একবার হারিয়ে গেলে অর্থ ব্যয় করে তার প্রতিলিপি তৈরি করা যায়, কিন্তু হারানো ঐতিহ্যের প্রকৃত মূল্য ফিরিয়ে আনা যায় না। সুনামগঞ্জের ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত, আর কোনো ঐতিহ্য ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছানোর অপেক্ষা না করে এখনই কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ উদ্যোগ গ্রহণ করা।

সম্পাদকীয় :

  • সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি : মো. জিয়াউল হক
  • সম্পাদক ও প্রকাশক : বিজন সেন রায়
  • বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : মোক্তারপাড়া রোড, সুনামগঞ্জ-৩০০০।

অফিস :

  • ই-মেইল : [email protected]
  • ওয়েবসাইট : www.sunamkantha.com