শহীদনূর আহমেদ::
স্বাধীনতার পূর্বে পরিবার-পরিজন নিয়ে ভারতে চলে যান সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার রঙ্গারচর ইউনিয়নের বল্লবপুর গ্রামের দেবেন্দ্র কুমার দেব ও সুরেন্দ্র কুমার দেব নামের দুই ভাই। দেশত্যাগের পর দীর্ঘ ৫৫ বছরেও তারা কিংবা তাদের কোনো উত্তরাধিকারী এলাকায় ফিরে আসেননি। তারা জীবিত না মৃত - এমন তথ্যও জানেন না স্থানীয়রা।
সম্প্রতি সদর উপজেলার সীমান্তবর্তী বনগাঁও এলাকায় দেবেন্দ্র ও সুরেন্দ্র দেবের মালিকানাধীন একটি জমি বিক্রি নিয়ে এলাকায় তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। ৫৫ বছর ধরে দুই ভাই নিরুদ্দেশ থাকলেও এলাকার দুই ব্যক্তিকে দেবেন্দ্র ও সুরেন্দ্র সাজিয়ে জমি ক্রয়-বিক্রয় করেছে একটি ভূমিখেকো চক্র। দীর্ঘ অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে জালিয়াতি ও প্রতারণার চাঞ্চল্যকর এসব তথ্য। অনুসন্ধানে জানাযায়, চলতি বছরের ১৯ জানুয়ারি সুনামগঞ্জ সদর সাবরেজিস্ট্রার অফিসে বনগাঁও সুন্ধাউড়া মৌজার ১৪নং জেএল ও ৬৮১ নং দায়ে ৪০ শতক ভূমি ক্রয়ের একটি দলিল সম্পন্ন হয়। যেখানে দেখানো হয় জমির মালিক দেবেন্দ্র কুমার দেব ও সুরেন্দ্র কুমার দেবের কাছ থেকে ৫ লক্ষ টাকা মূল্যে জমিটি ক্রয় করেন একই এলাকার গোলাম মোস্তফা বুলবুল নামের এক বাসিন্দা। দলিলে সাক্ষী হিসেবে একই এলাকার মো. সেলিম মিয়া ও সনাক্তকারী হিসেবে আব্দুর রহিমকে দেখানো হয়েছে। বাস্তবে যেখানে দেবেন্দ্র কুমার দেব ও সুরেন্দ্র কুমার দেবের অস্তিত্ব নেই সেখানে কি করে ক্রয়-বিক্রয়ের এই দলিল সম্পন্ন হয়েছে তা নিয়ে জনমনে রয়েছে প্রশ্ন।
দলিল ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, তথ্য গোপন, জাতীয় পরিচয়পত্র জালিয়াতি এবং ব্যক্তি পরিবর্তনের মাধ্যমে এই ভয়ংকর রকমের প্রতারণা করেছে ভূমিখেকো চক্র। দলিলে বিক্রেতা দেবেন্দ্র কুমার দেব ও সুরেন্দ্র কুমার দেবের যে জাতীয় পরিচয়পত্র নাম্বার ব্যবহার করা হয়েছে তা ভেরিফাই করে দেখা যায়, সম্পূর্ণ ফটোশপের কারসাজি করে একই ইউনিয়নের হাসাউড়া গ্রামের বকুল দাশ ও দুলু দাসের পরিচয়পত্রের নম্বর ব্যবহার করা হয়েছে। দলিলেও ব্যবহৃত ছবিও ওই দু’জনের।
সূত্র বলছে, দলিল রেজিস্ট্রির দিন স্বশরীরে সুনামগঞ্জ সাব রেজিস্ট্রার অফিসে উপস্থিত ছিলেন বকুল দাশ ও দুলু দাস। বাস্তবে দেবেন্দ্র কুমার দেব ও সুরেন্দ্র কুমার দেবের অস্তিত্ব না পাওয়া গেলেও অভিনব কারসাজির মাধ্যমে দীর্ঘ ৫৫ বছর পর তাদের নামে থাকা জমি বিক্রির বিষয়টি নিয়ে এলাকায় তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। অনুসন্ধান বলছে, একটি সংঘবদ্ধ চক্র এলাকার দু’জন নিরক্ষর ও সহজ-সরল প্রকৃতির দুইজন লোককে জমির মালিক সাজিয়ে এমন ভয়াবহ প্রতারণা করেছে। এই চক্রে রয়েছেন জমি ক্রয়কারী রঙ্গারচর ইউনিয়নে কান্দি ছমাদনগর গ্রামের গোলাম মোস্তফা বুলবুল, একই গ্রামের বেসরকারি সার্ভেয়ার আব্দুর রহিম, সেলিম মিয়া, মোটরসাইকেল চালক কবির হোসেনসহ একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট।
এদিকে সরজমিনে দেবেন্দ্র কুমার দেব ও সুরেন্দ্র কুমার দেবের খুঁজে দলিলে ব্যবহৃত ঠিকানা সদর উপজেলার বল্লবপুর গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, এমন নামে কোনো মানুষ বসবাস করেননা গ্রামটিতে। গ্রামের প্রবীণ ব্যক্তিরা জানান, একসময় বল্লবপুর গ্রামটি ছিল হিন্দু অধ্যুষিত এলাকা। মুক্তিযুদ্ধের আগে ও মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সকল সনাতন ধর্মের লোকেরা গ্রামটি ছেড়ে ভারতে চলে যান। দেশ ত্যাগের ৫৫ বছরেও কেউ ফিরে আসেননি। এখন গ্রামে শতভাগ মুসলিম বাসিন্দা বসবাস করেন। স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. মঈন উদ্দিন বলেন, আমার ওয়ার্ডে এই নামে কোনো মানুষ নেই। বাপ-চাচাদের কাছ থেকে শুনেছি, এক সময় বল্লবপুরে হিন্দু মানুষ বসবাস করতেন। তারা সবাই ভারত চলে গেছেন। দেবেন্দ্র কুমার দেব ও সুরেন্দ্র কুমার দেবের নামে যে জমি বিক্রি হয়েছে তা সম্পূর্ণ জালিয়াতি হয়েছে বলে জানান তিনি।
জালিয়াতির হালহকিকত জানতে সরেজমিনে হাসাউড়া গ্রামে গিয়ে জানাযায়, দীর্ঘদিন ধরে বকুল দাশ মানসিক সমস্যা ভুগছেন। তাছাড়া দুলু দাস ও বকুল দাস এলাকার সবচেয়ে সহজ সরল প্রকৃতির মানুষ।
দুলু দাস জানান, কবির হোসেন নামের এক মোটরসাইকেল চালক সরকারি সাহায্য দেয়ার কথা বলে প্রতিবেশী বকুল দাশ ও তার কাছ থেকে জাতীয় পরিচয়পত্র নিয়েগেছে। পরে দুজনকে ৭ হাজার টাকা এনে দিয়েছে সেই যুবক। সাবরেজিস্ট্রার অফিসে গিয়ে টিপসই দিয়েছেন কিনা এই বিষয়ে সঠিক উত্তর দিতে পারেননি তিনি। বকুল দাশ স্বাভাবিক না থাকায় বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি। তার পরিবারও এ বিষয়ে কিছু জানেনা বলে জানান।
বকুল দাশ ও দুলু দাসের জাতীয় পরিচয়পত্র নেয়ার কথা স্বীকার করেন মোটরসাইকেল চালক কবির হোসেন। তবে কি কারণে নিয়েছেন তার সঠিক উত্তর দিতে পারেননি তিনি। স্থানীয় ইউপি সদস্য হিরন মিয়া বলেন, কবির হোসেনসহ একটি চক্র রয়েছে যারা জালিয়াতির মাধ্যমে মানুষ জমিজমা লিখে নেয়। বকুল দাশ ও দুলু দাস গ্রাসের সাদাসিধা ও নিরক্ষর মানুষ। তাদের প্রলোভন দেখি এমন প্রতারণা করেছে। এই জালিয়াতিতে একটি সিন্ডিকেট স¤পৃক্ত রয়েছে বলে জানান তিনি। অপরদিকে, বনগাঁও এলাকায় ওই জমির ছবি তুলতে গেলে বাঁধা দেন জালিয়াতি দলিলের মাধ্যমে মালিক হওয়া গোলাম মোস্তফা বুলবুল। জালিয়াতি করে জমি ক্রয়ের ব্যাপারে জানতে প্রশ্ন করা হলে, তিনি সাংবাদিকদের গালমন্দ করেন। এসময় তিনি দাপুটের সহিত বলেন, আপনারা কে কাগজের বৈধতা দেখার। জাল হোক আর আসল, আমি দেখবো। সাংবাদিক কেন জমিতে আসবে। ভুয়া মালিক সাজিয়ে জমি ক্রয় করেছেন, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এসব আইনে দেখবনে। আমার জায়গা সঠিক। দলিলে জমির মালিক সনাক্তকারী সেলিম মিয়া, আব্দুর রহিমের বাড়িতে গিয়ে তাদের দেখা পাওয়া যায়নি। একাধিকবার তাদের দুজনের মুঠোফোন কল করেও সাড়া না পাওয়ায় এ বিষয়ে বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি।
স্থানীয় ইউপি সদস্য আনোয়ার হোসেন তালুকদার বাবুল বলেন, এই জমির মালিক ৫০ বছরের অধিক সময় হলো দেশে নেই। বুলবুল হঠাৎ পঞ্চায়েতের কাছে এসে বলে সে এই জমি ক্রয় করেছে মালিকের কাছ থেকে। তার কাছে আমরা দলিলের কপি চাইলাম, সে দেয়নি। সাবরেজিস্ট্রার অফিস থেকে দলিলের নকল নিয়ে দেখি ভুয়া কাগজ ও ফেইক মানুষ দিয়ে এই দলিল করেছে বুলবুল, সেলিম, রহিম। এটি বড় ধরনের প্রতারণা। তহশীল অফিস কি করে জমির উপরে খাজনা নিয়েছে আমার বুঝে আসেনা। পরবর্তীতে সুনামগঞ্জ সদর ইউনিয়ন ভূমি অফিসে গিয়ে জানাযায়, জমির খাজনা পরিশোধ করেছেন সদর উপজেলার মোল্লাপাড়ার ইউনিয়নের আছরব আলী নামে এক ব্যক্তি। নিজের মোবাইল নম্বরে আইডি খুলে কিভাবে অন্যের জমির খাজনা পরিশোধ করলেন এমন প্রশ্নের জবাবে মুঠোফোনে আছরব আলী বলেন, ৭-৮ মাস আগে ১০ হাজার টাকা কন্ট্রাকে আমাদের এলাকার এক হিন্দু ছেলেকে দিয়ে খাজনা দিছি। এই কাজের পেছনে আর কে আছে জানতে চাইলে ‘বনগাঁও এলাকা’ বলে কথা পাল্টিয়ে বলেন, অফিসে আমার মানুষ আছে। আমি নিজেই করাইছি।
এ বিষয়ে ইউনিয়ন ভূমি অফিসের দায়িত্বশীল কেউ বক্তব্য দিতে রাজি হননি।
এ ব্যাপারে দলিল লেখক জালাল মিয়া বলেন, বুলবুল, সেলিম মিয়া, আব্দুর রহীমসহ জমি বিক্রেতাসহ কাগজপত্র নিয়ে অফিসে আসছেন। খাজনা পরিশোধ ও আরএস ও এসএ পর্চা থাকায় জমি রেজিস্ট্রারের জন্য দলিল রেডি করেছি। যেখানে ব্যক্তি আইডি কার্ড মিল ছিল সেখানে সন্দেহ হয়নি। তাছাড়া আইডি কার্ড ভেরিফাই করার টেকনোলোজি আমাদের কাছে নেই।
দলিলে জালিয়াতির ব্যাপারে সুনামগঞ্জ সদর সাব রেজিস্ট্রার মো. মনজুরুল আলম বলেন, রেজিস্ট্রিতে দাতা-গ্রহীতা আসেন, জমির খাজনা পরিশোধ করেন। কাগজপত্র দেন তা যাচাই-বাছাই করে রেজিস্ট্রি করি। আমাদের কাছে জাতীয় পরিচয়পত্র ভেরিফাই করার কোনো প্রক্রিয়া নেই। এমন সুযোগ থাকলে ব্যক্তি সনাক্ত করা সহজ হতো। দলিল জালিয়াতির ব্যাপারে তিনি বলেন, আমরা প্রতিনিয়ত দালাল ও প্রতারক চক্রের ব্যাপারে তৎপর রয়েছি। আমি এ ব্যাপারে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের বরাবরে চিঠি লিখবো। প্রতারকদের ছবি অফিসের সামনে টাঙিয়ে রাখার পাশাপাশি অভিযান পরিচালনার কথা জানান তিনি।
স্বাধীনতার পূর্বে পরিবার-পরিজন নিয়ে ভারতে চলে যান সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার রঙ্গারচর ইউনিয়নের বল্লবপুর গ্রামের দেবেন্দ্র কুমার দেব ও সুরেন্দ্র কুমার দেব নামের দুই ভাই। দেশত্যাগের পর দীর্ঘ ৫৫ বছরেও তারা কিংবা তাদের কোনো উত্তরাধিকারী এলাকায় ফিরে আসেননি। তারা জীবিত না মৃত - এমন তথ্যও জানেন না স্থানীয়রা।
সম্প্রতি সদর উপজেলার সীমান্তবর্তী বনগাঁও এলাকায় দেবেন্দ্র ও সুরেন্দ্র দেবের মালিকানাধীন একটি জমি বিক্রি নিয়ে এলাকায় তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। ৫৫ বছর ধরে দুই ভাই নিরুদ্দেশ থাকলেও এলাকার দুই ব্যক্তিকে দেবেন্দ্র ও সুরেন্দ্র সাজিয়ে জমি ক্রয়-বিক্রয় করেছে একটি ভূমিখেকো চক্র। দীর্ঘ অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে জালিয়াতি ও প্রতারণার চাঞ্চল্যকর এসব তথ্য। অনুসন্ধানে জানাযায়, চলতি বছরের ১৯ জানুয়ারি সুনামগঞ্জ সদর সাবরেজিস্ট্রার অফিসে বনগাঁও সুন্ধাউড়া মৌজার ১৪নং জেএল ও ৬৮১ নং দায়ে ৪০ শতক ভূমি ক্রয়ের একটি দলিল সম্পন্ন হয়। যেখানে দেখানো হয় জমির মালিক দেবেন্দ্র কুমার দেব ও সুরেন্দ্র কুমার দেবের কাছ থেকে ৫ লক্ষ টাকা মূল্যে জমিটি ক্রয় করেন একই এলাকার গোলাম মোস্তফা বুলবুল নামের এক বাসিন্দা। দলিলে সাক্ষী হিসেবে একই এলাকার মো. সেলিম মিয়া ও সনাক্তকারী হিসেবে আব্দুর রহিমকে দেখানো হয়েছে। বাস্তবে যেখানে দেবেন্দ্র কুমার দেব ও সুরেন্দ্র কুমার দেবের অস্তিত্ব নেই সেখানে কি করে ক্রয়-বিক্রয়ের এই দলিল সম্পন্ন হয়েছে তা নিয়ে জনমনে রয়েছে প্রশ্ন।
দলিল ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, তথ্য গোপন, জাতীয় পরিচয়পত্র জালিয়াতি এবং ব্যক্তি পরিবর্তনের মাধ্যমে এই ভয়ংকর রকমের প্রতারণা করেছে ভূমিখেকো চক্র। দলিলে বিক্রেতা দেবেন্দ্র কুমার দেব ও সুরেন্দ্র কুমার দেবের যে জাতীয় পরিচয়পত্র নাম্বার ব্যবহার করা হয়েছে তা ভেরিফাই করে দেখা যায়, সম্পূর্ণ ফটোশপের কারসাজি করে একই ইউনিয়নের হাসাউড়া গ্রামের বকুল দাশ ও দুলু দাসের পরিচয়পত্রের নম্বর ব্যবহার করা হয়েছে। দলিলেও ব্যবহৃত ছবিও ওই দু’জনের।
সূত্র বলছে, দলিল রেজিস্ট্রির দিন স্বশরীরে সুনামগঞ্জ সাব রেজিস্ট্রার অফিসে উপস্থিত ছিলেন বকুল দাশ ও দুলু দাস। বাস্তবে দেবেন্দ্র কুমার দেব ও সুরেন্দ্র কুমার দেবের অস্তিত্ব না পাওয়া গেলেও অভিনব কারসাজির মাধ্যমে দীর্ঘ ৫৫ বছর পর তাদের নামে থাকা জমি বিক্রির বিষয়টি নিয়ে এলাকায় তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। অনুসন্ধান বলছে, একটি সংঘবদ্ধ চক্র এলাকার দু’জন নিরক্ষর ও সহজ-সরল প্রকৃতির দুইজন লোককে জমির মালিক সাজিয়ে এমন ভয়াবহ প্রতারণা করেছে। এই চক্রে রয়েছেন জমি ক্রয়কারী রঙ্গারচর ইউনিয়নে কান্দি ছমাদনগর গ্রামের গোলাম মোস্তফা বুলবুল, একই গ্রামের বেসরকারি সার্ভেয়ার আব্দুর রহিম, সেলিম মিয়া, মোটরসাইকেল চালক কবির হোসেনসহ একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট।
এদিকে সরজমিনে দেবেন্দ্র কুমার দেব ও সুরেন্দ্র কুমার দেবের খুঁজে দলিলে ব্যবহৃত ঠিকানা সদর উপজেলার বল্লবপুর গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, এমন নামে কোনো মানুষ বসবাস করেননা গ্রামটিতে। গ্রামের প্রবীণ ব্যক্তিরা জানান, একসময় বল্লবপুর গ্রামটি ছিল হিন্দু অধ্যুষিত এলাকা। মুক্তিযুদ্ধের আগে ও মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সকল সনাতন ধর্মের লোকেরা গ্রামটি ছেড়ে ভারতে চলে যান। দেশ ত্যাগের ৫৫ বছরেও কেউ ফিরে আসেননি। এখন গ্রামে শতভাগ মুসলিম বাসিন্দা বসবাস করেন। স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. মঈন উদ্দিন বলেন, আমার ওয়ার্ডে এই নামে কোনো মানুষ নেই। বাপ-চাচাদের কাছ থেকে শুনেছি, এক সময় বল্লবপুরে হিন্দু মানুষ বসবাস করতেন। তারা সবাই ভারত চলে গেছেন। দেবেন্দ্র কুমার দেব ও সুরেন্দ্র কুমার দেবের নামে যে জমি বিক্রি হয়েছে তা সম্পূর্ণ জালিয়াতি হয়েছে বলে জানান তিনি।
জালিয়াতির হালহকিকত জানতে সরেজমিনে হাসাউড়া গ্রামে গিয়ে জানাযায়, দীর্ঘদিন ধরে বকুল দাশ মানসিক সমস্যা ভুগছেন। তাছাড়া দুলু দাস ও বকুল দাস এলাকার সবচেয়ে সহজ সরল প্রকৃতির মানুষ।
দুলু দাস জানান, কবির হোসেন নামের এক মোটরসাইকেল চালক সরকারি সাহায্য দেয়ার কথা বলে প্রতিবেশী বকুল দাশ ও তার কাছ থেকে জাতীয় পরিচয়পত্র নিয়েগেছে। পরে দুজনকে ৭ হাজার টাকা এনে দিয়েছে সেই যুবক। সাবরেজিস্ট্রার অফিসে গিয়ে টিপসই দিয়েছেন কিনা এই বিষয়ে সঠিক উত্তর দিতে পারেননি তিনি। বকুল দাশ স্বাভাবিক না থাকায় বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি। তার পরিবারও এ বিষয়ে কিছু জানেনা বলে জানান।
বকুল দাশ ও দুলু দাসের জাতীয় পরিচয়পত্র নেয়ার কথা স্বীকার করেন মোটরসাইকেল চালক কবির হোসেন। তবে কি কারণে নিয়েছেন তার সঠিক উত্তর দিতে পারেননি তিনি। স্থানীয় ইউপি সদস্য হিরন মিয়া বলেন, কবির হোসেনসহ একটি চক্র রয়েছে যারা জালিয়াতির মাধ্যমে মানুষ জমিজমা লিখে নেয়। বকুল দাশ ও দুলু দাস গ্রাসের সাদাসিধা ও নিরক্ষর মানুষ। তাদের প্রলোভন দেখি এমন প্রতারণা করেছে। এই জালিয়াতিতে একটি সিন্ডিকেট স¤পৃক্ত রয়েছে বলে জানান তিনি। অপরদিকে, বনগাঁও এলাকায় ওই জমির ছবি তুলতে গেলে বাঁধা দেন জালিয়াতি দলিলের মাধ্যমে মালিক হওয়া গোলাম মোস্তফা বুলবুল। জালিয়াতি করে জমি ক্রয়ের ব্যাপারে জানতে প্রশ্ন করা হলে, তিনি সাংবাদিকদের গালমন্দ করেন। এসময় তিনি দাপুটের সহিত বলেন, আপনারা কে কাগজের বৈধতা দেখার। জাল হোক আর আসল, আমি দেখবো। সাংবাদিক কেন জমিতে আসবে। ভুয়া মালিক সাজিয়ে জমি ক্রয় করেছেন, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এসব আইনে দেখবনে। আমার জায়গা সঠিক। দলিলে জমির মালিক সনাক্তকারী সেলিম মিয়া, আব্দুর রহিমের বাড়িতে গিয়ে তাদের দেখা পাওয়া যায়নি। একাধিকবার তাদের দুজনের মুঠোফোন কল করেও সাড়া না পাওয়ায় এ বিষয়ে বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি।
স্থানীয় ইউপি সদস্য আনোয়ার হোসেন তালুকদার বাবুল বলেন, এই জমির মালিক ৫০ বছরের অধিক সময় হলো দেশে নেই। বুলবুল হঠাৎ পঞ্চায়েতের কাছে এসে বলে সে এই জমি ক্রয় করেছে মালিকের কাছ থেকে। তার কাছে আমরা দলিলের কপি চাইলাম, সে দেয়নি। সাবরেজিস্ট্রার অফিস থেকে দলিলের নকল নিয়ে দেখি ভুয়া কাগজ ও ফেইক মানুষ দিয়ে এই দলিল করেছে বুলবুল, সেলিম, রহিম। এটি বড় ধরনের প্রতারণা। তহশীল অফিস কি করে জমির উপরে খাজনা নিয়েছে আমার বুঝে আসেনা। পরবর্তীতে সুনামগঞ্জ সদর ইউনিয়ন ভূমি অফিসে গিয়ে জানাযায়, জমির খাজনা পরিশোধ করেছেন সদর উপজেলার মোল্লাপাড়ার ইউনিয়নের আছরব আলী নামে এক ব্যক্তি। নিজের মোবাইল নম্বরে আইডি খুলে কিভাবে অন্যের জমির খাজনা পরিশোধ করলেন এমন প্রশ্নের জবাবে মুঠোফোনে আছরব আলী বলেন, ৭-৮ মাস আগে ১০ হাজার টাকা কন্ট্রাকে আমাদের এলাকার এক হিন্দু ছেলেকে দিয়ে খাজনা দিছি। এই কাজের পেছনে আর কে আছে জানতে চাইলে ‘বনগাঁও এলাকা’ বলে কথা পাল্টিয়ে বলেন, অফিসে আমার মানুষ আছে। আমি নিজেই করাইছি।
এ বিষয়ে ইউনিয়ন ভূমি অফিসের দায়িত্বশীল কেউ বক্তব্য দিতে রাজি হননি।
এ ব্যাপারে দলিল লেখক জালাল মিয়া বলেন, বুলবুল, সেলিম মিয়া, আব্দুর রহীমসহ জমি বিক্রেতাসহ কাগজপত্র নিয়ে অফিসে আসছেন। খাজনা পরিশোধ ও আরএস ও এসএ পর্চা থাকায় জমি রেজিস্ট্রারের জন্য দলিল রেডি করেছি। যেখানে ব্যক্তি আইডি কার্ড মিল ছিল সেখানে সন্দেহ হয়নি। তাছাড়া আইডি কার্ড ভেরিফাই করার টেকনোলোজি আমাদের কাছে নেই।
দলিলে জালিয়াতির ব্যাপারে সুনামগঞ্জ সদর সাব রেজিস্ট্রার মো. মনজুরুল আলম বলেন, রেজিস্ট্রিতে দাতা-গ্রহীতা আসেন, জমির খাজনা পরিশোধ করেন। কাগজপত্র দেন তা যাচাই-বাছাই করে রেজিস্ট্রি করি। আমাদের কাছে জাতীয় পরিচয়পত্র ভেরিফাই করার কোনো প্রক্রিয়া নেই। এমন সুযোগ থাকলে ব্যক্তি সনাক্ত করা সহজ হতো। দলিল জালিয়াতির ব্যাপারে তিনি বলেন, আমরা প্রতিনিয়ত দালাল ও প্রতারক চক্রের ব্যাপারে তৎপর রয়েছি। আমি এ ব্যাপারে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের বরাবরে চিঠি লিখবো। প্রতারকদের ছবি অফিসের সামনে টাঙিয়ে রাখার পাশাপাশি অভিযান পরিচালনার কথা জানান তিনি।