উন্নয়নের যুগে দাঁড়িয়ে একটি গ্রামের কয়েক হাজার মানুষ যদি ৫০ বছর ধরে একটি নিরাপদ সড়কের জন্য অপেক্ষা করেন, তবে বিষয়টি শুধু একটি এলাকার যোগাযোগ সংকট নয় - এটি উন্নয়ন পরিকল্পনা ও প্রশাসনিক দায়িত্বশীলতারও প্রশ্ন। দিরাই উপজেলার চরনারচর ইউনিয়নের পেরুয়া মধুপুর গ্রামের মানুষ দীর্ঘ পাঁচ দশক ধরে যে দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন, তা কোনোভাবেই মেনে নেওয়ার মতো নয়।
গ্রামবাসীর চলাচলের একমাত্র অবলম্বন একটি দীর্ঘ বাঁশের সাঁকো। শুকনো মৌসুমে কোনোভাবে পারাপার করা গেলেও বর্ষায় সেটি হয়ে ওঠে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। বৃষ্টিতে সাঁকো পিচ্ছিল হয়ে পড়ে। নারী, শিশু, বয়স্ক ও শিক্ষার্থীদের প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পার হতে হয়। এক পা ভুল হলেই নিচে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। ইতোমধ্যে সাঁকো থেকে পড়ে আহত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। অথচ এই দুর্ভোগ যেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দীর্ঘদিন ধরেই গুরুত্বহীন।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, এই সাঁকো পেরিয়েই কোমলমতি শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে যেতে হয়। বর্ষাকালে ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় অনেক শিক্ষার্থী নিয়মিত স্কুলে যেতে পারে না। ফলে শুধু তাদের নিরাপদ চলাচলই বাধাগ্রস্ত হচ্ছে না, শিক্ষাজীবনও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একটি সড়কের অভাবে শিশুদের শিক্ষা যদি ব্যাহত হয়, তাহলে বিষয়টি উন্নয়ন বাজেটের সাধারণ কোনো প্রকল্প হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অধিকার ও মানবিক নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানও স্বীকার করেছেন যে সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও মাটির বরাদ্দ না পাওয়ায় কাজ এগোয়নি। এই বক্তব্যে সমস্যার একটি দিক স্পষ্ট হলেও প্রশ্ন থেকেই যায়- ৫০ বছর ধরে একটি সড়কের জন্য অপেক্ষা করতে হবে কেন? স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সমন্বিত উদ্যোগে এতদিনেও কি একটি স্থায়ী সমাধান বের করা সম্ভব হয়নি?
কোনো এলাকার উন্নয়ন শুধু শহরকেন্দ্রিক অবকাঠামো নির্মাণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষের নিরাপদ যোগাযোগও উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ সূচক। একটি সড়ক নির্মিত হলে শুধু যাতায়াতের কষ্টই কমবে না; শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কৃষিপণ্য পরিবহন, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকা-েও গতি আসবে।
তাই পেরুয়া মধুপুর গ্রামের মানুষের ৫০ বছরের অপেক্ষার অবসান হওয়া জরুরি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত দ্রুত সরেজমিনে পরিস্থিতি পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ নিশ্চিত করা এবং একটি টেকসই সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া। বাঁশের সাঁকোর ওপর মানুষের জীবন আর কতদিন নির্ভর করবে - এই প্রশ্নের উত্তর এখনই দিতে হবে। উন্নয়নের সুফল মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছাতে হলে পেরুয়া মধুপুরের মতো অবহেলিত জনপদগুলোর যোগাযোগ সমস্যার স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করতেই হবে।