স্টাফ রিপোর্টার ::
একটি পুকুর। পানিতে হাত-পা ছুড়ে সাঁতার শেখার চেষ্টা করছে একদল শিশু। কেউ পানির ভয় কাটানোর চেষ্টা করছে, কেউ আবার প্রশিক্ষকের নির্দেশনা মেনে ভেসে থাকার কৌশল রপ্ত করছে। দৃশ্যটি আর দশটি সাঁতার প্রশিক্ষণের মতোই মনে হতে পারে। কিন্তু এর পেছনের গল্পটি বেদনার।
প্রায় দুই বছর আগে পানিতে ডুবে মেয়েকে হারিয়েছিলেন সুনামগঞ্জের সফিউল আলম। সেই শোক এখনো বয়ে বেড়ান তিনি। তবে শোকের কাছে হার মানেননি। নিজের মেয়ের স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে গড়ে তুলেছেন স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান ‘তাহিয়া একাডেমি’। আর এই একাডেমির অন্যতম লক্ষ্য- শিশুদের সাঁতার শেখানো এবং পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঝুঁকি কমানো।
এরই ধারাবাহিকতায় শুক্রবার সকাল ১০টায় সুনামগঞ্জ শহরের পুরাতন লক্ষণশ্রী জামে মসজিদের পুকুরে শিশুদের সাঁতার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। শহরের বিভিন্ন এলাকার শিশু ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা এতে অংশ নেয়। পানিতে নামার আগে শিশুদের দেওয়া হয় প্রয়োজনীয় নির্দেশনা। প্রথমে পানির ভয় কাটিয়ে তাদের আত্মবিশ্বাসী করে তোলা হয়। এরপর শেখানো হয় পানিতে শ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়া, ভেসে থাকা এবং ধীরে ধীরে সাঁতারের বিভিন্ন কৌশল।
শুক্রবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, শিশুদের পানিতে নামিয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়ার সময় সফিউল আলমের চোখে-মুখে ছিল এক ধরনের দৃঢ়তা। যে পানি কেড়ে নিয়েছে তার সন্তানকে, সেই পানিকেই এখন শিশুদের জন্য নিরাপদ করে তোলার চেষ্টা করছেন তিনি।
সফিউল আলম বলেন, তাহিয়াকে হারানোর পর থেকেই মনে হয়েছে, সাঁতার জানা থাকলে হয়তো অনেক দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব। সেই ভাবনা থেকেই মেয়ের স্মৃতিতে তাহিয়া একাডেমি প্রতিষ্ঠা করেছি। যতদিন বেঁচে থাকব, শিশুদের সাঁতার শেখানোর পাশাপাশি জনকল্যাণমূলক কাজ করে যেতে চাই।
হাওরাঞ্চলের বাস্তবতায় সাঁতার শেখার গুরুত্ব আরও বেশি। বর্ষা এলেই বিস্তীর্ণ এলাকা পরিণত হয় পানির রাজ্যে। বাড়ির উঠান থেকে শুরু করে স্কুলে যাতায়াত - জীবনের নানা প্রয়োজনে পানির সঙ্গে প্রতিনিয়ত যোগাযোগ করতে হয় শিশুদের। অথচ অনেক শিশুই সাঁতার জানে না। ফলে অসাবধানতার সামান্য সুযোগে ঘটতে পারে বড় দুর্ঘটনা।
সফিউল আলম মনে করেন, সময়ের সঙ্গে মানুষের জীবনযাত্রায় পরিবর্তন এসেছে। আগে হাওরপাড়ের মানুষের জীবন পানির সঙ্গে আরও নিবিড়ভাবে যুক্ত ছিল। শিশুরাও ছোটবেলা থেকেই পানিতে চলাফেরা ও সাঁতার শেখার সুযোগ পেত। এখন আধুনিক সুযোগ-সুবিধার কারণে অনেক শিশুর সেই অভ্যাস নেই। ফলে তাদের আলাদাভাবে সাঁতার শেখানোর প্রয়োজন তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, শুধু হাওরপাড়ের শিশু নয়, শহরের শিশুরাও পানিতে ডুবে দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে। তাই দুর্ঘটনা ঘটার পর উদ্ধার তৎপরতার ওপর নির্ভর না করে আগে থেকেই শিশুদের সাঁতার শেখাতে হবে।
তাহিয়া একাডেমির এই উদ্যোগে সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছে ফায়ার সার্ভিসও। প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনায় ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তাদের পরামর্শ ও সহযোগিতা নেওয়া হচ্ছে। এতে শিশুদের সাঁতার শেখানোর পাশাপাশি পানিতে দুর্ঘটনার সময় করণীয় সম্পর্কেও সচেতন করা হচ্ছে।
শাহজালাল রহমাতুল্লাহি আলাই নূরানীয়া হাফিজিয়া মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক বলেন, শিক্ষার্থীদের সাঁতার শেখানোর উদ্দেশ্যেই তাদের এখানে নিয়ে আসা হয়েছে। পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু রোধে দুর্ঘটনার পর উদ্ধার তৎপরতার পাশাপাশি আগে থেকেই শিশুদের সাঁতার শেখানোর উদ্যোগ নিতে হবে।
তাহিয়ার চলে যাওয়ার শূন্যতা সফিউল আলমের জীবনে হয়তো কোনোদিন পূরণ হবে না। কিন্তু সেই শোককে তিনি এমন একটি উদ্যোগে রূপ দিয়েছেন, যার মাধ্যমে অন্য কোনো পরিবারকে যেন সন্তানের পানিতে ডুবে মৃত্যুর বেদনা বহন করতে না হয় - এটাই এখন তার প্রত্যাশা।
একটি শিশুর পানিভীতি কাটিয়ে যখন সে প্রথমবার নিজের শরীর পানিতে ভাসিয়ে রাখতে শেখে, তখন হয়তো সেখানে শুধু একটি সাঁতার শেখার গল্প থাকে না। থাকে একজন বাবার হারানো মেয়েকে স্মরণ করার গল্প, থাকে আরেকটি শিশুর জীবন বাঁচানোর স্বপ্ন। তাহিয়া নেই, কিন্তু তার স্মৃতিকে সামনে রেখে অন্য শিশুদের নিরাপদ ভবিষ্যতের জন্য এগিয়ে চলেছে ‘তাহিয়া একাডেমি’।