নির্ধারিত সময়ের আগেই বিদ্যালয় ছুটি - এ অনিয়ম মেনে নেওয়া যায় না

আপলোড সময় : ১১-০৯-২০২৬ ০৮:৫২:৩৯ পূর্বাহ্ন , আপডেট সময় : ১১-০৯-২০২৬ ০৮:৫২:৩৯ পূর্বাহ্ন
শিক্ষার আলো জ্বালানোর দায়িত্ব যাদের, তাদেরই যদি দায়িত্ব পালনে অনীহা দেখা দেয়, তাহলে প্রান্তিক এলাকার শিক্ষাব্যবস্থা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে - এ প্রশ্ন এখন সামনে এসেছে। দিরাই উপজেলার একাধিক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নির্ধারিত সময়ের আগেই বিদ্যালয়ে তালা ঝুলিয়ে শিক্ষকরা চলে যাওয়ার অভিযোগ অত্যন্ত উদ্বেগজনক। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নিজে বিদ্যালয় পরিদর্শনে গিয়ে এমন অনিয়মের চিত্র দেখতে পেয়েছেন। উজান বাউসী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ কয়েকটি বিদ্যালয়ে সরকারি সময় শেষ হওয়ার আগেই বিদ্যালয় বন্ধ পাওয়া গেছে। একজন শিক্ষার্থীর বক্তব্য অনুযায়ী, কোনো কোনো বিদ্যালয়ে প্রতিদিন বেলা ৩টার দিকেই ছুটি দিয়ে দেওয়া হয়। এ ঘটনা নিছক সময়ের অনিয়ম নয়; এটি শিক্ষার্থীদের অধিকার ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের প্রতি অবহেলা। একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেবল একটি ভবন নয়-এটি একটি এলাকার শিশুদের ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রতিষ্ঠান। শিক্ষকরা সেখানে রাষ্ট্রের প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। নির্ধারিত কর্মঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যালয়ে উপস্থিত থেকে পাঠদান করা তাঁদের পেশাগত ও নৈতিক দায়িত্ব। সেই দায়িত্বে অবহেলা করলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় দরিদ্র ও প্রান্তিক পরিবারের শিশুরা। দিরাইয়ের মতো হাওরাঞ্চলে শিক্ষাব্যবস্থা এমনিতেই নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি। বর্ষাকালে যোগাযোগব্যবস্থার দুরবস্থা, যাতায়াতের সমস্যা, দরিদ্রতা ও নানা সামাজিক বাস্তবতার কারণে শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করাই কঠিন। এর মধ্যে শিক্ষকরা যদি নিজেদের সুবিধামতো বিদ্যালয়ের সময় নির্ধারণ করেন, তাহলে শিক্ষার প্রতি শিশুদের আগ্রহ যেমন কমবে, তেমনি ঝরে পড়ার প্রবণতাও বাড়তে পারে। অভিভাবকদের অভিযোগও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। তাঁরা বলছেন, অনেক শিক্ষক উপজেলা সদরে বসবাস করায় বিদ্যালয়ে আসা-যাওয়ার সময়ের সঙ্গে সমন্বয় করে আগেভাগেই বিদ্যালয় ছুটি দিয়ে দেন। অভিযোগটি সত্য হলে তা অত্যন্ত গুরুতর অনিয়ম। একজন সরকারি কর্মচারী কোথায় বসবাস করবেন, সেটি তাঁর ব্যক্তিগত বিষয় হতে পারে; কিন্তু সেই কারণে সরকারি প্রতিষ্ঠানের নির্ধারিত কর্মঘণ্টা কমিয়ে দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আমরা মনে করি, এ ক্ষেত্রে শুধু ক্ষোভ প্রকাশ করাই যথেষ্ট নয়। উপজেলা প্রশাসন ও প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগের উচিত অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত করা এবং সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া। একই সঙ্গে শুধু এক দিনের পরিদর্শন নয়, নিয়মিত ও আকস্মিক বিদ্যালয় পরিদর্শনের ব্যবস্থা করতে হবে। বিদ্যালয়ে শিক্ষক উপস্থিতি, পাঠদানের সময় এবং নির্ধারিত কর্মঘণ্টা যথাযথভাবে পালন হচ্ছে কি না - তা কঠোরভাবে তদারক করতে হবে। তবে কোনো শিক্ষক যদি দুর্গম হাওরাঞ্চলে যাতায়াতের বাস্তব সমস্যার কারণে নির্ধারিত সময়ে দায়িত্ব পালনে সমস্যায় পড়েন, সে বিষয়টিও প্রশাসনের বিবেচনায় নেওয়া উচিত। প্রয়োজন হলে আবাসন, যাতায়াত বা স্থানীয় পর্যায়ে শিক্ষক উপস্থিতি নিশ্চিত করার কার্যকর ব্যবস্থা করতে হবে। কিন্তু বাস্তব সমস্যার সমাধানের পরিবর্তে নিজের ইচ্ছায় বিদ্যালয় আগেভাগে বন্ধ করে দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। ইউএনও সঞ্জীব সরকারের বিদ্যালয় পরিদর্শনে গিয়ে অনিয়ম শনাক্ত করা এবং উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস ইতিবাচক উদ্যোগ। এখন প্রয়োজন সেই আশ্বাসের বাস্তব প্রয়োগ। কারণ, ব্যবস্থা না হলে পরিদর্শন ও সতর্কবার্তা - দুটিই একসময় আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হবে। সরকার প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে বিপুল অর্থ ব্যয় করছে। বিদ্যালয়ের অবকাঠামো উন্নয়ন, উপবৃত্তি, বিনামূল্যে বইসহ নানা কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। এসব উদ্যোগের সুফল তখনই মিলবে, যখন শিক্ষকরা আন্তরিকভাবে তাঁদের দায়িত্ব পালন করবেন। শিশুদের শিক্ষা নিয়ে কোনো আপস করা যায় না। নির্ধারিত সময়ের আগে বিদ্যালয়ের দরজায় তালা ঝুলবে - এ দৃশ্য কোনোভাবেই স্বাভাবিক হতে পারে না। দিরাইয়ের ঘটনাটি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জন্য সতর্কবার্তা। এখন প্রয়োজন দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং হাওরাঞ্চলের প্রতিটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নিয়মিত, মানসম্মত ও পূর্ণ কর্মঘণ্টার পাঠদান নিশ্চিত করা।

সম্পাদকীয় :

  • সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি : মো. জিয়াউল হক
  • সম্পাদক ও প্রকাশক : বিজন সেন রায়
  • বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : মোক্তারপাড়া রোড, সুনামগঞ্জ-৩০০০।

অফিস :

  • ই-মেইল : [email protected]
  • ওয়েবসাইট : www.sunamkantha.com