সহযোগিতা বাড়িয়ে নির্ভরতা কমানো, দেশের সামনে বড় কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ

আপলোড সময় : ২০-০৯-২০২৬ ০৬:২২:০৭ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ২০-০৯-২০২৬ ০৬:২২:৩৪ অপরাহ্ন
‎বিশেষ প্রতিনিধি::
বিশ্ব রাজনীতির দ্রুত পরিবর্তনশীল বাস্তবতায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি এখন একাধিক শক্তির স্বার্থ, নিরাপত্তা উদ্বেগ ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের জটিল সমীকরণের মধ্য দিয়ে এগোচ্ছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ও কৌশলগত সম্পর্কের নতুন মাত্রা তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে চীনের সঙ্গে অবকাঠামো, বিনিয়োগ ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বিস্তৃত হচ্ছে। একই সময়ে প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক নতুন করে পর্যালোচনার পর্যায়ে এসেছে। ফলে বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন কোনো একটি শক্তির দিকে ঝুঁকে পড়া নয়; বরং বহুমুখী সম্পর্কের মধ্যে জাতীয় স্বার্থ ও কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন কীভাবে অক্ষুণ্ন রাখা যায়। ‎ ‎এই বাস্তবতার সাম্প্রতিক একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত ভারতের সঙ্গে স্বাক্ষরিত ১০১টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক পর্যালোচনার উদ্যোগ। ১১ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদের সরকারদলীয় চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি জানান, আগের সরকারের সময়ে ভারতের সঙ্গে করা এসব চুক্তি ও সমঝোতা পর্যালোচনা করা হচ্ছে। এর কয়েক দিন পর, ১৮ সেপ্টেম্বর ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, এ বিষয়ে দিল্লিকে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি। তিনি জানান, ভারতের স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। ‎ ‎এই ঘটনাকে শুধু একটি দ্বিপক্ষীয় চুক্তি পর্যালোচনার বিষয় হিসেবে দেখলে এর ব্যাপ্তি পুরোপুরি ধরা পড়ে না। এর মধ্যে ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্কের নতুন মূল্যায়নের একটি ইঙ্গিত রয়েছে। ২০২৩ সালে বাংলাদেশের নির্বাচনকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের চাপ, চীনের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ও কৌশলগত উপস্থিতি এবং ভারতের নিরাপত্তাগত স্বার্থ—সব মিলিয়ে যে ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছিল, ২০২৬ সালে তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পুরোনো দ্বিপক্ষীয় চুক্তিগুলোর নতুন মূল্যায়ন। ফলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে ওয়াশিংটন, বেইজিং ও নয়াদিল্লির পারস্পরিক সম্পর্ক এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রভাব এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ‎ ‎ঢাকার ঘোষিত অবস্থান হলো—জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে কোনো একটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা না বাড়িয়ে সব বড় শক্তির সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারতসহ বিভিন্ন অংশীদারের সঙ্গে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি, প্রযুক্তি, যোগাযোগ, নিরাপত্তা ও উন্নয়ন সহযোগিতা বাড়ানো হবে; কিন্তু এর বিনিময়ে বাংলাদেশের সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা যাতে সংকুচিত না হয়, সেটিও বিবেচনায় রাখতে হবে। ‎ ‎‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে শত্রুতা নয়’—বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির এই দীর্ঘদিনের মূলনীতি বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় নতুন করে পরীক্ষা দিচ্ছে। কারণ বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা থেকে বাংলাদেশের মতো একটি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ দেশ পুরোপুরি বাইরে থাকতে পারে না। আবার কোনো একটি শক্তির সঙ্গে অতিরিক্তভাবে জড়িয়ে পড়লেও অর্থনৈতিক ও কৌশলগত ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। ‎ ‎বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কও গত কয়েক বছরে রাজনৈতিক আলোচনা ছাড়িয়ে ক্রমেই অর্থনৈতিক ও কৌশলগত মাত্রা পেয়েছে। এর একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত ‘অ্যাগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড’। চুক্তিটি দুই দেশের বাজারে প্রবেশাধিকার, শুল্ক ও বাণিজ্য বাধা কমানোর পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও কাঠামোবদ্ধ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, চুক্তিটি দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক শক্তিশালী করার উদ্দেশ্যে করা হয়েছে এবং এতে বাংলাদেশি পণ্যের জন্য মার্কিন বাজারে প্রবেশাধিকার ও যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের জন্য বাংলাদেশের বাজারে প্রবেশাধিকারসংক্রান্ত বিভিন্ন ব্যবস্থা রয়েছে। (The American Presidency Project) ‎ ‎ফলে বাংলাদেশের সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্ককে শুধু অতীতের রাজনৈতিক চাপের ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখার সুযোগ কমছে। রপ্তানি বাজার, শুল্ক, বিনিয়োগ, সরবরাহশৃঙ্খল, প্রযুক্তি ও জ্বালানি—সবকিছুই এখন সম্পর্কটির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ‎ ‎এখানে বাংলাদেশের জন্য চ্যালেঞ্জ হলো অর্থনৈতিক সুবিধা গ্রহণের পাশাপাশি অতিরিক্ত নির্ভরতা এড়িয়ে চলা। যুক্তরাষ্ট্র যেমন তার নিজস্ব অর্থনৈতিক ও জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থকে বাণিজ্যনীতির সঙ্গে যুক্ত করছে, তেমনি বাংলাদেশেরও বাজার, বিনিয়োগ ও প্রযুক্তির সুযোগ গ্রহণের সময় দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থ বিবেচনা করতে হবে। ‎ ‎চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের পরিধিও গত কয়েক বছরে দ্রুত বিস্তৃত হয়েছে। বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পাশাপাশি অবকাঠামো, যোগাযোগ, শিল্প, প্রযুক্তি, জ্বালানি, কৃষি, শিক্ষা এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতার ক্ষেত্রেও দুই দেশের যোগাযোগ বাড়ছে। ‎ ‎২০২৬ সালের জুনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর এ সম্পর্কের নতুন মাত্রা তুলে ধরে। সফরে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াংয়ের সঙ্গে বৈঠক হয়। দুই দেশের সম্পর্ককে ‘নতুন যুগে অভিন্ন ভবিষ্যতের চীন-বাংলাদেশ সম্প্রদায়’ গঠনের দিকে এগিয়ে নেওয়ার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। পাশাপাশি কৌশলগত সংলাপ এবং কূটনীতি ও প্রতিরক্ষা বিষয়ে সম্ভাব্য ‘টু-প্লাস-টু’ সংলাপের বিষয় উঠে এসেছে। ‎ ‎মোংলা বন্দর আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ, চট্টগ্রামে চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল, যোগাযোগ অবকাঠামো, সবুজ জ্বালানি, প্রযুক্তি এবং তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনার মতো বিষয়গুলোও এই সম্পর্কের ব্যাপ্তি বোঝায়। ‎ ‎তবে চীনের সঙ্গে সম্পর্কের বিস্তারকে বাংলাদেশের কোনো নির্দিষ্ট সামরিক বা রাজনৈতিক জোটে যোগদানের সরাসরি প্রমাণ হিসেবে দেখার অবকাশ নেই। বরং বাংলাদেশের বর্তমান কৌশলে একাধিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার প্রবণতাই বেশি স্পষ্ট। তবে বড় অবকাঠামো প্রকল্প, ঋণ, বন্দর, প্রযুক্তি, জ্বালানি কিংবা প্রতিরক্ষা সহযোগিতার ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি নির্ভরতার সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে কি না—তা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনার বিষয়। ‎ ‎চীনের সঙ্গে সম্পর্কের সবচেয়ে বড় বাস্তব সমস্যাগুলোর একটি হলো বাণিজ্য ভারসাম্য। চীনের কাছ থেকে বাংলাদেশ বিপুল পরিমাণ পণ্য আমদানি করলেও চীনা বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি তুলনামূলকভাবে সীমিত। ফলে বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করার পাশাপাশি বাংলাদেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং বাণিজ্য ঘাটতি কমানো। ‎ ‎চীনা বিনিয়োগ ও অবকাঠামো প্রকল্প থেকে বাংলাদেশ কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি ও উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ নিতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে প্রকল্পের অর্থায়ন, ঋণের শর্ত, স্থানীয় শিল্পে প্রভাব এবং ভবিষ্যৎ আর্থিক দায়ও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। অর্থাৎ সম্পর্কের গভীরতা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি নির্ভরতার মাত্রাও গুরুত্বপূর্ণ। ‎ ‎ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের বাস্তবতা আরও জটিল। ভৌগোলিক নৈকট্য, প্রায় ৪ হাজার কিলোমিটার সীমান্ত, বাণিজ্য, যোগাযোগ, বিদ্যুৎ, নিরাপত্তা, নদীর পানি এবং সীমান্তবর্তী মানুষের জীবনযাত্রা—সবকিছু মিলিয়ে ভারত বাংলাদেশের জন্য অন্য যেকোনো শক্তির চেয়ে ভিন্ন ধরনের অংশীদার। ‎ ‎২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দুই দেশের সম্পর্কে নতুন ধরনের টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। ভারতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অবস্থান এবং তাঁকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর দাবি, সীমান্ত পরিস্থিতি, বাণিজ্য ও যোগাযোগের পাশাপাশি নদীর পানিবণ্টনের বিষয়গুলোও সম্পর্কের আলোচনায় রয়েছে। ‎ ‎এই কারণে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ককে শুধু যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতার একটি অংশ হিসেবে দেখা যথেষ্ট নয়। এ সম্পর্কের নিজস্ব ইতিহাস, পারস্পরিক নির্ভরতা ও দ্বিপক্ষীয় সমস্যা রয়েছে। ‎ ‎ভারতের সঙ্গে ১০১টি চুক্তি ও সমঝোতা পর্যালোচনার উদ্যোগ এই নতুন বাস্তবতায় বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তবে পর্যালোচনা মানেই সব চুক্তি বাতিল বা সংশোধন করা হবে—এমন কোনো সিদ্ধান্ত এখনো প্রকাশ্যে আসেনি। বরং সাম্প্রতিক বক্তব্য অনুযায়ী, চুক্তিগুলো পরীক্ষা করে অসঙ্গতি বা বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী কোনো বিষয় থাকলে তা চিহ্নিত করার বিষয়টি সামনে এসেছে। ‎ ‎এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হওয়া উচিত পর্যালোচনার পদ্ধতি। কোনো চুক্তি কোন সরকারের সময়ে হয়েছে—এটি একমাত্র বিবেচনা হতে পারে না। চুক্তির আইনি কাঠামো, অর্থনৈতিক ফলাফল, বাস্তব প্রয়োগ, নিরাপত্তাগত প্রভাব, পারস্পরিক সুবিধা এবং ভবিষ্যৎ দায়—সবকিছু বিবেচনায় নিয়েই মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। ‎ ‎ভারতের পক্ষ থেকেও এখন পর্যন্ত যে বক্তব্য এসেছে, তাতে দিল্লি বলেছে তারা এ বিষয়ে বাংলাদেশের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো যোগাযোগ পায়নি এবং নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে। এটিকে সরাসরি চুক্তি বাতিলের বিরুদ্ধে হুমকি হিসেবে ব্যাখ্যা করার চেয়ে ভারতের দ্বিপক্ষীয় স্বার্থ রক্ষার অবস্থান হিসেবে দেখা বেশি সংগত। ‎ ‎ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় সামনে অপেক্ষা করছে—গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি। ১৯৯৬ সালের চুক্তিটির মেয়াদ ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা। ভারতের সংসদীয় নথি অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দুই দেশের মধ্যে চুক্তি নবায়ন নিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হয়নি। বাংলাদেশের যৌথ নদী কমিশনের তথ্যেও বর্তমান চুক্তিটির মেয়াদ ২০২৬ সালে শেষ হওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে। ‎ ‎অতএব ১০১টি চুক্তি পর্যালোচনার পাশাপাশি পানি, সীমান্ত, বাণিজ্য, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগের মতো মৌলিক দ্বিপক্ষীয় বিষয়েও বাংলাদেশকে সক্রিয় কূটনৈতিক উদ্যোগ নিতে হবে। ‎ ‎বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক অবস্থানকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে ভারত-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতা। তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা নিয়ে চীনের সম্ভাব্য সহযোগিতা যেমন বাংলাদেশের উন্নয়ন ও পানি ব্যবস্থাপনার প্রশ্নে গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি ভারতের জন্যও এর কৌশলগত ও ভৌগোলিক গুরুত্ব রয়েছে। ‎ ‎এ ধরনের প্রকল্পে বিদেশি অংশীদার বাছাইয়ের ক্ষেত্রে শুধু অর্থায়ন বা প্রযুক্তির সুবিধা দেখলে চলবে না। প্রকল্পের পরিবেশগত প্রভাব, পরিচালন ব্যয়, দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক দায়, প্রযুক্তিগত নির্ভরতা এবং প্রতিবেশী দেশের নিরাপত্তাগত উদ্বেগ—সবকিছুকেই বিবেচনায় নিতে হবে। ‎ ‎বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা এখন আর কেবল অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির বিষয় নয়; এটি পররাষ্ট্রনীতি ও ভূরাজনীতির সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত। এলএনজি ও অন্যান্য জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরতা থাকায় আন্তর্জাতিক বাজারদর, সমুদ্রপথের নিরাপত্তা এবং সরবরাহব্যবস্থায় যেকোনো বড় পরিবর্তন দেশের বিদ্যুৎ ও শিল্প উৎপাদনে প্রভাব ফেলতে পারে। ‎ ‎যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশ থেকে জ্বালানি আমদানির সুযোগ বাড়ানো একটি বিকল্প হতে পারে। তবে তার পাশাপাশি দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, জ্বালানি অবকাঠামো উন্নয়ন, সরবরাহকারী দেশ বহুমুখীকরণ এবং কৌশলগত মজুত বাড়ানোর বিষয়ও গুরুত্ব পেতে হবে। ‎ ‎এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গে অর্থনৈতিক নিরাপত্তার সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠছে। চীন বাংলাদেশের বড় বাণিজ্য অংশীদার ও অবকাঠামো সহযোগী। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি বাজার এবং ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক অংশীদার। ভারতের সঙ্গে রয়েছে স্থল ও সমুদ্র যোগাযোগ, বিদ্যুৎ, বাণিজ্য এবং সীমান্ত অর্থনীতি। ‎ ‎তবে তিন দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের ধরন এক নয়। তাই একই মাপকাঠিতে তিনটি সম্পর্ককে বিচার না করে খাতভিত্তিক জাতীয় স্বার্থ নির্ধারণ করা প্রয়োজন। ‎ ‎যেখানে বাজার দরকার, সেখানে বাজার; যেখানে বিনিয়োগ দরকার, সেখানে বিনিয়োগ; যেখানে প্রযুক্তি প্রয়োজন, সেখানে প্রযুক্তি; আর যেখানে নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন রয়েছে, সেখানে দীর্ঘমেয়াদি কৌশল—এই পৃথক পদ্ধতিই বাংলাদেশের জন্য বেশি কার্যকর হতে পারে। ‎ ‎মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি বা সম্ভাব্য নতুন কোনো প্রতিরক্ষা কাঠামোতেও বাংলাদেশের অংশগ্রহণের প্রশ্ন উঠলে সেটিকে শুধু মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয় হিসেবে দেখলে হবে না। এ ধরনের কোনো কাঠামো বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক অবস্থানে কী প্রভাব ফেলতে পারে, তা ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, চীন এবং মধ্যপ্রাচ্যের অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্কের প্রেক্ষাপটেও বিবেচনা করতে হবে। ‎ ‎অর্থাৎ ভবিষ্যতে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা যত বাড়বে, ততই প্রয়োজন হবে স্পষ্ট নীতিগত অবস্থান এবং প্রতিটি উদ্যোগের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত মূল্যায়ন। ‎ ‎সব মিলিয়ে বাংলাদেশ এখন এমন কোনো অবস্থায় নেই যে তাকে সরাসরি একটি নির্দিষ্ট ভূরাজনৈতিক জোটের অংশ হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। বরং বাস্তবতা হলো—একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ, চীনের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক বিস্তার এবং ভারতের নিরাপত্তা ও প্রতিবেশী স্বার্থ বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। ‎ ‎১০১টি ভারতীয় চুক্তি পর্যালোচনার উদ্যোগ এই বহুমাত্রিক বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করেছে। তবে এর ফল কী হবে, তা নির্ভর করবে পর্যালোচনার মানদণ্ড, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বচ্ছতা এবং পরবর্তী কূটনৈতিক আলোচনার ওপর। ‎ ‎বাংলাদেশের সামনে তাই মূল প্রশ্ন কোনো একটি শক্তিকে বেছে নেওয়া নয়। বরং প্রতিটি অংশীদারের সঙ্গে সম্পর্কের নিজস্ব ক্ষেত্র ও প্রয়োজন অনুযায়ী জাতীয় স্বার্থ নির্ধারণ করা। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাজার ও বিনিয়োগ, চীনের সঙ্গে অবকাঠামো ও শিল্প সহযোগিতা, ভারতের সঙ্গে প্রতিবেশী সম্পর্ক ও আঞ্চলিক সংযোগ—প্রতিটি ক্ষেত্রের গুরুত্ব আলাদা। ‎ ‎জাতীয় স্বার্থ রক্ষার অর্থ সম্পর্ক সংকুচিত করা নয়; বরং এমন সম্পর্ক তৈরি করা, যেখানে সহযোগিতার সুযোগ সর্বোচ্চ হবে কিন্তু সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা অযথা সীমিত হবে না। ‎ ‎বড় শক্তির প্রতিযোগিতা থেকে বাংলাদেশ পুরোপুরি দূরে থাকতে পারবে না। আবার কোনো একটি শক্তির কৌশলগত হিসাবের সঙ্গে অতিরিক্তভাবে যুক্ত হয়ে পড়াও দীর্ঘমেয়াদে নতুন নির্ভরতা তৈরি করতে পারে। তাই প্রয়োজন আবেগনির্ভর অবস্থানের বদলে বাস্তববাদী কূটনীতি, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, স্বচ্ছ চুক্তি, অর্থনৈতিক হিসাব এবং নিরাপত্তাগত মূল্যায়নের সমন্বয়। ‎ ‎শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক সাফল্যের মাপকাঠি হবে—কত বড় শক্তির সঙ্গে কতটা ঘনিষ্ঠতা তৈরি হলো, তা নয়; বরং বহুমুখী সম্পর্কের মধ্যেও দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব ও কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা কতটা অক্ষুণ্ন রাখা গেল। এ ভারসাম্যই আগামী দিনের বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

সম্পাদকীয় :

  • সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি : মো. জিয়াউল হক
  • সম্পাদক ও প্রকাশক : বিজন সেন রায়
  • বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : মোক্তারপাড়া রোড, সুনামগঞ্জ-৩০০০।

অফিস :

  • ই-মেইল : [email protected]
  • ওয়েবসাইট : www.sunamkantha.com