::মোহাম্মদ আব্দুল হক::
আমার আলোচনার বিষয় দেশের ঐতিহাসিক স্থাপনা ও প্রতœতাত্ত্বিক নিদর্শন রক্ষার গুরুত্ব। এগুলো রক্ষা করা কেবল অতীতকে আঁকড়ে ধরে রাখার বিষয় নয়, বরং এটি একটি জাতির অস্তিত্ব, পরিচয় ও ভবিষ্যৎ অগ্রগতির সঙ্গে সরাসরি জড়িত। এগুলো সাক্ষ্য দেয় যে, অতীতে সেই অঞ্চলের সমাজ, সংস্কৃতি ও জীবনধারা কেমন ছিলো। তাই আমি মনে করি এগুলো ধ্বংস হলে জাতি তার নিজস্ব ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সংযোগ হারিয়ে ফেলে। অস্বীকার করার সুযোগ নাই যে লিখিত ইতিহাসের চেয়ে প্রতœতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলো অনেক বেশি প্রামাণ্য ও নিরপেক্ষ। প্রাচীন স্থাপত্য, ভাস্কর্য, শিলালিপি ও ব্যবহৃত জিনিসপত্র গবেষণা করে একটি জনগোষ্ঠীর শিল্পকলা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং জীবনযাত্রার মান সম্পর্কে সঠিক তথ্য জানা যায়। এসব থেকে আমাদের জ্ঞান চর্চা করার সুযোগ সৃষ্টি হয়। শিক্ষার্থী, ইতিহাসবিদ ও গবেষকদের জন্য এসব নিদর্শন এক বিশাল মুক্ত পাঠশালা। এগুলো পর্যবেক্ষণ করে অতীত সভ্যতার সাফল্য ও ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা যায়, যা ভবিষ্যতের পরিকল্পনা ও সভ্যতার বিকাশে সহায়তা করে। এছাড়াও এসবের রয়েছে অর্থনৈতিক গুরুত্ব। এসব ঐতিহাসিক ও প্রতœতাত্ত্বিক স্থানগুলো বিদেশি ও দেশি পর্যটকদের আকর্ষণ করে। এতে করে পর্যটন শিল্পের বিকাশ ঘটলে স্থানীয় অর্থনীতি সমৃদ্ধ হয়, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় এবং দেশের রাজস্ব আয় বৃদ্ধি পায়। আমাদের অনেক ঐতিহাসিক স্থাপনা আছে। একটি নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করলে আরো আরো বিষয়ের গুরুত্বও বোঝা যাবে আশা করি।
একবার গেছিলাম ‘লালবাগ কেল্লা’ দেখতে। তা-ও অনেক বছর আগে। বাংলাদেশের ঐতিহাসিক ও প্রতœতাত্ত্বিক স্থাপনাগুলোর একটি হলো লালবাগ কেল্লা - ঢাকায় অবস্থিত। আমরা এখনও যে অবস্থায় এটি দেখি সেটি কিন্তু অস¤পূর্ণ, অর্থাৎ এটির নির্মাণ কাজ কখনোই স¤পূর্ণ শেষ হয়নি। এটির নির্মাণ কাজ শুরু করেছিলেন মুঘল স¤্রাট আওরঙ্গজেবের তৃতীয় ছেলে যুবরাজ মুহাম্মদ আযম ১৬৭৮ খ্রীষ্টিয় সালে। মুঘল স¤্রাট আওরঙ্গজেবের সময় দুই দফায় বাংলার সুবেদার ছিলেন শায়েস্তা খান। এরমধ্যে মধ্যবর্তী সময়ে একবছরের বেশি সময় ঢাকায় সুবেদার হিসেবে ছিলেন স¤্রাট আওরঙ্গজেবের পুত্র মুহাম্মদ আযম। তখন তিনি এটির নির্মাণকাজ শুরু করেছিলেন। নির্মাণকাজ শুরুর কিছুদিন পরে যুবরাজ আযমকে ঢাকা থেকে দিল্লিতে ফিরিয়ে নেন স¤্রাট আওরঙ্গজেব। পরে দ্বিতীয় দফায় আবার শায়েস্তা খানকে ঢাকায় সুবেদার নিয়োগ করা হলেও তিনি আর এই দুর্গের কাজ এগিয়ে নেননি। কারণ অনুসন্ধানে বিভিন্ন ইতিহাসবিদদের লেখায় উঠে এসেছে, পরীবিবি’র মৃত্যু। পরীবিবি ছিলেন শায়েস্তা খানের মেয়ে। ঢাকায় সুবেদার হিসেবে যুবরাজ মুহাম্মদ আযম এসে শায়েস্তা খানের মেয়ে পরীবিবিকে বিয়ে করেছিলেন। পরীবিবি হঠাৎ মৃত্যুবরণ করায় শায়েস্তা খানের মনে হয়েছিলো এই দুর্গটি অশুভ। তাই তিনি দ্বিতীয় পর্যায়ে সুবেদার হিসেবে ঢাকায় এসে আর নির্মাণকাজ এগিয়ে নেননি। সেই থেকে প্রায় সাড়ে তিনশো বছর ধরে আমাদের সামনে লালবাগ কেল্লা নামে যে স্থাপনা আছে তা প্রকৃত কাঠামো পরিকল্পনা অনুযায়ী একটি অস¤পূর্ণ স্থাপনা। মুঘল সা¤্রাজ্যের অবসানের পরে ধীরে ধীরে দুর্গটি অবহেলিত হয়ে যায়। বর্তমানে লালবাগ কেল্লায় গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে যেসব আছে তা হলো- পরীবিবির সমাধি, লালবাগ মসজিদ, হাম্মামখানা, দরবার হল, দক্ষিণ ফটক এবং প্রতিরক্ষা প্রাচীর ও বুরুজ। এখানে উল্লেখ করছি, অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন তাঁর ‘স্মৃতি বিস্মৃতির নগরী’ বইয়ে লিখেছেন, “ঢাকায় থাকাকালীন সময়ে যুবরাজ আযম বুড়িগঙ্গার তীরে একটি দুর্গ নির্মাণ শুরু করলেন। নাম রাখলেন ‘কিল্লা আওরঙ্গবাদ’। যদিও সবাই এটিকে চিনতো লালবাগ দুর্গ নামেই।
জানা থেকে লেখা। আমার মনে হয়, এসব প্রাচীন ঐতিহাসিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ করে পর্যটন আকর্ষণের উপযোগী করা দরকার। দুর্ভাগ্য আমাদের, আমাদেরকে দেখতে হয় নিকট অতীত কিংবা শতাব্দী পুরোনো ঐতিহাসিক গল্প জড়িয়ে থাকা ঐতিহ্য ও স্থাপনা কেবলই ধ্বংস করে ফেলার তান্ডব।
আমাদের ভাষা আন্দোলন এবং আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস আছে এবং এসবের সাথে জড়িয়ে আছে অনেক স্থাপনা যেগুলো সংরক্ষণ করা ও রক্ষা রাষ্ট্রের দায়িত্ব এবং আমাদের সচেতন সহযোগিতা দরকার। তারও আগে শতাব্দীর সাক্ষী অনেক ঐতিহ্য আমাদের এই অঞ্চলের ইতিহাসের অংশ। এগুলো রক্ষণাবেক্ষণের দাবি রাখে। এসব ঐতিহাসিক স্থাপনায় ভ্রমণ করলে ইতিহাস ঐতিহ্য সম্পর্কে ধারণা সমৃদ্ধ হবে। একটা জাতির জন্য এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তেমনি আহসান মঞ্জিল এবং লালবাগ কেল্লাসহ বাংলাদেশের সকল ঐতিহাসিক ও প্রতœতাত্ত্বিক নিদর্শন একবার হলেও সময় পেলে দেখা দরকার। কিন্তু ধ্বংস হওয়া থেকে বা ধ্বংস করা থেকে দূরে থাকতে হবে। এটা সম্ভব হবে যদি আমরা এসবের গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পারি। এ বিষয়ে স্কুল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে আরও ঘনিষ্ঠ পাঠ করানোর ব্যবস্থা করতে হবে। সংক্ষিপ্ত আলোচনায় আশা করছি আমরা বুঝতে পারছি আমাদের অতীত ঐতিহ্য ও ঐতিহাসিক স্থাপনা আমাদের মাইলফলক হিসেবে আমাদেরকে সামনে এগুতে সাহায্য করবে।।
[লেখক : মোহাম্মদ আব্দুল হক, কলামিস্ট ও কথাসাহিত্যিক]