আকরাম উদ্দিন::
সুনামগঞ্জের শিক্ষাঙ্গনে নীরবে আলো ছড়ানো মানুষদের মধ্যে শিক্ষাবিদ দীপক রঞ্জন দাশ অন্যতম। চার দশকের দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে তিনি যেমন জ্ঞান ও মেধার আলো ছড়িয়েছেন, তেমনি অবসর জীবনেও লেখালেখির মাধ্যমে সমাজ ও শিক্ষাক্ষেত্রে অবদান রেখে চলেছেন। প্রচারের আলো থেকে তিনি সবসময়ই দূরে থাকেন। অথচ মানুষের ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও আস্থার জায়গায় তিনি আজও উজ্জ্বল। দীর্ঘ ৮৫ বছরের জীবনে জ্ঞান, মেধা, দায়িত্ববোধ ও নিষ্ঠার সঙ্গে শিক্ষকতা পেশায় অবদান রেখেছেন সর্বজন শ্রদ্ধেয় শিক্ষাবিদ দীপক রঞ্জন দাশ। শিক্ষকতা থেকে অবসর নিলেও থেমে থাকেননি। অবসর জীবনের অবসরটুকুও তিনি কাজে লাগাচ্ছেন লেখালেখি ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে। জ্ঞানচর্চার সঙ্গে তাঁর এই দীর্ঘ পথচলা তাঁকে আজও মানুষের কাছে শ্রদ্ধার আসনে অধিষ্ঠিত করে রেখেছে। গত ২৬ সেপ্টেম্বর (শনিবার) দুপুর ১টার দিকে শহরের নতুনপাড়ায় তাঁর বাসায় যাওয়ার সুযোগ হলো। দরজা পেরিয়ে ভেতরে ঢুকতেই দেখা হলো তাঁর একমাত্র মেয়ে অনুরাধা দাশ মুন্নীর সঙ্গে। কী বিষয়- জানতে চাওয়ার আগেই দীপক স্যারও এসে হাজির। মুন্নী পরিচয় করিয়ে দিয়ে সহজ-স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বললেন, তিনি আমাদের আপনজন।
ঘরের ভেতরে বসার পরপরই চা-নাস্তা চলে এলো। এক কাপ চায়ের উষ্ণতার সঙ্গে ধীরে ধীরে জমে উঠল কথোপকথন। প্রথমে টুকটাক কথা, তারপর সেই আলাপ কখন যে জীবনের নানা অধ্যায়ে গিয়ে পৌঁছাল, তা যেন টেরই পাওয়া গেল না। শৈশবের দিনগুলো থেকে শুরু করে পরিবার, শিক্ষাজীবন, শিক্ষকতা, কর্মজীবন-জীবনের নানা বাঁক নিয়ে কথা হলো। উঠে এলো মানুষের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের সম্পর্ক, শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ববোধ, সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং সময়ের সঙ্গে বদলে যাওয়া নানা অভিজ্ঞতার কথা। তাঁর কথার ফাঁকে ফাঁকে যেন ফিরে আসছিল জীবনের ফেলে আসা দিনগুলো, স্মৃতি আর অভিজ্ঞতার অসংখ্য গল্প।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আগের দিনের শিক্ষায় বই ছিল জ্ঞানের প্রধান দরজা, আর শিক্ষক ছিলেন সেই দরজার পথপ্রদর্শক। আজকের ডিজিটাল যুগে জ্ঞানের দরজা অসংখ্য। কিন্তু কোন দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে হবে, কোন তথ্য গ্রহণ করতে হবে-তা বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য একজন ভালো শিক্ষকের প্রয়োজনীয়তা এখনও অপরিবর্তিত। তিনি আরও বলেন, প্রযুক্তি শিক্ষার পদ্ধতিতে পরিবর্তন এনেছে, কিন্তু একজন আদর্শ শিক্ষকের প্রয়োজনীয়তা কমেনি। বরং তথ্যের এই বিস্তৃত যুগে শিক্ষকের দায়িত্ব ও ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ ও বহুমাত্রিক হয়েছে। একজন প্রবীণ শিক্ষকের দীর্ঘ জীবনের অভিজ্ঞতার ঝুলি যে কতটা সমৃদ্ধ হতে পারে, সেদিন তাঁর সঙ্গে কিছুক্ষণ বসে থাকাতেই তা অনুভব করতে পেরেছিলাম। তাঁর কথায় ছিল অতীতের স্মৃতি, বর্তমানের উপলব্ধি আর ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি এক ধরনের নীরব প্রত্যাশা। সেদিনের সেই আলাপ ছিল নিছক সাক্ষাৎ নয় বরং একজন গুণী শিক্ষকের দীর্ঘ জীবনের গল্প শোনার এক আন্তরিক সুযোগ। তাঁর জীবনের নানা অধ্যায় নিয়ে কথা বলতে বলতে মনে হলো, একজন শিক্ষক শুধু শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করেন না, তাঁর জীবন ও কর্মও পরবর্তী প্রজন্মের জন্য একেকটি পাঠ হয়ে থাকে।
জন্ম ও পারিবারিক পরিচয়: বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ দীপক রঞ্জন দাশ ১৯৪২ সালের ১ জানুয়ারি সুনামগঞ্জ শহরের বর্তমান নিলয় - ৮৩, নতুনপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা স্বর্গীয় ক্ষিতীন্দ্র কুমার দাশ এবং মাতা স্বর্গীয় গৌরী রানী দাশ। পিতা ক্ষিতীন্দ্র কুমার দাশ সুনামগঞ্জ শহরের বুলচান্দ উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। তাঁদের আদি নিবাস ছিল সুনামগঞ্জ জেলার ছাতক থানার রসুলগঞ্জ ইউনিয়নের ছৈলা গ্রামে। ছয় বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে দীপক রঞ্জন দাশ ছিলেন দ্বিতীয়। পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের মধ্যেও শিক্ষা ও কর্মজীবনে সাফল্যের দৃষ্টান্ত রয়েছে।
তাঁর পরিবারের কয়েকজন সদস্যও শিক্ষকতা পেশার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি নিজেও উচ্চবিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং ইংরেজি বিষয়ে অভিজ্ঞ ছিলেন। তাঁর বোন মাধবী দাশ (কুমকুম), বন্দনা দাশ (অঞ্জু), মাধুরী দাশ (কঙ্কা) ও পদ্মশ্রী দাশ (তন্দ্রা) প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন।
ব্যক্তিগত জীবন: দীপক রঞ্জন দাশ মৌলভীবাজার জেলা শহরের স্টেশন এলাকায় শিশির স্টুডিও’র মালিক শিশির সেনের মেয়ে মালবিকা সেন বিএসসি’র সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তিনি হাফিজা খাতুন গার্লস হাইস্কুলের বিজ্ঞান বিষয়ের শিক্ষিকা ছিলেন। তিনি ২০২৫ সালে প্রয়াত হন। তাঁদের একমাত্র সন্তান অনুরাধা দাশ মুন্নী। তিনি সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে জেলা প্রশাসকের সিএ পদে কর্মরত ছিলেন এবং চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করেছেন।
বাল্যকাল ও শিক্ষাজীবন: শিক্ষাবিদ দীপক রঞ্জন দাশের শিক্ষাজীবনের সূচনা ১৯৫০ সালে সুনামগঞ্জ শহরের বুলচান্দ উচ্চ বিদ্যালয়ে। তাঁর পিতা ওই বিদ্যালয়ের শিক্ষক থাকায় তিনি পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত বাসায় লেখাপড়া করেন। পরে ওই বিদ্যালয়ে সরাসরি ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হন। ১৯৫৬ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করে তিনি তৎকালীন সুনামগঞ্জ শহরের প্রাণকেন্দ্র ট্রাফিক পয়েন্ট এলাকায় অবস্থিত সুনামগঞ্জ কলেজে ভর্তি হন। তিনি ১৯৫৮ সালে আইএ পাস করেন। পরে ১৯৬১ সালে বিএ পাস করেন। ১৯৬৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এম.এ ডিগ্রি লাভ করেন।
শিক্ষকতা জীবনের শুরু: শিক্ষাজীবন শেষ করে ১৯৬১ সালে বর্তমান বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার পলাশ উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৬৩ সালে দিরাই উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৯ সালে সুনামগঞ্জ শহরের বুলচান্দ উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালনের পর ২০০১ সালে তিনি ওই বিদ্যালয় থেকে অবসর গ্রহণ করেন। এছাড়া তিনি কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে মাধ্যমিক পর্যায়ে ইংরেজি বিষয়ের পরীক্ষক ও নিরীক্ষক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
শিক্ষকতা, শুধু পেশা নয়, একটি দায়িত্ব: দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে বলতে গিয়ে শিক্ষাবিদ দীপক রঞ্জন দাশ জানান, তাঁর কাছে শিক্ষকতা কখনোই কেবল চাকরি ছিল না। শিক্ষার্থীদের জ্ঞান, নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধে গড়ে তোলার দায়িত্ব হিসেবেই তিনি শিক্ষকতাকে দেখেছেন।
প্রচারের আড়ালে স্বীকৃতি: দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবন ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে বিভিন্ন অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ শিক্ষাবিদ দীপক রঞ্জন দাশ সম্মাননা পেয়েছেন। তিনি জেলার শ্রেষ্ঠ শিক্ষকের সম্মাননাও লাভ করেছিলেন। জেলা শিক্ষা অফিস আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁকে এ সম্মাননা প্রদান করে।
জাতীয় শিক্ষক দিবস ২০০৩ উপলক্ষে সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও তাঁকে প্রবীণ শিক্ষক হিসেবে সম্মাননা প্রদান করা হয়। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, এসব অর্জন নিয়ে তাঁর মধ্যে কোনো আত্মপ্রচারের প্রবণতা নেই। এ কারণেই তাঁকে বলা যায় প্রচারবিমুখ একজন আলোকিত মানুষ। মানুষের ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও আস্থাই যেন তাঁর কাছে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
লেখালেখি ও সাহিত্য চর্চা: দীপক রঞ্জন দাশ একজন সাহিত্যিক ও লেখকও। বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক, সাময়িকী ও স্থানীয় সংবাদপত্রে তিনি নিয়মিত লেখালেখি করেন। ইতোমধ্যে তিনি কয়েকটি গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে- ঔঁহরড়ৎ ঋঁহপঃরড়হধষ ঊহমষরংয, মাধ্যমিক বাংলা প্রথম পত্র সহায়িকা (১৯৬৮), পনাতীর্থ ও শ্রীঅদ্বৈত, পনাতীর্থ পরিক্রমা ও মধুমাখা নাম। এ ছাড়া তিনি ‘সুনামগঞ্জ পরিচিতি’ গ্রন্থের ইতিহাস অংশ ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন। বয়সের ভারকে উপেক্ষা করে তিনি এখনও লেখালেখিতে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন।
মেধাবৃত্তি চালু: বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ দীপক রঞ্জন দাশের আদর্শ, শিক্ষা ও মূল্যবোধ নতুন প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে তাঁর নামে ‘দীপক রঞ্জন দাশ মেধাবৃত্তি পরীক্ষা’ চালু করা হয়েছিল। মেধাবী শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করার পাশাপাশি শিক্ষাক্ষেত্রে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অবদানকে স্মরণ ও সম্মান জানানোই ছিল এ উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য। তবে পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে বর্তমানে এ মেধাবৃত্তি কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।
শিক্ষকতা ও কর্মময় অবসর জীবন: শিক্ষকতা জীবনের পাশাপাশি অবসর সময়েও তিনি ছিলেন কর্মচঞ্চল। লেখালেখির পাশাপাশি নিজ বাসায় ইংরেজি বিষয়ে পাঠদান করতেন। একসময় তাঁর কাছে ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণ করেছেন সুনামগঞ্জের বাসিন্দা ও দেশের প্রথম নারী সলিসিটর জেসমিন আরা বেগম, রাজনীতিবিদ নূরুল হুদা মুকুট, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী মো. জিয়াউল হক, আমেরিকা প্রবাসী অ্যাড. রুহুল আমিন, শিক্ষক অনন্ত কুমার সিংহ সহ আরও কত শত শিক্ষার্থীরা ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণ করেছেন।
আশীর্বাদ প্রার্থনা: দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবন, সাহিত্যচর্চা ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে শিক্ষাবিদ দীপক রঞ্জন দাশ সুনামগঞ্জের শিক্ষা ও সমাজজীবনে একটি স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেছেন। সময়ের সঙ্গে অনেক মুখ আড়ালে চলে যায়, অনেক কর্মযজ্ঞও বিস্মৃতির আড়ালে হারিয়ে যায়। কিন্তু মানুষের জীবন ও কর্ম কখনো কখনো সময়কে অতিক্রম করে ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকে।
শিক্ষাবিদ দীপক রঞ্জন দাশ তেমনই একজন আলোকিত মানুষ। তাঁর দীর্ঘ কর্মময় জীবন, শিক্ষা ও সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা সুনামগঞ্জের মানুষের কাছে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। আমরা তাঁর সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনা করি। তাঁর জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও আশীর্বাদ নতুন প্রজন্মকে আরও সমৃদ্ধ করুক, এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
[লেখক: আকরাম উদ্দিন, সাংবাদিক ও গল্পকার]
সুনামগঞ্জের শিক্ষাঙ্গনে নীরবে আলো ছড়ানো মানুষদের মধ্যে শিক্ষাবিদ দীপক রঞ্জন দাশ অন্যতম। চার দশকের দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে তিনি যেমন জ্ঞান ও মেধার আলো ছড়িয়েছেন, তেমনি অবসর জীবনেও লেখালেখির মাধ্যমে সমাজ ও শিক্ষাক্ষেত্রে অবদান রেখে চলেছেন। প্রচারের আলো থেকে তিনি সবসময়ই দূরে থাকেন। অথচ মানুষের ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও আস্থার জায়গায় তিনি আজও উজ্জ্বল। দীর্ঘ ৮৫ বছরের জীবনে জ্ঞান, মেধা, দায়িত্ববোধ ও নিষ্ঠার সঙ্গে শিক্ষকতা পেশায় অবদান রেখেছেন সর্বজন শ্রদ্ধেয় শিক্ষাবিদ দীপক রঞ্জন দাশ। শিক্ষকতা থেকে অবসর নিলেও থেমে থাকেননি। অবসর জীবনের অবসরটুকুও তিনি কাজে লাগাচ্ছেন লেখালেখি ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে। জ্ঞানচর্চার সঙ্গে তাঁর এই দীর্ঘ পথচলা তাঁকে আজও মানুষের কাছে শ্রদ্ধার আসনে অধিষ্ঠিত করে রেখেছে। গত ২৬ সেপ্টেম্বর (শনিবার) দুপুর ১টার দিকে শহরের নতুনপাড়ায় তাঁর বাসায় যাওয়ার সুযোগ হলো। দরজা পেরিয়ে ভেতরে ঢুকতেই দেখা হলো তাঁর একমাত্র মেয়ে অনুরাধা দাশ মুন্নীর সঙ্গে। কী বিষয়- জানতে চাওয়ার আগেই দীপক স্যারও এসে হাজির। মুন্নী পরিচয় করিয়ে দিয়ে সহজ-স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বললেন, তিনি আমাদের আপনজন।
ঘরের ভেতরে বসার পরপরই চা-নাস্তা চলে এলো। এক কাপ চায়ের উষ্ণতার সঙ্গে ধীরে ধীরে জমে উঠল কথোপকথন। প্রথমে টুকটাক কথা, তারপর সেই আলাপ কখন যে জীবনের নানা অধ্যায়ে গিয়ে পৌঁছাল, তা যেন টেরই পাওয়া গেল না। শৈশবের দিনগুলো থেকে শুরু করে পরিবার, শিক্ষাজীবন, শিক্ষকতা, কর্মজীবন-জীবনের নানা বাঁক নিয়ে কথা হলো। উঠে এলো মানুষের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের সম্পর্ক, শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ববোধ, সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং সময়ের সঙ্গে বদলে যাওয়া নানা অভিজ্ঞতার কথা। তাঁর কথার ফাঁকে ফাঁকে যেন ফিরে আসছিল জীবনের ফেলে আসা দিনগুলো, স্মৃতি আর অভিজ্ঞতার অসংখ্য গল্প।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আগের দিনের শিক্ষায় বই ছিল জ্ঞানের প্রধান দরজা, আর শিক্ষক ছিলেন সেই দরজার পথপ্রদর্শক। আজকের ডিজিটাল যুগে জ্ঞানের দরজা অসংখ্য। কিন্তু কোন দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে হবে, কোন তথ্য গ্রহণ করতে হবে-তা বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য একজন ভালো শিক্ষকের প্রয়োজনীয়তা এখনও অপরিবর্তিত। তিনি আরও বলেন, প্রযুক্তি শিক্ষার পদ্ধতিতে পরিবর্তন এনেছে, কিন্তু একজন আদর্শ শিক্ষকের প্রয়োজনীয়তা কমেনি। বরং তথ্যের এই বিস্তৃত যুগে শিক্ষকের দায়িত্ব ও ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ ও বহুমাত্রিক হয়েছে। একজন প্রবীণ শিক্ষকের দীর্ঘ জীবনের অভিজ্ঞতার ঝুলি যে কতটা সমৃদ্ধ হতে পারে, সেদিন তাঁর সঙ্গে কিছুক্ষণ বসে থাকাতেই তা অনুভব করতে পেরেছিলাম। তাঁর কথায় ছিল অতীতের স্মৃতি, বর্তমানের উপলব্ধি আর ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি এক ধরনের নীরব প্রত্যাশা। সেদিনের সেই আলাপ ছিল নিছক সাক্ষাৎ নয় বরং একজন গুণী শিক্ষকের দীর্ঘ জীবনের গল্প শোনার এক আন্তরিক সুযোগ। তাঁর জীবনের নানা অধ্যায় নিয়ে কথা বলতে বলতে মনে হলো, একজন শিক্ষক শুধু শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করেন না, তাঁর জীবন ও কর্মও পরবর্তী প্রজন্মের জন্য একেকটি পাঠ হয়ে থাকে।
জন্ম ও পারিবারিক পরিচয়: বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ দীপক রঞ্জন দাশ ১৯৪২ সালের ১ জানুয়ারি সুনামগঞ্জ শহরের বর্তমান নিলয় - ৮৩, নতুনপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা স্বর্গীয় ক্ষিতীন্দ্র কুমার দাশ এবং মাতা স্বর্গীয় গৌরী রানী দাশ। পিতা ক্ষিতীন্দ্র কুমার দাশ সুনামগঞ্জ শহরের বুলচান্দ উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। তাঁদের আদি নিবাস ছিল সুনামগঞ্জ জেলার ছাতক থানার রসুলগঞ্জ ইউনিয়নের ছৈলা গ্রামে। ছয় বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে দীপক রঞ্জন দাশ ছিলেন দ্বিতীয়। পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের মধ্যেও শিক্ষা ও কর্মজীবনে সাফল্যের দৃষ্টান্ত রয়েছে।
তাঁর পরিবারের কয়েকজন সদস্যও শিক্ষকতা পেশার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি নিজেও উচ্চবিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং ইংরেজি বিষয়ে অভিজ্ঞ ছিলেন। তাঁর বোন মাধবী দাশ (কুমকুম), বন্দনা দাশ (অঞ্জু), মাধুরী দাশ (কঙ্কা) ও পদ্মশ্রী দাশ (তন্দ্রা) প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন।
ব্যক্তিগত জীবন: দীপক রঞ্জন দাশ মৌলভীবাজার জেলা শহরের স্টেশন এলাকায় শিশির স্টুডিও’র মালিক শিশির সেনের মেয়ে মালবিকা সেন বিএসসি’র সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তিনি হাফিজা খাতুন গার্লস হাইস্কুলের বিজ্ঞান বিষয়ের শিক্ষিকা ছিলেন। তিনি ২০২৫ সালে প্রয়াত হন। তাঁদের একমাত্র সন্তান অনুরাধা দাশ মুন্নী। তিনি সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে জেলা প্রশাসকের সিএ পদে কর্মরত ছিলেন এবং চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করেছেন।
বাল্যকাল ও শিক্ষাজীবন: শিক্ষাবিদ দীপক রঞ্জন দাশের শিক্ষাজীবনের সূচনা ১৯৫০ সালে সুনামগঞ্জ শহরের বুলচান্দ উচ্চ বিদ্যালয়ে। তাঁর পিতা ওই বিদ্যালয়ের শিক্ষক থাকায় তিনি পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত বাসায় লেখাপড়া করেন। পরে ওই বিদ্যালয়ে সরাসরি ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হন। ১৯৫৬ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করে তিনি তৎকালীন সুনামগঞ্জ শহরের প্রাণকেন্দ্র ট্রাফিক পয়েন্ট এলাকায় অবস্থিত সুনামগঞ্জ কলেজে ভর্তি হন। তিনি ১৯৫৮ সালে আইএ পাস করেন। পরে ১৯৬১ সালে বিএ পাস করেন। ১৯৬৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এম.এ ডিগ্রি লাভ করেন।
শিক্ষকতা জীবনের শুরু: শিক্ষাজীবন শেষ করে ১৯৬১ সালে বর্তমান বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার পলাশ উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৬৩ সালে দিরাই উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৯ সালে সুনামগঞ্জ শহরের বুলচান্দ উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালনের পর ২০০১ সালে তিনি ওই বিদ্যালয় থেকে অবসর গ্রহণ করেন। এছাড়া তিনি কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে মাধ্যমিক পর্যায়ে ইংরেজি বিষয়ের পরীক্ষক ও নিরীক্ষক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
শিক্ষকতা, শুধু পেশা নয়, একটি দায়িত্ব: দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে বলতে গিয়ে শিক্ষাবিদ দীপক রঞ্জন দাশ জানান, তাঁর কাছে শিক্ষকতা কখনোই কেবল চাকরি ছিল না। শিক্ষার্থীদের জ্ঞান, নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধে গড়ে তোলার দায়িত্ব হিসেবেই তিনি শিক্ষকতাকে দেখেছেন।
প্রচারের আড়ালে স্বীকৃতি: দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবন ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে বিভিন্ন অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ শিক্ষাবিদ দীপক রঞ্জন দাশ সম্মাননা পেয়েছেন। তিনি জেলার শ্রেষ্ঠ শিক্ষকের সম্মাননাও লাভ করেছিলেন। জেলা শিক্ষা অফিস আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁকে এ সম্মাননা প্রদান করে।
জাতীয় শিক্ষক দিবস ২০০৩ উপলক্ষে সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও তাঁকে প্রবীণ শিক্ষক হিসেবে সম্মাননা প্রদান করা হয়। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, এসব অর্জন নিয়ে তাঁর মধ্যে কোনো আত্মপ্রচারের প্রবণতা নেই। এ কারণেই তাঁকে বলা যায় প্রচারবিমুখ একজন আলোকিত মানুষ। মানুষের ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও আস্থাই যেন তাঁর কাছে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
লেখালেখি ও সাহিত্য চর্চা: দীপক রঞ্জন দাশ একজন সাহিত্যিক ও লেখকও। বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক, সাময়িকী ও স্থানীয় সংবাদপত্রে তিনি নিয়মিত লেখালেখি করেন। ইতোমধ্যে তিনি কয়েকটি গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে- ঔঁহরড়ৎ ঋঁহপঃরড়হধষ ঊহমষরংয, মাধ্যমিক বাংলা প্রথম পত্র সহায়িকা (১৯৬৮), পনাতীর্থ ও শ্রীঅদ্বৈত, পনাতীর্থ পরিক্রমা ও মধুমাখা নাম। এ ছাড়া তিনি ‘সুনামগঞ্জ পরিচিতি’ গ্রন্থের ইতিহাস অংশ ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন। বয়সের ভারকে উপেক্ষা করে তিনি এখনও লেখালেখিতে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন।
মেধাবৃত্তি চালু: বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ দীপক রঞ্জন দাশের আদর্শ, শিক্ষা ও মূল্যবোধ নতুন প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে তাঁর নামে ‘দীপক রঞ্জন দাশ মেধাবৃত্তি পরীক্ষা’ চালু করা হয়েছিল। মেধাবী শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করার পাশাপাশি শিক্ষাক্ষেত্রে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অবদানকে স্মরণ ও সম্মান জানানোই ছিল এ উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য। তবে পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে বর্তমানে এ মেধাবৃত্তি কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।
শিক্ষকতা ও কর্মময় অবসর জীবন: শিক্ষকতা জীবনের পাশাপাশি অবসর সময়েও তিনি ছিলেন কর্মচঞ্চল। লেখালেখির পাশাপাশি নিজ বাসায় ইংরেজি বিষয়ে পাঠদান করতেন। একসময় তাঁর কাছে ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণ করেছেন সুনামগঞ্জের বাসিন্দা ও দেশের প্রথম নারী সলিসিটর জেসমিন আরা বেগম, রাজনীতিবিদ নূরুল হুদা মুকুট, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী মো. জিয়াউল হক, আমেরিকা প্রবাসী অ্যাড. রুহুল আমিন, শিক্ষক অনন্ত কুমার সিংহ সহ আরও কত শত শিক্ষার্থীরা ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণ করেছেন।
আশীর্বাদ প্রার্থনা: দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবন, সাহিত্যচর্চা ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে শিক্ষাবিদ দীপক রঞ্জন দাশ সুনামগঞ্জের শিক্ষা ও সমাজজীবনে একটি স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেছেন। সময়ের সঙ্গে অনেক মুখ আড়ালে চলে যায়, অনেক কর্মযজ্ঞও বিস্মৃতির আড়ালে হারিয়ে যায়। কিন্তু মানুষের জীবন ও কর্ম কখনো কখনো সময়কে অতিক্রম করে ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকে।
শিক্ষাবিদ দীপক রঞ্জন দাশ তেমনই একজন আলোকিত মানুষ। তাঁর দীর্ঘ কর্মময় জীবন, শিক্ষা ও সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা সুনামগঞ্জের মানুষের কাছে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। আমরা তাঁর সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনা করি। তাঁর জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও আশীর্বাদ নতুন প্রজন্মকে আরও সমৃদ্ধ করুক, এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
[লেখক: আকরাম উদ্দিন, সাংবাদিক ও গল্পকার]