ধোপাজান-চলতি নদী সুনামগঞ্জের প্রাকৃতিক সম্পদের অন্যতম আধার। এই নদীর বালুমিশ্রিত পাথর একসময় জেলার অর্থনীতি ও অসংখ্য মানুষের জীবিকার সঙ্গে যুক্ত ছিল। কিন্তু অপরিকল্পিত ও অবৈধ বালু উত্তোলন নদীটির পরিবেশ, প্রতিবেশ ও প্রাকৃতিক ভারসাম্যকে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। আদালতের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে অতীতে দফায় দফায় বালু লুটের ঘটনা ঘটেছে। এতে সরকার বিপুল রাজস্ব হারিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নদী ও নদীপাড়ের জনজীবন। এখন আবার সিসি ক্যামেরার নজরদারি ফাঁকি দিয়ে বালু লুটের অভিযোগ নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
ধোপাজান-চলতি নদীর মোহনায় সিসি ক্যামেরা স্থাপন ছিল অবৈধ বালু উত্তোলন ও পাচার প্রতিরোধে প্রশাসনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। ক্যামেরা স্থাপনের পর বালু লুট কমে আসার খবরও পাওয়া গিয়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে রাতের শেষ ভাগে বালুবোঝাই বাল্কহেড ও নৌযান বেরিয়ে আসার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের বক্তব্য, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ছবি ও মন্তব্য এবং সরেজমিনে পাওয়া তথ্য - সব মিলিয়ে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন। যদিও পুলিশ বলছে, সিসি ক্যামেরা স্থাপনের পর বালু লুট সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। প্রশাসনের এই বক্তব্যের সঙ্গে স্থানীয়দের অভিযোগের এমন বিরোধ জনমনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি করেছে।
প্রশ্ন হচ্ছে, যদি বালু লুট বন্ধই হয়ে থাকে, তাহলে রাতের আঁধারে বালুবোঝাই নৌযান চলাচলের অভিযোগ উঠছে কেন? আর যদি অভিযোগ সত্য হয়, তবে সিসি ক্যামেরার নজরদারি থাকা সত্ত্বেও কীভাবে অবৈধ কর্মকাণ্ড চলছে? ক্যামেরা স্থাপনই কি দায়িত্ব পালনের শেষ কথা, নাকি এর কার্যকারিতা নিশ্চিত করাও প্রশাসনের দায়িত্ব? এসব প্রশ্নের জবাব খুঁজে বের করা জরুরি।
অবৈধ বালু উত্তোলন কেবল রাজস্ব ফাঁকির বিষয় নয়। এর সঙ্গে নদীর গতিপথ, জীববৈচিত্র্য, পরিবেশ এবং নদীতীরবর্তী মানুষের নিরাপত্তার প্রশ্ন জড়িত। প্রভাবশালী কোনো চক্রের ছত্রচ্ছায়ায় এ ধরনের কর্মকাণ্ড চললে তা আইনের শাসনের জন্যও উদ্বেগজনক। অভিযোগে যাদের নাম বা সংশ্লিষ্টতার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, তদন্তের মাধ্যমে তাদের ভূমিকা যাচাই করতে হবে। অপরাধে জড়িত যে-ই হোক, প্রমাণ সাপেক্ষে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
ধোপাজান-চলতি নদী রক্ষায় এখন প্রয়োজন লোকদেখানো তৎপরতা নয়, কার্যকর ও নিরবচ্ছিন্ন নজরদারি। সিসি ক্যামেরার ফুটেজ নিয়মিত পর্যালোচনা, রাতের বেলায় নৌযান চলাচল পর্যবেক্ষণ, সন্দেহজনক বালুবোঝাই নৌযান শনাক্ত এবং অবৈধ উত্তোলনের উৎসে অভিযান নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ গ্রহণ ও তার নিরপেক্ষ তদন্তের ব্যবস্থাও জরুরি।
ধোপাজান-চলতি নদী কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়; এটি জনসম্পদ। এই সম্পদ লুটের সুযোগ বন্ধ করা প্রশাসনের দায়িত্ব। সিসি ক্যামেরার চোখ যদি বালু লুটের বিরুদ্ধে কার্যকর না হয়, তবে তার উদ্দেশ্যই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়বে। নদী রক্ষায় কথার চেয়ে দৃশ্যমান পদক্ষেপই এখন সবচেয়ে বেশি জরুরি।