মনে পড়ে সাংবাদিক শাহার উদ্দিন আহমেদ ভাইয়ের কথা। ২০০৬ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর তিনি পরপারে চলে গিয়েছিলেন আমাদের ছেড়ে। অনেকেই হয়তো ভুলে গেছেন দিনটির কথা। অথচ সুনামগঞ্জ শহরের সংবাদপত্র জগতে শাহার উদ্দিন আহমেদ ছিলেন অতিপরিচিত নাম। পিতা- আফসার উদ্দিন আহমেদ, মাতা- মেহেরুন্নেছা খানম, স্ত্রী তৈয়বুন্নেছা খানম। শাহার ভাই’র জন্মস্থান বর্তমান তাহিরপুর উপজেলার আমবাড়ি গ্রামে। ভাই-বোনদের মধ্যে তিনি ছিলেন খুবই মেধাবী। গ্রামের পাঠশালা থেকে হাইস্কুল এবং কলেজপাড়া সর্বত্রই তিনি রেখেছিলেন মেধার স্বাক্ষর।
ছোটবেলা থেকেই শাহার উদ্দিন আহমেদ ছিলেন পড়াশোনার প্রতি আগ্রহী। শখ ছিল ভ্রমণ ও সংবাদপত্র পাঠ। বিভিন্ন কারণে তিনি ভ্রমণ করেছেন ভারতের প্রায় ২৪টি প্রদেশ। ভ্রমণের পাশাপাশি অসুস্থ রোগী নিয়ে যেতেন ভারতে। কারণ তিনি জানতেন বাংলার পাশাপাশি ইংরেজি, হিন্দি, উর্দু ও আরবী ভাষা। এজন্য অনেক মানুষ ভারত বা অন্য দেশে গেলে তাঁর সহযোগিতা চাইতেন। কখনও তিনি কাউকে নিরাশ করতেন না। তিনি মনে করতেন অসুস্থ রোগীর সেবা করা বিশেষ পুণ্যের কাজ। ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে ওঠে তিনি মানবসেবায় নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন। ভারতের অনেক প্রদেশের ভাষাও তিনি জানতেন। তাই ভারত, নেপাল ও অনেক দেশে তিনি বার বার ভ্রমণে গিয়েছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন ভ্রমণ হচ্ছে অর্ধেক জ্ঞান। এক পর্যায়ে তিনি সংবাদপত্রের দিকে ঝুঁকে পড়েন। তিনি বাংলার পাশাপাশি ইংরেজি ভাষাও ভালো জানতেন। তাই বাংলার পাশাপাশি ইংরেজি ভাষায় সাংবাদিকতা করতে শুরু করেন। দৈনিক ইনডিপেনডেন্ট পত্রিকার তিনি ছিলেন সুনামগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি। এক পর্যায়ে জড়িত হয়ে পড়েন সাপ্তাহিক সুনামকণ্ঠের সাথে। ২০০১ খ্রিস্টাব্দের ১৩ জুলাই প্রথম আত্মপ্রকাশ করে আজকের দৈনিক সুনামকণ্ঠ। সুনামগঞ্জ শহরের পৌরবিপণিতে তখন সুনামকণ্ঠের প্রাথমিক অফিস শুরু হয়। পৌরবিপণিতে বসে বিজন সেন রায় পরিকল্পনা করলেন একটি দৈনিক বা সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশ করবেন। আমার সাথে পরামর্শ করলেন। আশ্বাস দিলাম সর্বাত্মক সহযোগিতার। যুক্ত হলেন আরও অনেকেই। মনেপড়ে পুলিন রায়ের কথা। তিনি সুনামকণ্ঠে দায়িত্ব পালন করেন। শাহার ভাই ছিলেন বার্তা সম্পাদক। মনে পড়ে আবুল হোসেন ভাই, সাজাউর ভাই, সাংবাদিক আকরাম উদ্দিন ভাই, এটিএম ইলিয়াস, শামস শামীম এবং সাজ্জাদ ভাইয়ের কথা। বিকেল হলেই আড্ডা হতো সুনামকণ্ঠ কার্যালয়ে। সাপ্তাহিক সাহিত্য আড্ডা হতো জমজমাট। এনএসআই কর্মকর্তা তোবারক আলী ছিলেন আড্ডার মধ্যমণি। চালু হলো সাপ্তাহিক কলাম। “পথচারী” নাম দিয়ে “পথে যেতে যেতে”। দিনে দিনে কলামটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠেছিল। এই কলামটিকে ঘিরে সৃষ্টি হলো প্রচুর কৌতূহল। সবাই জনাতে চায় এই কলামটি প্রকৃতপক্ষে কে লিখেন? কিন্তু লেখকের নাম প্রকাশ করা হয় না। কলামের বিষয়বস্তু থাকে নানা প্রসঙ্গে।
এর মধ্যে আমার বদলি হয়ে গেল চট্টগ্রামে। ২০০৪ খ্রিস্টাব্দের ১৭ নভেম্বর শাহার ভাই আমার চট্টগ্রামের ঠিকানায় চিঠি লিখলেন। উপরে আরবীতে লিখলেন, “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম”। সেই চিঠিতে লিখলেন বিজন দা, পুলিন দা, আবুল হোসেন ভাই, সাজাউর ভাই, আকরাম উদ্দিন, পাপন, এটিএম ইলিয়াস ভাইয়ের কথা। বিশেষ করে তাঁর একমাত্র ছেলে জিল্লুর রহমানের যুক্তরাজ্য যাওয়ার কথা জানিয়েছিলেন। সবকিছু ঠিক থাকলে জিল্লুর রহমান চলে যাবে ২০০৫-এর ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে। জিল্লুর রহমানও ঠিক চলে গিয়েছিল লন্ডন। কিন্তু পিতার সাথে সাক্ষাৎ হয়নি। ওসমানী নগরের গোয়ালাবাজারে ২০০৬ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর ভোরে এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান আমাদের শাহার উদ্দিন ভাই।
শাহার ভাই রেখে গেছেন অগণিত ভক্ত, শুভাকাক্সক্ষী। তাঁর হাতে হাত রেখে সাংবাদিকতার পাঠ নিয়ে এখন প্রতিষ্ঠিত অনেক সাংবাদিক। তিনি রেখে গেছেন পাঁচ সন্তান। সাবিনা ইয়াসমিন, ফরিদা ইয়াসমিন, জিল্লুর রহমান, রুমানা আক্তার ও সোনিয়া আক্তার।
শাহার ভাই নেই, কিন্তু তাঁর হাতে গড়া সাপ্তাহিক সুনামকণ্ঠ আজ রূপান্তরিত হয়েছে দৈনিকে। আজ প্রতিদিন বের হচ্ছে দৈনিক সুনামকণ্ঠ ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ায়। কার্যালয় স্থানান্তরিত হয়েছে শহরের মুক্তারপাড়ায়। মিডিয়ার অনেক প্রতিভাবান ব্যক্তিরা সংযুক্ত হয়েছেন সুনামকণ্ঠের সাথে। সুনামকণ্ঠ আজ সুনামগঞ্জের জনপ্রিয় দৈনিক। আশা করি সুনামকণ্ঠ এগিয়ে যাবে অনেক দূর। তৈরি হবে নতুন নতুন শাহার উদ্দিন আহমেদ। আমরা শাহার উদ্দিন ভাইয়ের আত্মার চিরশান্তি কামনা করি।