স্বাধীন বিচারব্যবস্থা গণতন্ত্রের পূর্বশর্ত

আপলোড সময় : ২২-১০-২০২৬ ১২:২৯:১১ পূর্বাহ্ন , আপডেট সময় : ২২-১০-২০২৬ ১২:৩২:১৩ পূর্বাহ্ন
প্রফেসর মোঃ শাহাদত হোসেন:
গণতন্ত্রের প্রাণ নির্বাচন, কিন্তু তার মেরুদ- স্বাধীন বিচারব্যবস্থা। নির্বাচন সরকার গঠন করে, আর স্বাধীন বিচারব্যবস্থা নিশ্চিত করে - সেই সরকার আইনের সীমার মধ্যে থেকে দেশ পরিচালনা করছে কি না। বিচার বিভাগ দুর্বল হলে সংবিধান হয়ে পড়ে কাগুজে দলিল, আইন পরিণত হয় ক্ষমতাবানদের হাতিয়ারে, আর নাগরিকের অধিকার নির্ভর করে শাসকের সদিচ্ছার ওপর। তাই স্বাধীন বিচারব্যবস্থা গণতন্ত্রের অলংকার নয়, অস্তিত্বের শর্ত। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কেউ আইনের উর্ধ্বে নন। শাসক ও সাধারণ নাগরিক - সবার জন্য আইন সমানভাবে প্রযোজ্য। এই নীতি কার্যকর করার দায়িত্ব বিচার বিভাগের। বিচার বিভাগ স্বাধীন না হলে ক্ষমতাবানদের অপরাধের বিচার বাধাগ্রস্ত হতে পারে, বিরোধী মতের মানুষ ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হতে পারে এবং নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার অনিরাপদ হয়ে পড়ে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে গণতন্ত্রের সংকটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্বলতা এবং ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ। বিচার বিভাগ যখন নির্বাহী বিভাগের প্রভাবমুক্ত থেকে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়, তখন ক্ষমতাসীনদের স্বেচ্ছাচারিতার পথ প্রশস্ত হয়। কারণ, যে রাষ্ট্রে শাসকের ক্ষমতার ওপর কার্যকর আইনি নিয়ন্ত্রণ নেই, সেখানে ক্ষমতার অপব্যবহার ঠেকানোর নিশ্চয়তাও থাকে না। স্বৈরাচারের সূচনা সব সময় বন্দুকের নল কিংবা প্রকাশ্য দমন-পীড়নের মধ্য দিয়ে হয় না; অনেক সময় শুরু হয় বিচারব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণে নেয়ার মাধ্যমে। বিচারক নিয়োগে দলীয় আনুগত্য প্রাধান্য পেলে, বিচারিক সিদ্ধান্তে রাজনৈতিক চাপ কাজ করলে কিংবা ক্ষমতাবানদের অন্যায়ের বিচার বাধাগ্রস্ত হলে আইনের শাসন দুর্বল হয়ে পড়ে। একপর্যায়ে শাসক নিজেকে আইনের ঊর্ধ্বে ভাবতে শুরু করেন। তখন রাষ্ট্র পরিচালিত হয় সংবিধানের বিধান অনুযায়ী নয়, বরং শাসকের ইচ্ছা অনুযায়ী। একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম বিচারব্যবস্থা থাকলে কোনো শাসকের পক্ষেই নির্বিঘেœ স্বৈরাচারী হয়ে ওঠা সহজ নয়। কারণ, স্বাধীন বিচার বিভাগ ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে সাংবিধানিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে, নাগরিকের অধিকার রক্ষা করতে পারে এবং নির্বাহী বিভাগের বেআইনি কর্মকা-ের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পারে। তবে এ জন্য বিচার বিভাগের প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতার পাশাপাশি বিচারকদের ব্যক্তিগত সততা, সাহস ও নৈতিক দৃঢ়তাও অপরিহার্য। বিচারকের মেরুদ- বলতে কোনো রাজনৈতিক পক্ষের প্রতি আনুগত্য বোঝায় না; বোঝায় সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে অবিচল থাকার সাহস। বিচারকের সামনে অভিযুক্ত ব্যক্তি সাধারণ নাগরিক হোন কিংবা রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর শাসক - বিচারের মানদ- হতে হবে একই। ক্ষমতাবানকে সন্তুষ্ট করা নয়, আইন ও বিবেকের নির্দেশ অনুসরণ করাই বিচারকের প্রকৃত মর্যাদা। যে বিচারক চাপের মুখে ন্যায়বিচার বিসর্জন দেন, তিনি শুধু নিজের দায়িত্বেই ব্যর্থ হন না; দুর্বল করে দেন রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ভিত্তিকেও। স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশের মানুষ ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র ও স্বাধীন বিচারব্যবস্থার স্বপ্ন দেখে আসছে। প্রত্যাশা ছিল, রাষ্ট্রের কোনো প্রতিষ্ঠান অন্যায়ভাবে নাগরিকের অধিকার হরণ করতে পারবে না; ক্ষমতাসীনদের অন্যায়ও আইনের আওতার বাইরে থাকবে না। কিন্তু বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, নিরপেক্ষতা ও কার্যকারিতা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, তা সেই প্রত্যাশা পূরণে ঘাটতির কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। মামলার দীর্ঘসূত্রতা, বিচারপ্রাপ্তির ব্যয় এবং প্রভাবশালীদের চাপের আশঙ্কা সাধারণ মানুষের আস্থাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে। এই বাস্তবতা থেকে উত্তরণের জন্য বিচার বিভাগকে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাবমুক্ত রাখা জরুরি। বিচারক নিয়োগ ও পদোন্নতিতে স্বচ্ছতা, যোগ্যতা ও সততা নিশ্চিত করতে হবে। বিচার বিভাগের প্রশাসনিক ও আর্থিক স্বাধীনতা কার্যকর করতে হবে। একই সঙ্গে বিচারকদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে এমনভাবে, যাতে জবাবদিহির নামে তাঁদের স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা খর্ব করা না হয়। কারণ, স্বাধীনতা ছাড়া ন্যায়বিচার দুর্বল হয়, আর জবাবদিহি ছাড়া স্বাধীনতা অপব্যবহারের ঝুঁকি তৈরি করে। তবে গণতন্ত্র রক্ষার দায় শুধু বিচার বিভাগের নয়। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন, কার্যকর সংসদ, নিরপেক্ষ প্রশাসন, স্বাধীন গণমাধ্যম এবং সচেতন নাগরিক সমাজও গণতান্ত্রিক ভারসাম্যের অপরিহার্য অংশ। কিন্তু এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা রক্ষায় স্বাধীন বিচার বিভাগের ভূমিকা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, শেষ পর্যন্ত সাংবিধানিক অধিকার লঙ্ঘিত হলে নাগরিকের ন্যায়বিচার পাওয়ার কার্যকর পথ থাকতে হয়। একজন শাসকের প্রকৃত মহত্ত্ব প্রকাশ পায় বিরোধী দলে থাকাকালে তিনি যে নীতি ও আদর্শকে ন্যায়সংগত মনে করেন, ক্ষমতায় গিয়েও তা বাস্তবায়ন করার মধ্য দিয়ে। ক্ষমতার বাইরে থেকে স্বাধীন বিচারব্যবস্থার পক্ষে কথা বলা সহজ; কিন্তু ক্ষমতায় গিয়ে নিজের ক্ষমতাকে বিচারিক পর্যালোচনা ও আইনের সীমার অধীন রাখাই প্রকৃত গণতান্ত্রিক মানসিকতার পরীক্ষা। যে শাসক স্বাধীন বিচার বিভাগকে ভয় পান, তিনি মূলত নিজের ক্ষমতার সীমাবদ্ধতাকেই ভয় পান। আর যে শাসক স্বাধীন বিচার বিভাগকে সম্মান করেন, তিনি জানেন - রাষ্ট্র কোনো ব্যক্তির স¤পত্তি নয়; রাষ্ট্র পরিচালিত হবে সংবিধান ও আইনের ভিত্তিতে। সংবিধানের ২২ অনুচ্ছেদে বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক করার নির্দেশনা রয়েছে। এর কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব। একই সঙ্গে রাজনৈতিক নেতৃত্বকে বুঝতে হবে, স্বাধীন বিচার বিভাগ সরকারের প্রতিপক্ষ নয়; বরং রাষ্ট্র ও জনগণের অধিকার রক্ষার গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, জার্মানি, দক্ষিণ আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া, ফ্রান্স প্রভৃতি দেশের বিচারব্যবস্থা শক্তিশালী হওয়ায় সেখানে শাসকগণ জবাবদিহি করতে বাধ্য থাকেন। ফলে তাদের পক্ষে স্বৈরাচার হওয়া সহজ নয়। বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে টেকসই করতে হলে শুধু সরকার পরিবর্তন যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ করতে সক্ষম স্বাধীন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা। বিচার বিভাগকে শাসকের অনুগ্রহের ওপর নির্ভরশীল রেখে সুশাসন প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়, স্বৈরাচারের পুনরুত্থানও ঠেকানো সম্ভব নয়। যে দেশে বিচারক নির্ভয়ে শাসকের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগ করতে পারেন, সে দেশেই নাগরিক নির্ভয়ে নিজের অধিকার দাবি করতে পারেন। আর যে দেশে শাসক আইনের উর্ধ্বে উঠে যান, সেখানে গণতন্ত্র শেষ পর্যন্ত নামমাত্র ব্যবস্থায় পরিণত হয়। স্বাধীন ও শক্তিশালী বিচারব্যবস্থা ছাড়া সুশাসন প্রতিষ্ঠা, নাগরিকের অধিকার সুরক্ষা এবং স্বৈরাচারের পুনরুত্থান প্রতিরোধ কঠিন। স্বাধীন বিচারব্যবস্থা তাই কোনো রাজনৈতিক স্লোগান নয়; এটি গণতন্ত্রের নিরাপত্তাবলয়, নাগরিকের শেষ আশ্রয় এবং আইনের শাসনের প্রধান ভিত্তি।
​​​​​​[লেখক প্রফেসর মোঃ শাহাদত হোসেন, সাবেক অধ্যক্ষ, সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজ, সুনামগঞ্জ]

সম্পাদকীয় :

  • সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি : মো. জিয়াউল হক
  • সম্পাদক ও প্রকাশক : বিজন সেন রায়
  • বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : মোক্তারপাড়া রোড, সুনামগঞ্জ-৩০০০।

অফিস :

  • ই-মেইল : dailysunamkantha@gmail.com
  • ওয়েবসাইট : www.sunamkantha.com